সাহিত্যে আমরা জীবনের গান শুনতে পাই। কেননা সাহিত্যের উৎসই জীবন। জীবনের ভাব-চিন্তা-প্রয়াসিই অভিব্যক্তি পায় সাহিত্যে। সাহিত্যের অনেকগুলো ধারা আছে। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, প্রভৃতি। আশা-নিরাশার কথন, স্বপ্ন-বাস্তবতা কখনো বা ঐতিহাসিক ঘটনা-চরিত্র নিয়েই গড়ে ওঠে গল্প-উপন্যাস। কবিতার বাস খুব সম্ভব ‘বোধের জগতে’। বাকী থাকলো প্রবন্ধ। প্রশ্ন হলো প্রবন্ধ কি? সহজ কথায় ‘সমকালীন দৈশিক ও জাতীয় জীবনের আনন্দ ও উদ্বেগ, প্রয়োজন ও সমস্যা, সাহিত্য ও স্বংস্কৃতি, সমালোচনা ও প্রশংসা, শিল্প ও সম্পদ, ধর্ম ও রাষ্ট্র, অনিয়ম ও অনাচার সহ মানব চিন্তা প্রসূত যা কিছু লিখিয়ে মানুষের বিবেকের ঘরে কড়া নাড়িয়ে দেওয়া হয় কিংবা আনন্দে-হতাশায় উদ্বেলিত করা হয় তার নাম’ই প্রবন্ধ’। প্রবন্ধে মানুষের বিদ্যা-বুদ্ধি, জ্ঞান-প্রজ্ঞা, মন-মনন, রুচি-সংস্কৃতি, আদর্শ-উদ্দেশ্য, ভাব-চিন্তা প্রভৃতি প্রতিবিম্বিত হয়। এ কারণেই প্রবন্ধ সাহিত্যে দেশগত ও কালগত জীবনের ভাব-চিন্তা-কর্মের প্রতিচ্ছবিটা যতটা স্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে, এমনটি গল্প-উপন্যাস-কবিতা এমনকি গান-নাটকেও ফুটে ওঠে না। প্রবন্ধেই একটা দেশের ও কালের মানুষের জীবন-দৃষ্টির একটা সামগ্রিক চিত্র মেলে।
এই যে ’প্রবন্ধ’ নিয়ে এতবড় একখান ভূমিকার জন্ম দিলাম তার পেছনে একটা উদ্দেশ্য আছে। হ্যাঁ নিজের পড়া সর্বশেষ ’প্রবন্ধ গ্রন্থ’ নিয়ে আলোকপাত করতেই লম্বা ভূমিকা। ভূমিকা থেকেই বুঝে যাওয়ার কথা প্রবন্ধের প্রতি পোষ্টদাতার প্রেম কতটা টুইটম্বুরে ভরপুর! সেই প্রেম সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে এ লেখা। সত্যিকার অর্থে একের ভেতর অসংখ্য চিন্তাধারা, প্রশ্ন, হতাশা, স্বপ্ন, ক্ষোভ, কাল’কে শুধু প্রবন্ধেই পাওয়া যায়। বাংলা সাহিত্যে উঁচু মানের ’প্রবন্ধ’ অনেক বেশি অবহেলিত। এখানে সৃষ্টিশীল প্রাবন্ধিক খুব বেশি নেই, রবীন্দ্রনাথ-প্রমথ চৌধুরী-হুমায়ুন আজাদ-আহমদ শরীফ-অধ্যাপক আবু সায়ীদ-আহমদ ছফার মধ্যেই সীমাবদ্ধ বাংলা প্রবন্ধের গন্ডি। যদিও ছফা যতগুলো সৃষ্টিশীল প্রবন্ধের জন্ম দিয়েছেন তার চেয়ে বেশি আবর্জনার জন্ম দিয়েছেন। যাই হোক ছফা প্রবন্ধ আলোচনা আরেকদিন। আজ আলোচনার বিষয় সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও তার প্রবন্ধ। লম্বা একটা বিরতি দিয়ে পড়লাম উনার লেখা প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘তাকিয়ে দেখি’। প্রবন্ধ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৪ সালে। লেখকের জীবনের মাঝ বয়সে (জন্ম ১৯৩৬)। কিন্তু লেখায় তার ছাপ নেই। বরং এক অভিজ্ঞ মানুষের সৃষ্টিশীল কথন হয়েছে প্রবন্ধ সংকলনটি। তরুণ দুটো চোখের পেছনে রাখা তীক্ষ্ণ বোধ, জাগ্রত বিবেক আর সচেতন প্রজ্ঞা দিয়ে দেখা সময় এবং জীবনকে সহজ গদ্যের ভাষায় লিখেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধরী।
মূলত নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা, মানুষের ভেতরকার আত্নকথা, জীবনে সমাজিক মূল্যবোধ, আর মানুষের যাপিত জীবনের নানান ছবি এঁকেছেন লেখক প্রবন্ধ সমগ্রটিতে। সতেরটি শিরোনামে লেখা প্রবন্ধের সবগুলো সম-পর্যায়ের হয়নি, হয় না ও কখনো। তাই সবলেখার পাঠানুভূতিও এক নয়। কিছুটা আত্ন-জীবনী মূলক প্রবন্ধ গ্রন্থটির কোথাও ফেলে আসা জীবনের জন্যে হতাশা, কোথাও পাপবোধ, কোথাও পিছুটান, কোথাও দায়-স্বীকার, কোথও বা নেহাত অভিজ্ঞতার বহি:প্রকাশ ঘটেছে লেখাগুলোতে। হিউমার, স্যাটায়ারের মাঝে আমাদের সংকীর্ণতাও কথাও প্রকাশ করেছেন লেখক। যেমন ’স্বপ্ন’ প্রবন্ধটির কথাই ধরা যাক। লেখক বলছেন ’আমার এক পরিচিত অধ্যাপক-ভদ্রলোক চিন্তায় পড়েছেন পরীক্ষার খাতা দেখে। ছাত্ররা যে খারাপ লেখে, তারা যে অজ্ঞ কি অবোধ সে নিয়ে তাঁর ভাবনা নয়। অজ্ঞতা সে তো থাকবেই, তার প্রতিকার আছে। কিন্তু তিনি দেখতে পেয়েছেন অসুখ, ভীষন সে অসুখ। বাংলা রচনা লেখার বিষয় ছিলো তিনটি। একটি শীতের রাত, উড়োজাহাজ ভ্রমণ, ও আমার উচ্চাকাঙ্খা। পরীক্ষার খাতায় দেখা গেল আর্টসের বেশিভাগ ছেলের পছন্দ শীতের রাত। গরম লেপের নীচে শুয়ে ভূতের গল্প শোনার চেয়ে আরাম নাকি এ জীবনে আর নেই! আর এই আরাম ভঙ্গের ভয়ে একজন নাকি বিছানায় প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দিয়েছে বহুবার! দুই চারজন লিখেছে উড়োজাহাজ নিয়ে, তাদেরি একজন বলছে ছোট ভাইকে প্লাটফর্মে বসিয়ে আমি গেলাম টিকেট কাটতে! এ যদি হয় সাধারণ জ্ঞান তাহলে সেটা কে আপনি অজ্ঞতা বলতে পারেন কিন্তু কিছু আর্টেসে পড়া ছাত্র উচ্চাকাঙ্খা হিসেবে লিখেছে ‘আমি ডাক্তার, আমি ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই! এটাও কি অজ্ঞতা নাকি অসুখ? কতিপয় দেশহিতৈষী বাসনা রাখে দেশের উন্নতি করবে, গোলা ভরা তুলবে ধান, পুকুর ভরে দেবে মাছে লিখেছে, কিন্তু কি করে করবে সেটি উহ্য থাকে। সেটা বোধহয় টপ সিক্রেট! এদের-ই মাঝে একজন আবার তার রচনা শেষ করেছে আচমকা জয় বাংলার ধ্বনি তুলে! শুধু একজন লিখেছে অসামান্য সাহসী আর সতিকার উচ্চাকাঙ্খার কথা। লিখেছে ’তার প্রেমিকা কে নিয়ে সে পালাবে! সব প্ল্যান করা, দুজনেই বাপের পকেট কাটবে, গয়না সরাবে তারপর পালাবে!
পুরো লেখাটা মানুষের নানান রকম ’স্বপ্নকে’ নিয়ে। সেই স্বপ্নের ইতি টেনেছেন এভাবে ‘দিবাস্বপ্নের ভেতর দিয়েই শিল্পকলার ক্ষেত্রে বড় বড় সৃষ্টি সম্ভব হয়েছে। বড় শিল্পী না হই, জীবনশিল্পী হবো না কেন?
‘অবসর’ নিয়ে লেখা প্রবন্ধটিও আমার দারুণ লেগেছে। বলছেন ’কাজের কাজ যখন করি তখন আমরা সকলেই সকলের মত, কিন্তু অকাজের বেলায়, অবসর-সময়ে, আমরা প্রত্যেকে বিভিন্ন। তখন আমরা প্রত্যেকে অনন্য ও অসামান্য, তখন আমরা স্রষ্টা ও সম্রাট। একটি সভ্যতা-সংস্কৃতির মানসলোকের গোপন খবর জানতে হলে তার জনগোষ্ঠির অবসর-বিনোদনের উপায় ও উপকরণগুলো খুঁজে নেয়া একটি অত্যুৎকৃষ্ট প্রন্থা। কাজ যদি হয় জীবিকার, অবসর তা’হলে জীবনের। অবসর দিয়েই জীবনকে চেনা যায়, অভাব কে জানা যায়। বড় বড় মনীষীরা জীবিকার জন্যে ’মেধাকে’ খাটিয়েছেন আর জীবনের জন্যে রেখেছেন মনীষাকে। বড় অবদান আমরা সবাই রেখে যাব না নিশ্চয়ই, রাখলে বিপদ ছিলো, সঙ্কুলান হত না স্থানের। কিন্তু জীবনকে সুখী ও স্বাভাবিক করার জন্যে নিজের মতন করে অবসরযাপন করব না কেন?