৮০র দশকের কাহিনী, এ গল্পের গল্পকথক হুমায়ুন আহমেদ তার মামাতো ভাইয়ের বিয়ে উপলক্ষে হাজির হয় এক মফস্বল শহরে। দূর্ঘটনাবশত সে রাতে বরপক্ষকে সেখানেই থেকে যেতে হয় এবং হুমায়ুন আহমেদের আশ্রয় মেলে নিঃসঙ্গ, চিরকুমার, কিছুটা সাধু স্বভাবের মানুষ সুধাকান্তবাবুর কাছে, যার বাড়িও কিনা তার স্বভাবের মতোই একটা জনবিরল এলাকায়। সেই জায়গার রাতের গা ছমছমে পরিবেশে সুধাকান্তবাবু হুমায়ুন আহমেদকে শোনায় তার জীবনে ঘটে যাওয়া এক ভৌতিক ঘটনার কথা।
এরপর হুমায়ুন আহমেদ ফিরে আসে তার দৈনন্দিন জীবনে। এই গল্প বলে আরও অনেককে, যা একান ওকান ছড়িয়ে শেষ পর্যন্ত পৌছায় মিসির আলির কাছে। প্যারানর্মাল ঘটনা সম্পর্কে আগ্রহী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজির অধ্যাপক মিসির আলি আসেন হুমায়ুন আহমেদের কাছে। যুক্তি দিয়ে চিন্তা করা মিসির আলির কিছু প্রশ্ন আছে সুধাকান্তবাবুর এই গল্প নিয়ে, যা কিনা এই প্যাঁচানো রহস্যের মোড়ই ঘুরিয়ে দেয়।
বছরের শেষের দিকে অ্যাকাডেমিক পড়াশোনার চাপে যখন বই পড়ার প্রতি মারাত্মক অনীহা জন্মাই, তখন হুমায়ুন আহমেদের বইগুলোই সেটার নিখুঁত প্রতিষেধক। যদিও এখন তাঁর শেষদিকের হিমু, মায়াকান্না জড়ানো মধ্যবিত্ত পরিবার সাথে রোমান্টিক কমেডি গল্প (লেখকের বেস্টগুলো না আবার)গুলো ভালো লাগে না। সেই হিসেবে তাঁর লেখা সায়েন্স ফিকশন আর মিসির আলি সিরিজের গল্পগুলোই প্রেফার করব। আর এ শীতের রাতে কম্বলের তলায় অতিপ্রাকৃত কাহিনী আর মিসির আলির রহস্য যুক্তির খেলা ভালোই জমবে ভেবে গুডরিডসে মিসির আলি সিরিজের বেশ প্রশংসিত এই বইটা ধরা।
মিসির আলি সিরিজটা পুরো বাংলা সাহিত্যেই এক অনবদ্য সৃষ্টি। প্রকাশকাল বিবেচনায় গতানুগতিক ভূতের গপ্পোকে পাশ কাটিয়ে প্যারানর্মাল অ্যাক্টিভিটি, হিউম্যান সাইকোলজি, যুক্তিতর্কের খেলা দিয়ে সাজানো এই গল্পগুলো অবশ্যই ইউনিক। এমনকি বর্তমান সময়ের প্রচুর সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার, সাইফাই কিংবা হরর বইয়ের আনরিয়েলেবল ন্যারেটর, মাল্টিপল রিয়েলিটি, বডি হরর এমনকি ল্যাভক্রাফটিয়ান হররের উপাদানগুলো দেখেও মনে পরে যায় মিসির আলি সিরিজের গল্পগুলোর কথা। সেইসাথে হুমায়ুন আহমেদের স্বতন্ত্র চরিত্রায়ন যাতে চরিত্রগুলোর মানবিক অনুভূতি অল্পেও ফুটে ওঠে ভালোভাবে।
'বৃহন্নলা' বইটার মধ্যেও এইসব উপাদানই বিদ্যমান এবং তা খুব গোছানোও। গল্পটা ছোট পরিসরের, তবুও তার মাঝে মূল রহস্য, সেটার জটিলতা এবং মিসির আলি সিরিজের খুব অল্প কিছু বইয়ের মতো শেষমেশ একটা পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত সমাধান আর সমাপ্তি সবই খুব গুছিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। চরিত্রায়নও ভালো, সুধাকান্তবাবুর জটিল মনস্তত্ত্ব, মিসির আলির ভিন্নধর্মী আচরণ, চিন্তার ধরণ সেই সাথে কোমল হৃদয়ের বহিঃপ্রকাশ, এমনকি লেখকের নিজের ফিকশনাল রুপ সবই ভালো হয়েছে।
তবুও কিছুটা আক্ষেপ রয়ে গেল। প্রথম কারণ এই বইটা আমার আগে পড়া ছিল, কাহিনী প্রায় সব ভুলে গেলেও গল্পের মাঝামাঝি এসে মূল টুইস্টটা মনে পরে যাওয়ায় মজাটা একটু কমে যায়। আর গল্পটা প্রকাশকাল বিবেচনায় কিছুটা ইউনিক হলেও, আজকের দিনে বেশ সাদামাটা। আমি মিসির আলির গল্পে আরও বেশী জটিলতা আশা করি, যা এই বইয়ে একটু কম, আর মূল টুইস্টটা জানা থাকায় তা আরও কমে যায়।
📚 বইয়ের নাম : বৃহন্নলা
📚 লেখক : হুমায়ুন আহমেদ
📚 বইয়ের ধরণ : সাইকোলজিক্যাল হরর, মিস্ট্রি থ্রিলার
📚 ব্যক্তিগত রেটিং : ৩.৫/৫