'মানুষ শক্তি ও কবি শক্তির অস্তিত্বের একটা বড়ো অংশ অধিকার করে ছিল রবীন্দ্রনাথের গান, সারাদিনে একটাও কলি গেয়ে ওঠে নি এমন দিন ওর একটাও গেছে বলে মনে হয় না - অন্তত কবি হয়ে ওঠবার পর থেকে।... রবীন্দ্রনাথের গান গাইতে ভালবাসত শক্তি, তাছাড়া অন্য কোনো গানই প্রায় গাইত না।'- একথা লিখেছেন কবির অন্তরঙ্গ বন্ধু তাঁর স্মৃতিচারণে। গান ছাড়া অন্যান্য সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে সাধারণ্যে শক্তির রবীন্দ্রবিরূপতার কথাই প্রচলিত, বিনম্র শ্রদ্ধাটি নয়, সেগুলি পূর্ণ প্রকাশিত কবিতা বা কবিতাংশের মধ্যে। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে প্রথম জীবনে শক্তির একটা গ্রহণ বর্জনের লুকোচুরি খেলার সম্পর্ক থাকলেও পরবর্তীকালে স্বীকার করেছিলেন - 'উনি এসেই পড়েন, উপায় নেই'। অগ্রজের কাছে অনুজের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ 'তুমি তারই পুজা নেবে আজ'।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়-এর জন্ম ২৫ নভেম্বর ১৯৩৩, বহড়ু, চব্বিশ পরগনা। শৈশবে পিতৃহীন। বহড়ুতে মাতামহের কাছে ও বাগবাজারে মাতুলালয়ে বড় হন। পড়াশোনা: বহড়ু হাইস্কুল, মহারাজা কাশিমবাজার স্কুল, প্রেসিডেন্সি কলেজ; যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্যে অধ্যয়ন অসমাপ্ত। বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকায় ‘যম’ কবিতা লিখে (১৯৫৬) সাহিত্যজগতে প্রবেশ। যুক্ত ছিলেন কৃত্তিবাস পত্রিকার সঙ্গে। ‘কবিতা সাপ্তাহিকী’ পত্রিকা প্রকাশ করে আলোড়ন তুলেছিলেন কবিতাজগতে৷ প্রণীত, অনূদিত-সম্পাদিত কবিতা ও গদ্যগ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক, তা ছাড়া অজস্র অগ্রন্থিত রচনা ছড়িয়ে আছে পত্রপত্রিকায়। পেয়েছেন আনন্দ পুরস্কার, সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, সম্বলপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গঙ্গাধর মেহের পুরস্কার, মরণোত্তর রবীন্দ্র পুরস্কার। জীবিকাক্ষেত্রে সাংবাদিক হিসেবে যুক্ত ছিলেন আনন্দবাজার পত্রিকার সঙ্গে। অতিথি-অধ্যাপক হিসেবে বিশ্বভারতীতে সৃষ্টিশীল সাহিত্যের অধ্যাপনায় রত থাকাকালীন অকস্মাৎ হৃদরোগে শান্তিনিকেতনে মৃত্যু, ২৩ মার্চ ১৯৯৫।
রবীন্দ্রনাথ কে নিয়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের তিনটি গদ্য লেখা, একটি সাক্ষাৎকার আর কয়েকটি কবিতা। শক্তি,সুনীল একসময় রবীন্দ্রবিরোধিতা করেছেন রবীন্দ্র সাহিত্য বলয় থেকে বাংলা কবিতাকে মুক্ত করতে।রবীন্দ্রনাথের প্রকাশ্য বিরোধিতা করলেও তারা ছিলো রবীন্দ্রের গভীর অনুরাগী । শক্তি এই বইয়ে তাঁর রবীন্দ্রনাথের গানের প্রতি মুগ্ধতা ব্যক্ত করেছেন। গদ্য রচনাগুলো ফরমায়েসি লেখা যে বোঝা ই যায়, কোন ইনসাইট নেই তবে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লেখা কবিতাগুলোর জন্য এই ক্ষুদ্র বইটি হাতে নেওয়া যায়।
একজন কবির প্রয়াণদিবস আরেকজন ভবিষ্যৎ কবির মনে যে বিষাদ সৃষ্টি করেছিলো সেই বিষাদই হয়তো এই সংকলিত বইটিকে পাঠক অব্দি পোঁছে দিয়েছে। শক্তি চট্টোপাধ্যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি কতখানি অবসেসিভ ছিলেন তা এই বইটি পড়লে সহজেই অনুমান করা যায়। সাধারণ দৃষ্টিতে তাঁকে রবীন্দ্রবিরূপ মনে হলেও তিনি আসলে তাঁর জীবনে ও মননে রবীন্দ্রনাথকে ধারণ ও লালন করেছেন। তাইতো তিনি লিখেছেন- 'কখনো সমুদ্রে তাঁকে করেছি সন্ধান কখনো পাথরে কখনো হেমন্তে শান্ত মানসিক ঝড়ে বৃষ্টিতে খরায় ফুলে শিকড়ে কখনো'
শক্তির কিশোর মন আর কবিগুরুর প্রয়াণদিবসের সেই টুপটাপ বৃষ্টি মিলেমিশে যেই মেলানকোলিয়া তৈরি করেছিলো, সেই মেলানকোলিয়া চিরকালই তাঁকে ভাবিয়েছে। তাইতো তিনি রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করার উপায় খুঁজেফিরেও শেষটায় গিয়ে বলেন- 'উনি এসেই পড়েন, উপায় নেই'।
তিনি রবীন্দ্রনাথকে যেমনি ভালোবেসেছেন, তেমনই আবার সমালোচনাও করেছেন। কলকাতার মতো ডিটেইলসে পরিপূর্ণ একটি শহর কিভাবে রবীন্দ্রনাথের লেখায় সাবজেক্ট হলোনা, তাঁর নাটক, তাঁর কবিতা, সবকিছু নিয়েই তীক্ষ্ণ সমালোচনা করেছেন; কিন্তু পরক্ষণেই যখন আবার তাঁকে নিয়ে বলেন 'তুমি আমার অশ্রু কাদাময়', তখনই বোঝা যায় রবীন্দ্রনাথের প্রতি শক্তির সমালোচনা আর মুগ্ধতা দাঁড়িপাল্লার একপাশেই অবস্থান করে। এদেরকে পৃথক করার উপায় নেই।
এই বইটি আমার কাছে অসাধারণ লেগেছে। তিনটি প্রবন্ধ, একটি সাক্ষাৎকার আর কবর লেখা কবিতা দিয়ে বইটির সমাপ্তি টানা হয়েছে। রবী ঠাকুরকে বাদ দিয়ে স্বতন্ত্র ধারার কবিতা লিখেছেন কবি। তিনি যেমন ভাবে রবী ঠাকুরকে ভালোবেসেছেন তেমনি সমলোচনা করতেও কুন্ঠিত হোননি। কবির শেষের কবিতা যেভাবে জীবন্ত হয়েছে সবার কাছে সে তুলনায় 'সোনার তরী, বলাকা' এত ছাপ পেলেনি। তার নাটক গুলোর চরিত্র ও যে জীবন্ত হয়ে ওঠে নি তাও কবি দেখিয়েছেন। রবী ঠাকুরও তা বুঝতে পেরেছিলেন শেষ বয়সে। তাই তো অকপটে শিকার করে গেছেন, 'শেষ লেখা'. রবীন্দ্রনাথ প্রভাব থেকে বের হয়ে শক্তিদা যে অন্য জগৎ তৈরী করেছিলেন তা অভাবনীয়। রবি ঠাকুরের গানের করেছেন ভূয়সী প্রশংসা। তিনি এও বলেছেন, কোন দিন বাদ যায় না রবীন্দ্র সঙ্গীত ছাড়া। রবীন্দ্রনাথকে সকলে ভালবাসে। তার আসনে তাকে বসিয়ে আমাদের তার সাথে চললে কি হবে? তার থেকে বের হয়ে না আসতে পারলে নতুন ধারার লেখক তৈরী হবে না।
"তুমি আমার অশ্রু কাদাময়" যখন তিনি বলেন এই কথা রবী ঠাকুরকে নিয়ে মন ভরে যায়। শুধু পড়তে ইচ্ছে করে।
এই বইটি অসাধারণ একটি বই। সব কিছুর একটি ফাঁকফোকড় থাকে এটিতেও আছে। তবুও নন্দনশৈলী মন্ত্রমুগ্ধকর।