বিজ্ঞানের সাথে ধর্মের দ্বন্দটা আপাতত চিরন্তন। অন্য ভাষায় বলতে গেলে এটা হচ্ছে ‘পুরোনো’র সাথে ‘নতুনে’র দ্বন্দ। এই ‘নতু্নত্ব’ পরিচয়টা একই সাথে বিজ্ঞানের জন্য অ্যাডভানটেজ আবার ডিসঅ্যাডভান্টেজ। অ্যাডভান্টেজ এই কারণে, ধর্ম বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে তার পুরোনো বর্ম নিয়ে ডিফেন্ড করছে আদিকাল থেকে, বিজ্ঞান নতুনত্ব’র মাধ্যমে নিজের অস্ত্রাগার আরও সমৃদ্ধ করছে ধর্মের বর্ম গুড়িয়ে দিতে, তাই নতুনত্ব এখানে ব্লিস। আবার নতুনত্ব ডিসএডভান্টেজ এই কারণে নতুনত্ব মানেই অডিটি(Oddity)। আর অডিটি মানেই, ল্যাক অফ নাম্বারস। অন্যদিকে ধর্মের মূল অস্ত্রই হচ্ছে সংখ্যা। এবং দিনশেষে সবকিছু সংখ্যাতেই এসে ঠেকে। কারণ সংঘবদ্ধতা সারিভাইভ্যালের বেটার চান্স দেয়। মানুষও চালাক অনেক। সে সারভাইভ করতেই আসছে পৃথিবীতে, সে টুক করে ঢুকে যায় কোনও একটা সংখ্যাগুরু দলে (আসলে সে তো জন্মই নেয় একটা দলে। ঢুকে যাওয়া বলতে বুঝালাম সে তার দলে নিজের অবস্থানটা পাকাপোক্ত করে আর কী)। এই পাকাপোক্ত করার সিদ্ধান্তটা তার কাছে এই জন্য সহজ, কারণ ধর্মের কাছে ‘সংখ্যা’ আছে আর আছে একটা পরিপূর্ণ গাইডলাইন। অন্যদিকে বিজ্ঞান কোনো পরিপূর্ণতার মধ্যে আবদ্ধ নাই, বেড়ে চলাই এর বৈশিষ্ট্য। বিজ্ঞানের কিছু খামতির মধ্যে একটা হল, বিজ্ঞান তার নিজের আপাত সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে অবগত (আপাত সীমাবদ্ধতা বললাম, বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা আসলে নাই)। এই আপাত কিছু সীমাবদ্ধতার মাঝে অন্যতম টপিক হল মহাবিশ্বের উৎপত্তি।
অভিজিৎ রায়ের এই বইটায় এই টপিক নিয়ে কাঠখোট্টা কিছু কথাবার্তা আছে। তবে অভিজিৎ রায় কাঠখোট্টা জিনিসগুলো বেশ মুখরোচক ভাবে ব্যক্ত করেছেন বলতে হয়। বিজ্ঞানের সাথে একটু আধটু যোগাযোগ থাকলেই সবারই এই বই পড়তে পারার কথা। যা বলছিলাম, বিজ্ঞানের যে আপাত সীমাবদ্ধতাটা এর কারণেই আমাদের মহাবিশ্বের উৎপত্তির এই পুরো গল্পটা একটুখানি অসম্পূর্ণ আছে। তাই বিজ্ঞান আর ধর্ম, দুই প্রতিদ্বন্দীই তাকিয়ে আছে একই বান্দার দিকে। সে হল বিশ্বাস। এখন পুরো ব্যাপারটাই এমন অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে যে কোনটার বিশ্বাসযোগ্যতা বেশি। এই বিশ্বাসযোগ্যতা কিন্তু আমাদের পুরোনো বন্ধু ‘সংখ্যা’র মতই। এখন দেখার বিষয় বিজ্ঞান তার গতি আর কত বাড়াতে পারে আর অসম্পূর্ণ গল্পটার সমাপ্তি টানতে পারে। যদি ভবিষ্যতে সমাপ্তও হয় তবুও বিজ্ঞানের পাল্লা যে খুব বেশি গতিতে ভারী হবে সেটা ঠিক বলা যাচ্ছে না। কারণ পৃথিবীতে আজও ফ্ল্যাট আর্থার’রা বিরাজ করে। দিনশেষে সবকিছু সংখ্যার খেল। চোখে কালো পট্টি বেঁধে যদি আপনি সংখ্যাগুরুর বর্মে নিজেকে সজ্জিত করেন তাহলে আলো আপনার কাছে ট্যাবুই।