প্রখ্যাত ভারতীয় সাংবাদিক ও লেখক খুশবন্ত সিংয়ের বয়স তখন ৯৮ চলছে। ১৬৫ পাতার এই বইটি দীর্ঘজীবন পেরিয়ে এসে তাঁর লাভ-ক্ষতিতে কী শিক্ষা পেলেন জীবন থেকে তারই আত্মদর্শন। আবার পুরো বইকে স্মৃতিচারণা বলা অনুচিত কেননা স্মৃতি রোমন্থন করে যা লিখলেন তা "লাইফ লেসন্স"ও বটে।
এত দীর্ঘায়ু পেয়েছেন এমন লিখিয়ে উপমহাদেশে, বিশেষত, ইংরেজিতে লিখেছেন এমন একজনের সাথেই তুলনা চলে খুশবন্ত সিংয়ের। তিনি নীরদ সি চৌধুরী। চৌধুরী আর সিং দু'জন দুইপ্রান্তের লিখিয়ে। ধরন বিচারে তা বলাই যায়। অথচ অতীত হাতড়ে কলমের কালিতে যা প্রকাশ পেল তাতে দুইজনের ভাবগতিকে অনেক মিল পেলাম পড়তে গিয়ে। একেই বোধহয় বলে, ভদ্রলোকের বন্ধু ভদ্রলোক!
অতিকথন থাক। এই বইটি লেখবার সময়কার প্রেক্ষাপট আর শেষ বয়সে এসে খুশবন্ত সিং প্রথমেই লিখেছেন,
"In my ninety-eighth year, I have little left to look forward to, but lots to reminisce about. I draw a balance sheet of my achievements and failures. On the credit side I have over eighty books: novels, collections of short stories, biographies, histories, translations from Punjabi and Urdu, and many essays. On the debit side is my character."
আত্মস্মৃতি পড়া নিয়ে আমার আলাদা আকর্ষণ আছে। বাঙালি (মহা)পুরুষদের স্মৃতিকথায় স্বর্গীয় দূতদেরও গুণে,জ্ঞানে, পবিত্রতায় ছাড়িয়ে যাওয়ার বিশেষ প্রবণতা লক্ষণীয় ( শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের আত্মকথাকে সে ক্যাটেগরিতে ফেলা যাবে না)। কিন্তু খুশবন্ত সিং যা নিজের সম্পর্কে ভাবেন তা অকপটে লিখেছেন এই বইতে।
দিল্লি শহরের কথা লিখেছেন। ১৯১১ সালেরও আগে এসেছিলেন দিল্লিতে। ঠিকাদার পিতার ব্যবসা ফুঁলেফেঁপে উঠে। একই সাথে নিজের বিভিন্ন দিকে দক্ষতাও প্রকাশ পেতে থাকে। স্কুল কিংবা কলেজে ছাত্র হিসাবে ভালো ছিলেন না তিনি। অথচ স্কুলের এক শিক্ষক ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল তিনি লেখক হবেন!
যে সময়ে লিখতে বসেছেন তখন তাঁর সংসারধর্ম মোটামুটি ত্যাগ করার কথা। বারবার লিখেছেন এখন তাঁর সন্ন্যাসীর ন্যায় জীবনকে যাপন করা উচিত। কেন তাঁর এরূপ উপলব্ধি?
তাঁর সমসাময়িক কেউই তখন বেঁচে নেই। সারাদিন অনেকটা একাই কাটান সময়। বসে ভাবেন নিজের তারুণ্যের কথা। প্রকৃতিকে গভীরভাবে দেখতে বলেন পাঠককে। কেননা জীবন তাকে এটাই শিখিয়েছে।
প্রচুর পড়ছেন। অথচ বিন্দুমাত্র জ্ঞানের গরিমা নেই। লিখেছেন লেখক হবার কৌশল নিয়ে। বলেছেন লেখক হবার ক্ষমতা জন্মলব্ধপ্রাপ্ত। উপদেশ দিয়েছেন। অথচ যখন পড়েছি তখন মনে হচ্ছিল যেন কথার পিঠে কথা বলছেন বৈঠকি আমেজে। লিখেছেন,
"To be a good writer, you have to be totally honest and not afraid to speak out. You have to have the ability to work hard and the stamina for a long haul. Sometimes you will sit for hours staring at a sheet of blank paper in front of you. You will have to have the determination not to get up till the sheet is filled with writing. It doesn’t matter if you fill it with rubbish. The discipline will prove worthwhile.Practise as much as you can. Keeping a diary, writing letters, emails—even that is good exercise."
নারী, মদ্য - এদুয়ের প্রতি ঘোরতর প্রীতি ছিল খুশবন্ত সিংয়ের। যৌনতার পক্ষে সুপারিশে তাঁর যৌনতা সংশ্লিষ্ট অধ্যায়টি পড়লে মনে হবে কামই সব। কাম ব্যতীত কেউই সুখে হতে তো পারেই না। এমনকি কামকেই একমাত্র সুখের আশ্রয়স্থল গণ্য করেছেন। খুশবন্ত সিংয়ের সাথে এখানেই দ্বিমত করার সুযোগ, কামই সব নয়। কিংবা কামজ সম্পর্ক ছাড়াও সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতর অন্যান্যরূপকে রীতিমত এড়িয়ে গেছেন খুশবন্ত সিং।
আর তাঁর মদ্যপ্রীতি বোঝাতে বারবার মির্জা আসাদুল্লাহ খান গালিবের কথা আনছিলেন। বোঝাতে চাচ্ছিলেন মদিরা ছাড়া দুনিয়া অচল। মদ্যপ্রীতির এহেন কথাবার্তা পড়তে গিয়ে মাথায় আসছিল আরেক বিখ্যাত বাঙালি সুরারসিক তারাপদ রায়ের কথা। নীরদ সি চৌধুরীও কিন্তু বিখ্যাত সুরারসিক (স্মৃতিচারণাগুলো তাই বলে)।
লেখকের সাংবাদিকতার শুরু ১৯৬৯ সাল থেকে। "ইলাস্ট্রেটেড উইকলি" ম্যাগাজিনের মাধ্যমে। সাংবাদিকতা নিয়ে লিখতে গিয়ে নিরপেক্ষতার প্রশ্নটি তুলেছেন। যা লিখেছেন তা সবদেশের জন্যই সমভাবে প্রযোজ্য। খুশবন্ত সিং মনে করেন,
"You have to be able to hold the reader’s attention. If you can’t capture the reader’s interest in the first few lines, then you’ve lost him."
কবিতার প্রতি অসম্ভব দুর্বল ছিলেন খুশবন্ত সিং। পুরো বইতে বহুবার উর্দু, ইংরেজি সব কবিতার উদ্ধৃতি কাব্যবিমুখ পাঠককেও করে তুলবে কবিতার প্রতি অনুগ্রহপ্রার্থী।
দেশভাগ নিয়ে আলাদা একটা স্ট্যান্ড লেখকের ছিল। তাঁর ভাষায়,
"As the time neared for the British to leave, Muslims began to feel uneasy at the prospect of living in a Hindu-dominated India."
কেন মুসলমানরা হিন্দুদের দ্বারা শাসিত হবার ভয়ে ভীত ছিল সেকারণের কোনো ইঙ্গিত লেখাতে নেই। সরাসরি একটি পক্ষকে পরোক্ষভাবে দায়ী করা নিরপেক্ষতার লক্ষণ তো নয়ই, বরং তা সত্যকে অস্বীকার করার শামিল।
গান্ধিভক্ত খুশবন্ত সিং স্বভাবতই এমকে গান্ধিকে নিয়ে কোনো আক্ষরিকঅর্থেই বিশ্লেষণী লেখা লিখতে চাননি। যা লিখেছেন তা গুরুস্তুতিমাত্র।
রবীন্দ্রনাথ প্রাণ কবিতায় লিখেছিলেন,
"মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে ,
মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই ।"
ছাঁচীকৃত ধারণা হল সবাই দীর্ঘায়ু চায়। জীবনের শেষপ্রান্তে এসে খুশবন্ত সিং উল্টো লিখেছেন,
"The truth is that I want to die. I have lived long enough. Whatever I wanted to do in life, I have done. So what is the point of hanging on to life with nothing whatsoever left to do?"
ভূয়োদর্শী দুর্দান্ত এক রসিক খুশবন্ত সিংয়ের "খুশবন্তনামা" চমৎকার সাবলীল গদ্যে লেখা। ইংরেজিকে কতটা পাঠকবোধ্য করে লেখা সম্ভব (যদি মূল পাঠক হয় ভারতীয় উপমহাদেশিয়রা) তা খুশবন্ত সিংয়ের কাছ থেকে শেখা যেতে পারে।