Ahmed Sofa (Bangla: আহমদ ছফা) was a well-known Bangladeshi philosopher, poet, novelist, writer, critic, translator. Sofa was renowned for his intellectual righteousness as well as his holistic approach to the understanding of social dynamics and international politics. His career as a writer began in the 1960s. He never married. On 28 July 2001, Ahmed Sofa died in a hospital in Dhaka. He was buried in Martyred Intellectuals' Graveyard.
Sofa helped establishing Bangladesh Lekhak Shibir (Bangladesh Writers' Camp) in 1970 to organize liberal writers in order to further the cause of the progressive movement.
Ahmed Sofa's outspoken personality and bold self-expression brought him into the limelight. He was never seen hankering after fame in a trivial sense. His fictions were often based on his personal experience. He protested social injustice and tried to portray the hopes and dreams of common people through his writing. Sofa always handled his novels with meticulous thought and planning. The trend of telling mere stories in novels never attracted him; he was innovative in both form and content.
' যে যেভাবেই ব্যাখা করুন, বাংলাদেশে একটি মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছে। রাশিয়া চায়নি, আমেরিকা চায়নি, ভারত চায়নি, চীন চায়নি, পাকিস্তান চায়নি বাংলাদেশে বাঙালিদের একটি জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হোক। ' - আহমদ ছফা
পঞ্চাশের দশক থেকে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি স্বায়ত্তশাসনের দাবি করে আসছিল। কিন্তু তখন দশটির এই ন্যায্য দাবিকে অন্যান্য রাজনৈতিক দল সমর্থন করেনি, বরং ন্যাপকে 'ভারতের চর', 'নেহেরু আ্যডেড পার্টি' এবং 'ইসলাম ও পাকিস্তানের শত্রু' বলে গালাগাল দিয়েছে। ন্যাপ যখন স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানাচ্ছে, তখন আওয়ামী লীগের নেতা সোহরাওয়ার্দী সাহেব গর্বভরে বলছেন, শতকরা আটানব্বই ভাগ স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়েছে এবং লীগের পাণ্ডারা তা শুনে হাততালি দিচ্ছেন।
ষাটের দশকে এই পরিস্থিতি পালটে গেল। এদেশের বামপন্থী দলগুলো চীন-রাশিয়ার প্রেসক্রিপশনে রাজনীতি করে৷ মস্কোপন্থিরা তাদের মক্কা রাশিয়ায় ঘুরে আসে, চীনপন্থিরা নিজেদের কিবলা পিকিংয়ে সফরে যেতো। তাই ভারতকে ঠেকাতে আইয়ুব চীনমুখী হলে, চীনপন্থিরা ভাবলো আইয়ুবের ঘাড়ে ভর করে সমাজতন্ত্র কায়েম করে ফেলবে। মস্কোপন্থিরা অবশ্য বিপদে পড়লো। যারা আইয়ুবের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারতো, তাদের বিভক্তির সুযোগ আইয়ুব নিলেন। এ প্রসঙ্গে ছফা আফসোস করে লিখেছেন,
' অঞ্চল-বহির্ভূত রাজনৈতিক অন্ধ-আনুগত্যের এমন বেদনাদায়ক নজির বোধ করি দুনিয়ার ইতিহাস সন্ধান করলেও অধিক পাওয়া যাবে না। '
মস্কো এবং পিকিংপন্থিদের আত্মকলহের সময়ে আবির্ভূত হলেন শেখ মুজিবুর রহমান। উত্থাপন করলেন ছয়দফা প্রস্তাব। জনগণ লুফে নিলো। এদিকে বামপন্থিরা এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানানোর বদলে এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে বিষোদগার করার ঐতিহাসিক ভুল করলো। রুশপন্থিরা ভ্রম সংশোধনে এগিয়ে আসবার চেষ্টা করলেও ততদিনে দেরি হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ বামপন্থিদের সহযাত্রী হিসেবে একই নায়ে নিতে রাজি নয়। অবশ্য এ হলো একাত্তরের আগের ঘটনা।
একাত্তরে ভারতের ক্ষমতাসীন কংগ্রেস নিজ দেশেই নানা বিপদে পর্যদুস্ত। ভারতের অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে থামিয়ে দেওয়া গেল মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। ছফা লিখেছেন,
' কংগ্রেসের সুচতুর প্রচারণার দরুণ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামকে ভারতের জনগণ এভাবে বুঝেছেন যে জিন্নার দ্বি-জাতি তত্ত্ব মিথ্যা হতে যাচ্ছে, পাকিস্তান ভাঙ্গন আসন্ন হয়ে উঠেছে এবং শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশি জনগণ যে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছে তা মূলত কংগ্রেসের ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের অসমাপ্ত পর্যায়। '
ছফা মনে করেন, ভারত পাকিস্তানকে শায়েস্তা করতে চেয়েছিল। কিন্তু ভাঙতে চায়নি। কেননা ভারতের মতো বহুভাষী এবং বহুজাতিক রাষ্ট্রের নাকের ডগায় ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদকে কেন্দ্র করে একটি নয়া রাষ্ট্রের পত্তন হোক তা ভারতের কাম্য হতে পারে না। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাকে ভারতের কোনো কোনো অঙ্গরাজ্য উদাহরণ হিসেবে নিতে পারে বলে ভয় ছিল ভারতের। আহমদ ছফার সাথে একমত পোষণ করে খানিকটা দ্বিমত জানাব। ভারতের চরম শত্রু পাকিস্তানকে ভাঙার এমন সুযোগ ভারত কেন হারাতে চাইবে? অবিভক্ত পাকিস্তানের চাইতে বিভক্ত পাকিস্তানকে মোকাবিলা অনেকবেশি সহজ নয় কি? দ্বিতীয়ত, ষাটের দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভারতের স্বাধীনতাকামীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিতো পাকিস্তান - এমন একটি অভিযোগ ছিল। স্বাধীন বাংলাদেশ তা করবে না বলেই ধরা যায়। সেদিক থেকে দেখলে পাকিস্তানকে দুর্বল করার বদলে ভেঙে দেওয়াই বেশি যৌক্তিক নয়?
ভারত রাজনৈতিক মীমাংসা চাইলেও বাংলাদেশের তা মেনে নেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। কারণ ততদিনে বাঙালির একটাই লক্ষ্যে দৃঢ়বদ্ধ হয়েছিল তা হলো স্বাধীনতা। তাই আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ভেবেছিলেন ভারত শুরুতেই সামরিক হামলার মাধ্যমে দেশ মুক্ত করে দেবে এমন ভ্রান্তি ঘুচলে লাগলো। কেননা,
' কার যুদ্ধ কে করে? মুসলমান কিংবা কমিউনিস্ট সকলকেই নিজের লড়াই নিজেকে করতে হয়। '
ভারতের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। পরিস্থিতি নাজুক। ছফা লিখেছেন,
' এই সময় পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশে এলেন। তাঁর বড় বড় হুঙ্কার দেওয়া ছাড়া করার কিছুই ছিল না। '
বঙ্গবন্ধুর 'করার কিছুই ছিল না' কথাটা শুনতে খারাপ লাগে। তবে কথাটা একেবারে অসত্য নয়। একদিকে দলীয় কর্মীদের লুটপাট এবং অন্যদিকে তাঁর বিরুদ্ধে পাকিস্তানপন্থি এবং বামপন্থিদের একটি অংশের অপপ্রচারের বিরোধিতা শেখ সাহেবকে 'একঘরে' করে ফেলেছিল। এই অবস্থার বর্ণনা ছফার কলমে,
' আওয়ামী লীগের যাবতীয় অপকর্মের সমালোচকদের 'চীন-পাকিস্তানের এজেন্ট' বলে তারা গলা চড়িয়ে বেড়াত। প্রকৃত সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধির গোড়ায় আঘাত দেওয়ার মত কোন কর্মসূচি তাদের পক্ষেও গ্রহণ করা একরকম অসম্ভব ছিল। '
মস্কোপন্থি কমিউনিস্ট পার্টি এবং ন্যাপের নিজেদের কোনো যোগ্যতার বালাই ছিল না। ভারত-রুশের সাথে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের সম্পর্ককে পুঁজি করে এরা শেখের ঘাড়ে সিন্দাবাদের বুড়োর মতো ভর করে।
ছফার লেখা পড়লে একটি বিভ্রান্ত তৈরি হওয়ার সুযোগ আছে। তাঁর সকল যুক্তিকে 'ভালো'যুক্তি বলে গ্রহণ করা যাচ্ছিল না। বিশেষত, ভারত-বিরোধিতা নিয়ে ছফার বক্তব্য সর্বাঙ্গে বিদ্বেষমুক্ত নয় বলে মনে হয়েছে। শেখের ভক্তরা ছফার ওপর ক্ষোভ দেখাতে পারেন। কারণ শেখ সাহেবকে একহাত দেখে নিয়েছেন ছফা। তবু বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু নিয়ে যা লিখেছেন, তাতে মনে হয় শেখের প্রতি আলাদা দরদ ছফার ছিল। শেখের মৃত্যুপরবর্তী সময়ে তৎক্ষনাৎ কোনো লেখক, রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী সরাসরি এই হত্যাকাণ্ডের বিরোধিতা করেনি। নামেনি রাজপথে। ছফা এই কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করতে পারেননি। লিখেছেন,
' আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, ইতিহাস এ নিয়ে একদিন প্রশ্ন উত্থাপন করবে এবং পরবর্তী বংশধর সকলকে সমানভাবে অপরাধী সাব্যস্ত করবে। '
আহমদ ছফা শতভাগ সত্য বলেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর দায় জাতি হিসেবে আমরা এড়াতে পারি না।
ভারত এবং আওয়ামী লীগ নিয়ে অনেকবেশি কড়া অবস্থান নিয়েছেন ছফা। অন্তত এই বইতে। ছফা দ্রোহী স্বভাবের মানুষ। এ ধরনের লেখা তাঁর জন্য নতুন নয়৷ তবু পাঠককে বলব, লেখার সময়কালে মনোযোগ দিতে। এটি ১৯৭৭ সালে লিখিত, জিয়াউর রহমানের আমলে।
বর্তামানে একজন আওয়ামীলীগ এবং বিএনপি সমর্থক যেভাবে একে অপরকে মূল্যায়ন করে ঠিক একইভাবে ১৯৭০-১৯৭৫ সালে একজন কমিউনিস্ট পার্টির নেতা বঙ্গবন্ধু এবং তৎকালীন (তাঁর) সরকারকে মূল্যায়ন (সমালোচনা) করে। তৎকালীন কমিউনিস্ট ধারনার দল (সমাজতান্ত্রিক দল যেমন জাসদ, কমিউনিস্ট পার্টি, সর্বাহার ইত্যাদি) সম্পর্কে অনেক বই পুস্তকে পাওয়া যায় যে, তারা গঠিত হয়েছিল বঙ্গবন্ধু সরকারকে উৎখাত করার মূলনীতি নিয়ে। আহমেদ সফা কিছুদিনের জন্য ছিলেন এই কমিউনিস্ট পার্টির একজন সদস্য এবং নেতা। তাঁর লেখা বইয়ে স্বাধীনতা, বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর ৭১ পরবর্তী সরকারের কড়া সমালোচনা ছাড়া অন্য কিছু পাওয়া যাবে না এবং সেটাই হয়েছে। এখানে উল্লেখ করা দরকার সত্তুর/ আশির দশকে সমাজতান্ত্রিক ফ্রন্ট তৈরি হয়েছিল আওয়মীলীগের ওই সব সদস্য দিয়ে যাদের সাথে আওয়ামীলীগের অন্য গ্রুপের মতের মিল হয়নি। এই বইটি যে কারণে ভালো লাগেনি বা গ্রহণযোগ্য মনে হয় নাই- ০১. লেখক একটি ইতিহাস বই লিখেছেন অথচ একটা রেফারেন্স ব্যবহার করেন নাই। লেখকের সব কথা কিভাবে বিশ্বাস করা যায়? তার কথা অন্ধ অনুসরণ করার কোন কারণ খুজে পাইনা। বিশেষকরে, তিনি ছিলেন একজন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য যারা এন্টি আওয়ামী হিসেবে পরিচিত। একজন এন্টি আওয়ামী স্বাভাবিক ভাবেই আওয়ামীলীগের সমালোচনা করবেন, হয়েছেও তাই। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু এবং তার প্রত্যেকটি পদক্ষেপকে সমালোচনা করেছেন। আসলে বলতে গেলে স্বাধীনতা এবং তার পরবর্তী প্রতিটি বিষয়কেই তিনি সমালোচনা করেছেন। এটা আসলে ইতিহাস বই না, একটা সমাজতান্ত্রিক মনোভাবের লোকের তাদের বিরোধীদল আওয়ামীলীগের সম্পর্কে একান্ত নিজস্ব মতামত এবং সমালোচনা। ০২. এই বইয়ে অনেক গুজামিল টাইপের মতামত আছে, যেগুলো অন্য কোন লেখকের সাথে মিলবে না। কয়েকটা উল্লেখ করা যেতে পারে। লেখক বলেছেন, যুদ্ধের সময় বাংলাদেশের কোন পূর্ব প্রস্তুতি ছিল না। যার জন্য ভরতে এক কোটি লোক গিয়েছিল। ফলে যুদ্ধ ভারত নির্ভর হয়েছিল। লেখক এরপরে মতামত দিয়েছেন- ভারত থেকে যদি আগে অস্ত্র কিনে রাখা হত এবং প্রতিরোধ করা হত তাহলে ভারতে এত লোক যেত না এবং ভারত নির্ভর হওয়া লাগত না। মাথায় আসে না, ভারত থেকে অস্ত্র কিনে এবং তাদের সাথে নিরাপত্তা চুক্তি করে কিভাবে ভারত নির্ভর না হয়ে থাকা যায়? আর ভারত থেকে পূর্ব পাকিস্তানে তখন অস্ত্র কেনার কি কোন উপায় ছিল? আর যদি উপায় থেকেও থাকে, তাহলে পশ্চিম পাকিস্তানের চোখ এড়ানো কিভাবে সম্ভব ছিল? আগরতলায় সামন্য একটা বৈঠক করে ৩৫ জনের ফাঁসির আদেশ হয়েছিল লেখক বোধহয় এটা ভুলে গিয়েছেন সমালোচনা করতে করতে। লেখকের দেওয়া এমন অনেক যাচ্ছেতাই যুক্তি আছে যোগুলা রেফারেন্স সহ আলোচনা করতে গেলে এক সপ্তাহর বেশী লেগে যাবে। ০৩. এছাড়া তিনি ছয় দফা, মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধ শুরুর ইতিহাস সম্পর্কে নিজের মনগড়া তথ্য দিয়েছেন যার কোন ভিত্তি নাই বলে মনে হয় কারণ তিনি কিভাবে এই সব তথ্য পেয়েছেন সে সম্পর্কে কছু উল্লেখ করেন নাই।
বইটা পড়া শেষ করেছি গতকাল রাত্রে কিন্তু কিছু লিখতে পারিনি! কিছু বই আছে যেগুলো পড়ার পর আসলে হজম করতে একটু সময় লাগে! এই বইটাও তাই! আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, এর পিছনের বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির যে বিশাল হাত আছে তা সম্বন্ধে খুব আবছা আবছা ধারণা ছিল কিন্তু এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পাওয়ার জন্য এই বইটার দরকার ছিল! এই বিষয়ে আসলে লিখতে খুব কম মানুষই মনে হয় সাহস পেয়েছে আর কেউ গুছিয়ে লিখলেও সেটা পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি! খুব অল্প কথাতে অনেক কিছুই উনি ক্লিয়ার করেছেন তাই পড়তে ভালো লেগেছে। 'যে যেভাবেই ব্যাখ্যা করুন, বাংলাদেশে একটি মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। রাশিয়া চায়নি, আমেরিকা চায়নি, ভারত চায়নি, চিন চায়নি, পাকিস্তান চায়নি বাংলাদেশে বাঙালিদের একটি জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হোক। তথাপি বাঙালি জনগণের দাবি অনুসারে এখানে একটি যুদ্ধ হয়েছে, হত পারে সে যুদ্ধের ফলাফল অপরে আত্মসাৎ করেছে।' কথাগুলো ভালো লাগছে, এর পরে আর কোন কথা হতে পারে না! আমার মনে হয় বাংলাদেশের সকলেরই এই বইটা একবার হলেও পড়া উচিৎ!
'যে যেভাবেই ব্যাখ্যা করুন, বাংলাদেশে একটি মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। রাশিয়া চায়নি,আমেরিকা চায়নি,ভারত চায়নি, চীন চায়নি, পাকিস্তান চায়নি বাংলাদেশে বাঙালিদের একটি জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হোক। তথাপি বাঙালি জনগণের দাবি অনুসারে এখানে একটি যুদ্ধ হয়েছে, হতে পারে সে যুদ্ধের ফলাফল অপরে আত্মসাৎ করেছে।
যাঁরা একটি নতুন জাতির জন্মের স্বপ্ন দেখে রণধ্বনি তুলেছিলেন, সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিলেন___সমাজের কোলে বিকশিত সেই কেন্দ্রবিন্দুটি থেকে আগামী দিনের নতুন নেতৃত্ব বেরিয়ে আসবেই আসবে। '
অত্যন্ত সাহসী একটি বই। বাংলাদেশের জন্মবৃত্তান্তের সংঘাতময় ইতিহাস মনে হয়না কেউ এত খোলাখুলি ভাবে বিশ্লেষণ করেছেন এর আগে। ছোট্ট একটি ভূখণ্ড বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে কেন্দ্র করে যে নোংরা গেঁয়ো রাজনীতি আন্তর্জাতিক ময়দানে খেলা হয়েছে তা পড়তে গেলে প্রচণ্ড দুঃখ পেতে হয়। স্বার্থ হাসিলের জন্য দলাদলি আমাদের দেশের তৎকালীন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও মোটেও কম হয়নি বরং যে মানুষগুলোর (ও দলগুলোর) নাম আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে ওতপ্রোতোভাবে জড়িত, তাদের ভূমিকা জানলে লজ্জায় আপনিই মাথা হেঁট হয়ে যায়! আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থা নিয়ে লেখক প্রায়ই ব্যঙ্গ করেছেন, কিন্তু ব্যঙ্গের সেই হাসিটা তো শেষ পর্যন্ত আমাদের গায়েই এসে পড়েছে। কী অসামান্য মনোবেদনা নিয়ে তিনি এই বিশ্লেষণটি করতে বসেছেন, তা শুধু কল্পনাই করা যায়। স্বাধীনতা কোন রাজনৈতিক দলের একার অর্জন নয় মোটেও, বরং তা এখানের ছাত্র কৃষক সমাজের অসামান্য ত্যাগের ফসল, এই ব্যাপারটি বার বার উঠে এসেছে। অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির যে ধুয়ো তোলা হয়েছিলো, তা শুধু কথাতেই রয়ে গেছে, কখনো বাস্তবায়িত হয়নি (যার ফল এখনও বিদ্যমান)।
আমার মনে হয়, সত্যান্বেষী একটি প্রজন্মের জন্য এটি অবশ্যপাঠ্য। আহমদ ছফা কে অসংখ্য ধন্যবাদ পরবর্তী প্রজন্মগুলোর জন্য এমন একটি প্রামাণ্য দলিল রেখে যাবার জন্য।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে লেখকের বিশ্লেষণ প্রসংশাযোগ্য। বিভিন্ন অন্তর্দন্ধ এবং শীতল যুদ্ধ কিভাবে আন্দোলনকে প্রভাবিত করেছে সে সম্পর্কেও তিনি ধারনা দিয়েছেন।
"সমগ্র ভারত পাকিস্তান এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জুড়ে একটি সমাজবিপ্লবের ঝড় আসছে। কেউ তার গতিরোধ করতে পারবে না। বাংলাদেশই সেই আসন্ন ঝটিকার প্রাণকেন্দ্র।"
আহমেদ ছফা,! আজ থেকে প্রায় ৫০ বছর আগে তৎকালীন রাজনৈতিক বিচার বিশ্লেষণ শেষে অনুমান করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিয়ে বলা প্রায় সকল বক্তব্যই সুসংগত। ভারত বিদ্বেষ এবং তার কারণ! স্বাধীনতার পর পর যে এই বিদ্বেষ এসেছে তা এখন অব্দি চলমান এবং তাহা সুসংগত কারণেই। ২৫ শে মার্চ হামলার বৈশ্বিক সুপরিকল্পিত হামলা। যুক্তরাষ্ট্রের দোদুল্যমান রাজনীতি (যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে সাহায্য করেছিল কমিনিজমকে<এম.এল মার্কসবাদী ও লেলিনবাদী পার্টি> প্রতিরোধ করার জন্য আবার ভারত কেও আর্তিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছিল) , সুসংহতভাবে এই প্রবন্ধ টিতে ফুটে উঠেছে।
পূর্ব বাংলায় তৎকালীন সংখ্যালঘুরা ৭১-এ সাম্প্রদায়িকভাবে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে আবার বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সাম্প্রদায়িকভাবেই ফিরেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক জ��িলতা প্রবন্ধে আহমেদ ছফা সংখ্যালঘুদের মধ্যে অনেক অংশ কেন ভারত মুখী হয়ে পড়েছে তার ব্যাখ্যা দিয়েছে এবং তাদের ভারতমুখী রাজনৈতিক দলকে অন্ধ সমর্থনের কারণও বুঝিয়েছেন। "এই অবস্থায় তাদের একটি মুখ্য অংশের ভারতমুখী হয়ে পড়া খুবই স্বাভাবিক। যে সমস্ত রাজনৈতিক দল ভারতকে সমর্থন করত তাদের প্রতি অন্ধ-সমর্থন দিয়ে টিকিয়ে রাখাকেই তারা মনে করত নিরাপত্তার সর্বোত্তম গ্যারান্টি।"
রাজনৈতিক দলকে অন্ধ সমর্থন! যা এত বছর পর ও অনুভব করছি। অল্প কিছুদিন আগে মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান রিন্টু এর লিখা "আমার ফাঁসি চাই " বইয়েও একই কথা উঠে এসেছে সাথে আরোও ভারত প্রাচারের কথাও উঠে এসেছে। বইটির একটি অংশ ছিল এমন --"" এক বৃদ্ধ হিন্দু মহাশয় কে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি কেন নৌকায় ভোট দেন? উত্তরে তিনি বললেন নৌকা মা দুর্গার বাহন, নৌকায় ভোট না দিলে মা দুর্গা মনঃক্ষুণ্ণ হবেন। "" আসনটি গোপালগঞ্জ এর। বলাই বাহুল্য আওয়ামী লীগের ওই পাঁচ আসনকে বলা হতো ভিক্ষার আসন।
সে যাইহোক এই প্রবন্ধের আলোচনায় ফিরে আসি। প্রবন্ধে লেখক ৭১-এর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব এর অংশ ফুটে উঠেছে।
"আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ শেষ পর্যন্ত বিশ্বাসই করতে পারেন নি যে তাঁরা সত্যি সত্যি পাকিস্তানি ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো থেকে বাংলাদেশকে বের করে আনার জন্য পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে একটি সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হতে যাচ্ছেন। তাঁদের দৃষ্টি যদি পূর্ব থেকে স্বচ্ছ থাকত তাহলে সে সম্বন্ধে পূর্বপ্রস্তুতিও তাঁরা গ্রহণ করতেন। বাঁশের লাঠি দিয়ে ঘরে ঘরে দুর্গ তৈরির 'যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা' ঘোষণার বদলে অন্য কোন কার্যকর পন্থা অবলম্বন করতেন।" বাংলাদেশ যা স্বয়ং শেখ মুজিবুর রহমান কিংবা আওয়ামী লীগ চায়নি, পাকিস্তান চায় নি, ভারত(বন্ধু রাষ্ট্র) চায় নি, যুক্তরাষ্ট্র চায়নি, চীন চায়নি, সোভিয়েত রাশিয়া চায় নি। যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের সংগ্রামী জনতা, তরুণ, কৃষক, ছাত্র জনতা হতাশাগ্রস্ত হয়েছিল। কারন, যে পরাধীনতা অতিক্রম করে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেছে, তারা সেই পরাধীনতার ভিতরেই থেকে গেছে। "যে সকল তরুণ দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাঁরা-সেই সকল সংবেদনশীল তরুণ- দেখলেন বাংলাদেশে তারা রক্ত দিয়ে, আত্মত্যাগের মাধ্যমে স্বার্থপর সুবিধাভোগীদের স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। এরা এতই নৈতিকতাবোধ বিবর্জিত যে গোলায় আগুন দিয়ে খই খেতেও তাদের আটকায় না। দেখে তরুণদের হতাশার সীমা রইল না। তাঁরা ভয়ঙ্কর রকম দমে গেলেন। আবার অন্যদিকে কতিপয় উচ্ছৃঙ্খল তরুণ মুক্তিযোদ্ধা নাম ভাঙ্গিয়ে লুটতরাজ এবং রাহাজানির আশ্রয় গ্রহণ করল। নির্মম বেকারত্ব, অভাব এবং দ্রব্যমূল্যের ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতিতে কেউ কেউ একেবারে মুষড়ে পড়লেন।"
আওয়ামী অনিশ্চিত নেতৃত্ব! "এ রকম অনিশ্চয়তা এবং দোদুল্যমানতার মধ্যে আওয়ামী লীগারদের দীর্ঘদিন কাটিয়ে দিতে হয়। এই সময় তাদের লোভ লালসার প্রবৃত্তি গুটিবসন্তের জীবাণুর মত ব্যাপকভাবে প্রকাশ পেতে আরম্ভ করে। অবাঙালিদের ঘরবাড়ি দখল, দোকান-ব্যবসা আত্মসাৎ এবং যে সকল লোক মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন দখলদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করেছে তাদের ধন সম্পদ লুটতরাজ করাই আওয়ামী লীগের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের পেশা হয়ে দাঁড়াল।
তারা লুটপাট এবং ব্যক্তিগত সঞ্চয়ে এত তন্ময় এবং নিবিষ্ট ছিল যে এরই মধ্যে ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পরিত্যক্ত অস্ত্রপাতি, কলকারখানার নানা যন্ত্রাংশ, মিলের মজুত সামগ্রী ভারতে পাচার করে দিতে সক্ষম হয়েছে। এই সময় পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশে এলেন। তাঁর বড় বড় হুঙ্কার দেয়া ছাড়া করারও কিছু ছিল না। যে রাজনৈতিক দলটির তিনি সর্বাধিনায়ক সেই দলটির ধারণা তারা যুদ্ধ করে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছে। আপাতত দেশে কোন অর্থনৈতিক পদ্ধতি চালু করতে অপারগ হওয়ায়, তারা মনের আনন্দে লুটপাটের ব্যবসাটি চালিয়ে যাচ্ছে এবং পাকিস্তানের শত্রু সম্পত্তির অবশিষ্টাংশ মাড়োয়ারিদের কাছে বেঁচে দু পয়সা কামাই করছে। এই কর্মের সঙ্গে কর্মী এবং নেতা এত অধিক হারে জড়িত ছিল যে দলীয় কোন শৃঙ্খলা প্রয়োগ করে তাঁর পক্ষে রাশ টেনে ধরা অসম্ভব ছিল। বরং ইচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক এই পঙ্কিল আবর্তে নিপতিত হয়ে তিনি নিজেও খেই হারিয়ে এই কর্মকাণ্ডের অংশীদার হয়ে উঠছিলেন।"
#বুক_রিভিউ বই: বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা লেখক: আহমদ ছফা
স্বার্থ হাসিল করা পৃথবির সবথেকে নিষ্ঠুর সত্যগুলোর একটি। প্রাকৃতিক ভাবেই প্রতিটি জীব স্বার্থ হাসিল করে। মানুষ তার ব্যতিক্রম নয়। মানুষ নিজেদের স্বার্থের জন্য বিভিন্ন প্রকার সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে। এসব সংগঠনের মূলনীতিতে মহৎ অনেক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য লেখা থাকলেও এসবের অলিখিত উদ্দেশ্য হলো নিজ স্বার্থ। কথাগুলো আমার ব্যাক্তিগত না। ইতিহাস এমনটাই বলে। ইতিহাস ঘাটতে আপনাকে খুব বেশি অতীতে যেতে হবে না। আহমদ ছফার লেখা, "বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা" বই এর আলোকে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যালোচনা করলেই দেখা যাবে, সময়ের ব্যবধানে রাজনৈতিক দল ও দলগুলোর নেতা-কর্মীদের স্বার্থ হাসিলের গল্প। মহান মুক্তিযুদ্ধে বন্ধুরূপে ভারত কীভাবে বাংলাদেশকে ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সুবিধা হাসিল করে ও যুদ্ধশেষে লুট করে দেশের অগাধ সম্পদ। প্রক্ষান্তরে, সাধারণ মানুষ কীভাবে ঠকেছে ভিনদেশী ও স্বদেশী রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর কাছে। সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী হারিয়েছে তাদের সর্বস্ব। এছাড়াও মহান মুক্তিযুদ্ধে চীন,রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কেমন ছিলো, যুদ্ধের আগে ও পরে দেশের নেতৃত্বস্থানীয় রাজনৈতিক দলসহ বামপন্থী দলসমূহের আচরণ ও সাধারণ মানুষের দূর্দশা সম্পর্কে হৃদয়বিদরক সত্য ধারণা দিয়েছেন আহমদ ছফা।
এছাড়াও বইটির শেষাংসে উল্লিখিত অমোঘ সত্য বইটিকে অনন্য করেছে।
বইটা অনেক আনপপুলার, বাংলাদেশের সৃষ্টি থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠা হওয়ার আগ পর্যন্ত রাজনৈতিক ইতিহাস আর ইতিহাসের ভেতরাকার মারপ্যাচ ধারাবাহিকভাবে লিখিত একটা বই। সুপাঠ্য।