শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের এই দুর্দান্ত উপন্যাস কোনওক্রমেই ভুতুড়ে কাহিনী নয়। প্ৰায় রূপকের ব্যঞ্জনা নিয়েই যে এসেছে এই গয়নার বাক্সের ঘটনাটা, তা ধরা পড়ে দারুণ কৌতুহলকর ও গভীর তাৎপর্যময় এই উপন্যাসের একেবারে শেষ পঙক্তিতে পৌছে গিয়ে।
পড়তি বনেদি পরিবারে বিয়ে হয়েছিল সোমলতার। খোলাটাই আছে, সার নেই। একটু বড়-বড় কথা বলা এবং সুযোগ পেলেই দেশের বাড়ির জমিদারির গল্প বলা এদের একটা প্রিয় অভ্যেস। যাকে বলে, বারফট্টই। সোমলতার স্বামীটি বি. এ. পাশ। তবু তবলা বাজানো ছাড়া কিছু করেন না। সোমলতাদের যৌথ পরিবারের। এ-বাড়িতেই তিনতলায় তিনটে ঘর নিয়ে থাকেন এক দজ্জাল পিসশাশুড়ি। বালবিধবা এই শাশুড়িই সংসারের সর্বময় কর্ত্রী। এই পিসশাশুড়িই মৃত্যুকালে সোমলতাকে ডেকে তার একশো ভরি সোনার গয়নার বাক্স সোমলতার হাতে গচ্ছিত করে গেলেন। মৃত্যুর আগে,না মৃত্যুর পরে? সোমলতা ভাল করে বুঝতে পারেনি। কিন্তু পিসশাশুড়ি যে এরপরেও বারবার দেখা দিয়েছেন এতে সন্দেহ নেই।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় একজন ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক।
তিনি ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত ময়মনসিংহে (বর্তমানে বাংলাদেশের অংশ) জন্মগ্রহণ করেন—যেখানে তাঁর জীবনের প্রথম এগারো বছর কাটে। ভারত বিভাজনের সময় তাঁর পরিবার কলকাতা চলে আসে। এই সময় রেলওয়েতে চাকুরিরত পিতার সঙ্গে তিনি অসম, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের বিভিন্ন স্থানে তাঁর জীবন অতিবাহিত করেন। তিনি কোচবিহারের ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। শীর্ষেন্দু একজন বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। বর্তমানে তিনি আনন্দবাজার পত্রিকা ও দেশ পত্রিকার সঙ্গে জড়িত।
তাঁর প্রথম গল্প জলতরঙ্গ শিরোনামে ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সাত বছর পরে সেই একই পত্রিকার পূজাবার্ষিকীতে তাঁর প্রথম উপন্যাস ঘুণ পোকা প্রকাশিত হয়। ছোটদের জন্য লেখা তাঁর প্রথম উপন্যাসের নাম মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি।
এই উপন্যাস নিয়ে এক পরিচিতা মন্তব্য করেছিলেন 'নিঃসন্দেহে চমৎকার', আরেকজন জনৈকা মুরুব্বীকে ধার দিয়ে পড়িয়েছেন, বাদমে উনি ভি বহুৎ তারিফ কিয়া। পর পর তিনজন সমলিঙ্গ পাঠিকার পজিটিভ ফিডব্যাকে কৌতুহলী হয়ে কবে যেন পড়েছিলাম বইটা, নেট খুঁজে নামিয়ে। আহা, কতো সহজে মুগ্দ্ধ হয় লোকজন! আই এনভি ইউ পিপল...
অপর্ণা সেনের মুভি 'গয়নার বাক্স' এ উপন্যাস নিয়েই তৈরি। আবার নাম ভাঁড়ানো অলমোস্ট সেইম আরেকটা উপন্যাস আছে, রাসমণির সোনাদানা। দুটোই অখাদ্য। কষ্ট করে বাংলাদেশ আর ৭১ লেবেল সেঁটে জাতে তোলার চেষ্টা করায় দয়া/মায়া করে ২ তারা দেয়া।
হাস্যরসের মধ্যে দিয়ে কিছু কিছু অসঙ্গতি অর্থাৎ আগেরকার আমলের পুরুষশাসিত সমাজটাকে দারুণভাবে দেখিয়ে দিলেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়।
অষ্টাদশী, গরীব ঘরের মেয়ে সোমলতার বিয়ে হয়ে আসে কোলকাতার এক পড়তি জমিদার বাড়িতে। জমিদার বংশ পড়তি হলে যা হয় আর কি.. যতোটা না আছে তার চেয়ে বেশি ঠাঁটবাঁট দেখাতে ব্যস্ত। বাড়ির পুরুষ সদস্যদের কুঁড়েমি নামক রোগটা মজ্জাগত। তারা কেবল জমি-সোনাদানা বেচেই খেতে পারে, দু'টা টাকা যে রোজগার করবে সে মুরোদ নেই। এইরকম অবস্থায় মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে সোমলতার। কষ্টেসৃষ্টে শৈশব-কৈশোর কাটিয়েছে বলে দুঃখ কষ্ট কি জিনিস জানা আছে বেশ ভালো ভাবেই। শুরু হয় তার অক্লান্ত পরিশ্রম স্বামীকে স্বাবলম্বী করে তুলবার। সংসারের মানুষগুলোকে একটু ভালো রাখার।
তাহলে সোমলতার গল্পে গয়নার বাক্স এলো কোথা থেকে? আরে! বলছি... বলছি.. সোমলতার এক পিসি শ্বাশুড়ি, মহা জাঁহাবাজ মহিলা। কাউকে বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করে না, খুব ছোটকালে বিয়ে, আর তার প্রায় সাথে সাথেই বিধবা। ঘটনাক্রমে পিসির এই এক শ' ভরি সোনার গহনা হাতে চলে আসে সোমলতার। সেই গয়নার বাক্স, নিরীহ সোমলতা আর মরে যেয়ে ভূত হয়ে যাওয়া পিসশাশুড়িকে নিয়েই এগিয়ে যায় কাহিনি৷ পিসি বেঁচে থাকবার সময় যেমন দজ্জাল টাইপ ছিল, মরে ভূত হবার পরও কথার ঝাঁজ বিন্দুমাত্র কমেনি। সোমলতাকে বকাবকির করার মাধ্যমে বুঝতে পারা যায় সেকালে অল্পবয়সী বিধবাদের দুঃখ, কষ্ট, তাদের দীর্ঘশ্বাস মাখা হাহাকারটুকু৷ আহারে! পিসি!
বসন অংশটুকুও ইল্লজিক্যাল বলার কোন কারণ নেই৷ লেখক তার নভেলায় তুলে ধরেছেন তিন প্রজন্মের কথা। পিসি যদি সব হারানোদের তালিকায় থাকে অর্থাৎ প্রথম প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করে, বসন তবে সব পেয়েছির যুগের প্রতিনিধি, তথা তৃতীয় প্রজন্ম। মেয়েরা যুগে যুগে নিষ্পেষিত হয়ে এসেছে। কিন্তু এই স্বাধীনতাটুকু একদিনে আসেনি। হয়তো সেই স্বাধীনতা এনে দেয়া নারীদের প্রতীক অল্পবয়সী, ভীরু সোমলতা, যে মোমের মতো নরম আবার পাথরের মতো কঠিন। তবে হ্যা, নারীর এই সংগ্রামে পুরুষের ভূমিকা যে কোনমতেই ফ্যালনা নয়, সেটাও সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন শীর্ষেন্দু সোমলতার স্বামী চকোর মিত্রের চরিত্রটি দিয়ে৷ এই ছোট্ট বইটার ব্যাপকতা বিশাল। অন্তর্নিহিত তাৎপর্যও আছে অনেক৷ প্রথমে মুভিটা দেখেছিলাম। বই পড়ার সময় মুভিতে অভিনয় করা পাত্র-পাত্রীদের বইয়ের চরিত্র হিসেবে চোখের সামনে দেখেছি (মুভি আগে দেখার কুফল) -_- তবে একটা জিনিস বুঝলাম না, বইটার এন্ডিংও তো কম সুন্দর না! হুদামাডিত মুভিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে টানা হ্যাঁচড়া করলো ক্যান। :3
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের খুব সুন্দর কিছু নভেলাগুলোর একটা৷ ❤
এই গল্পে বসনকে কেন আনা হয়েছে আর তার ভূমিকাটাইবা কি এই কাহিনীতে আমি বুঝিনি।শীর্ষেন্দুর প্রায় উপন্যাসেই রহস্য এবং ভৌতিক বিষয়টা থাকে।এই বইটাতে ভৌতিকতা কিছুটা থাকলেও,আমি রহস্য খুঁজে পাইনি।শুরুটা বেশ লেগেছিল মনে হচ্ছিল বেশ রহস্যময় হবে কিন্তু গল্পের মাঝটা এবং শেষটা বেশ হতাশই করেছে।
যাইহোক, আমার খারাপ লাগলেই যে সবার খারাপ লাগবে এমনতো নয়।পড়ে দেখেন হয়তবা ভালোলাগতেও পারে আপনার......
একটানে পড়া শেষ....মজা পেয়েছি। সিনেমাটা আগে দেখা থাকলেও বইটাও ভালো লাগলো। সিনেমায় অপ্রয়োজনীয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আসা হয়েছে। এটা দরকার ছিল না। বইতে এটা করা হয়নি। টিপিকাল শীর্ষেন্দু স্টাইলে শেষ করা হয়েছে বইটা।
একজন মধ্যবিত্ত বাঙালি হিন্দু শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের এই ছোট উপন্যাসটার সঙ্গে একাত্ম হতে পারবে। পুরোনো পরিবারগুলোতে এইরকম বিধবা মেয়েদের গল্প অনেক শুনেছি ,যারা মরে গেলেও বাড়ি ছেড়ে যায় না। এই উপন্যাসে সমস্ত উপাদান মজুত আছে, যা থাকার কথা একটা বনেদি হিন্দু বাঙালির বাড়ি তথা পরিবারকে আঁকতে - পুরোনো বাড়ি, পূর্ব পাকিস্তানে ছেড়ে আসা জমিদারি, অলস পুরুষমানুষ, এক বিধবা সর্বময় কর্ত্রী, তার ভূত, সাহসী মহিলা আর তার বিবর্তন, ঝগড়া-মোকদ্দমা, নীল রক্ত। এই বাড়িগুলো-পরিবারগুলো এখন ধ্বংস হয়ে গেছে অবশ্য। বাঙালির চিয়ায়ত হিপোক্রিট দিকটাও উপন্যাসে কিছুটা ফুটে উঠেছে, যেটা শীর্ষেন্দু ধরনের লেখকদের লেখাতে পাওয়া যাবে এটা ভাবিনি। "কিছু উপাদানের পরিমাপের" দিক দিয়ে দেখতে গেলে উপন্যাসটা বাঙালির নিজস্ব "আউরা"। যদিও ভূত বা অশরীরী জিনিসটা এবং একটা জাতি, অনেক মানুষ অথবা একটা সময়ের সুনিপন ভাবে বর্ননা ও সম্পর্ক, সুন্দর ভাবে এসেছে নবারুণের "হার্বাট" অথবা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে ইলিয়াসের "খোয়াবনামা" উপন্যাসে। তবে এই ছোট্ট উপন্যাসটা বাঙালি মধ্যবিত্ত গন্ডির মধ্যেই থেকেছে এবং সেটা ভালো সিদ্ধান্ত। খুব খারাপ যে আমি এই উপন্যাসটার এতো পড়ে খোঁজ পেলাম। আমি ওনার "অদ্ভুতরে" সিরিজের বেশ ভক্ত ছিলাম ছোটবেলাতে। ভাবতাম ঐ সিরিজে যাদুবাস্তব/ভুতুড়ে উপাদানগুলো হয়তো ওনার বড়দের জন্য লেখা উপন্যাসে নেই। যাই হোক, আমি এখন দেজ থেকে প্রকাশিত ওনার ছোটগল্প সমগ্র নিয়ে বসেছি। লেখক'কে প্রকাশকের চাপে পড়ে অনেক সময় নিন্ম-মাঝারি লেখা লিখতে হয়। আবার প্রচারিত ভালো লেখার আড়ালে চাপা পড়ে থাকে আরো ভালো কিছু লেখা। সেগুলো খুঁজে পেলে ভালোই লাগে।
শুরুর দিকে খুব ইন্টারেস্টিং লাগছিল। শেষের দিকে পুরোই খাপছাড়া মনে হলো। দুই প্রজন্মের কাহিনীর মেলবন্ধনটা মোটেও পরিষ্কার মনে হয়নি। সহজেই আরো জমজমাট ভাবে এক প্রজন্মে হয়ত গল্প শেষ করা যেত, অথবা আরো বড় পরিসরে দুই প্রজন্ম মিলিয়ে। সবচেয়ে বড় কথা, গয়নার বাক্সের সিগনিফিকেন্সটাই ব���ঝে উঠতে পারলাম না :(
অস্বচ্ছল পরিবারের মেয়ে সোমলতা। সে বিয়ে হয়ে আসে এক জমিদার পরিবারে। তবে নামে জমিদার অবশ্য। বংশের ধন দৌলত সব শুন্যের কোটায়। সেজন্যে যা না আছে তারচেয়ে দেখাতে ব্যস্ত বেশী৷
সোমলতার স্বামীটির নাম চকোর মিত্র। তিনি বিএ পাশ কিন্তু অবসরে তবলা বাজানো ছাড়া বিশেষ কোনো কাজ করেন না। বংশপরম্পরায় বাড়ির পুরুষেরা পেয়ে আসছেন "কুঁড়েমি" সাথে কিঞ্চিৎ কুঅভ্যাস ও আছে বইকি। কারণ এপরিবারের কর্তারা মনে করেন পূর্বপুরুষের জমি-জমা, সোনা-দানা বেচেই রোজগারের জোগাড় হবে। কিন্তু কথায় আছে বসে খেলে রাজার ভান্ডারও ফুরোয়। এই নিয়ে সোমলতার দুশ্চিন্তার শেষ নেই।
সোমলতার পিসিশ্বাশুড়ি রসময়ী মহা জাঁদরেল মহিলা ছিলেন। পেল্লায় জমিদার বাড়ির দোতলায় বড় দুটো ঘর জুড়ে তিনি থাকতেন। একে বাল্যবিধবা তার উপর কাওকে বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করতেন না। পিসিমা বৈবাহিক এবং পৈতৃকসুত্রে ১০০ ভরি গয়না পেয়েছিলেন। এই গয়নার বাক্স তিনি যক্ষের ধনের মতো আগলে রাখতেন। এই বাক্স ঘটনাচক্রে চলে আসে সোমলতার হাতে কিন্তু কি করে?
এই বইটির পরিসর ছোট্ট হলেও এর শিক্ষা অতি বিস্তারিত। লেখক প্রথমে তৎকালিন জমিদার বংশের পুরুষদের গোড়ামি এবং কুড়েমি দেখিয়েছেন। সাধারণত এমন অবস্থায় বাড়ির বউ মেয়েদের সব মেনে মুখ বুঝে থাকতে দেখা যায়। কিন্তু এখানেই পেয়েছি ব্যতিক্রম। বাড়ির বউ সব সংশয় ঝেড়ে স্বামীকে শোধরানোর চেষ্টা শুরু করে যাতে পরিবারটির অর্থনৈতিক অবস্থা আবার আগের অবস্থায় ফিরতে পারে। চকোর মিত্রও নিজের সমস্ত ভুল শুধরে নেয়।
এরপরে দেখানো হয় ৩য় প্রজন্ম, সোমলতার মেয়ে, বসন। অনেকেই বলেন বইটির এই অংশটি খাপছাড়া কিংবা অনেকে বুঝতে পারেন নি। তবে ধারণা সেটি ভুল৷ প্রথম প্রজন্ম সোমলতার পিসিশ্বাশুড়ি যিনি মরে ভুত হয়ে সোমলতার ঘাড়ে চেপেছিলেন তিনি আক্ষরিকঅর্থে সারাজীবনে কষ্ট ছাড়া কিছুই পাননি। নিয়মের বেড়াজালে তিনি নিজের শৈশব, কৈশোর, যৈবন, বার্ধক্য চারকালেই আবব্ধ ছিলেন। এখানে লেখক বিধবাদের দুঃখ দুর্দশা দেখিয়েছেন। ২য় প্রজন্ম সোমলতা, যে মোমের মতো নরম কিন্তু ইস্পাতের মতো কঠিন। সে নিজের ইচ্ছাশক্তি, বুদ্ধি, পরিশ্রম এবং ভালোবাসা দিয়ে সব কিছু অর্জন করে নিয়েছিলো। একই সাথে বড় সমর্থক হিসেবে পেয়েছিলো নিজের স্বামীকে এবং পরবর্তীতে পুরো পরিবারকেই। ৩য় প্রজন্ম বসন, সে ছিলো সম্পূর্ণ স্বাধীন। পরিবার তাকে সমস্ত স্বাধীনতা, ভালোবাসা দিয়েছিলো একঅর্থে না চাইতেই সব পেয়েছিলো সে। বসন ছিলো পুরো মিত্র পরিবারের চোখের মনি। কুসংস্কারাচ্ছন্ন আবহাওয়া থেকে পুরো পরিবারটি একটি আধুনিক রুচিবোধ সম্পন্ন পরিবারে রুপান্তরিত হয়েছিলো এভাবেই।
আমি বলবো লেখক হাস্যরস এবং রুপক দিয়ে সুক্ষ্ণ সুক্ষ্ম ব্যাপার গুলো খুব সুন্দর তুলে ধরেছেন অতি স্বল্প পরিসরে। যদিও রহস্যের গন্ধ অল্পই ছিলো। এই বইটা পড়ার খুব শখ ছিলো এবং পড়ে আরাম পেয়েছি। যারা খুব গভীরভাবে চিন্তা করতে পারেন তারা বইটি পড়ে আমার মতোই আনন্দ পাবেন আশাকরি।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘গয়নার বাক্স’—১৯৯৮-এ পড়েছিলাম, সিনেমাটা অবশ্য অনেক পরে দেখা। তবু উপন্যাসটির স্মৃতি আজও টাটকা, কারণ এটি কেবল ভূতের গল্প নয়, এটি তিন প্রজন্মের নারীর ক্ষমতা, পরিচয় আর স্বাধীনতার এক দুর্দান্ত রাজনৈতিক রূপক।
গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে সেই সোনার গয়নার বাক্স, যা রাশমণির হাতে ছিল—এক বিধবা কিশোরী, যিনি মৃত্যুর পরও তার গয়নার টানে আত্মারূপে ফিরে আসেন। তার নাতনি সোমলতা যখন সেই গয়নার মালিক হয়, তখন লেখকের সূক্ষ্ম রূপকে বোঝা যায়—এই বাক্সটি আসলে নারীর আত্ম-মর্যাদার প্রতীক। সোমলতা শাশুড়ির পরকীয়া আর সংসারের পতনের মধ্যেও সাহস করে ব্যবসা শুরু করে, আর তার মেয়ে চৈতালি সেই গয়না মুক্তিযুদ্ধের জন্য উৎসর্গ করে। এই তিন নারীর গল্প যেন একই সূত্রে গাঁথা—ঐতিহ্য, প্রতিরোধ আর রূপান্তরের সুরে।
‘গয়নার বাক্স’-এ অতিপ্রাকৃত, বাস্তব আর রাজনৈতিক সময়কাল এমনভাবে মিশে যায় যে উপন্যাসটি একপ্রকার বাংলা ম্যাজিক রিয়ালিজমে রূপ নেয়। গার্সিয়া মার্কেজের One Hundred Years of Solitude-এর মতো, এখানে ভূত-রূপী অতীত ও বর্তমানের সংলাপে তৈরি হয় এক গভীর সামাজিক প্রতিচ্ছবি। আবার, চিমামান্ডা আদিচির Half of a Yellow Sun বা Purple Hibiscus-এর মতো, নারী-নির্ভর প্রতিরোধ ও যুদ্ধের হূদয়স্পর্শী বিবরণ এ উপন্যাসেও পাওয়া যায়।
অপরাজেয় এই বর্ণনাতেই ‘গয়নার বাক্স’ সিনেমার রূপ পেয়েছে—অপর্ণা সেনের পরিচালনায় উপন্যাসের ব্যঙ্গরস আর শক্তিশালী নারীচরিত্রগুলো পর্দায় আরও প্রাণ পায়।
শিল্পসুষমা, ইতিহাসচেতনা আর নারীবাদের সংমিশ্রণে গয়নার বাক্স এক অনন্য সৃষ্টি। এটি মনে করিয়ে দেয়—একটি বাক্স কখনও শুধু গয়নার নয়; তা হয়ে ওঠে স্মৃতি, শক্তি আর উত্তরাধিকার বহনের এক জীবন্ত প্রতীক।
এই ছবিটি তিন প্রজন্মের নারী এবং তাদের জীবন এবং সমাজে পরিবর্তনশীল অবস্থানের আশেপাশে ঘুরছে। এবং এটি একটি গয়নার বাক্সের সাথে সম্পর্কিত।গল্পের মূলে আছে পূর্ববাংলার এক বাঙালী হিন্দু পরিবার(যৌথ পরিবার)।যেখানে সোমলতা সংসারে তার পিসিশাশুরি (রসময়ী) এসে চিরকালের জন্য ঘাঁটি গারে। তিনি ১১ বছর বয়সে বিয়ে করেছিলেন এবং তারপরে খুব শীঘ্রই বিধবা হয়েছিলেন। গল্পটি তার বিয়ের গয়নাগুলির চারপাশে ঘুরছে, যা সে একটা বাক্সে লুকিয়ে রাখে।
দেশভাগের সময় তাদের অনেক জমি জায়গা সম্পত্তি চলে যায়। আর যেহেতু এই পরিবারের কেউ চাকরি করে না (আসলে চাকরিকে অন্যের দাসত্ব মনে করে তাই) সেইজন্য তাদের আর আগের মতো অবস্থা থাকে না, টুকটাক জিনিসপত্র বিক্রি করে সংসার চলে। আর বিধবা রসময়ী বাপের বাড়িতে বৈধব্য জীবন কাটাতে থাকে এবং তার একমাত্র সম্বল ওই গয়নার বাক্স। বাড়ির সকলেই তাঁকে একটু ভয় করেই চলে। হঠাৎ একদিন তার মৃত্যু হয় এবং কেউ কিছু জানার আগেই নববধূ সোমলতা কে ভূত হয়ে দেখা দিয়ে তার কাছে সেই গয়নার বাক্সের দায়িত্ব দিয়ে যায়।
কিন্তু এরপর প্রায়ই সোমলতা পিসি-শাশুরীর আত্মাকে দেখতে পেতো। সোমলতাকে সে নানা গালমন্দ করতো, এবং স্পষ্ট বলে দিয়েছিল যেনো সে তার ওই বাক্সে হাত না দেয়। অবশেষে অবশ্য রসময���ী চকোরের (সোমলতার স্বামী) ব্যবসার জন্য গয়না দিতে রাজি হয়।এরপর সোমলতা স্বামীকে শাড়ির দোকান দিতে বলে এবং আস্তে আস্তে তাদের আর্থিক উন্নতি হতে থাকে। সোমলতার স্বামী ব্যবসার কাজে বাইরে গেলে, সোমলতাই ব্যবসার কাজ দেখভাল করতো। এরকমই একসময় স্বামীর অনুপস্থিতিতে একটা ঘটনা ঘটে। একজন পুরুষ তাকে প্রেম নিবেদন করে, অন্যদিকে রসময়ীর আত্মাও সোমলতা কে এতে উৎসাহিত করে তার প্রেম গ্রহণ করার জন্যে ও যৌবনের আনন্দ নেওয়ার জন্য। কিন্তু সোমলতা শেষপর্যন্ত স্বামীর কাছেই ফিরে আসে এবং তাদের মিলন হয় । এরপর তাদের এক কণ্যাসন্তান হয় আর তখন থেকেই রসময়ীর আত্মাকে সোমলতা দেখতে পায়না। আর সবাই মনে করে রসময়ীই সোমলতার কন্যা হয়ে জন্ম নিয়েছে। এই হলো গল্পের মূল বিষয়।
আমার গল্পটা ভালোই লেগেছে। এই গল্পকে কেন্দ্র করে "গয়নার বাক্স" সিনেমাও বেরিয়েছে। তবে সিনেমাটা অত ভালো লাগেনি যতটা বই পড়ে লেগেছে। সবশেষে একটা লাইন লিখতে চাই যেটা সোমলতা বলেছিল (তার স্বামীর উদ্দেশ্যে) এবং যেটা আমার খুবই ভালো লেগেছে - " আমি যে ওকে ভালোবাসি ওঁর রূপের জন্য নয়,গুণের জন্যও নয়।ভালো না বেসে থাকতে পারি না বলে বাসি।"
প্রথমেই বলি আমি আগে মুভি দেখেছি, তারপর গল্পটা পড়ছি। কারণ আমি সত্যি জানতাম না যে, এটা শীর্ষেন্দু বাবুর লেখা একটা বই। যাই হোক, মুভি টা আমার ভীষণ পছন্দের, সেখানে পড়তে পড়তে চরিত্র গুলির সাথে মিল পেয়ে অসম্ভব ভালো লাগছিলো পড়তে। গল্পটা তিন প্রজন্মের। পিসি রসময়ী, সোমলতা, আর বসন। অষ্টাদশী, অভাবী ঘরের মেয়ে সোমলতা বিয়ে হয়ে আসে কলকাতায় এক জমিদারি পরিবারে। কিন্তু সে ছিল নামেই জমিদার, বিষয় সম্পত্তি আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না, থাকার মধ্যে ছিল জমিদারি ঠাট বাট। আর সেখানেই লতার প্রথম পরিচয় হয় তার পিসিশাশুড়ি রসময়ী র সাথে। তিনি বাল্যবিবাহ র শিকার। ৭ এ বিয়ে আর ১২ তে বিধবা। কিন্তু তার কাছে ছিল বাপেরবাড়ি থেকে যৌতুক হিসেবে পাওয়া ১০০ ভরির মতো সোনা। তাই দোর্দণ্ডপ্রতাপ পিসির সামনে প্রায় বাড়ির সবাই ই চুপ। এই পিসি একদিন মারা যান, আর ভূত হয়ে এসে লতা র কাছে গচ্ছিত রেখে যান তার সোনাদানা। মাঝে মাঝেই তিনি ভূত বেশে লতার সাথে কথা বলতেন, আর তাকে নানারকম উপদেশ দিতেন। আর এখানেই লেখক দেখিয়েছেন তার অসাধারণ প্রতিভা। যে হাস্যরস তিনি ব্যবহার করেছেন তা পড়ে সত্যিই মুগ্ধ হয়ে যেতে হয়। কিন্তু এর মধ্যেই আসে সংসারে চরম টানাটানি, আর লতা তখন নিজে হাল ধরে সংসারের। একটি শাড়ির দোকান দেয় সে এবং ধীরে ধীরে হাল ফিরেও আসে। কিন্তু তবু সে ওই গয়না হাতছাড়া করে না। এরপর লতার একটি মেয়ে হয়, বসন, তাকে দেখতে অবিকল পিসিমার মতো। আর আশ্চর্যজনক ভাবে তারপর থেকেই পিসিমা আর আসতেন না। এইভাবে সেই গয়নার বাক্স লতা তার মেয়ের হাতে তুলে দেয়। প্রজন্মের পরিহাসে রসময়ী যেমন কিছুই পায়নি, কিন্তু বসন সেদিক থেকে দেখতে গেলে স্বাধীনতা, ঐশ্বর্য সব ই পেয়েছে। এককথায় খুব ই মজার একটা বই, সকল বয়সের উপভোগ্য ♥️♥️
বইটা শুরুর দিকে বেশ ভালোভাবেই আগাচ্ছিল। স্টোরিটেলিং বিবেচনা করলে পুরো উপন্যাসটাকেই মোটাদাগে ভালো বলে দেয়া যায়। কিন্তু ঘটনার বিস্তৃতি টানতে গিয়ে লেখক কেমন যেন সব সুতোগুলো চারপাশে ছড়িয়ে রেখেই ইতি টেনে দিলেন। পিসিমার গয়নার বাক্সরহস্যের ইতিবৃত্ত উদঘাটনের মাঝপথে সোমলতার সংসারের হাল ধরার পর বসনের ভূমিকা বুঝে উঠবার আগেই গল্প মোড় নিল অন্য দিকে। এখানটায় গিয়ে উপন্যাসের নামকরণের উদ্দেশ্যটাও ব্যাহত হলো বলেই মনে হয়েছে। চরিত্রগুলোর গভীরতা কম ছিল বলে শেষটায় এসে বেশ হতাশই হতে হয়েছে। সোমলতার চরিত্রায়ণের বাঁকটাকে আনার প্রয়োজন যথাযথভাবে ফুটে ওঠেনি। বসনের সাথে পিসিমার সংযোগের আভাস দেয়ার পর অমলেশকে ঘিরে পুনরায় রহস্য তৈরি করে গল্পটা যেন হঠাৎ করে শেষ গেছে।
উত্তরবঙ্গের এক পড়তি বনেদি বাড়িতে বিয়ে হয় আঠারো বছর বয়সী সোমলতার। শোনা যায় এককালে পাকিস্তানে এদের জমিদারি ছিলো, তবে তা শেষ হতে হতে একেবারে প্রায় শূন্যের কোঠায়। তিনতলা বাড়িটা মূলত সোমলতার দাদাশ্বশুরের তৈরি হলেও আরও শরিকরা এসে তাতে ভাগ বসিয়েছে, এ বেশ নিয়ে মামলা মোকদ্দমাও চলছে।
বাড়ির দক্ষিণ দিকটার উপর নিচ মিলিয়ে সোমলতার শ্বশুড়ঘরের বাস। নিচতলায় সোমলতা তার বর আর শ্বশুরশ্বাশুড়ি থাকেন, দোতলায় থাকেন ভাশুর আর তিনতলায় বিশাল তিনটি কামড়া নিয়ে থাকেন পিসি শাশুড়ি। তার নাম রাসময়ী, বালবিধবা মানুষ। সাত বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিলো, স্বামী-সংসার এসব ভালো করে বোঝার আগেই তিন বছরের মাথায় বিধবা হলেন। বৈবাহিক সূত্রে পিসিমার কাছে ১০০ ভরি সোনার গয়না আছে, যক্ষের ধনের মতো আগলে রাখেন গয়নাগুলো। এই গয়নার জোড়েই পিসিমা পুরো সংসারের তদারকি করেন। জাঁদরেল এই পিসশাশুড়িকে সোমলতাও ভীষণ ভয় পায়। পিসিমা ওই গয়নার বাক্স সোমলতার কাছে গচ্ছিত রেখে যান, মৃত্যুর পরে নাকি মৃত্যুর আগে সেটা না হয় বই পড়েই জানবেন।
জমিদার বাড়ির ছেলেরা আরামপ্রিয় হয়, তারা ঘরের বাইরে চাকরি করতে যায়না, কিন্তু তখন ভালোভাবে বাঁচার তাগিদে অন্যান্য শরীকদের মধ্যে কেউ কেউ রুটিরুজির কাজ শুরু করেছে। সোমলতার স্বামী চকোর মিত্র বিয়ে পাশ করেছে। আরামপ্রিয় হলেও সংসারের টানাপোড়েনে সোমলতার সাথে সাথে সেও চিন্তিত, কিছু একটা করা দরকার । কিন্তু চাকরি করা তার আঁতে নেই, তাই ঠিক হলো ব্যবসা করা হবে। প্রথম দিকে পরিবারের কেউ মেনে না নিলেও, পরবর্তীতে পুরো পরিবার তাদের পাশে দাঁড়ায়। একে একে দুটো দোকান খাড়া হলো, বেচাকেনাও বেশ চলছে। সোমলতার বিচক্ষণতায় তাদের সংসারে আয় রোজকার বাড়ছে তার সাথে ভাঙছে অনেক পারিবারিক কুসংস্কার। কিন্তু স্বামী,সন্তান, ভরা সংসার এসব পেয়েও মাঝে মাঝে তার মন আকুল হয়।
উপন্যাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হলো সোমলতার মেয়ে। বসন্ত কালে জন্মেছিলো বলে তার নাম রাখা হয় বসন। দুই প্রজন্ম আগের কুসংস্কারাচ্ছন্ন পরিবার টা তখন ব্যবসায়ী রুচিশীল পরিবার, আর সেই পরিবারের মধ্যমণি হলো বসন। বসনের চেহারায় কিছুটা পিসিমার চেহারার ছাপ পাওয়া গেলেও দুজনের জীবনযাপনে রয়েছে আমূল পরিবর্তন। পিসিমা নিয়মের বেড়াজালে আটকে ছিলেন, পরিবারের কোনো সদস্য তার সাথে ছিলোনা। কোনো না কোনো ভাবে তারাও এসবের জন্য দায়ী ছিলো। সেই পরিবারের সবাই কিন্তু একসময় দাঁড়িয়ে ছিলো সোমলতার পাশে এরপর বসনকে দিয়েছে বেড়ে উঠার একটা সুন্দর পরিবেশ। এতোকিছু পাওয়ার পরেও বসনের জীবনেও কিন্তু ছিলো অপূর্ণতা।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় গয়নার বক্স বই কিছুটা ভৌতিক আদলে লেখা হলেও বইটা ভয়ের কিছু মনে হয়নি। বরং তিনি উপন্যাসে তিনপ্রজন্মের নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। সময়ের সাথে সমাজ পরিবর্তন হচ্ছে, সেই সাথে পরিবর্তিত হচ্ছে নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি, কিন্তু কোথাও যেন খামতি রয়েই গেছে। ৮৭ পৃষ্ঠার এই বইটা অনায়েসে একবসায় পড়ে শেষ করা যায়। যারা রিডার্স ব্লকে ভুগছেন তারা এই বইটা পড়ে দেখতে পারেন, আশাকরি ভালো লাগবে। দূরবীন পড়ে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এর লেখার সাথে পরিচয় হয়েছিলো, এরপর আরও কয়েকটা বই পড়া হয়েছে। যতই পড়ছি ততই উনার লেখার প্রতি মুগ্ধতা বাড়ছে।
দুই প্রজন্মের গল্প "গয়নার বাক্স"। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের অন্যান্য লেখার চেয়ে এই বইটা একটু ভিন্ন বলা যায়। দুই প্রজন্মের গল্প, মা, মেয়ের গল্প একই সমান্তরালে বলেছেন লেখক। মা যেখানে সংসার, আপনজনের মধ্যে প্রেমকে খুঁজে ফিরেছেন। বার বার নিজের গভীরে ডুব দিয়ে নিজেকে আরো ভালোভাবে চেনার প্রয়াস পেয়েছেন। সেখানে তার মেয়ে প্রেমের প্রশ্নে ফুরিয়ে যাওয়া, ক্লান্ত হওয়া, শেষ হয়ে যাওয়ার ভয়ে বার বার নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে। ভিন্নধর্মী এই বইটা এক বসায় পড়ার মতো। উপলব্ধি করার মতো অনেককিছুই আছে। যা পাঠককে অনেককিছু নতুন করে ভাবনার খোরাক জোগাবে।
সোমলতার স্বামী চকোর মিত্র চৌধুরী। চৌধুরী ছেঁটে ফেলে চকোর মিত্র নামেই পরিচয় ওনার। সোমলতার আঠারো বছর বয়সে যখন বিয়ে হয় তখন ওর স্বামী ভেরেণ্ডা ভেজে বেড়ান বলা যায়। পড়তি বনেদি পরিবার লোক-দেখানো বাহাদুরি করার সুযোগ তারা ছাড়ে না। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ির ভিতরকার নানা ছোটখাট অশান্তি আর তর্কবিতর্কের ভিতর দিয়ে সোমলতা জানতে পারে যে, তার বিয়েতে খরচ করতে গিয়ে এদের সম্বল প্রায় শেষ। উপরন্তু বাজারে বেশ ধারও হয়েছে।
সোমলতার শাশুড়ি মানুষটি বেশ ভালই। শান্তশিষ্ট এবং খুবই সমবেদনাশীলা। গরিব এবং ধার্মিক পরিবারের মেয়ে তিনি। তিনি সোমলতাকে ডেকে একদিন কাছে বসিয়ে বললেন, ফুচু-র সঙ্গে তোমার বিয়ে হয়েছে সেটা তোমার কপাল। ফুচু ছেলে খারাপ নয়। কিন্তু আমাদের শুধু এখন খোলাটা আছে, সার নেই। বিয়ে দিয়েছি, যদি বউয়ের ভাগ্যে ওরও ভাগ্য ফেরে। এ বাড়ির পুরুষদের ধাত তো জানি। বড় কুঁড়ে। শাশুড়ি দুঃখ করে বললেন, এ সংসার চলছে কিভাবে তা জানো? জমি আর ঘরের সোনাদানা বিক্রি করার টাকায়। বেশিদিন চলবে না। যদি ভাল চাও তো ফুচুকে তৈরি করে নাও।
স্বামী জমিদারবাড়ির ছেলে, আদরে আলস্যে মানুষ। লেখাপড়ার চাড় কম ছিল বলে গড়িয়ে গড়িয়ে বি.এ পাশ। মেজাজটা একটু উঁচু তারে বাঁধা। যখন তবলার রেওয়াজ করেন তখন একটুও বিরক্ত করা চলবে না। ঘুম থেকে ডেকে তুললে রেগে যান। স্ত্রীর বুদ্ধি পরামর্শ নেওয়া ওনার কাছে অপমানজনক। বয়সের পার্থক্য এবং ওনার গুরুগম্ভীর রকমসকম দেখে সোমলতা ওনাকে ‘আপনি’ করেই বলতো।
সোমলতা সুযোগ পেয়ে একদিন স্বামীকে বলল, "আমি শুনেছি, সোনা আর জমি বেচে এ সংসার চলে।" "ঘরের সোনাও লক্ষ্মী, জমিও লক্ষ্মী। শুনেছি এসব বেঁচে খাওয়া খুব খারাপ।" সোমলতা আরেকটু সাহস করে বলল, "দেখুন, সোনাদানা অফুরন্ত নেই। জমিও বোধহয় শেষ হয়ে এল। আমাদের কি সাবধান হওয়া উচিত নয়?" স্বামী সোমলতার দিকে অকপটে চেয়ে থেকে বললেন, "আমাদের বলতে? তুমি কি তোমার আর আমার কথাই ভাবছ?" সোমলতা তাড়াতাড়ি বলল, "তা কেন? এ বাড়ির সকলে মিলেই তো আমরা।" "আপনি ইচ্ছে করলেই রোজগার করতে পারেন তো!"
স্বামী বললেন কিভাবে করব বলো তো! আমি মোটে বি.এ পাশ। এতে বড়জোর একটা কেরানিগিরি জুটতে পারে। তার বেশি কিছুই নয়, এবং সেটাও পাওয়া শক্ত। চাকরি করব বলে তো কখনও ভাবিনি। সোমলতার বড় জা তাকে সহ্য করতে পারেন না। তিনতলায় থাকেন সোমলতার পিসশাশুড়ি। তিনখানা বড় বড় ঘর তাঁর কিসে লাগে কে জানে! সোমলতা পারতপক্ষে ওনার কাছে যায় না। গেলেই এমনভাবে তাকান যে, র*ক্ত জল হয়ে যায়। মাঝে মাঝে কোনও কারণ ঘটলে তিনতলা থেকে উনি এমন চেঁচান যে, গোটা বাড়ির লোক শুনতে পায়।
বিয়ের পর লতাকে উনি একদিন ওনার ঘরে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। খুব ভারী একছড়া খাঁটি সোনার হার পরিয়ে দিয়েছিলেন গলায়। এ পর্যন্ত বেশ ভালই ছিল ব্যাপারটা। কিন্তু তারপর লতাকে এমন অনেক ঠেস-দেওয়া কথা বলেন, এত অপমানজনক যে চোখে জল এসেছিল লতার। তেজী মেয়ে হলে গলা থেকে হার খুলে ফেরত দিত। লতা তা পারেনি।
একদিন লতা ছাদে যাচ্ছিল। যাওয়ার পথে পিসির ঘর। লতা একটু উঁকি দিয়ে দেখে পিসিমা কীভাবে যেন মূর্তির মতো বসে আছে। লতার সন্দেহ হলো।সে সাবধানে ওনাকে ছুঁয়ে দিলো। নাকের কাছে হাত ধরলো। তারপর ওর নিজের হাত-পা যেন হিম হয়ে এল। পিসিমা বোধহয় বেঁচে নেই। তাড়াতাড়ি ছুটে নীচে আসতে যাচ্ছে সে। হঠাৎ পিছন থেকে পিসিমার গলা পেল, দাঁড়াও। খবরটা পরে দিলেও হবে।
লতা চমকে ফিরে তাকালো। তা হলে কি পিসিমা মা*রা যাননি? কিন্তু একই রকমভাবে বসে আছেন। চোখ বিস্ফারিত, মুখ হাঁ করা। সেই হাঁ করা মুখ একটুও নড়ল না। কিন্তু পিসিমার কথা শোনা যেতে লাগল, আঁচল থেকে চাবি খুলে নে। উত্তরের ঘরে যাবি। কাঠের বড় আলমারিটা খুলে কাঠের বাক্স পাবি। নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে লুকিয়ে রাখবি। কেউ টের না পায়।
সোমলতা বাক্সটা আঁচলে আড়াল করে ঘরে আসবার সময় দুজন তাকে দেখতে পায়। একজন ওর জা বন্দনা আরেকজন চাকর ভজহরি। এবার পিসিমার গয়না সোমলতা কীভাবে আগলে রাখে নাকি ধরা পড়বে দেখা যাক।
🚿পাঠ প্রতিক্রিয়া🚿
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের "অদ্ভুতুড়ে" সিরিজ আমার খুব পছন্দের। কিশোর উপন্যাস হিসেবে বেশ ভালো এবং সাবলীল বর্ণনা। পড়তে ভালো লাগবে। ওনার অন্যান্য বইগুলো পড়ার ইচ্ছা থেকেই "গয়নার বাক্স" পড়া। সত্যি বলতে আমার কাছে তেমন ভালো লাগেনি। কিছু কিছু জায়গায় বর্ণনা বেশ ধীরগতিতে চলেছে। বিশেষ করে সোমলতার মেয়ে বসন এর অংশগুলো। সোমলতার অংশ ভালো লেগেছে কিন্তু বসনের অংশ বোরিং। যেন বই বড় করতে আনা।
আপনি যদি বেশি খুঁতখুঁ��ে হন বইয়ের ব্যাপারে তাহলে ভালো নাও লাগতে পারে এই বইটি। এখানে মুক্তিযু*দ্ধের প্রসঙ্গ আছে সেটা নিয়ে আলোচনায় গেলাম না কতটুকু যৌক্তিক তবে এটা যদি সোমলতার গল্প হয় তাহলে ভালো কিন্তু বসন এখানে ব্যর্থ। ভূ*ত পিসির হাস্যরসাত্মক অংশ ভালো ছিল তবে সবমিলিয়ে বলা যায় মোটামুটি। এই বই নিয়ে সিনেমা আছে। ওখানে আবার কিছু জিনিস অতিরঞ্জিত করে দেখানো হয়েছে। বইয়ের সাথে মিল পাবেন না। তাই বইয়ের চিন্তা থাকলে সিনেমা আগে দেখা ঠিক হবে না।
"আমি যে তাকে ভালবাসি তা ওঁর রূপের জন্যও নয়, গুণের জন্যও নয়। ভাল না বেসে থাকতে পারি না বলে বাসি।"
সোমলতার বিয়ে হয় এক জমিদার বাড়িতে। জমিদার বাড়ির "ভাঁড়ে মা ভবানী" হলেও রক্তের ঠাট বাট ষোলো আনা বজায় রয়েছে; হোক সে ঘরের মেয়ে বউদের গয়না বেঁচে বা বৈঠক খানার ঝারবাতি নিলামে তুলে। অলস অকর্মণ্য পুরুষে গিজগিজ যে নামমাত্র জমিদারি সে বাড়ির বউ হয়ে আসে গরীব খেটে খাও��়া ঘরের অল্প বয়সী সোমলতা। সোমলতার চেষ্টায় সংসারের হাল ফেরে, বাড়ির পুরুষগুলো কর্মঠ হয়ে ওঠে।কিন্তু সোমলতা সংসারের হাল ধরার মাঝে রয়েছে কিছুটা রহস্য, কিছুটা ভৌতিক চরিত্রের অবদান। সোমলতার মৃত পিসি শাশুড়ির ১০০ ভরি সোনা সমেত গয়নার বাক্স হলো উধাও! আর সেই পরিপ্রেক্ষিতেই উপন্যাসের নাম হয়েছে "গয়নার বাক্স"।
উপন্যাসে "রাসমণি-সোমলতা-বসন" এই তিন নারী চরিত্রকে প্রাধান্য দিয়ে কাহিনীর দিক পরিবর্তন করা হয়েছে।রাসমনি, অর্থাৎ পিসিমা হলেন প্রথম প্রজন্মের মেয়ে, যে খুব অল্প বয়সে সমাজের নিষ্ঠুরতায় জীবনের সব রঙ হারিয়ে গৃহবন্দী হতে বাধ্য হয়। যৌবন থেকে শুরু করে তার পুরোজীবন কেটে যায় মস্ত বড় বাড়ির তিন কামড়ার চিলেকোঠায় এক সাদা থান গায়ে জড়িয়ে। এর পরে আসে দ্বিতীয় প্রজন্মের নারী চরিত্র, সোমলতা। সোমলতার মতো চরিত্র সার্বিক নারী সমাজকে প্রতিনিধিত্ব করে।তাঁর স্বামীর প্রতি ভালোবাসা, সংসারের প্রতি অবদান, শশুর, ভাসুরের প্রতি দায়িত্ববোধ ও শ্রদ্ধা যেকোনো নারীর সাধারণ বৈশিষ্ট্য বৈকি! এই সমলতার গর্ভে জন্ম নেয় তৃতীয় প্রজন্ম, বসন। সোমলতার সাজানো মহা প্রাচুর্যের সংসার আলো করে আসে বসন। মুখ ফুটে রা করবার আগে ঠাকুরদা-জ্যাঠা-বাবা মেয়ের সামনে পৃথিবী তুলে ধরেন। আদর আহ্লাদের গন্ডি ছাড়িয়ে নিজ স্বভাবে বসন হয়েছে সবার চেয়ে আলাদা, আধুনিকা, ভাবনাবিলাসি। অনেকেই পুরো বই পড়ে ভাবতে পারেন বসন কে অর্নর্থক উপন্যাসে জায়গা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমার মনে হয়, তিন প্রজন্ম কে একে অপরের পরিপূরক বোঝাতে এর থেকে চমৎকার উদাহরণ আর হয়না। ১ম প্রজন্মের রাসমনি যদি হয় বঞ্চিত, অভাগী, কপালপোড়া তাহলে তার অন্য পিঠে ৩য় প্রজন্মের বসন হলো রাজকপালি।
উপন্যাসের আলোকে নির্মিত অপর্ণা সেনের "গয়নার বাক্স" চলচ্চিত্রটি বাংলা বিনোদন জগতে সেরার তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।ব্যক্তিগতভাবে আমার উপন্যাসের তুলনায় চলচ্চিত্রটিকে খুব বেশি গোছানো বলে মনে হয়েছে। তবে সিনেমার শেষ অংশ মুক্তিযোদ্ধার মতো ব্যাপার কে আংশিক যুক্ত করে কাহিনীকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করা হয়েছে। বই পড়ায় আকর্ষণ বোধ না করলে অনায়াসে "গয়নার বাক্স" সিনেমাটি দেখে ফেলতে পারেন।
"গয়নার বাক্স" আমার পড়া শীর্ষেন্দুর প্রথম বই। রহস্যের উপন্যাস শুনেছিলাম কিন্তু রহস্য খুঁজি নি, সেজন্যেই বোধ হয় উপভোগ করেছি। অনেকের কাছে খাপছাড়া মনে হলেও আমি কিছু সূক্ষ্ম বার্তা পেয়েছি, জানিনা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় কি সেটিই বোঝাতে চেয়েছিলেন কিনা।
বিধবা নারীর শেষ সম্বল দশ ভরি গয়না বাড়ির লক্ষ্মীমন্ত বউয়ের কাছে সুরক্ষিত রেখে মহাকালে যাত্রা করেন পিসিমা। বউ গয়না ঠিক মত সামলে রেখেছে কিনা তা লক্ষ্য রাখার জন্য যেনো ইহজীবন পুরোপুরি ছাড়তেও পারেন নি তিনি, এতই প্রিয় সে গয়না। সেই বউয়ের কোলে যখন ঘর আলো করা কন্যা সন্তানের আগমন হয় তখন মনে হয় যেন পিসিমারই পুনর্জন্ম হয়েছে।
অনেকেই এখানে প্রথম প্রজন্ম থেকে তৃতীয় প্রজন্মের রুপবদলটি তুলে ধরেন। সেটি ভুলে গিয়ে আমি যদি চিন্তা করি দুটি প্রজন্ম কিংবা দুটি জীবন, রসময়ীর জীবন আর বসনের জীবন। একই বাড়িতে দুটি ভিন্ন সময়ে জন্ম নেওয়া দুটি প্রাণ, কিন্তু কি ভীষন তফাৎ তাদের চিন্তাভাবনায়, পাওয়া না-পাওয়ায়।
বসন জীবনে সেসব কিছুই পেয়েছে যা পিসিমার জীবনে কল্পনার অতীত ছিল। সেজন্যই বোধ হয় বসনের জীবনকে দেখার দৃষ্টি সম্পূর্ন ভিন্ন। যে একাকিত্ব রসময়ীর জীবনে ছিল দুঃখের কারণ, তা বসনের কাছে অমূল্য সম্পদ। আর এই গয়না? তা বসনের চোখে বিশ্রী পুরনো দিনের জিনিস। রসময়ী বিধবা বালিকা হয়ে বড় হয়েছে, সঙ্গীর ভালোবাসা সে কোনোদিন পায় নি। আর বসনের জীবনে সেরকম চাওয়াই নেই, কোনো পুরুষের প্রতি তার ভালো লাগা কাজ করে না। একা থাকতেই তার পরম সুখ।
বসন এর তিনতলার ঘরে যে হু হ্ন বয়ে যাওয়া, সে যেনো রসময়ীর একলা থাকার বেদনা, রসময়ীর যন্ত্রণা। কেননা সে বসনের মধ্যেই পুনর্জন্ম পেয়েছেন, যে বসন সম্পূর্ন ভিন্ন মানুষ হয়ে উঠেছে। একাকীত্ব সে উপভোগ করে, যে একাকিত্ব রসময়ীর দুঃখের কারণ।
বইটিতে সবচেয়ে উজ্জ্বল চরিত্র সোমলতা, নিজের বুদ্ধি আর ধৈর্য দিয়ে সে অনেক সাহসিকতার পরিচয় দেয়। পিসিমার মনের জ্বালা যন্ত্রণা যে বিষবানের মত ছুড়ে মারতো, তা দিয়ে সেসময়ের বাল্যবিধবাদের জীবনের কষ্ট ধারণা করা যায়। বাকি চরিত্র গুলো সমাজের আর দশটা মানুষের মতোই। তবে অলকেশ কিছু টা ভিন্ন।
গল্পের শেষে বসনের প্রাণের গভীরে যে পুরুষের স্থান, যায় জন্য সে নিজের অজান্তেই জায়গা তৈরি করে রেখেছে মনে, সেই পুরুষের পায়ের আওয়াজে ঘরের হ্ন হ্ন করা যন্ত্রণা থেমে যায়। পিসিমা যেন শেষ পর্যন্ত পেলেন যা তিনি আগের জনমে হারিয়েছিলেন।
This entire review has been hidden because of spoilers.
আমি এর আগে শীর্ষেন্দুর কিছু পড়িনি, এটাই প্রথম। বইয়ের শুরুটা বেশ ভালো ছিল। কিন্তু শেষটা এতই আকস্মিক যে আমি প্রথমে ভাবলাম আমার ইবুকে কোন সমস্যা। একদিনে একটা বই শেষ করার দুর্লভ অভিজ্ঞতা হল অনেক দিন পরে। তবে বইটা তেমন ভালো না। উনার স্টোরিটেলিং এর গতি আছে বলাই বাহুল্য; কিন্তু চরিত্রগুলো মনে হয়েছে পলিশ করা উচিত ছিল আরো। শীর্ষেন্দু সম্ভবত চেয়েছেন ফেমিনিজম অ্যাটেম্পট করতে। তিন জেনারেশনের তিনজন, মা মেয়ে আর মায়ের বিধবা পিসিশ্বাশুড়ি। পিসির জীবনে শুধু একশ ভরি গয়না ছাড়া আর কিছু ছিল না। আজীবন সে বিধবা হয়ে একটা ঘরে বন্দী হয়ে থাকে। এই গয়না সে দিয়ে যায় উপন্যাসের মাকে। আর ভূত হয়ে এসে সে মাঝে মাঝেই খবর নিতে আসে গয়নার। অন্যদিকে, মা খুবই স্বামীপরায়ণ, লক্ষ্মী আর চালাক। পরে যখন মেয়ে বসনের জন্ম হয়, তখন যেন পিসিই বসন হয়ে জন্ম নেয়। কারণ এরপর থেকে আর কখনো পিসিমার ভূত আসে না। বসন টিনেজার, আর আমার ধারণা লেখক টিনেজ কোন মেয়ের মনস্তত্ত্ব হয় বিশ্লেষণ করেননি, নাহয় সেদিকে মনোযোগ দেননি। বসন খুবই স্টেরিওটিপিক্যাল "Not like other girls"। সেই পরে পিসির গয়নার অধিকারী হয়। কিন্তু তার এর প্রতি কোন আগ্রহই থাকে না! হয়তো লেখক দেখিয়েছেন পিসিমার জীবন গয়নাতেই সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু বসন পড়ালেখা করে, ভিডিও গেম খেলে, স্কুটি চালায়! কিন্তু বইটা শুধু পর্যবেক্ষণেই থেমে গেল, চরিত্রগুলোর ডেপথে আরো এক্সপ্লোর করল না। তাই একটু হতাশ হলাম আরকি। rating: 3/5
মুভিটা দেখেছিলাম অনেক আগে। শেষের দিকে হযবরল করে ফেলেছিল, তখন থেকেই ভাবছিলাম বইটা পড়ব। বইটা সুন্দর তবে সবকিছুই যেন খুব সহজেই হয়ে গেল। ব্যবসা শুরু করল, লাভ হল, আরেকটা দোকান নিল, শ্বশুর-শ্বাশুড়ি সবাই সবকিছু অতি সহজেই মেনে নিল, ব্যবসাও তরতর করে চলল, একেবারে ছবির মত সাজানো সংসার! মনে হচ্ছিল সবকিছু খুব দ্রুত হচ্ছে, এই গল্প নিয়ে আরও বিশাল উপন্যাস লেখা যেত। সবচেয়ে অদ্ভুত লেগেছে, যে গয়না নিয়ে বড় জা এত কাহিনী করল, সে জা কে সোমলতা কখন গয়নার কথা বলল, কি বলল, সে কেন এত সহজে মেনে নিল, কিছুই বোঝা গেল না! হঠাৎ একদিন তার সামনে বাক্স খুলে বসনকে গয়না দেখানো শুরু করল, অদ্ভ��ত! সবচেয়ে ভালো লেগেছে মেয়েদের অবস্থার পরিবর্তন দেখতে, মাত্র এক জেনারেশনের পার্থক্যে রসময়ী আর বসনের জীবনে আকাশ-পাতাল তফাৎ! মুভিতে যদ্দুর মনে পড়ে, সোমলতা দোকান করেছিল পিসির গয়না বন্দক দিয়ে, পরে সেটা ছাড়িয়ে আনে, শেষে বসনও গয়না দান করে, অর্থাৎ গয়নার আরও ভূমিকা ছিল। কিন্তু বইতে বাক্সের গয়নার কোন ভূমিকাই নাই! নিল আর লুকিয়ে রেখে দিল!
ছোটবেলায় সংগীত বাংলায় গয়নার বাক্সের ট্রেইলার বা কিছু একটা দেখেছিলাম। অন্য কিছু মনে না থাকলেও বুড়ি ভূতটার কথা ভুলিনি। হয়তো সেই স্মৃতিচারণ করতেই বইটা পড়া। ৮৭ পৃষ্ঠার ছোট্ট একটা বই। রিডারস ব্লকে থাকলে এ বই পড়তে পারেন। লাইট একটা গল্প। সোমলতার পিসশ্বাশুড়ীর ভূত এবং তার গয়নার বাক্সকে ঘিরে যত কাহিনী। পড়ে বেশ মজা লেগেছে। সোমলতা চরিত্রটা খুবই ভালো লেগেছে, এতটা ভালো লাগবে আশা করিনি। পিস শ্বাশুড়ীর চরিত্র নিয়ে আলাদা কিছু বলতে হবে বলে মনে করি না। বাকি চরিত্রগুলো মোটামুটি ছিল।তবে বসনকে আমার তেমন ভালো লাগেনি।সোমলতার গল্পে বারবার তার উপস্থিতিতে খেই হারিয়ে ফেলছিলাম। শেষে অবশ্য বসনের এতbবর্ণনার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম।কিন্তু বসনের গল্প যখন এতদূর বলাই হলো, তখন সমাপ্তি কেন ঠিকঠাক দেয়া হলো না ? সমাপ্তির সময়ই লেখকরা কেন এত নির্দয় হয়ে যান বুঝিনা।কিন্তু সব মিলিয়ে পড়তে ভালোই লেগেছে। অনেক জায়গায় শুনলাম লেখকের অন্য একটা বই 'রাসমনির সোনাদানা'-র সাথে নাকি এই গল্পের প্রায় পুরোটাই মিল । আমি তো পড়িনি তাই বুঝছি না। যারা পড়েছেন,দেখতে পারেন।
খুব ছোটবেলা থেকেই বই পড়ার সুবাদে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় লেখা পড়ার সুযোগ হয়েছে। সগর্বে বলতে পারি, সিনেমাটি তৈরীর অনেক আগেই উক্ত বইটি প্রায় দুই থেকে তিনবার পড়ে ফেলেছি। টাইম পিরিয়ড নিয়ে লেখা বইটা আমার বরাবরের প্রিয়। এখানে দেশভাগ, স্মৃতিচারণ, জীবনের ওঠা পড়া, পিসি ঠাকুরমা, এবং ভূত। সবটাই বিশেষ উল্লেখ্য। ১০০ কোটি গয়নার বাক্সটিকে ঘিরেই সমগ্র উপন্যাস।
শীর্ষেন্দুর লেখা গয়নার বাক্স উপন্যাসটি ৩ টি প্রজন্মকে সাজিয়ে লিখা হয়েছে।পিসিমা রাসময়ী,সোমলতা আর বসন।সোমলতা হচ্ছে নিচু বংশের পরিবারের মেয়ে।তার স্বামী ছিলেন বনেদি পরিবারের ছেলে।লোক দেখানো বাহাদুরি ছিলো তাদের শুধু।বংশের সকল পুরুষ ছিলো অলস প্রকৃতির।কেউ নিজে খেটে খেতে রাজি নন।নিজেদের পূর্ব পুরুষের জমি স্বর্ণ গয়না বিক্রি করে সংসার চালাতো। সোমলতার শাশুড়ি ছিলেন খুব শান্ত প্রকৃতির,আর সবসমই তিনি লতার সকল কাজে সাথে থাকতেন।এই নিচু বংশের মেয়ে লতা এসেই বনেদি বংশের পুরুষদের করেছে পরিশ্রমী।নিজের স্বামী চকোরকে ব্যবসায় বসিয়েছেন।সবসময় নিজে ঢাল হয়ে পাশে ছিলেন।কিন্তু পরিবারের অন্য পুরুষরা সেটাই সম্মতি না দিলেও পরে তারাও নিজেরা খেটে আয় করতে শুরু করে।
তাহলে তো প্রশ্ন উঠে গয়নার বাক্স আসে কোথা থেকে এখানে?এই গয়নার বাক্স ছিলো তাদের পিসিমার।সেসময়ের ১০০ ভরি স্বর্ণ ছিলো এই বাক্সে।পিসিমা ৭ বছর বয়সে বিধবা হয়ে এই বাড়িতে উঠে আসেন।তাকে এই বাড়িতে রাখা হয় শুধুমাত্র তার স্বর্ণের উপর লোভের কারণে।যেনো মারা গেলেই সব স্বর্ণ তারা বণ্টন করতে পারে।কিন্তু স্বর্ণের লোভ কি কেও এত সহজে ছাড়ে?পিসিমা মারা যাওয়ার পরও তার গয়নার বাক্স এর নজরদারি করতেন।আর এই বাক্স সামলানোর দায়িত্ব পরে লতার উপর।তিনি জীবিত তেও দাজ্জালের মত ছিলেন আর মৃত্যুর পর ভুত হয়ে লতার উপর কম অত্যাচার করতেন না। বসন হলো লতার মেয়ে।বসনের সময়কার ঘটনা পড়লে বুঝা যায় কিভাবে সমাজ আস্তে আস্তে পরিবর্তন হয়ে মেয়েদের জন্য সহজ হয়ে যায়।মেয়েরা তখন আগের থেকে সবকিছুতে এগিয়ে।আর বসনের মধ্যে তারা সকলে নিজেদের পিসিমা কে খুঁজে পেতো।লতা ভাবতো পিসিমার আবার পুনর্জন্ম হয়েছে বসন হয়ে।তবে এই গয়নার বাক্সের কি হয়।পিসিমা কি সারাজীবন এর নজরদারি করে গিয়েছেন?ভুত হয়ে অত্যাচার করে গিয়েছেন খালি লতাকে?শেষটা জানতে হলে বইটি পড়ে দেখতে পারেন। পাঠ প্রতিক্রিয়া:এই গল্প কিছুটা ভৌতিক আবার সে সময়ের সমাজের কথাও তুল ধরে।দূরবীন উপন্যাসের মত এই উপন্যাসেও লেখক প্যারালাল এ উপন্যাসটি সাজান।শেষটা খুব সুন্দর ছিলো।কিন্তু বসনের কাহিনীটা না আনলেও ভালো হতো।হয়তো লেখক বসনের কাহিনী বলে তখনকার সময়ে মেয়েদের সমাজের পরিবর্তনের কথা বুঝাতে চেয়েছিলেন আর পিসিমার পুনর্জন্ম তার মধ্যেই হয় সেটি বুঝাতে চেয়েছিলেন।
আমার পড়া সবচেয়ে ফালতু উপন্যাসগুলোর মধ্যে একটা হল গয়নার বাক্স।লেখক মহাশয় বোধহয় চেষ্টা করেছেন নারীবাদী হওয়ার,তা করতে গিয়ে উলটো নারীকে অসম্মান করে ফেলেছেন। এই উপন্যাসের ৩টি প্রধান নারী চরিত্র রসময়ী,সোমলতা আর বসন।এদের মধ্যে সবচেয়ে ডাইমেনশনহীন চরিত্র হল বসন।কেন তা বলি।গল্পের প্রথমে দেখা যায় রসময়ী নিতান্তই তিক্ত এক বিধবা,যিনি তার গয়নার বাক্সকে পুঁজি করে সংসারে টিকে আছেন।তার মৃত্যুর পর সেই গয়নাকে পরিবারের অকর্মন্য পুরুষদের হাত থেকে রক্ষা করতে তিনি এর ভার চাপিয়ে যান সোমলতার উপর।সোমলতা যদিও অত্যন্ত যোগ্য একজন নারী,তার মনোভাব পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এক দুর্ভাগ্যজনক ফসল।তার স্বামী পরকীয়া করলেও সে বলে "তাকে ভালবাসি কারণ না বেসে পারি না,আমি সতীন সহ্য করতে পারব" ইত্যাদি। এইটুকু পড়ে মনে হয় যে দুইজন ই টিপিকাল মহিলা।একজন গয়না নিয়ে অবসেসড আরেকজন পতিপ্রেমে পাগল।এই পর্যায়ে লেখক আমাদের 'নট লাইক আদার গার্লস' চরিত্র বসনকে নিয়ে আসেন।সে তার মেয়ের মত স্বামীকে ঘিরে জীবন গড়ে তুলতে রাজি না(আসলে তাকে একজন রিজেক্ট করেছে সেই অপমান সহ্য হয়নি) আবার তার দাদির মত সে গয়না নিয়েও আগ্রহী না।এমনকি,তার গয়না দেখলে 'গা ঘিন ঘিন করে'। কি বুঝলাম এই উপন্যাস পড়ে তাহলে?যেসব মেয়ে স্কুটি চালায়,ভিডিও গেমস খেলে আর ছেলেদের অপছন্দ করে তারা হচ্ছে কুল।আর লেখকের মতে যেসকল স্টেরিওটিপিকাল নারী আছেন (মানে যারা স্বামীর জন্যই সব করে,গয়না জামাকাপড় ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত থাকে) তারা একদম হাস্যকর,তাদের জীবনটা কী দুঃখের! পুরুষতান্ত্রিক মনমানসিকতা নিয়ের নারীবাদী উপন্যাস রচনা করলে যা হয় তাই গয়নার বাক্সে হয়েছে।২ স্টার রেটিং দিলাম কারণ লেখায় ফ্লো আছে,এছাড়া একদম অখাদ্য বই।