সাধারণ কিন্তু মর্মস্পর্শী এক উপন্যাস "চাঁপাডাঙার বউ" একটি সামাজিক উপন্যাস যাতে উনিশ শতকের প্রথম দিকের গ্রাম-বাংলার জীবনকে তুলে ধরা হয়েছে। অনুন্নত দেবগ্রামের একমাত্র সমৃদ্ধ মন্ডল বাড়ির সেতাব ও তার ছোটভাই মহাতাপ নামের ভিন্নধর্মী দুই মানুষিকতার ভাইয়ের সংসার জীবনের গল্প। তাদের স্ত্রী কাদম্বিনী ও মানদাকে ঘিরে পারিবারিক জীবনের বর্ননা দিতে গিয়ে লেখক গ্রামীণ জীবনকে খুব সুক্ষ্মভাবে তুলে ধরেছেন। নিজের মধ্যে নিজে হেরে গিয়ে ঘুরে দাঁড়াবার গল্প। সর্বোপরি আবহমান গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের সংসার-এর এক নিখুঁত উপাখ্যান " চাঁপাডাঙার বউ"।
Tarashankar Bandyopadhyay (Bangla: তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়) was born at his ancestral home at Labhpur village in Birbhum district, Bengal Province, British India (now West Bengal, India). He wrote 65 novels, 53 story-books, 12 plays, 4 essay-books, 4 autobiographies and 2 travel stories. For his novel Arogyaniketan, he received the Rabindra Puraskar in 1955 and the Sahitya Akademi Award in 1956. In 1966, he received the Jnanpith Award for his novel গণদেবতা. He was honoured with the Padma Shri in 1962 and the Padma Bhushan in 1969.
Tarasankar is one of those writers of the third decades of the twentieth centuries who broke the poetic tradition in novels but took to writing prose with the world around them adding romance to human relationship breaking the indifference of the so called conservative people of the society who dare to call a spade a spade. Tarasankar’s novels, so to say, do not look back to the realism in rejection, but accepted it in a new way allowing the reader to breathe the truth of human relationship restricted so far by the conservative and hypocrisy of the then society.
He learned to see the world from various angles. He seldom rose above the matter soil and his Birbhum exists only in time and place. He had never been a worshipper of eternity. Tarasankar’s chief contribution to Bengal literature is that he dared writing unbiased. He wrote what he believed. He wrote what he observed.
His novels are rich in material and potentials. He preferred sensation to thought. He was ceaselessly productive and his novels are long, seemed unending and characters belonged to the various classes of people from zaminder down to pauper. Tarasankar experimented in his novels with the relationships, even so called illegal, of either sexes. He proved that sexual relation between man and women sometimes dominate to such an extent that it can take an upperhand over the prevailing laws and instructions of society. His novel ‘Radha’ can be set for an example in this context.
His historical novel ‘Ganna Begum’ is an attempt worth mentioning for its traditional values. Tarasankar ventured into all walks of Bengali life and it’s experience with the happenings of socio-political milieu. Tarasankar will be remembered for his potential to work with the vast panorama of life where life is observed with care and the judgment is offered to the reader. and long ones, then any other author. He is a region novelist, his country being the same Birbhum. He mainly flourished during the war years, having produced in that period a large number of novels and short stories.
বিভূতিভূষণের উপন্যাস মোটামুটি সব শেষ করে ফেলার পর আমার মধ্যে হতাশা কাজ করছিলো,এরপর কি পড়বো? এখন আর সেই ভয় নাই। কারণ তারাশঙ্কর সেই অভাব নিশ্চিতভাবেই পূরন করবেন। চমৎকার লেখার গাঁথুনি,কাহিনী বিন্যাস,গ্রামীন জীবনের দারিদ্র্যতার,সুখ দুঃখের গল্পের সুনিপুণ বর্ননা দিয়ে তারাশঙ্কর আমার হৃদয় হরন করিলেন। সাধু ভাষায় লেখা এই দুই লেখকের লেখনীতে আমি রীতিমত নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছি।
রিভিউ- সেতাব ও মহাতাপ দুই ভাই। দুইজন সম্পূর্ণ দুই মেরুর। একজন যেমন হাড় জিরজিরে,শান্তশিষ্ট,বিষয়প্রেমী ও কৃপণ আরেকজন তেমনই খরুচে,পরিশ্রমী,নেশারু এবং স্পষ্টভাষী। একজন ব্যবসা ছাড়া,কাজ ছাড়া কিছু বোঝে না আরেকজন যাত্রা ছাড়া,চাষ ছাড়া কিছু বোঝে না। এদের দুজনের দুটো বউ আছে। কাদম্বিনী ও মানদা। দুজনেই জ্ঞাতি,চাঁপাডাঙ্গা নামক গ্রামে তাদের বাড়ি।
মানদার একটি ছেলে আছে কিন্তু কাদম্বিনী নিঃসন্তান। বড় বউ কাদম্বিনীর সাথে দেবর মহাতাপের একটু অতিরিক্ত রকমের ভালো সম্পর্ক। বদরাগী দেবরকে বড় বউ ছাড়া কেউ শান্ত করতে পারে না। বড় বউও দেবরকে না খাইয়ে নিজে খায় না। তার কিপ্টা স্বামী কোনোভাবেই দেবরকে সিকি পরিমাণ বিষয় আশয়ে ঠকিয়ে দেবে,কাদম্বিনী থাকতে সেই উপায় নেই।
দেবর ভাবীর এরকম সম্পর্ক আমাদের সমাজ কি ভালোভাবে দেখে? কখনোই দেখে না। তার ওপর সেটা গ্রাম। স্বাভাবিকভাবেই কথা ওঠে। দেবর যখন মাঠে কাজ করে তখনও তার জন্য খাবার নিয়ে যায় তার বউ নয়,বড় বউ। টিকুরীর খুড়ি বলে একজন মহিলা আছেন যার মুখে কোন কথা বাঁধে না। চুন থেকে পান খসলেই রাস্তার মাঝখানে দাড়িয়ে গালাগালি,শাপশাপান্তের মাঝে দেবর ভাবীর এই সম্পর্ক নিয়ে টিটকারি মারতে সে ছাড়ে না। তার কথা থেকে আরো দশজনের, তারপর একশজনের মনে সন্দেহ তৈরি হয়।
কিন্তু কাদম্বিনী আর মহাতাপের সম্পর্ক আসলে কি? সেই ছোটবেলায় যখন সে বিয়ে হয়ে বউ হয়ে আসে তখন থেকে দেখছে মহাতাপকে। একসাথে খেলা করেছে। রান্নাবাটি খেলায় কাদম্বিনী সবসময় মহাতাপের মা হয়ে তাকে শাসন করতো। আর তাই দেখে তার শ্বাশুড়ি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলতেন,ওকে তোর হাতে দিয়ে গেলাম,তুই হবি ওর মা। মা ছাড়া যে ও একেবারেই থাকতে পারে না!
কিন্তু সমাজ তার কতটুকু জানে? সমাজের কাজ শুধুই কুৎসা রটানো। শ্বাশুড়ি বৌমাতে,জায়ে জায়ে সবসময় ঝগড়া হবে,ভাইয়ে ভাইয়ে হাঁড়ি আলাদা হবে এসবই তাদের কাছে নিত্য স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু ভাইয়ে ভাইয়ে একটি পরিবার হয়ে একত্রে মিলেমিশে বাস করা দেখলে সমাজের চোখ টাটাবেই।
তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায় শুনেছি খুব পরিশ্রমী লেখক ছিলেন। সারাক্ষণ লিখতেন, প্রচুর লিখতেন। তিনি তার লেখায় সমাজের সংসারের অনেক কিছুই যেমন তুলে এনেছেন তেমনই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনার জন্য আলাদা একটি দৃষ্টিকোণ থেকেও সমাজকে দেখিয়ে দিয়েছেন, যেটা আমরা কখনো ভাবতেও পারি না তেমনই আধুনিক চিন্তাধারা সেই আমলের একজন লেখকের মস্তিষ্কপ্রসূত লেখায় বের হয়ে এসেছে,ব্যাপারটা সত্যি মুগ্ধ করার মতো।
সাধারণ কিন্তু মর্মস্পর্শী এক উপন্যাস "চাঁপাডাঙার বউ"। মহাতাপ ও সেতাব নামের ভিন্নধর্মী দুই মানুষিকতার ভাইয়ের সংসার জীবনের গল্প। নিজের মধ্যে নিজে হেরে গিয়ে ঘুরে দাঁড়াবার গল্প। সর্বোপরি আবহমান গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের সংসার-এর এক নিখুঁত উপাখ্যান " চাঁপাডাঙার বউ"।
সাজানো-গোছানো সামাজিক উপন্যাস বলতে যা বোঝায়, 'চাঁপাডাঙার বৌ' পড়ে তা-ই মনে হয়েছে আমার কাছে। একটা গ্রামের দুটো পরিবারের মধ্যেই কাহিনি সীমাবদ্ধ রেখেছেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। চাপাডাঙা অথবা অন্য কোনো স্থানের কাহিনি সম্পূরক হিসেবে যোগ না করে এককভাবে সরল বর্ণনার ঢঙে মিলনাত্মক পরিসমাপ্তি টেনেছেন। এ উপন্যাস অবলম্বনে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবদ্দশায়ই ১৯৫৩ সালে সিনেমা বানিয়েছিলেন নির্মল দে। সে কারণেই কিনা, জানি না, লেখাটা চালচ্চিত্রিক পরিচর্যায় নির্মিত। পরে বাংলাদেশেও নায়করাজ রাজ্জাকের নির্মাণে আমরা 'চাঁপাডাঙার বৌ' পেয়েছিলাম ১৯৮৬ সালে।
'চাঁপাডাঙার বৌ' সংসারে ভাঙনের সুর ধরাতে ধরাতে এগিয়ে শেষমেশ মিলনের বীণা বাজায়। ভাঙনের কলকাঠি নাড়া দুটো গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ঘোঁতন ঘোষ আর টিকুরীর খুড়ী। সহজাত খলবৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল উভয়েই। মানুষের প্রত্যেকটা আচরণেরই পেছনে একটা সুনির্দিষ্ট কারণ থাকে। ঘটনাক্রমে ঘোঁতন আর টিকুরীর খুড়ীর খল আচরণের পেছনে পঞ্চায়েতের বিচার প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। এ ব্যাপারটি কথিত 'ভিলেজ পলিটিক্স'-এর নোংরা নিদর্শন হিসেবে উপন্যাসে এসেছে।
'ভিলেজ পলিটিক্স' ধারণাটা একইভাবে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় 'বিপিনের সংসার' উপন্যাসে দেখিয়েছেন। বিপিনের বোন বীণার কথা মনে পড়ে প্রতিতুলনায়। জহির রায়হানের লেখা 'হাজার বছর ধরে'। হালিমা সালেহার মুহূর্তের খল আচরণে আত্মাহুতি দিতে যায়। কিন্তু জীবনের তৃষ্ণার কাছে পরাজিত হয় সে চেষ্টা।
'ভিলেজ পলিটিক্স'-এর অস্তিত্ব এবং অস্তিত্বহীনতা একইসাথে দেখা যায় 'বোবা কাহিনী' উপন্যাসে। আজাহের প্রথমত যে গ্রামে থাকত, সেখানে শ্রেণিবৈষম্য প্রকট। বিশেষত তার মতো সহজ-সরল চাষীকে ঠকিয়ে বড়ো হওয়া শরৎরা প্রবল পরাক্রমে বড়ো হতে থাকে একদিকে, অন্যদিকে তাম্বুলখানা গ্রামে দেখা যায় একতার সৌম্য-সুন্দর নিদর্শন।
চাঁপাডাঙার বৌয়ের মহাতাপের সাথে বাৎসল্যের বন্ধন। এ ব্যাপারটির কুৎসিত ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে ভোগায় তাকে টিকুরীর খুড়ী। 'হাজার বছর ধরে' উপন্যাসে হীরণের বিয়ের আসরে মন্তু আর টুনিকে ঘিরে সালেহা এবং ফকিরের মা প্রশ্ন তোলে। যদিও সে লেখায় মন্তু এবং টুনি উভয়েই এ ধরণের সম্পর্কের ব্যাপারে অল্প হলেও আগ্রহী ছিল। 'চাঁপাডাঙার বৌ' উপন্যাসে এরকম আগ্রহের স্থান নেই। বরং সন্তান-বাৎসল্যই এতে প্রধান হয়ে উঠেছে।
এদিকে সন্তান না হবার ব্যাপারটি নিয়ে টিকুরীর খুড়ী ব্যক্তি-আক্রমণ করলে আত্মঘাতী হতে দেখি বড় বৌকে। সেতাবের পথভ্রষ্টতা ত ছিলই।
'হাজার বছর ধরে' উপন্যাসের ছমিরন বিবির ঘটনাটি তুল্য এর সাথে। সন্তান জন্ম দিতে ব্যর্থ হয়ে কাশেম শিকদারকে বিয়ে করিয়ে নিজে ধুতুরার ফুল খেয়ে আত্মহত্যা করে সে।
গ্রামীণ সমাজে নিঃসন্তান নারীর অবস্থা বুঝতে হলে চাঁপাডাঙার বৌকে বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে। সর্বশেষ মাহবুব-উল হকের 'মফিজন' উপন্যাসে দেখেছি কনের পিতাকেই নানা হবার আগ্রহে ভুল জামাতার ভিড়ে ঠিক জামাতা খুঁজে পেয়ে তৃপ্ত স্বীকারোক্তি জানাতে।
নিঃসন্তান নারীর বেদনা সেলিনা হোসেনের 'হাঙর নদী গ্রেনেড' উপন্যাসেও দেখেছি বুড়ির মধ্যে। নীতা আর বুড়ির সংলাপে এ বেদনা ধরা পড়ে।
- তুই যেন কি ভাবছিস সই? তোর কি হয়েছে রে? নীতা দরদ দিয়ে বুড়ির সঙ্গে কথা বলে। - আমি যদি তোর মতো হতে পারতাম। - যা, এ জীবন আবার কেউ চায় নাকি। তোর কত সুখ! তুই কেনো আমার মতো ভবঘুরে হতে যাবি। তোর মতো জীবন পেলে আমি আর কিছুই চাইতাম না রে? এমন গোছানো সংসার, স্বামী, ছেলে - - ছেলে? বুড়ির কণ্ঠ ���েন চিরে যায়।
সলীম আর কলীম গর্ভের সন্তান নয়, তাই বলে তাদের বুড়ি ভালোবাসে না, এমন নয়। তবু নিজের গর্ভে ধরা সন্তানের মাতৃত্ব না পাওয়া��া তাকে কাঁদায় প্রতিনিয়ত। যতদিন পর্যন্ত না রইস আসে।
'নদী ও নারী' উপন্যাসে কুসুম চরিত্রেও নিঃসন্তান মায়ের আর্তনাদ রয়েছে। মালেকের সাথে তার বাৎসল্যের সম্পর্ককে বাঁকা চোখে দেখা হয় এ গ্রামীণ আখ্যানে।
"স্বপ্নে আইলো রাজার কুমার স্বপ্নে গেল চইলা রে দুধের মতো সুন্দর কুমার কিছু না গেল বইলা রে!"
আম্বিয়া 'হাজার বছর ধরে' উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হলেও তাকে নিয়ে আলোচনা কম। ওপরের গানটি তারই বাঁধা। ঢেঁকিতে পাড় দিতে দিতে বাঁধে। উপন্যাসে আছে কিনা মনে পড়ছে না, মকবুল তার দুই বৌকে বলে - আম্বিয়া কী সোন্দর গীত গায় আর ঢেঁকিতে পাড় দেয়। আর তরা?!
আম্বিয়ার প্রেম টুনির প্রভাবে ঢাকা পড়ে যায় শুরুতে। আমরা শেষদিকে দেখি হাটে সওদা করে ফিরে এসে আম্বিয়ার সাথে চোখে চোখে কথা বলতে বলতে পুথির আসরে বসে মন্তু।
মন্তুকে নিজের করে পেতে পেতে না পাবার আক্ষেপই বোধকরি শুরুর দিকের "স্বপ্নে আইলো রাজার কুমার..."
হীরণের বিয়েতে আবার আম্বিয়া ঢেঁকিতে চড়ে গান ধরে -
"ভাটুইরে না দিও কলা ভাটুইর হবে লম্বা গলা..."
বলতে চাচ্ছি ঢেঁকিতে চড়ে গান ধরাটা আমাদের দেশীয় অন্তঃপুরের সংস্কৃতির অংশ। কখনো সে গানে বিরহ, কখনো উৎসব, কখনো বা অতিথি আপ্যায়ন।
এও কিন্তু ঢেঁকিতে পাড় দিতে দিতে গাওয়া আপ্যায়নের গান।
মহাতাপ-মানদার সংসারে প্রেমের অল্প কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অস্তিত্ব দেখা যায়।
- হ্যাঁ। আমার কোলে মাথা রেখে শো। আমি জল দেখি আর তোকে দেখি। হঠাৎ এই বর্ষার আমেজে তাহার আবেগ-উথলিয়া উঠিল। সে দুইহাতে মানুর মুখখানি ধরিয়া বলিল, পাগলি পাগলি পাগলি! তোকে আমি খু-ব ভালবাসি। - ছাই বাস। দিনরাত-মারব, মারব আর আকথা কুকথা! - আরে। সে কথা তোকে না মানু তোকে না। তোর ক্যাঁট-কেঁটে কথাকে- - হুঁ। বড় মোল্যানের কথাগুলা তো মিষ্টি লাগে! তার বেলা? আরে বাপরে! দুই হাত জোড়া করিয়া কপালে ঠেকাইয়া মহাতাপ বলিল, আরে বাপরে, বড়কী বহু, উ তো ঘরকে লছমী হ্যায়। মহাতাপ মানদাকে সজোরে বুকে চাপিয়া যেন পিষিয়া ফেলিল।
তারাশঙ্কর 'কবি' আর 'সপ্তপদী'তে যে প্রেম লিখেছেন, 'চাঁপাডাঙার বৌ' সে ধারায় ব্যতিক্রম। এখানে পুরোদস্তুর দাম্পত্য প্রেম। সমাজের চোখে যাতে কোনো কলঙ্ক হবার নয়।
নিতাই আর ঠাকুরঝির প্রেমে যদি সমাজ ডান চোখ পাকিয়ে তাকায়, তবে বসন্তের সাথে বিয়েতে বাম চোখ গরম করে ভস্ম করে দিতে চায়। তবু প্রকৃত নায়ক অকুতোভয়।
কৃষ্ণস্বামী ত জাতই দিয়ে দিল প্রেমের জন্য।
সেদিক দিয়ে 'চাঁপাডাঙার বৌ' প্রেমের বেলায় কিছু বৈচিত্র্যহীন। দুঃসাহসিক কিছু করে ফেলবার প্রেষণা তারাশঙ্কর মহাতাপকে দেননি।
অবশ্য প্রেম করতে গিয়ে স্থির হয়ে থাকা বিয়ে ভেস্তে দিয়েছে ঘোঁতন ঘোষ। কাহিনির গঠনবিচারে তার সেরকম সর্বগ্রাসী প্রভাব না থাকায় এ প্রেমের ব্যাপারে আলোচনার সুযোগ তেমন নেই।
আসলে কৃষিজীবী পরিবারের সামাজিক গল্পে সে অর্থে প্রেমের আলোচনার অবকাশ নেই বললেই চলে। অথচ বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে দুজন দেখিয়েছেন নিম্নবর্গের কৃষিজীবী মানুষের প্রেমের গভীর রূপ।
প্রথমত বলি সেলিনা হোসেনের কথা। 'হাঙর নদী গ্রেনেড' উপন্যাসে তিনি চিরায়ত প্রেম এবং দাম্পত্যপ্রেম দুই-ই দেখিয়েছেন বুড়ির জীবনে। আলোচনায় যেহেতু প্রতিতুলনা জরুরি, গফুরের অংশটুকু থেকে ঘুরে আসি -
"শান্ত পানিতে নৌকা ভাসে। গফুর বৈঠা ছেড়ে দিয়ে বুড়িকে কাছে টেনে নেয়। বুড়ির কিশোরী ঠোঁটে অপূর্ব মাধুর্য। গফুর পাগলের মতো নেশা খোঁজে। দিক ভুল হয়ে যায় গফুরের। কোনো দিশা করতে পারে না। বুড়ি এখন অনেক কাছের-অনেক উষ্ণ-অনেক মিনতি ভরা। ..."
এখানে সরল বর্ণনার আশ্রয়ে নির্মল সাহসী প্রেমের আনাগোনা।
আবার,
"বউ একটু হাসিয়া আঁচলের বাতাসে কেরোসিনের কুপিটি নিবাইয়া আজাহেরের মুখে একটি মৃদু ঠোক্না মারিয়া বিছানার উপর যাইয়া শুইয়া পড়িল। আজাহের বউ-এর সমস্ত দেহটি নিজের দেহের মধ্যে লুকাইয়া তার বুকে মুখে ঘাড়ে সমস্ত অঙ্গে মুখ রাখিয়া কেবলই বলিতে লাগিল, "আমার একটা বউ ঐছে--সোনা বউ ঐছে--লক্ষ্মী বউ ঐছে--মানিক বউ ঐছে। তোমারে আমি বুকে কইরা রাখপ--তোমারে আমি কলজার মধ্যে ভইরা রাখপ--আমার মানিক, আমার সোনা, তোমারে মাথায় কইরা আমি মাঠ ভইরা ঘুইরা আসপ নাকি? তোমারে বুকে কইরা পদ্মা গাঙ সাঁতরাইয়া আসপ নাকি? আমার ধানের খ্যাতরে, আমার হালের লাঠিরে--আমার কোমরের গোটছড়ারে--আমার কান্ধের গামছারে। তোমারে আমি গলায় জড়ায়া রাখপ নাকি?"
এভাবে পল্লীকবি তাঁর 'বোবা কাহিনী' উপন্যাসে সংলাপের ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রেম রচনা করলেন।
আবার দাম্পত্য প্রেমের আতিশয্যে বিলটু বুধ্নীর গর্ভে নিজের ঔরসে জন্ম নেওয়া সন্তানটিকে নির্মমভাবে হত্যা করে পরে ফাঁসি পায়। বনফুলের গল্পটির শিরোনাম 'বুধ্নী'।
'চাঁপাডাঙার বৌ' পড়তে নিয়ে শুরু থেকেই একে একটা সোজাসাপ্টা ফ্যামিলি ড্রামা ধরণের উপন্যাস মনে হয়েছে। সে কারণে এ উপন্যাস নিয়ে বিস্তারিত লেখার চিন্তা প্রথমত করিনি। পরে যত সামনে এগিয়েছে পড়া, সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক কিছু উপাদান আমাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে।
সই মা, বড় বৌ আর মানদার চরিত্রের মাতৃরূপের আলাদা আলাদা বিশেষত্ব চাইলে খুঁজে বের করা সম্ভব।
সই মা সেতাবের সংসারের অমঙ্গল বুঝে তা ঠেকানোর প্রতিজ্ঞা থেকে সেতাবের দেওয়া পোশাক ফিরিয়ে দেন। তাতে মাতৃবিশেষত্ব উজ্জ্বল হয়। উজ্জ্বল হয় তার শক্ত ব্যক্তিত্ববোধ।
বড় বৌ যদিও তাবিজ ধারণ করে সন্তানের আশায়, তবু তার চিরায়ত মাতৃত্ব তাকে সেসব ছিঁড়ে জলে ফেলতে উদ্যত করে তোলে।
আবার মহাতাপ মানিককে দিয়ে দিচ্ছে বড় বৌকে। এ অবস্থায় মানদার প্রতিক্রিয়া মাতৃসুলভ ছিল কিনা, ভেবে দেখা যেতে পারে।
মা চরিত্র যেসব কথাশিল্পে আমরা পাই তার মধ্যে এ মুহূর্তে মনে পড়ছে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শওকত ওসমানের 'জননী' নামের আলাদা দুটো উপন্যাসের কথা। হরিশংকর জলদাস নিম্নবর্গের সচেতন মা চরিত্র তৈরি করেছেন তাঁর বিভিন্ন উপন্যাসে। আগেই বলেছি বনফুলের বুধ্নী গল্পের কথা। সেখানে তিনি লিখেছেন - "বর্বর জননীরও মাতৃত্ব আছে, ..."। কথাসাহিত্যিক মোহিত কামালের 'চোরাগলি' উপন্যাসে দেখি নিঃসন্তান এক কলেজশিক্ষিকা ফুপুর মাতৃহৃদয় ইথা'র প্রতি কতখানি স্নেহশীল।
আরেকটি জরুরি বিষয় না লেখাটা অন্যায়ের পর্যায়েই পড়বে। যেদিন বড় বৌ চাপাডাঙা চলে যাবেন তার আগের রাতে সেতাবের মনের খচখচানিটা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই জায়গাটায় তার ভুল ভেঙে যাওয়ার উপক্রম। আমেনা আর ফাতেমাকে তালাক দেবার পর 'হাজার বছর ধরে' উপন্যাসে মকবুল জ্বরের ঘোরে ভুল বকতে গিয়ে আমেনা আর ফাতেমার নামে উতলা হয়ে যায়। একপর্যায়ে ভোররাতে তার মৃত্যু ঘটে। সংসার জীবনের এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ মনস্তত্ত্ব।
🅒 রেজওয়ান আহমেদ শিক্ষার্থী, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য (���ষ্ঠ আবর্তন), বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
This entire review has been hidden because of spoilers.
খুবই পেইন নিয়ে পড়তেসিলাম, কারণ মনে হচ্ছিলো সেই শরৎচন্দ্রের মতোই সবকিছু ঠিকঠাক করে শেষ করে দিবে, কিসের নারী স্বাধীনতা কিসের ভালা কাজকারবার! কিন্তু শেষে এসে ভ��ল্লাগসে ব্রো, খুব কমই এই সময়কার লেখক হ্যাপি এন্ডিং দিতো, তখন মেইবি মানুষ স্যাডিস্টিক ছিলো!
বইটা এখন পড়লেও নাম শুনেছি বহুবার। চাঁপা ডাংগার বৌ শুনলেই কেন যেন খুব সুন্দরী, দেবী প্রতিমার মত একটা বৌ এর ছবি চোখে ভেসে উঠত! বই পড়ে সেটা আরও পাকাপোক্ত হল! এই উপন্যাস নিয়ে সম্ভবত মুভি হয়েছে। আমার মনে হচ্ছে এই গল্প নিয়ে কয়েকশ পর্বের সিরিয়াল বানানো যেতে পারে! কাদম্বিনীর যার সাথে বিয়ে হবার কথা ছিল তার বোনকেই আবার ওর বর বিয়ে করতে চাচ্ছে দেবরের প্রতি সন্দেহ বশত! আহ! সেই কত বছর আগে তারাশংকর কত হিন্দি সিরিয়ালের রসদ রেখে গেছেন! :P উপন্যাসটা সত্যিই ভাল লেগেছে। এমন নাটকীয় সমাপ্তি সত্ত্বেও ভাল লাগার কারণ লেখকের লেখনী।
যাদের ভেতরটা কদর্যে ভরা , তারা তাদের চারপাশটাকেও নোংরাই দেখে। সহজ সরল মানুষরা জগতটাকে সুন্দরই দেখে, তাদের সম্পর্কগুলোও হয় সহজ সরল। কিন্তু নোংরা মনের মানুষগুলোই সমাজে সবচেয়ে বেশী সরব। তারা মহা উৎসাহে সমাজে বিষবাষ্প ছড়াতেই থাকে। সহজ সরল মনের মানষগুলোর সহজ সুন্দর জীবন তারা বিষাক্ত করে তোলে। তাদের কারনে কত নিষ্পাপ সম্পর্ক প্রতিদিনই ধ্বংস হচ্ছে তার হিসেব নেই।
আমাদের সমাজে ঘোতন বা ঠিকুজি খুড়ির মত মানুষগুলোর সংখ্যা কমে যাক। অন্তত খুব দেরি হওয়ার আগে সেতাবের মত মানুষরা নিজের ভুল বুঝতে শিখুক। পৃথিবীতে ভালোবাসার জয় হোক, ঈর্ষা আর ঘৃণার হোক পরাজয়।
ইন্ডিয়ান বাংলা ডেইলি সোপের গ্রাম্য ভার্সন। ১১০ পৃষ্ঠা পড়তে যেখানে ১ দিন লাগার কথা, সেখানে ৩ থেকে ৪ দিন নষ্ট হলো। মলাট অকারণে বেশি সুন্দর হয়ে গেছে, এবং বেমানান।
বাংলা সাহিত্যের ক্লাসিক্যাল উপন্যাস গুলোর একটা। তারাশঙ্কর মানেই তারার মত জ্বলজ্বলে তার দুর্দান্ত প্রমাণ৷ মাহতাপ এর প্রেমে পড়ার মত অবস্থা৷ আমার কাছে দুর্দান্ত লেগেছে ❤️
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের চাঁপাডাঙার বউ কেবল একটি গ্রামীণ পরিবারকেন্দ্রিক উপন্যাস নয়—এটি আমাদের সমাজের অন্তরালে জমে থাকা বিষাক্ত সন্দেহ, ঈর্ষা এবং অপবাদ রটনার বিরুদ্ধে এক নীরব কিন্তু বিস্ফোরক প্রতিবাদ। গল্পটি পাঠকের হৃদয় টানে তার আশ্চর্য সহজ বুনোটে, যেখানে অতি পরিচিত একটি গ্রাম্য সংসার হঠাৎ করে এক বিরল অসাধারণতার রঙে রঙিন হয়ে ওঠে।
বৌ নাকি মা? দেবর নাকি ছেলে? সম্পর্কের রূপান্তর
উপন্যাসের মর্মস্থলে রয়েছেন কাদম্বিনী—এক নিঃসন্তান নারী, যিনি একদিকে স্বামীর কিপটে, হিসেবি মনের ভার বইছেন, অন্যদিকে মাতৃস্নেহে বড় করেছেন শ্বশুরবাড়ির ছোট দেবর মহাতাপকে। কাদম্বিনীর চরিত্রটি এতটাই নিখুঁতভাবে আঁকা, যে পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগে—এ কি কেবল বৌদির দায়িত্ব? নাকি এর অনেক গভীরে লুকিয়ে আছে এক নিঃস্বার্থ, মাতৃত্বমণ্ডিত ভালোবাসা? আর এই ভালোবাসার ব্যাখ্যা না বুঝেই সমাজ তাকে তকমা পরিয়ে দেয় "অবৈধ সম্পর্ক"-এর।
তারাশঙ্করের মুন্সিয়ানা এখানেই। তিনি কখনও কিছু বলেন না সরাসরি। তিনি দেখান। এবং আমরা পাঠক হিসেবে বুঝি—নির্ভেজাল সম্পর্কও এই সমাজে নোংরা চোখে দেখা হতে পারে। আমরা ভাবতে বাধ্য হই—কে বেশি অপরাধী? কাদম্বিনী আর মহাতাপ, না ঘোতন মাসি, ঠিকুজি খুড়ি আর রাস্তাঘাটের গুজব-শিল্পীরা?
তারাশঙ্করের সমাজচিন্তা: অতীতেও আধুনিকতার ধাক্কা
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে লেখা হয়েও উপন্যাসটি আশ্চর্যরকম সমসাময়িক। বিশেষত, তারাশঙ্করের লেখনী সমাজের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রশ্ন করে। দুই ভাই—সেতাব ও মহাতাপ—একজন স্থির, কৃপণ, সংবরণশীল; আরেকজন উচ্ছৃঙ্খল, অনুভূতিপ্রবণ। এবং এই দুই মেরুর মাঝে দাঁড়িয়ে কাদম্বিনী নিজস্ব এক আলোকবর্তিকা—যে কিনা ‘মহিলাদের আদর্শ’ হতে চায় না, বরং হতে চায় একজন মানুষ, এক পরিচর্যাকারী, এক স্তম্ভ।
এখানে বিয়ে কেবল সমাজ-স্বীকৃত কাঠামো নয়, বরং চরিত্রদের বাস্তব জীবনের সংকট আর সঙ্কটে পরিণত হয়। মানদা, মহাতাপের স্ত্রী, প্রায় অনুপস্থিত। তবু কাদম্বিনীর সাথে তার বিরোধ তৈরি হয় দেবরের প্রতি কাদম্বিনীর নিঃস্বার্থ স্নেহে ঈর্ষা থেকে। যেন “মাতৃত্ব”-ও কখনো কখনো অসহ্য হয়ে ওঠে অন্য নারীর চোখে।
ভাষা ও বর্ণনার গুনে এক পাঁজরভাঙা যন্ত্রণা
তারাশঙ্করের ভাষা কঠিন নয়, তবে অনায়াসে পাঠকের মর্মে ঢুকে যায়। একেকটি সংলাপ, একেকটি পরিস্থিতি যেন গ্রামবাংলার হৃদয় ছুঁয়ে আসে। আমরা দেখতে পাই, কাদম্বিনীর নিষ্পাপ অনুভব কীভাবে সমাজের সন্দেহে কলুষিত হয়, আর শেষমেশ ভাইয়ে ভাইয়ে বিভেদের রেখা ফুটে ওঠে। তবু সেতাবের আত্মোপলব্ধি পাঠকের কাছে এক নরম আলো। যেন লেখক বলছেন—সব দেরি শেষ দেরি নয়।
এই উপন্যাস আসলে কী শেখায়?
যে সম্পর্ক সবসময় নাম পায় না, তা বেইমান নয়।
সমাজের মুখ সবসময় সত্য কথা বলে না।
নারী, বিশেষত নিঃসন্তান নারী, সব কিছুতেই শুধু ‘দায়’ নয়—তিনি নিজেও একটা নিজস্ব মহাকাব্য।
ভালোবাসা যতটা স্পষ্ট, সমাজ তাকে ততটাই ঝাপসা করে তোলে।
শেষ কথা
চাঁপাডাঙার বউ পড়া মানে হলো—একজন নারীর চরিত্রের গাঁথুনি বুঝে ওঠা, একজন রচয়িতার সমাজদর্শনের গভীরতা উপলব্ধি করা। এই বই পড়ার পর হুট করে উঠে যাওয়া যায় না। একটা দীর্ঘশ্বাস থেকে যায়। একটা মৌন অস্বস্তি—আমরা কি কাদম্বিনীকে এখনো ঠিক করে পড়ে উঠতে পারি?
আর সবশেষে একটা কথা—এই বই যদি এখনও না পড়ে থাকেন, তবে একটা পরামর্শ: casually নয়, বুক খালি করে পড়ুন । কারণ এই বই, আপনাকে নিঃস্ব করে দেবে... নিজের অজান্তে।
বইয়ের নামঃ চাঁপাডাঙার বউ লেখকঃ তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ধরনঃ সামাজিক-পারিবারিক উপন্যাস প্রথম প্রকাশঃ ১৯৫৪ পরবর্তী সংস্করণঃ ফেব্রুয়ারি ২০০৪ প্রকাশনীঃ অবসর প্রকাশনী মোট পৃষ্ঠাসংখ্যাঃ ১১২
তারাশঙ্কর বাবুর লিখনের চমৎকার একটি দিক হলো, তিনি পল্লীগাঁয়ের খেটে খাওয়া মানুষের চরিত্রের নানান মোড় ও বাঁকের এক অবিমিশ্র ব��্ণনা তুলে ধরেন। "চাঁপাডাঙার বউ" ও ঠিক তেমনই একটি উপন্যাস। খুব ছোটবেলায় মুভিটা দেখা হয়েছিলো, তাই এর সম্পূর্ণ কাহিনী সম্পর্কে বিস্মৃত ছিলাম। শুধু আবছা আবছা মনে ছিলো চাঁপাডাঙার বৌ চরিত্রে শাবানার লক্ষীপ্রতিমার মত মুখখানি, এবং মহাতাপ চরিত্র ধারণকারী বাপ্পারাজের আধপাগল বেশে গাঁয়ের মেঠোপথে গান গেয়ে বেড়ানো। তবে হ্যাঁ, কোন উপন্যাসভিত্তিক চলচ্চিত্র দেখে যতটা না আনন্দ, তার চেয়েও বেশি আনন্দ বোধহয় বইটির পাতা উলটে উলটে যাওয়ায়। সে যাইহোক! কাহিনীতে আসা যাক।
দেবগ্রামের সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী ঘরটি মন্ডলবাড়ি। এই মন্ডল পরিবারের দুই ভাই- সেতাব ও মহাতাপ। সচরাচর দুই ভাইয়ে অত মিল না থাকলেও কিছুটা মিল তো থাকবেই এটাই স্বাভাবিক তাই নয় কি? কিন্তু এই দুই মন্ডল ভাইয়ের মাঝে ছিলো আকাশ পাতাল তফাত! শীর্ণকায় গড়নের সেতাব স্বভাবে ছিলো রাশভারি, সাংসারিক এবং হিসাবী, অপরদিকে ছোট ভাই মহাতাপ ছিলো আমুদে, চঞ্চল এবং ঠিক ততটাই খরুচে। সাংসারিক ধ্যানজ্ঞানের কোন গাছপাথর না থাকা এই আধপাগল দেওরটিকে মায়ের মত স্নেহ ভালবাসায় আগলে রেখে এসেছেন বৌদি কাদম্বিনীই-- জি ঠিক ধরেছেন, এই কাদম্বিনীই হচ্ছে আমাদের উপন্যাসের মূখ্য চরিত্র-- "চাঁপাডাঙার বউ"। এগারো বছর বয়সে লাল টুকটুকে চেলির কাপড় পরে ঝুমঝুম শব্দে মল বাজিয়ে মন্ডলবাড়িতে প্রবেশ ঘটেছিলো তার, আর তখন থেকে এই সাতাশ বছর অব্দি ঘরকন্না, পূজো আর্চা থেকে শুরু করে দেওর মহাতাপের বিয়ে দেয়া অব্দি সবই করেছে সে একা হাতে। জা হিসেবে এনেছে তারই জ্ঞাতি বোন মানদাকে।
সংসারজীবনে নিঃসন্তান কাদম্বিনীর প্রাণ বলতে যদি কিছু থাকে, তা হলো তার সন্তানসম দেওর মহাতাপ এবং মহাতাপ ও মানদার একমাত্র ছেলে মানিক। প্রায় পিঠেপিঠি বয়সের এই দেওর বৌদির স্নেহার্দ্র মমতা মাখানো সম্পর্কটিকে গাঁয়ের লোকেরা কুটিল চোখে দেখবে, এটিই স্বাভাবিক। আর সেই কুটিলতার আগুনে ঘি ঢেলে দিতে বদ্ধপরিকর ছিলো দেবগ্রামের গোপাল ঘোষের ছেলে ঘোতন ঘোষ এবং শিবকেষ্টর টিকুরির খুড়ী। একরাশ সন্দেহ, কুৎসা, শ্লেষ ইত্যাদির সংমিশ্রণে প্রায় ছারখার হয়ে যেতে নেয় মন্ডল পরিবারের সুখশান্তি, স্ত্রীকে পরিত্যাগ করে সেতাব। সেতাবের এরূপ আচরণ এবং জা মানদার অপমানভরা বিদ্বেষ সইতে না পেরে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয় শান্তিপ্রিয় কাদম্বিনী, এবং নিরুদ্দেশের পথে পা বাড়ায় আধপাগল মহাতাপ।
কিন্তু আসলেও কি কাদম্বিনী পেরেছিলো সংসারের মায়া কাটাতে? এত সহজ সেই মায়া কাটানো?
উপন্যাসটা নিয়ে নতুন করে বলবার কিছুই নেই। শরৎচন্দ্রের 'বিরাজ বৌ" পড়ে চোখ ভিজে এসেছিলো; ঠিক তেমনই একটা ছায়া পেলাম পুরো গল্পে। বিরাজের মত কাদম্বিনীও পল্লীগাঁয়ের এক মায়াবতী বধূ, যার জীবনে সংসারধর্ম এবং পরিবারের সদস্যদের সুখশান্তি সর্বাগ্রে। একই সাথে গাঁয়ের সকলের প্রতি সহানুভূতিশীলও সে। কিন্তু বালিকা বধূ হিসেবে সংসারে অনুপ্রবেশের পর মৃত্যুশয্যায় কাতর শ্বাশুড়িকে দেয়া বচন রক্ষা করতে গিয়ে একজনকে মাতৃসম স্নেহ ও মায়ার আকরে রাখতে যেয়েই বিপত্তি ঘটলো তার। বাংলার সমাজে দেবর - ভাবির সম্পর্ক নিয়ে কুৎসা রটাটাই স্বাভাবিক! কিন্তু এর বাইরেও কিছু সম্পর্ক থাকে, যার মাঝে থাকে মাতৃস্নেহের মত নির্মলতা ও বিশুদ্ধতা। তৎকালীন প্রাগৈতিহাসিক সেই বঙ্গসমাজে এই পবিত্র সম্পর্কের এক নিটোল চিত্র অঙ্কন করেছেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়।
তবে হ্যাঁ, ব্যক্তিগতভাবে আমি কাদম্বিনী চরিত্রটিকে আরও বেশি আত্মপ্রত্যয়ী এবং আত্মসম্মানশীল হিসেবে কল্পনা করেছিলাম। প্রতিবাদের ভাষা, দৃঢ়সংকল্পচিত্তে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার ভাষা আরো মজবুত হওয়া উচিত ছিলো তার। আসলে যারা খুব বেশি মায়াবতী হয় এবং দুনিয়াকে স্নেহ মায়ার ভাষায় পড়তে অভ্যস্ত, তাদের জন্য এরূপ বিপদে ভেঙে পড়াই স্বাভাবিক বৈকি। তবে সেটাই সঠিক পন্থা নয়! আমার মতে, কাদম্বিনীর ব্যক্তিত্ববোধ চলনসই হলেও তার আত্মসম্মানের জায়গাটা তুলনামূলকভাবে ফাঁপা। এবং লেখক তার এরূপ চারিত্রিক চিত্র অঙ্কন করেছেন কাহিনীরই স্বার্থে।
উপন্যাসে আরো ঠাঁই পেয়েছে কাদম্বিনীর প্রতি সহানুভূতিশীল প্রৌঢ় বিপিন মোড়ল (মোটা মোড়ল), গাঁয়ের চাষী রাখাল পাল, কুটিল ও ধূর্ত ঘোতন ঘোষ, তার বোন পুঁটি, কলহপ্রিয়া টিকুরির খুড়ীসহ আরো অনেকে। এই সকল চরিত্রের সম্মেলনে উপন্যাসটি আরো বিমূর্ত হয়ে উঠেছে, এ যেন সাক্ষাত সেই চিরায়ত বাংলার ঐতিহ্যকে বহন করে।
যেকোন সামাজিক উপন্যাসের একটি উপকারিতা এই যে, সেটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের কথা বলে, একটি সভ্যতাকে ধারণ করে। কেমন ছিলো সেই অবিভক্ত প্রাচীন বাংলা (বঙ্গ)? বারো মাসে তেরো পার্বণে মুখরিত ছিলো সেই সমাজ। সেই সমাজ আবৃত ছিলো সামাজিক রীতিনীতি এবং বিচার শালিসে! একজনের বিপদে আপদে আরেকজনের এগিয়ে আসার নামই ছিলো সেই বঙ্গসমাজ, যার প্রতীকী চরিত্র বহন করে কাদম্বিনী, মহাতাপ, পুঁটি, বিপিন মোড়ল, রাখালের মতো মানুষেরা।
"সংসার এক দুঃখ সুখের খেলা আশাই তার একমাত্র ভেলা"-- নিঃসন্তান কাদম্বিনীও আশা করেছিলো দুঃখ সুখের সেই ভেলায় চড়ে সংসার নামক সায়র সে পাড়ি দেবে, আর তার সঙ্গী হবে স্বামী সেতাব। কিন্তু সেই দাম্পত্যজীবনে আশা নামক ভেলা মরীচিকা মাত্র, যেখানে ঠাঁই নেয় অন্যদের ভিত্তিহীন গালগল্পের মাধ্যমে তৈরি হওয়া সন্দেহ ও অবিশ্বাস!
সবমিলিয়ে ১১২ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসটি হয়ত সাধারণ, কিন্তু মর্মস্পর্শী এবং শিক্ষণীয়।
সেতাব মন্ডল ও মহাতাপ মন্ডল দুই ভাই। বাবার রেখে যাওয়া আর প্রায় হারিয়ে যেতে বসা সম্পদ বুদ্ধিমত্তা আর কঠোর পরিশ্রম দিয়ে তিল তিল করে ভাগ্যের চাকা বদলায় সেতাব। কিন্তু সে বড় কিপ্টে স্বভাবের।
সেতাব ও তার স্ত্রী কাদম্বিনী নিঃসন্তান। নাম কাদম্বিনী হলেও চাঁপাডাঙা থেকে বউ করে আনায় তাকে সবাই তাকে চাঁপাডাঙার বউ বলে ডাকে। কাদম্বিনীকে ছাড়া কারোই চলে না। বিশেষ করে মহাতাপের।
সে সেতাবের ছোট ভাই আর একেবারেই তার উল্টো চরিত্রের। ছোটবেলায় অসুখে পড়ার পর থেকেই মহাতাপের মাথায় খানিকটা সমস্যা। যখন তখন রেগে যায় আর রাগলেই এরে ধরে তো ওরে মারে। তার স্ত্রীর নাম মানদা । মানিক নামের ছোট্ট ছেলেও আছে তাদের। কিন্তু সংসার জীবন ফেলে মাঝে মাঝে ভবঘুরে হয়ে থাকে সে।
তবে অশান্ত মহাতাপকে শান্ত করতে পারে চাঁপাডাঙার বউ। নিজের সন্তান না থাকলেও মহাতাপকে ছেলের মতো আদর করে বড় করেছে সে। ১১ বছর বয়সে বউ হয়ে মন্ডলবাড়িতে আসার পর থেকে আজও অবদি মহাতাপকে মায়ের আদর স্নেহ দিয়েছে।
মহাতাপের ভুলভাল কাজ যেমন কাদম্বিনী দৃষ্টিগোচর করে, মহাতাপও বড় বউ বা কদম্বিনীর অসম্মান হওয়া মেনে নিতে পারে না। তবে গ্রাম্য সমাজে দেবর ভাবীর এই সম্পর্ক নিয়ে লোকমুখে কটুক্তি ও গুঞ্জন শোনা যায় প্রায়ই। যা তাদের সংসারের নানান সমস্যার সৃষ্টি করতে থাকে।
আর এর মাঝেই গল্প আগায়।
------
"চাঁপাডাঙার বউ" বইটি দেখে কেন জানি নামটা চেনা চেনা লাগছিলো। হঠাৎ মনে পড়ে ছোটবেলায় দেখা সিনেমার কথা। নায়িকা শাবানা ছিলেন চাঁপাডাঙার বউ বা কাদম্বিনী, নায়ক বাপ্পারাজ ছিলেন মহাতাপ, সেতাব আর মানদার চরিত্রে ছিলেন এটিএম শামসুজ্জামান আর অরুনা বিশ্বাস।
অনেক আগে দেখলেও সিনেমাটি বেশ ভালো লাগায় কিছুটা মনে ছিলো। তাই বইটা পড়ার সময় চরিত্র আর দৃশ্যগুলো সিনেমার মতো মনে হচ্ছিলো।
গল্পের মূল চরিত্র দুই ভাই আর তাদের দুই স্ত্রী। মূলত এই চারজনের সংসার আর ভিলেজ পলিটিক্সকে কেন্দ্র করেই বইটি লেখা। সংসার ও জীবনের সুখ দুঃখ হাসি তামাসার মধ্য দিয়ে জীবনের বিচিত্র সব দিক উঠে এসেছে গল্পে।
গল্পের প্রতিটি চরিত্র যার যার দিক থেকে অন্যতম। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ছিলো কাদম্বিনীর আর মহাতাপের ভালোবাসা, স্নেহ, মান-অভিমানের দৃশ্যগুলো। তবে বইটির প্রিন্টে বিরামচিহ্নসহ অনেক জায়গায় ভুল আছে। তাই বুঝতে বেগ পেতে হয়েছে। এছাড়া বইটি অবশ্যই ভালো লাগার মতো।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এর লেখা আমার খুব খুব ভাল্লাগে। উনার লেখার মধ্যে কেমন যেন একটা মায়া আছে আর আছে তখনকার সময়ের চিত্র, গ্রাম বাংলায় প্রচলিত শ্লোক বা গান। চাঁপাডাঙ্গার বউ বইটা যখন হাতে পাই তখন নামটা দেখেই চোখের সামনে ভেসে উঠছিলো সুন্দর, মায়াময় এক নারীর ছবি। বইটা পড়ার সময় ও ঠিক তেমন একজনকে পেয়েছি। সেতাব আর মহাতাপ। দুই ভাই এর মধ্যে মিলের চেয়ে অমিল বেশি। সেতাব যখন ছোট তখন তার বাবা মারা যায়। সেতাব সেই সময়ই দেখতে পায় বাবা মারা গেলে কিভাবে আপনজন পর হয়ে যায়। কিভাবে কাছের মানুষরাই ধোঁকা দেয় সবার আগে। বিভিন্ন ধার-দেনা শোধ করতে গিয়ে আর নিজের মা আর ছোট ভাইকে সামলাতে গিয়ে বাদ দিতে হয় নিজের সব স্বপ্ন। এভাবে সে একটু একটু করে জমাতে জমাতে সারা গ্রামের সবচেয়ে বড় আর প্রভাবশালী পরিবার হিসেবে নিজের পরিবারকে গড়ে তোলে। এত কিছু সহ্য করে বড় হয়ে সে যদি একটু কৃপণ হয় তাকে দোষ দেওয়া যায়? মহাতাপ ছোটবেলায়ই এক রোগে আক্রান্ত হয়ে কেমন বোকা হয়ে গেছে। সংসারের কাঠিন্য, মনোমালিন্য, ঠিক-বেঠিক কিছুই বোঝে না। আবার অল্প বয়সেই সেতাবকে বিয়ে করে এ বাড়িতে বউ হয়ে আসে চাঁপাডাঙ্গার বউ। সেই যে শাশুড়ী মারা যাওয়ার আগে তাকে বলে গিয়েছিল সংসারটাকে সামলাতে, মহাতাপকে সামলাতে আজ পর্যন্ত সে কখনো ভোলেনি সেকথা। নিঃসন্তান সে আজও মহাতাপকে নিজের ছেলের মত ভালোবাসে। সে ছাড়া তাকে আর কেউ শান্ত করতে পারেনা। এমনকি বিয়েও দিয়েছিলো নিজের পছন্দমত। কিন্তু এইযে দেবরের সঙ্গে এত ভালো সম্পর্ক এটাকে কি পারবে মহাতাপের বউ মেনে নিতে? এই চারটা মূল চরিত্র ছাড়াও আরো কিছু চরিত্রের দেখা পাওয়া যায় বইয়ে। তার মধ্যে আছে ঘোতন ঘোষ। একজন পরাজিত মানুষ যে অন্যের ভালো সহ্য করতে না পেরে একটা পুরো পরিবারকে শেষ করে দিতে চায়। আর আছে টিকুরি বুড়ি। দেবর- ভাবীর সম্পর্ক নিয়ে কথা শুনাতে ছাড়ে না কারণ ঘোতন ঘোষ তাকে লোভ দেখায় তাকে তার বাড়ি ছাড়িয়ে এনে দেবে বলে। এক থেকে দশ, দশ থেকে একশ জনের মধ্যে একথা ছড়াতে সময় লাগেনা। কিন্তু চাঁপাডাঙ্গার বউ আর মহাতাপের সম্পর্ক আসলে কি? সমাজ কতটুকু জানে তাদের সম্পর্কের? কুৎসা রটাতে তো বিন্দুমাত্র সময় লাগেনা। ভালোবাসার সম্পর্ক মানেই যে প্রেমের সম্পর্ক না সেটা তাদের কে বোঝাবে?
তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়ের বই হিসেবে এটাই ছিল প্রথম পাঠ আমার। আর বইটা পড়া শেষে বলতেই হচ্ছে যে হতাশ হতে হয়নি। লেখক খুব সাধারণ কিন্তু সুন্দরভাবে প্রতিটা চরিত্র, তৎকালীন সময়ের সামাজিকতা, গোঁড়ামি, সমাজের মানুষের কুটিলতা ফুটিয়ে তুলেছেন। এবার মূল কাহিনীতে আসা যাক, সেতাব ও মহাতাপ দুই ভাইয়ের সংসারজীবন, তাদের জীবনের উত্থান পতনের গল্প চিত্রিত হয়েছে এখানে। সেতাব স্বভাবে রাশভারী, কৃপণ অন্যদিকে মহাতাপ চঞ্চল, বেহিসেবি, আর কিছুটা বোকাসোকা। পিতার মৃত্যুর পর সেতাব সম্মুখীন হয় তিক্ত অভিজ্ঞতার, দেনা শোধ করার জন্য বেশিরভাগ সম্পত্তি তাদের বিক্রি করতে হয়, আর এই বিপদে তাদের পরিবার কাউকেই পাশে পায়নি, তখনই সংসার এর হাল ধরে সেতাব। সেতাবের স্ত্রী কাদম্বিনী যে নিঃসন্তান, যার ধ্যান- জ্ঞান তার সংসার, স্বামী, দেবর আর দেবরের ছেলে। অন্যদিকে মহাতাপের স্ত্রী মানদা যে কাদম্বিনীর জ্ঞাতি বোন। কাদম্বিনীর মহাতাপের অতিরিক্ত ভালো সম্পর্ক। মহাতাপের ছোট বেলার খেলার সাথী ছিল এগারো বছর বয়সে মন্ডল বাড়িতে বউ হয়ে আসা কাদম্বিনী। শাশুড়ি মৃত্যুর সময় মহাতাপের দায়িত্ব কাদম্বিনীর হাতে দিয়েছিলেন, বলেছিলেন তার মা হতে আর কাদম্বিনী প্রতিনিয়ত তাই করে গিয়েছে। কিন্তু আমাদের সমাজ, সমাজের কিছু মানুষ কি এসব সম্পর্ক ভালো চোখে দেখে?? এক্ষেত্রেও তাই হয়, সবাই কাদম্বিনী আর মহাতাপের সুন্দর সম্পর্কে কালিমা লেপন করে দেয়। এই পুরো কর্মকান্ডের মূল হোতা ছিল ঘোঁতন ঘোষ আর টিকুরির খুড়ি। আর এসব দেখে সেতাব ও পথভ্রষ্ট হয়ে কাদম্বিনীকে ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেয়। কাদম্বিনী এই অপবাদ থেকে মুক্তির জন্য আত্মহত্যার চেষ্টা করে আর মহাতাপ সব ছেড়ে অজানার পথে পা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু কাদম্বিনী কি শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করতে পেরেছিল? সেতাব কিংবা মানদার ভুল কি ভেঙেছিল শেষ পর্যন্ত?? আমাদের সমাজ আমাদের বিপদে পাশে না থাকলেও, আমাদের ভালো কিছুতে আমাদের সমর্থন না করলেও আমাদের ব্যাপারে কুৎসা রটাতে, কুটিলতার আগুনে মানুষের জীবনকে ছাই করে দিতে তারা সর্বদা প্রস্তুত থাকে। সময় বদলেছে, যুগ পাল্টেছে কিন্তু আমাদের সমাজের সেই বৈশিষ্ট্য এখনও রয়ে গিয়েছে।
সেতাব মন্ডল ও মহাতাপ মন্ডল দুই ভাই। বাবার রেখে যাওয়া আর প্রায় হারিয়ে যেতে বসা সম্পদ বুদ্ধিমত্তা আর কঠোর পরিশ্রম দিয়ে তিল তিল করে ভাগ্যের চাকা বদলায় সেতাব। কিন্তু সে বড় কিপ্টে স্বভাবের, হয়ত বাবার হারিয়ে বসা সম্পদ নিজের কষ্ট আর পরিশ্রমে রক্ষা করতে পেরেছিল বলেই। সেতাব ও তার স্ত্রী কাদম্বিনী নিঃসন্তান। নাম কাদম্বিনী হলেও চাঁপাডাঙা থেকে বউ করে আনায় তাকে সবাই তাকে চাঁপাডাঙার বউ বলে ডাকে। কাদম্বিনীকে ছাড়া কারোই চলে না। বিশেষ করে মহাতাপের, তার কাছে ছিল বৌদি ঘরের লক্ষ্মী। ছোট ভাই মাহতাপ ছিল বড়ভাই এর ঠিক উল্টো চরিত্রের। ছোটবেলায় অসুখে পড়ার পর থেকেই মহাতাপের মাথায় খানিকটা সমস্যা। যখন তখন রেগে যায় আর রাগলেই এরে ধরে তো ওরে মারে। তার স্ত্রীর নাম মানদা । মানিক নামের ছোট্ট ছেলেও আছে তাদের। কিন্তু সংসার জীবন ফেলে মাঝে মাঝে ভবঘুরে হয়ে থাকে সে। তবে অশান্ত মহাতাপকে শান্ত করতে পারে চাঁপাডাঙার বউ। নিজের সন্তান না থাকলেও মহাতাপকে ছেলের মতো আদর করে বড় করেছে সে। ১১ বছর বয়সে বউ হয়ে মন্ডলবাড়িতে আসার পর থেকে আজও অবদি মহাতাপকে মায়ের আদর স্নেহ দিয়েছে। মহাতাপের ভুলভাল কাজ যেমন কাদম্বিনী দৃষ্টিগোচর করে, মহাতাপও বড় বউ বা কদম্বিনীর অসম্মান হওয়া মেনে নিতে পারে না। তবে গ্রাম্য সমাজে দেবর ভাবীর এই সম্পর্ক নিয়ে লোকমুখে কটুক্তি ও গুঞ্জন শোনা যায় প্রায়ই। যা তাদের সংসারের নানান সমস্যার সৃষ্টি করতে থাকে। আর এভাবেই এগিয়ে চলে চাপাডাঙার বউ এর গল্পকাহিনী।
সমাজিক উপন্যাস পড়ার জন্য এযাবৎ বারবার শরৎচন্দ্রের কাছেই ফিরে যেতাম। তারাশঙ্কর-এর যদিও এর আগে কিছু পড়েছিলাম তবে এই বইটার নাম ইন্টারেস্টিং লাগায় কোনোকিছু আর না ভেবেই পড়তে নিয়েছিলাম। এবার আসি কাহিনিতে। সেতাব ও মহাতাপ দুই ভাই। দুই বউ এবং মহাতাপের এক পুত্র নিয়ে গাঁয়ে তাদের বাস। মহাতাপ পাগলা গোছের। উপন্যাসে লেখক বিভিন্ন সামজিক দিক দেখালেও মূল পয়েন্ট- দেবর-বউঠাকরুনের সম্পর্ককে আমাদের সমাজে যে কীরকম ��টাক্ষে দেখা হয় এবং তা লেখক কীরকম সুচারুরুপে ইতিবাচক সম্পর্কে দেখিয়েছেন;তা পড়তে পড়তে রোমাঞ্চ জাগে।
শেষের দিকে যেন তামিল ব্লকবাস্টারের মতো একেকটা সিন ক্রিয়েট হচ্ছিল!
কিছু সম্পর্ক মিষ্টি মধুর হতে পারে অবশ্যই। যাকে ছোটবেলা থেকে কোলেপিঠে করে মায়ের মতো করে মানুষ করা হোক না সে সম্পর্কে দেবর। সন্তানের মতো ভালোবাসা উজাড় করে তাকে দিয়েছে কাদম্বিনী। মাহতাপ ও বৌদির মাঝে খুঁজে পায় নিজের মাকে। কিন্তু সমাজ কী আদৌ বুঝতে পারবে তাদের এই মধুর সম্পর্ক? নাকি ছিটিয়ে দেবে কলঙ্কের কালি?
দীর্ঘদিন পর চিরায়ত বাংলা উপন্যাস পড়ে দারুণ লাগলো। প্রতিটি মুখ্য চরিত্র পাঠকের ভালোবাসার দাবিদার । আর বইটির পাতায় পাতায় যেন মিশে আছে গ্রামবাংলার রূপ-রস-বর্ণ-গন্ধ ।