তারেক মাসুদ ছিলেন দেশবরেণ্য চলচ্চিত্রকার। তিনি বলেছিলেন, ‘চলচ্চিত্রকার না হলে লেখক হওয়ার চেষ্টা করতাম।’ তার মানে লেখালেখির প্রতি একটা টান তাঁর বরাবরই ছিল। প্রায় ২৫ বছর ধরে তিনি চলচ্চিত্রকেন্দ্রিক যেসব প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেছেন তাতে তাঁর চলচ্চিত্র-ভাবনা, দেশের চলচ্চিত্র নির্মাণের সংকট ও সম্ভাবনা এবং চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্ট তাঁর নানামুখী অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটেছে; সঙ্গে রয়েছে তাঁর আত্মস্মৃতি। সেইসব প্রবন্ধের সংকলন এই বইটি।
Tareque Masud (Bengali: তারেক মাসুদ) was a Bangladeshi independent film director, film producer, screenwriter and lyricist. He first found success with the films Muktir Gaan (1995) and Matir Moina (2002), for which he won three international awards, including the International Critics' FIPRESCI Prize, in the Directors' Fortnight section outside competition at the 2002 Cannes Film Festival. The film became Bangladesh's first film to compete for the Academy Award for Best Foreign Language Film.
He died in a road accident on 13 August 2011 while returning to Dhaka from Manikganj on the Dhaka-Aricha highway after visiting a filming location. Masud was working on Kagojer Phool (The Paper Flower). In 2012, he posthumously received Ekushey Padak, the highest civilian award of Bangladesh. In 2013, New York University Asian/Pacific/American Institute, and South Asia Solidarity Initiative, hosted the first North American retrospective of his films.
তারেক মাসুদের চলচ্চিত্র ভাবনা নিয়ে করা নানান লেখালেখি, কোনোটি হয়তো কলাম, কোনটি সেমিনারে পাঠ করা প্রবন্ধ ইত্যাদি লেখা নিয়ে তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশ করা হয়েছে বইটি।
শুরুর দিকের বেশ কয়েকটি লেখা তাঁর নিজের চলচ্চিত্রগুলো তৈরির অভিজ্ঞতা নিয়ে। তাই খানিকটা পড়ে মনে হয়েছিল থাক পরে পড়ি, আগে তারেক মাসুদের সব কাজগুলো ক্রোনোলজিকাললি দেখে নিই। দেখা শুরু করতে আরেক বিপত্তি বাঁধল। যেগুলো আগে দেখেছি, সেগুলো ছাড়া আর মাত্র দুটো দেখতে পারলাম। ক্রোনোলজি মেন্টেন তো দূরে থাক, বহুল আলোচিত কাজগুলো ছাড়া বাকিগুলোর কোনো হদিসই পাওয়া না। দেখা হলো না। এই চেষ্টা করতে করতে প্রায় মাস খানেক চলে গেল। বুঝে গেলাম এই কাজে ব্যর্থ হতে চলেছি, অসমাপ্ত বইয়ের লিস্ট আর লম্বা করতে ইচ্ছা হলো না তাই সুবোধ বালিকার মত বইটিই পড়ে ফেললাম। তবে খোঁজ করে ক্যাথরিন মাসুদের ইমেইল আইডি জোগাড় করে একটি ইমেইল করেছি সব কাজের একটি বক্সসেট বের করার আবদার নিয়ে। দেখা যাক।
স্বাধীন ধারার নির্মাতা হিসেবে ছবি তৈরি করেছেন, বাংলাদেশে চলচ্চিত্রকে সে দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখেছেন। দৃষ্টিভঙ্গির স্বচ্ছতা প্রশংসনীয়। জানিই একটি চলচ্চিত্র নিয়ে কতটা স্ট্রাগল বাংলাদেশের নির্মাতাদের করতে হয়। কিন্তু গভীরতাটা এর আগে এতটা স্পর্শ করেনি। হয়তো বাংলাদেশী একটা ছবি মূল্যায়ন ক্ষেত্রে এখন আমার দৃষ্টিভঙ্গিও আর আগে মত থাকবে না। পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল তারেক মাসুদের সবচেয়ে ভাল গুণ গুলোর একটি হলো পরিবর্তনকে সহজে গ্রহণ করতে পারা। নিজের ব্যাপারে আমার ধারণা ছিল আমি পরিবর্তন কে বেশ ভাল ভাবে গ্রহণ করতে পারি। কিন্তু কিছু অভিজ্ঞতার পর নিজের সম্পর্কে এই ধারণা থেকে সরে এসেছি, তখন থেকেই এই গুণটিকে বেশ বড় বলে মনে হয়।
শেষ দিকে বেশ কিছু লেখায় চলচ্চিত্র আর্কাইভ নিয়ে হতাশার কথা এসেছে। বইটি শেষ করার পর আমার যে অনুভূতিগুলো দীর্ঘক্ষণ ছিল, তার মাঝে একটি ছিল সেই চলচ্চিত্র আর্কাইভ নিয়ে হতাশাই। কিভাবে উপরদিকের মানুষগুলো আর্কাইভিংয়ের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারে না, আমি সে জিনিসটিই বুঝি না। একটি শিশুও তো তার তৈরি জিনিস সংরক্ষণ করতে চায়।
গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কাজ নিয়ে আলোচনাও ছিল কিছু। এখানেও তারেক মাসুদের ব্যক্তিত্বের একটি ব্যাপার ভাল লেগেছে। যার ক্ষেত্রে প্রবল মুগ্ধতা কাজ করে তারও অপছন্দের ব্যাপারগুলোতে সমালোচনা করেছেন।
বইটির লেখাগুলো বেশ ছাড়া ছাড়া। এছাড়াও বেশ কিছু পুনরাবৃত্তিমূলক লেখা রয়েছে। যদি পুনারবৃত্তির ব্যাখ্যা সম্পাদক ক্যাথরিন মাসুদ দিয়েছেন। লেখাগুলোর রচনাকাল দেয়া হয়নি উল্লেখ করলেও কেন দেয়া হয়নি এমন কোনো ব্যাখ্যা সম্পাদক দেননি। সময় না জানতে পারায় অনেক লেখার কনটেক্সট বুঝতে ঝামেলা হয়েছে। এছাড়াও ভাষাগত, তথ্যগত এবং এডিটোরিয়াল ছোটখাটো ভুল ভ্রান্তি এবং অপূর্ণতা রয়েছে গেছে।
যাই হোক, তারেক মাসুদ আফসোস করছিলেন চলচ্চিত্র অঙ্গনে শূন্যতা নিয়ে, নিয়তির সাথে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের শত্রুতার কথা নিয়ে। জহির রায়হান, আলমগীর কবির সবারই মৃত্যু হয়েছে অপঘাতে। তিনি নিজেও চলে গেলেন সড়ক দুর্ঘটনায়। আমি যখন বইটির শেষ পর্যায়ে, তখনিই ড্রয়িং রুম থেকে এলো খালিদ মাহমুদ মিঠুর অদ্ভুত অপঘাতে মৃত্যুর সংবাদ। কেমন যেন মনে হলো চলচ্চিত্র বারবার হারায় আর হেরে যায়। তারেক মাসুদ আশা করেছেন হয়তো ফিনিক্সের মত ছাই থেকেই আবার বাংলাদেশের চলচ্চিত্র উঠে দাঁড়াবে, তবে আমি ঠিক এতটাও আশা করতে পারি না।
তারেক মাসুদ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনে অত্যন্ত পরিচিত কিন্তু অসম্পূর্ণ একজন নাম। অসম্পূর্ণ বলছি এই কারণে, কারণ আরও অনেক কিছুই দিয়ে যাবার ছিলো পরিচালকের। তার আগেই দেশে সড়কদুর্ঘটনায় তার প্রাণ সংহার হয়।
তারেক মাসুদ কে ছিলেন, কি করেছিলেন সেসব তথ্য সহজলভ্য। যেটা সহজলভ্য নয়, সেটি হলো তিনি কেমন ছিলেন, তিনি কোন সময়ে ছিলেন, চলচ্চিত্র নিয়ে তার কি ভাবনা ছিল? এসব তথ্যের জন্য 'চলচ্চিত্রযাত্রা' বইটি একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। যা পরিচালকের স্মৃতি ও স্বপ্নের কিছু খন্ডিত অংশও বটে।
পুরো নাম আবু তারেক মাসুদ। তারেক মাসুদের ব্যাপারে সবচাইতে বড় ট্রিভিয়া হলো এই, ভদ্রলোক ইউনিভার্সিটিতে পড়বার আগে সিনেমাই দেখেননি। মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে উঠে আসা তারেক মাসুদ একসময় বিশ্বনন্দিত সিনেমা 'মাটির ময়না' বানাবেন কে জানতো? 'মাটির ময়না' যেসময় দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে সেসময় আমার শৈশব কৈশোর পর্ব চলছে। ছাড়াছাড়া ভাবে মনে আছে তিনি কোনো একটা গুরুত্বপূর্ণ পুরষ্কার পাচ্ছিলেন ছবিটির জন্য। বইতে কান চলচ্চিত্র উৎসব সহ অনেকগুলো উৎসবে সিনেমাটির পুরষ্কার পাওয়ার সাথে সাথে, পরিচালকের অত্যন্ত অভিমান করা কিছু কথা ছিল। কারণ নিজ দেশে সিনেমাটি তখন ব্যানড!! তারেক মাসুদ কে নিয়ে কিছু অবাঞ্চিত বিতর্ক আমি দেখেছি। কেউ কেউ তার পুরষ্কার, বা অর্জন নিয়ে দৌড়াদৌড়ির কারণে তাঁকে ছোট করেছেন বিভিন্ন ভাবে। এই মনোভাব বা বিষয়টির উত্তরটি প্রচ্ছন্নভাবে দিয়েছেন সত্যজিৎ ও রবীন্দ্রনাথ এর বাঙালি সমাজে পরিচিত পাওয়ার বিষয়টা ব্যাখ্যা করে। আমি বক্তব্যটি হুবহু উদ্ধৃত করছি,
"ইতিহাসের পরিহাস হলো, দুজনের প্রতিভাই আবিষ্কৃত এবং প্রাথমিকভাবে আদৃত হয়েছে পশ্চিমে, জন্মভূমিতে নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল জেতার পরেই কেবল বাঙালি সাহিত্যেসমাজ বুঝতে পারে তাদের মধ্যে এত বড়মাপের একজন কবি রয়েছেন। নোবেল জেতার পর বাঙালি অভিজাত সাহিত্যসমাজের দেওয়া সংবর্ধনা সভায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই অস্বস্তিকর বাস্তবতাটিকে জোর দিয়ে তুলে ধরেন। একইভাবে 'পথের পাঁচালী'র বিরতিহীন প্রশংসা আর মহিমাকীর্তনের মধ্যে আমরা ভুলে যাই যে 'কান উৎসব'-এ সাফল্যের পরও দেশীয় কর্তৃপক্ষ এই বলে ছবিটিকে বাতিল করেছিলেন যে 'ছবিটি অনুজ্জ্বল ও গতিহীন'।"
সত্যজিৎ রায়ের প্রসঙ্গ যখন আসলো, আপনি জানতেন কি তারেক মাসুদের সাথে সত্যজিৎ রায়-এর দেখা হয়েছিলো? বইয়ের এই অংশটায় আমার নিতান্তই গুজবাম্পস হয়েছে বলাই বাহুল্য। যাহোক, তারেক মাসুদ চলচ্চিত্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে জীবিত ছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন, অস্থির রাজনৈতিক সময় দেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধের পর দেশে চলচ্চিত্রের উত্থান এবং নব্বই দশকে অশ্লীলতায় শিল্পের পতন দুইই দেখেছেন। একই সাথে এই সময়ে তিনি ওঠাবসা করেছেন চলচ্চিত্রাচার্য আলমগীর কবির, আহমদ ছফার শিষ্য হয়ে। সাত বছর ধরে তিনি দ্য ম্যান, দ্য মিথ, দ্য লেজেন্ড শিল্পী এস এম সুলতানের সাথে থেকে, গ্রাম বাংলায় ঘুরে তার প্রথম কাজ 'আদম সুরত' নির্মাণ করেন। সুলতানের সাথে ঘুরতে ঘুরতেই তিনি মাটির কাছে পৌছেছিলেন। শেকড়কে চিনতে পেরেছিলেন। যেখান থেকেই একসময় জন্ম নেয় নিজের শেকড়ের গল্প, 'মাটির ময়না'। ছবিটি ফ্রান্সে চার মাস ধরে ৪৪টি সিনেমা হলে চলেছিল।
তারেক মাসুদ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দুটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন। একটি অংশে তিনি তৎকালীন সাংবাদিক লিয়ের লেভিন কে অত্যন্ত সম্মান জানান। কারণ তাঁ্র কাছে তিনি এবং আমরা সকলেই ভীষণভাবে ঋণি।
বইটি আমার ভালো লেগেছে। তারেক মাসুদ কে নিয়ে আমার অনেক প্রশ্ন ছিল। সেসবের কিছু অংশের উত্তর পেয়েছি। সব পাইনি। যেহেতু এটি অনেকগুলো কলামের সংকলন, অনেক জায়গায় একই কথা বারবার এসেছে। তিনি লেখক হিসেবেও দারুণ। চলচ্চিত্রে না এলে তিনি লেখকই হতেন, এটাও জানিয়েছেন। কিছু বিষয�� তিনি আমার মনে হয়েছে এড়িয়ে গিয়েছেন সবসময়ই। এই ছোটখাটো কিছু বিষয় বাদ দিলে বইটিকে বেশ ভালো লাগবে। আমার বইটি আরও ভালো লেগেছে কারণ এই সময় নিয়ে একই সময়ে আরও কিছু বই পড়ছি। কিছু ব্যক্তিত্ব ওই সময়ে একেক বইতে একেকভাবে একেক দৃষ্টিকোণে বর্ণিত হয়েছে। বিষয়টি মজার।
তারেক মাসুদ চিন্তাভাবনায় প্রগতিশীল ছিলেন, সময়ের চাইতে অনেক এগিয়ে ছিলেন। তিনি শুধু নিজের কাজ নিয়ে নয়। দেশের সিনেমা, এর ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে ভাবতেন। তাঁ্র দেশকে দেবার আরও অনেক কিছু ছিলো। তিনি দেশের আশির দশকের তরুণদের নিয়ে একটি সিনেমা বানাতে চেয়েছিলেন। এসব কোনোকিছুই আর সম্ভব হলোনা। তারেক মাসুদ কি গ্রেট হতে পেরেছিলেন কিনা আমরা সে উত্তরটা হয়তো কখনোই পাবোনা। এই আক্ষেপ আমাদের সবসময়ই থেকে যাবে। কিন্তু চলচ্চিত্র বিশ্বে আজও তাঁর নাম স্মরণ হয়। গুগল তার প্রয়াণ দিবসে মাটির একটি ময়নার ডুডল এঁকে এখনো বিশ্ববাসীকে জানিয়ে যায়।
প্রয়াত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের বই 'চলচ্চিত্রযাত্রা'। ২৮ নিবন্ধ নিয়ে রচিত এই বইয়ে স্থান পেয়েছে সমকালীন বাঙলা সিনেমা নিয়ে লেখকের ভাবনা। রয়েছে বিস্তারিত ভাবে লেখকের নানা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা।
সহজ, সাবলীল ও প্রাঞ্জল ভাষায় তারেক মাসুদ বর্ণনা করেছেন চলচ্চিত্রের তাত্ত্বিক বিষয়গুলোকেও। চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানকে নিয়ে দীর্ঘ ছয়বছর ধরে শুটিং এর পর তিনি তৈরি করেন একটি প্রামান্য চিত্র। মূলত এর মাধ্যমে তার যাত্রা শুরু হয়। বইয়ের প্রথম লেখা জুড়ে রয়েছে এর পেছেনের নানা গল্প।
এরপর তিনি সিনেরমার ঐতিহাসিক ব্যাকরণের বিরুদ্ধে গিয়ে তৈরি করেন মুক্তির গান, যা নির্মাণ করতে তারেক মাসুদ ছুটে বেড়ান বিভিন্ন দেশে। ১৯৭১ সালে তরুণ মার্কিন নির্মাতা ও চিত্রগ্রাহক লিয়ার লেভিনের শরণার্থী শিবিরের ফুটেজ ও বিভিন্ন দেশ থেকে কেনা মুক্তিযুদ্ধের ফুটেজ নিয়ে তৈরি হয় মুক্তির গান।
বইয়ের অনেক লেখাতেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে উঠে লেখকের তৈরিকৃত ছবি মাটির ময়না। যা আমার মত তার শ্রেষ্ঠ শিল্পকাজ। মাটির ময়না যখন আটকে সেন্সর বোর্ডে, অন্যদিকে একই ছবি বিশ্বের নানা প্রান্তে ঘরে তুলছিল নানা পুরুষ্কার। লেখকের ক্ষোভ হতাশা আর আনন্দের নানা চিত্র ফুটে উঠে মাটির ময়না নিয়ে প্রতিটা লেখায়।
মাদ্রাসায় থেকে উঠে আসা এই স্বাধীননির্মাতা বইয়ের বিশাল একটা অংশ জুড়ে কথা বলেন নিজের ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলো নিয়ে। তিনি কথা বলেন তাদের নিয়ে, সেই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের আড্ডাগুলো নিয়ে যেগুলো তাকে 'তারেক মাসুদ হতে সাহায্য করেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন লেখক শিবিরের সঙ্গে সম্পর্ক, আহমদ ছফার সান্নিধ্য, বন্ধুমহল ইত্যাদি সম্পর্কে সরস বর্ণনা আছে বইটিতে।
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে লেখক বলেন, "মুক্তিযুদ্ধের ছবিতে একাধিক আখ্যান থাকবে এবং পরস্পরবিরোধী বয়ান থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। মুক্তিযুদ্ধ মানেই যে ফর্মুলা, যাকে এভাবেই দেখতে হবে, অন্যভাবে বলা বা দেখার কোনো অধিকার শিল্পির নেই, এটা ঠিক নয়।"
তারেক মাসুদ বারবার জোর দিয়েছেন বাঙলার ছবির বাজারের বিশ্বায়নের উপরে। তিনি বলেন, "স্যাটেলাইট ও টিভির যুগে বিশ্বায়ন ছাড়া বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বাজারই টিকে থাকবেন না। বিশ্বায়ন না করলে আমরাই বিশ্বায়িত হয়ে পড়ব।"
লেখার বড় একটা অংশ জুড়েই তারেক মাসুদ আফসোস করেছেন বাংলা ছবির করুণ অবস্থা নিয়ে। জহির রায়হান, আলমগীর কবির এর মত তিনিও চলে গেলেন অপঘাতে। চলচ্চিত্র বিষয়ে নানা দিক থেকে নানা সমস্যা-সম্ভাবনা সংকট, তার থেকে উত্তরণের সম্ভাব্য উপায়, দেশি-বিদেশি চলচ্চিত্রের বৈশিষ্ট্য, সিনেমার দীর্ঘ যাত্রার ইতিহাস ইত্যাদি সম্পর্কে তারেক মাসুদের নিজস্ব বয়ান খুব সাবলীল ভাষায় উপস্থাপিত হয়েছে এ বইয়ের লেখাগুলোতে।
খুব সহজ ভাষায় হওয়াতে আমারমত আধমরা ও কমবুদ্ধিসম্পন্ন পাঠকের জন্য বেশ আরামদায়ক হবে বইটি। বিশেষ সিনেমা জগতের গভীরতা একটু আঁচ করা যাবে।
আদম সুরত নির্মাণের নেপথ্য কাহিনি; আলমগীর কবির, তানভীর মোকাম্মেল, মোরশেদুল ইসলামের বিভিন্ন চলচ্চিত্রের আলোচনা, সত্যজিৎ রায়ের সাথে সাক্ষাৎ, বিশ্বচলচ্চিত্রের বিকাশের খুবই সংক্ষিপ্ত ইতিহাস এই অংশগুলো ইন্টারেস্টিং, বাকিগুলো গড়পড়তা একই বিষয়ের ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে রিপিটেশন।
তারেক মাসুদ অবশ্য ভালোই জানতেন—এইসব লেখা ঝাউগাছরুপী চুলের মত আউলাঝাউলা হয়ে আছে—এইখানে কিম জন-উং ছাঁট না চালানো হোক—নিদেনপক্ষে সেই চুল আঁচড়ে সুন্দর করে বাঁধা দরকার। তাই তিনি করসেন কী—জীবদ্দশায় বইটা ছাপানই নাই।
ছাপাইসেন ক্যাথরিন। তিনি অবশ্য শুরুতেই লিখে দিসেন—এই বই সবিশেষ সম্পাদনা করা হয় নাই; কিন্তু আমার নিখাদ মত হইতেসে—করা উচিত ছিল। লেখকের নিউ ফোল্ডার থেকে যয়গাদা ডক বের হল—তাদের হয়তো আর্কাইভাল মূল্য আছে—কিন্তু চলচ্চিত্রযাত্রা তো আর সেই আর্কাইভ না! যা যা লেখা পড়লাম—একটু যত্ন নিয়ে সম্পাদনা করলে এই বইটা আগুন হতে পারতো। এখন স্রেফ গরম পানি হয়ে আছে।
এই জিনিস চাষী, রিফাত—এদের জন্য টেক্সটবুক হতে পারে। আমার কাজ খালি অন্তর্গত রসটা বের করা। সেই রস খুঁজতে গিয়ে বোমা বের হল। তারেক মাসুদ এইদিকে শিশির স্যারের সাথে ঘুরতেন, ঐদিকে নাকি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সাথেও ‘খুব ঘনিষ্ঠতা’ ছিল, এরপর হ্যাপী আখন্দ প্রসঙ্গে আসলেন, ওয়াকিলুর রহমান পর্যন্ত বাদ গেলেন না লেখা থেকে! আহমদ ছফা তো বাই ডিফল্ট আলোচনায় থাকবেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা নাকি তাঁর সাথে তক্ক করতেন তারেক মাসুদরা। আহমদ ছফা হুমকি দিসিলেন, “এই ছেলে, তুমি বিপদে পড়বে!”
সেই বিপদ বোধহয় বিশেষ মূর্তি নিয়ে আসেনি। আহমদ ছফার স্নেহ মানুষের গায়ে লাগে, অভিশাপ লাগে বলে মনে হয় না। তারেক মাসুদ ঠিকই অসাধারণ কাজ করে গেসেন, আর দেশের সিনেমাশিল্পের করুণ অবস্থা নিয়ে সমানে বকে গেসেন। মাথায় একশোরকম প্রস্তাব ছিল তাঁর। কেউ কর্ণপাত করসে বলে মনে হয় না।
তারেক মাসুদের জীবদ্দশায় লেখা বিভিন্ন স্মৃতিকথা, প্রবন্ধ ইত্যাদি নিয়ে এই সংকলন। মোটাদাগে যেটা চোখে পড়ে, একই কথা অনেকবার আসছে (মূল কারণ এগুলো একেকটা একেক সময় একেক জায়গায় প্রচারের জন্য লেখা ছিল, তবে সম্পাদক ক্যাথেরিন মাসুদ চাইলে এগুলো একটু ফিল্টার করে নিতে পারতেন)। আমাদের দেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির বিকাশ, মননশীল ছায়াছবি প্রচারে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, লেখকের জীবনের অনেক আক্ষেপ, অপ্রাপ্তি আর অনেক অজানা কাহিনী পাওয়া যাবে এতে। বইটা পড়তে অনেকদিন সময় লাগছে আমার।
আমাদের দুর্ভাগ্য যে তারেক মাসুদকে এত তাড়াতাড়ি হারিয়েছি। তার আরো কাজ, আরো চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ আমরা পাই নি। তার লেখা এই বইটির আবেদন তাই অনেক বেশি।
বইটি প্রকাশিত হয়েছে তারেক মাসুদ চলে যাওয়ার পরে। ভূমিকায় বলে দেয়া আছে, সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তাই পান্ডুলিপি সম্পাদনা করা হয়নি তাঁর লেখা অবিকৃত রাখার উদ্দেশ্যে। তাই কিছু কিছু লেখায় একই বিষয়ের পুনরাবৃত্তি আছে। সেটি পড়তে ব্যক্তিগতভাবে আমার কোনো অসুবিধা হয়নি, বরং যে বিষয়গুলো বারবার এসেছে তা হয়ত লেখকের বারবার বলতে চাওয়া কথা - এই মনোভাব নিয়েই আমি পড়েছি। লেখাগুলোয় লেখার চাইতে বক্তব্যভাবও আমার কাছে বেশি মনে হয়েছে।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনের শুরুর দিকের অনেক ইতিহাস, চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রারম্ভ, চলচ্চিত্র আর্কাইভসের চমৎকার শুরু এবং পরবর্তীতে দুর্দশা, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বিশ্বায়ন - এই বিষয়গুলোর ইতিহাস, তারেক মাসুদের নিজস্ব ভাবনা, স্বপ্ন, পরিকল্পনা, আকুতি এবং প্রস্তাবনা সংক্রান্ত আর্টিকেলগুলো পড়তে পড়তে বারবার আফসোস হচ্ছে যে, কত কত স্বপ্ন, কাজ আর উদ্যোগ অসম্পূর্ণ রেখে এই সিনেমাওয়ালাকে চলে যেতে হলো।
রেটিং ৩.৫. হিজিবিজি করে বইটা পড়ে শেষ করলাম। শুরুর থেকে সুন্দর ফ্লো ছিল, ধীরে ধীরে সেটা হারিয়ে গেল। সেটার কারণ কি এই জন্য যে লেখার ধাঁচ কিছুটা আত্মজীবনীমূলক, এবং কিছুটা প্রবন্ধের! জানি না। আত্মজীবনীমূলক অংশগুলো বেশি ভালো লাগল। অন্যরা একমত নাও হতে পারেন। তবে তার নিজের কাজ নিয়ে অনেক কিছু জানলাম, সেটা হয়তো উইকি বা অন্য কারো লেখা থেকে জানা সম্ভব ছিল না।
পড়ার সময় খালি একটা কথাই মাথায় ঘুরছিল - আমরা কী হারিয়েছি শুধু আমরাই জানলাম! এমন গুণী এই চলচ্চিত্রকারের কাছ থেকে কত কিছু নেয়ার ছিল আমাদের! কপালের দোষ দেব কি? তারেক মাসুদ নিজেও জহির রায়হান ও আলমগীর কবিরের শূন্যতার কথা লিখেছেন বইতে। তিনিও বোধহয় জানতেন না যে এই বইটা যারা পড়বে, তারা একদিন তার অনুপস্থিতিকে এত গভীরভাবে অনুভদ করবে।
২০১৮/১৯ এ পড়া। চলচ্চিত্র নামে লেখা হলেও এটি এক-অর্থে 'অন্তর্যাত্রা'। এখানে বাংলাদেশের ইতিহাস আর লেখকের জীবন-অভিজ্ঞতা সমান্তরালে প্রবাহমান। বইটি পড়ার পর আগ্রহীরা দেখতে পারেন এই ডকুমেন্ট্রি- Fera (Return Journey) https://youtu.be/m5rD5fqvgPo?si=8ztlu...
Enjoyed the collection of articles from the renowned film director. I think it is a posthumous publication. Tareque Masud recounted his journey as a film maker, this thoughts, dreams, and regrets surrounding the film industry of Bangladesh.
I still remember the accident that took his life at 2011. It was interesting to read his expectations and disappointments regarding the conservation and foundation of Bangladesh Film Archive from the then ruling party - AL. Now, in 2025, when the ousting of AL is so fresh in my mind it is interesting to think about their many shortcomings that would’ve made Tareque Masud more disappointed for sure.
I particularly loved the articles about Satyajit Roy and Ravindranath Tagore. I have read the stories he mentioned but haven’t watched the films, but it was an intriguing point of view. I learned about so many films and directors from this book, which is always appreciated.
I was happy to see some of his dreams regarding the digital film making media, young makers and also his wish that Cinema Halls in Shopping Complexes will make viewers more inclined to watch films come true. He was a dreamer and he seemed to have a lot of hope for Bangladesh's film community and industry.
বাংলা চলচ্চিত্র জগতে ভিন্নমাত্রা নিয়ে আসা একজন প্রযোজক এবং পরিচালক ছিলেন। বইটিতে চলচ্চিত্র জগতের সংকট, সংশয়, আশাবাদ এবং সম্ভাবনা; একই ধারণায় উন্মোচিত হয়েছে।।