Dristi Pradeep is a Bengali language novel by Bibhutibhushan Bandyopadhyay. This story is about the life of Jitu who at first lived in Darjeeling with his parents and brother- sister. Later their life changed completely as his father lost his mental balance and they had to shift to their ancestor's house for shelter. Here they faced poverty which affected all the characters in different ways.
Bibhutibhushan Bandyopadhyay (Bangla: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়) was an Indian Bangali author and one of the leading writers of modern Bangla literature. His best known work is the autobiographical novel, Pather Panchali: Song of the Road which was later adapted (along with Aparajito, the sequel) into the Apu Trilogy films, directed by Satyajit Ray.
The 1951 Rabindra Puraskar, the most prestigious literary award in the West Bengal state of India, was posthumously awarded to Bibhutibhushan for his novel ইছামতী.
বিভূতিভূষণ ভালো লাগে এমন মানুষ অনেক। প্রিয় বইয়ের তালিকায় বেশিরভাগ মানুষেরই থাকে পথের পাঁচালী, অপরাজিত, আরণ্যক। আমার তালিকায় নতুন সংযোজন দৃষ্টি প্রদীপ। অসাধারণ কনসেপ্ট। এই বছর পড়া প্রিয় বইয়ের তালিকায় অবশ্যই উপরের দিকে থাকবে এই বইটি। এই বইটা পড়ে মনে হইসে, যতটা আলোচনা হওয়া উচিত ততটা হয়নি। আমার একটা স্বভাব হচ্ছে যে বই ভালো লাগে সেটা পরিচিত মানুষদের ধরে বেঁধে পড়াই। এটা এখনো কাউকে পড়াইতে পারি নাই। এটা একটা দুঃখ। যাদের বিভূতিভূষণ ভালো লাগে, তারা অবশ্যই পড়বেন।
বিভূতিভূষণের বিরুদ্বে একটা অভিযোগ বরাবরই শুনে আসছি - তিনি নাকি ' অপু ' ছাড়া আর কোন ধরনের চরিত্র তৈরি করতে পারেন নি । ' দৃষ্টি প্রদীপ ' পড়ার পর এর হাতে নাতে প্রমান পেলাম। জিতু আর অপু এর মধ্যে এত মিল ,যে তারা সহোদর ভাই হলেও আমি অবাক হব না।
তাই বলে এতা কিন্তু নয় যে অভিযোগটা আমারও। কারণ বিভূতিভুষণের গল্পের প্লট আর লেখনীই এমন যে ,অপুর মতো খানিকটা আত্মভোলা, নিষ্পাপ মনের অধিকারী আর শিশুর মতো বিশাল দু চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখার ক্ষমতাসম্পন্ন চরিত্র না হলে তা মানাবেই না।
গল্পের শুরুর দিকে ভেবেছিলাম জিতুর গল্পটা হবে অনেকটা শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের মত, সামাজিক। কিন্তু সামনে এগিয়ে বুঝতে পারলাম ওই অংশটুকু স্থাপন করেছে জিতুর মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি। ও যে প্রতিমা পুজো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ছিল , তাই ওকে পৃথিবীকে নতুন চোখে দেখতে সাহায্য করেছিল। প্রথমে তার কিশোর মন যিশু খ্রিষ্টকে ধরেছিল তার দেবতা হিসেবে। কিন্তু ধীরে ধীরে সে বুঝতে পারে, সৃষ্টিকর্তা আরো বিশাল, বৃহৎ এক সত্ত্বা। জিতুর ধর্মীয় অনুভূতিগুলো নাড়া দিয়েছে আমাকেও। শুধু বুঝতে পারছি না, কী করে বিভূতিভূষণ এত মায়াময় ভঙ্গিতে, এত সুন্দর করে, এত গভীর কথা এত সহজে বলে দিলেন! ভাবকে ভাষা দেয়া এত সহজ নয়, অন্তত আমার জন্যে তো নয়ই। একে ঐশ্বরিক উপহার ছাড়া কি-ই বা বলার আছে?
জিতুর মত মানুষের সংসারী হওয়াই বোধহয় এ উপন্যাসের বড়ো ট্র্যাজেডি। তাকে এ রূপে মানায় না। হয়তো সন্ন্যাসী হত না, হয়তো পদব্রাজক হত, কিন্তু সংসারের ঘোরপ্যাচের মধ্যে জিতুর প্রদীপের মত উজ্জ্বল দৃষ্টি বৃথা, কেবল বৃথা।
“ঈশ্বর থাকেন ওই ভদ্র পল্লীতে, এখানে তাহাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না।” মানিকবাবু বেশ ঠোঁটকাটা স্বরে কথাটা বলেছেন। দৃষ্টি-প্রদীপ উপন্যাসেও বারংবার কথাটার সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। পক্ষপাতদুষ্ট বটতলার গোসাঁই তাই গৃহস্থ জমিদারে কাছে ভোগ পেয়ে এদের বড়মানুষ ক’রে দিয়েচে, লক্ষ গরীব লোককে মেরে––জ্যাঠামশায়দের গৃহ-দেবতা যেমন তাদের বড় ক’রে রেখেছিল, জিতুর মাকে, সীতাকে ও ভুবনের মাকে করেছিল ওদের ক্রীতদাসী।
বৈরাগ্যমুখী মানুষগুলোর জন্য সংসার বড় কষ্টের জায়গা। অথচ চাইলেও বাঁধন ছিঁড়ে পালিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। জিতু বারবার গৃহত্যাগী হতে গিয়েও সংসারের মায়ায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়ে।
বিভূতিবাবুর লেখনী নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। বরাবরের মতই ভাবিয়ে তোলে। দৃষ্টি-প্রদীপ উপন্যাসেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। চির পুরানো সংসার আর ধর্মকে নতুন দৃষ্টিতে দেখার আর ভাবার নির্দেশনা দিয়েছে।
সুনীলের মতন নামকরণ করলে আমার এই রিভিউ এর নাম হত "আমার বিভূতি আবিষ্কার"। দৃষ্টিপ্রদীপ ই আমার পড়া পূর্ণাঙ্গ বিভূতির উপন্যাস। অনেকে শুনে হয়ত ভ্রু কুঁচকে বলতে পারেন, কি! বিভূতি পড়েন নাই!
- জ্বী হ্যাঁ। পড়া হয় নাই। চেষ্টা করিনি সেটা বলব না, বেশ কয়েক বছর আগে একবার পথের পাঁচালী পড়া শুরু করেছিলাম। তখন আমি ক্লাস টেনের ছাত্র, চিকেন পক্সের ভয়াবহ জ্বরে হাসপাতালে শুয়ে কাতরাচ্ছি, সেই মুহুর্তে এক জুনিয়র থেকে নিয়ে পড়া শুরু করলাম, পথের পাঁচালী, কিন্তু অর্ধেক যাওয়ার পর মন বসাতে পারলাম না। জ্বরে বিক্ষিপ্ত মনের ফল খুব সম্ভবত। এরপর বহুদিন আমি বিভূতি পড়িনি, তবে কিনে রেখেছি, যদি কোন দৈবভাবে পড়ার সুযোগ হয়ে যায়।
হয়ে গেলও, এক বন্ধুর সাথে ঘুরতে গিয়ে প্রচণ্ড বৃষ্টিতে পড়লাম, দুইজনে আশ্রয় নিলাম কাঁটাবনের পাঠক সমাবেশে। বন্ধু নিল শহীদুল জহিরের "আবু ইব্রাহীমের মৃত্যু"। আমি কি পড়ব সেটাই ভাবছিলাম, সম্প্রতি সব বড় প্রকাশনীই ক্লাসিক বইগুলো নিজস্ব আঙ্গিকে ছাপানোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। পাঠক সমাবেশের দৃষ্টিপ্রদীপ উল্টে পাল্টে দেখতে গিয়েই আটকে গেলাম গল্পের টানে। এক নিমিষে পড়ে ফেললাম বহুখানি, তখন বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা, বুঝতেই পারিনি।
দৃষ্টিপ্রদীপ পড়ে আমি সীমাহীন যে যন্ত্রণায় পড়লাম কিভাবে বুঝাব, জিতেনের পরিবারের কাহিনী বার বার পীঁড়া দিচ্ছিল আমায়, মনে হতে লাগল, এত প্রিভিলেজড জীবন, তাও আফসোসের সীমা নেই, জিতেনের জায়গায় থাকলে কি করতাম। এত কষ্ট কি মানুষ সইতে পারে, মানুষ কি এত নিষ্ঠুর হতে পারে, জানি না। সবচেয়ে খারাপ লেগেছে সীতার জন্য, সীতা কি অবলীলায় নিজের জীবনের সমস্ত দুঃখকে মানিয়ে নিল। নারী কি আজীবনই অবহেলিত। জিতেনের মায়ের সহ্যক্ষমতার প্রশংসা না করে পারব না, জয়তু।
অনেকে হয়ত ভেবেছিল, এত কষ্টের পর জিতেন হয়ত প্রচুর পড়াশোনা করে ধনী বা সফল হয়ে দেখিয়ে দিবে, কিন্তু জিতেন বেছে নিল সন্ন্যাস বা আধ্যাত্মিক জীবন, বিভূতিভূষণ এখানেই সফল, চিরাচরিত রাস্তায় হাঁটেন নি। মানিক কিংবা বিভূতির মতন মধ্যবিত্ত বাঙালীকে কেউই খুব সম্ভবত এত ভালভাবে রুপায়ন করতে পারে নি। দুর্দান্ত!
হুলিও কোর্তাসার বলেছিলেন, “সহস্র জীবন যাপন করতে চাও? তাহলে বই পড়”। একজন মানুষ যদি সত্যি পার্থিব জীবন থেকে পালিয়ে কিছু মূহুর্তের জন্য অন্য জীবন যাপন করতে চায় সেটা সম্ভব একমাত্র বই নিয়ে। কিন্তু সব বই আপনাকে নতুন জীবনের আস্বাদন দিতে পারে না। খুব কম বই আছে যার অদৃশ্য চরিত্রগুলো অকপটে আপনাকে নিজের দর্শন দিয়ে নতুন জীবনে সন্ধান দিতে পারে। ঠিক তেমন একটি বই বিভূতিবাবুর দৃষ্টিপ্রদীপ। দৃষ্টি প্রদীপের প্রধান চরিত্র জিতেন আপনাকে দারিদ্র্য আর বাস্তবতার এক নীলগিরির চূড়ার নিয়ে যাবে, যেখান থেকে পাঠকদের নিজের জীবনে জমে থাকা সব যন্ত্রনা, না পাওয়া অনেক ক্ষুদ্র মনে হবে।
জিতেন নামের একটি চরিত্রের জীবন দর্শন এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার নিষ্ঠুর পাষাণের গাঁথুনিতে সৃষ্টি হয়েছে এই উপন্যাসের ভিত্তি।
বাল্যকালে আর পাঁচজনের মতই বাবা-মায়ের স্নেহ আর মমতার আবন্ধনে বড় হচ্ছিলো জিতেন আর ওর ভাইবোনেরা। কিন্তু হঠাৎ একদিন জিতেনের মদ্যপ বাবার চাকুরী চলে যায়। বাধ্য হয়ে ওদের পাহাড় ছেড়ে নেমে আসতে হয় বাংলা সমতল ভূমিতে। যেখানে ওর ��ূর্ব-পুরুষদের পৈতৃক নিবাস। কিন্তু জিতেনের বাবারা জ্ঞাতি সহোদরেরা অনেক পূর্বেই তাদের সব জমি বাড়ি গ্রাস করেছিল । ফলশ্রুতিতে নিজেদের বাড়িতে ওদের দাসত্বের শৃঙ্গল মেনে নিতে হয়। এখানে এসে জিতেন জানতে পারে, অর্থের দাড়িপাল্লায় মনুষ্যত্ব মানা হয়, স্বার্থ যেখান বধির সমৃদ্ধি যেখানে অনুপস্থিত এমন কি ভক্তিরও পরিমাপ কাঠি হলো সাফল্য।
চাকুরী না পেয়ে একদিন জিতেনের বাবা উন্মাদ হয়ে যান। অর্থ ফুরিয়ে আসে। নিতেন আর জিতেন নিজের উন্মাদ পিতাকে শুধুমাত্র দুটো খাওয়াতে, পরাতে অক্ষমতার কারণে দূর গায়ের জলার পাশে রেখে দৌড়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। দারিদ্যতা বড় নিষ্ঠুর!! অতঃপর জিতেনের বাবা মারা যান। জিতেন পড়াশোনার জন্য গ্রাম ছেড়ে চলে আসে শ্রীরামপুরে। আর এখান থেকে সূত্রপাত হয় জিতেনের ভবঘুরে জীবনের। কিন্তু বাস্তবতা কখনোই জিতেনকে জীবন থেকে পালাতে দেয়নি । একে একে জিতেনের মা, দাদা, দাদার শিশুকন্যা মারা যায়। জিতেন যতবার পালাতে গিয়েছে কখনো মায়ের মৃত্যু হয়ে, কখনো দাদার শীর্ণ দেহ হয়ে বাস্তবতা তাঁকে ঢেকে পাঠিয়েছে।
শুধু একটি চপল কিশোরী কিছুদিনের জন্য জিতেনকে যন্ত্রনা আর মৃত্যুর কালো মিশ্রণের মেঘের থেকে আড়াল করে রেখেছিলো। মেয়েটির নাম ছিল মালতী। জিতেন ভালোবেসেছিলো মালতীকে। মানুষের সেবা করা ছিল মেয়েটির ধর্ম, মানুষ খাওয়ানো আর যত্মের মাঝে যে কেউ কতটা সুখ খুঁজে নিতে পারে তাঁকে দেখেছি জেনেছিল জিতেন। জীবনে প্রথমবার একটি কুঁড়েঘর আর দুই মুঠো ফুটন্ত চালের গন্ধ নিতে চেয়েছিলো মালতীকে নিয়ে। কিন্তু মালতী তাঁকে ফিরিয়ে দিলো। হয়তো সেই ফিরিয়ে দেবার মাঝেই ছিল মালতির জিতনকে আগলে রাখার চাপা চিৎকার । যা জিতেন সেদিন শুনতে পায়নি।
জিতেন কি ফিরে গিয়েছিলো মালতির কাছে? মালতি না বলা কথা কি জিতেন জানতে পেরেছিল? নাকি আবার সেই বাস্তবতার নিঃশ্বাসে হারিয়ে গেছে মালতি আর জিতেনকে নিয়ে লিখেছে অন্য গল্প?
প্রিয় উক্তিঃ
♠ খুব বড় শিল্পী, কি খুব বড় গায়ক যেমন পথেঘাটে মেলে না-খুব বড় প্রমিক বা প্রেমিকাও তেমনি পথেঘাটে মেলে না। ♠ সত্যিকার ধর্ম কোথায় আছে? কি ভীষণ মোহ, অনাচার ও মিথ্যের কুহকে ঢাকা পরে গেছে দেবতার সত্য রূপ সেদিন, যেদিন থেকে এরা হৃদয়ের ধর্মকে তুলে অর্থহীন অনুষ্ঠানকে ধর্মের আসনে বসিয়েছে।
বিভূতিবাবুর প্রকৃতি-প্রেম, জীবনবোধ, মধুময় গদ্য তার সব বইতেই থাকে। তবে তার ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গীর কিছুটা দেখা পেয়েছিলাম ইছামতি বইতে। আর আজকের এই বইয়ের মূল বিষয়ই এটা। কি অসাধারন করেই না ভাবতে পেরেছিলেন তিনি আর ততোধিক অসাধারণ করে তাতে দিয়েছিলেন ভাষা। আহা মধু! মধু!
আরণ্যক এর পর বিভূতি ভূষণ আবার আমায় মুগ্ধ করল ! এখনো মনে লেগে থাকবে রোজদিনকার শঠতার পৃথিবী , আচার অনুষ্ঠানের ধর্ম । তার মাঝে জিতুর দেবতা খোঁজা , শান্তি খোঁজা , সুন্দর খোঁজা , প্রেম খোঁজা । একজন বড় মাপের মানুষ হয়ে ওঠা । যার যাত পাত ধর্ম নেই আছে মানুষের জন্য ভালোবসা , মানুষের কাছে , জীবনের কাছে গিয়ে বাঁচা
জিতুর একেকটা উপলব্ধি গুলো ভীষণ চিন্তায় ফেলে দেয়। এতো দারুণ একটা বই অথচ এটা নিয়ে কথা খুব কমই হয়। জিতুকে মনে হবের অপুর মতই কিন্তু জিতুর চিন্তা আরো গভীর আরো স্বচ্ছ। অসংখ্য ট্র্যাজেডিতে ভরা এই বই পড়ার সময় চরিত্রের উপর মায়া আনবেন না, আনলেই মন খারাপ হবে।
বিভূতিভূষণের উপন্যাস বরাবরই হৃদয়কে নাড়া দিয়ে থাকে।প্রত্যেকটা লেখকই ভিন্ন ভিন্ন স্টাইলে হৃদয়কে নাড়া দেন।তাঁর মধ্যে বিভূতি বাবুর স্টাইলটা সবচেয়ে অসাধারণ। প্রত্যেকটা উপন্যাসের মতো এই উপন্যাসেও তিনি বেদনার মাধ্যমে প্রচ্ছন্ন আনন্দের বহিঃপ্রকাশ করেছেন। হয়তো একবার চোখের জল গড়িয়ে পড়ে নতুবা সেই জল ধীরে ধীরে শুষ্ক হয়ে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে।কি চমৎকার লেখনি! সাধারণত রবি ঠাকুরের উপন্যাস পড়ার পর খুব কম লেখকের লেখাই আমাকে মুগ্ধ করে;আর বিভূতি বাবু সেই লেখকদের মধ্যে একজন।শরৎ বাবুর দুঃখে জর্জরিত লেখার মাঝে আনন্দের প্রভাবটা খুব কমই বলতে গেলে;কিন্তু বিভূতিভূষণের লেখার মধ্যে দুইয়েরই এক অপূর্ব মিশ্রণ রয়েছে।তাছাড়া প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনা তো আছেই–মনে হয়না কোনো ঔপন্যাসিক তাঁর উপন্যাসে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে মনুষ্য আত্মার সম্পর্কটাকে এতো চমৎকার ভাবে ব্যাখা করতে পেরেছেন।
বিভূতিভূষণের দৃষ্টি-প্রদীপ প্রথম পাঠে এক নিঃশব্দ আত্মজীবনীর মতো মনে হতে পারে—নায়ক জিতুর জীবনের গতিময় বর্ণনা, যেখানে নেই নাটকীয়তা, নেই জাঁকজমক, নেই থ্রিলারধর্মী মোচড়। কিন্তু এই নিরাবরণ, অনাড়ম্বর গদ্যের নিচে রয়েছে এক বিশাল মানসিক যাত্রাপথ, আত্মসংলাপের ধ্বনি, দর্শনের আলোকছায়া, আর রয়েছে বিশ্বাস, নৈঃশব্দ্য ও জীবনের প্রতি মুগ্ধ দৃষ্টির এক অদ্বিতীয় প্রক্ষেপণ। এই উপন্যাসের টেক্সচারে ছড়িয়ে আছে এক ধরনের ‘ধর্মচেতনা’—যা অলৌকিক নয়, আচারভিত্তিক নয়, বরং আত্মদর্শনের।
জিতু চরিত্রটির নির্মাণ যেন বিভূতিভূষণের নিজস্ব ধারায় এক আত্মান্বেষী আদর্শ মানুষ—দারিদ্র্য, সংসারের ক্লান্তি, জীবনের অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও সে জীবনের সৌন্দর্য ও প্রজ্ঞা আবিষ্কার করতে শেখে। এই যাত্রা অনেকটাই হেরমান হেসের Siddhartha-র মতো—যেখানে নদীর ধারে দাঁড়িয়ে মানুষ শোনে জ��বনের ছন্দ, উপলব্ধি করে অনিত্যতা, আর তার মধ্য দিয়েই জন্ম নেয় উপলব্ধির আলো। হেসের সিদ্ধার্থ যেমন চূড়ান্ত সত্যের খোঁজে শহর ছেড়ে প্রকৃতির কোলে ফিরে আসে, জিতুও শহরের চাকচিক্য, পিতার উন্মাদনা আর অনিশ্চয় ভবিষ্যৎ পেরিয়ে গ্রামের এক সরল, সংযত জীবনে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে শেখে।
দৃষ্টি-প্রদীপ–এ যে আত্মবীক্ষণের শক্তি আছে, তা ইউকিও মিশিমার Confessions of a Mask বা কস্তুরিবা গোয়ার The Book of Disquiet–এর মতো আত্মজৈবনিক পাঠেও দেখা যায়। তবে বিভূতিভূষণের গদ্যে আত্মকেন্দ্রিকতা কখনও আত্মমোহিত নয়; তা বিশ্বচেতনায় প্রসারিত—গাছের পাতার মর্মরধ্বনি, বৃষ্টির ধ্বনি, রেলগাড়ির নীরবতা—সবই জিতুর অভিজ্ঞতাকে একটা অতল গাম্ভীর্য দেয়।
এই আখ্যানের শক্তি জিতুর নির্লিপ্ত স্বীকারোক্তিতে। সে কখনও বিপ্লবের দাবি তোলে না, বিরুদ্ধতা করে না, রাজনৈতিকভাবে উত্তাল না হলেও সে এক ধরণের অভ্যন্তরীণ 'সত্য'র সঙ্গে একাত্ম হয়। এ এক ধরনের গান্ধীয় বীক্ষা, তবে তা প্রকাশ্য অহিংসা নয়—অন্তরাত্মার একরোখা সংকল্প, যা সমাজের প্রান্তিকতায় দাঁড়িয়ে অন্তর্লোকের ধ্যান করে।
এখানে উপন্যাসটির আখ্যানরীতি আমাদের নিয়ে যায় লেও তলস্তয়ের The Death of Ivan Ilyich–এর দিকে। সেখানে যেমন এক উচ্চপদস্থ আমলা মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করে জীবনের অর্থহীনতা ও আত্মপ্রতারণা, তেমনই জিতু বুঝতে শেখে জীবন মানে শুধু দারিদ্র্য নয়, চাকরি নয়, দায়বদ্ধতা নয়—জীবন মানে কোনো এক অভ্যন্তরীণ আলোকস্তম্ভের দিকে ধাবমান থাকা। বইটির নাম ‘দৃষ্টি-প্রদীপ’ সেই কারণেই প্রতীকী: দৃষ্টি মানে শুধু দেখা নয়, তা উপলব্ধি; আর প্রদীপ মানে শুধু আলো নয়, বরং অন্তরের আলো, যা জিতুকে ক্রমে দীক্ষিত করে।
উপন্যাসে মলাটি আর হিরণময়ী যেন দুটো মেরু। হিরণময়ী আধা-রোমান্টিক, স্মৃতিমেদুরতার আধার, কিন্তু মলাটি এক ধরণের স্পিরিচুয়াল কেন্দ্র—তার আত্মত্যাগ, স্বল্পবাক জীবন আর নিঃশব্দ সেবা জিতুর জীবনের প্রিজম হয়ে ওঠে। এখানে পাঠক চাইলে টমাস হার্ডির Tess of the d’Urbervilles বা টলস্টয়ের Anna Karenina–র মতো নারীকেন্দ্রিক ট্র্যাজিক চরিত্রের ছায়া খুঁজে পেতে পারেন। কিন্তু মলাটি ট্র্যাজিক নয়, বরং এক ধরণের ‘বোধিসত্ত্বা’—অসংখ্য কষ্ট সত্ত্বেও সে আলোকবান। বিভূতিভূষণ নারীর চেহারা এঁকেছেন তাদের অন্তর্চেতনার মাধুর্যে।
আবার, জিতুর কর্মজীবন—চাকরির খোঁজে কলকাতা বা গ্রামীন নানা পরিসরে তার গমনাগমন—তাতে বারবার উঠে আসে রেললাইন, অফিস, অভাব, শিক্ষকতা, যাত্রা। এই যাত্রার মধ্যে আমরা শুনি রেললাইনের অনুরণন, যেভাবে রেবেকা সলনিট লিখেছেন, "Every journey outwards is also a journey inwards." এই যাত্রা কেবল ভৌগোলিক নয়, তা এক অন্তঃসারশূন্যতার মধ্য থেকে অর্থ খোঁজার চেষ্টা।
বিভূতিভূষণ এই উপন্যাসে প্রকৃতি ও মানুষকে নিয়ে নির্মাণ করেছেন এক ‘তৃতীয় জগৎ’—যেখানে বসবাস করে শুধুই উপলব্ধি। প্রতিটি ছোট ছোট ঘটনা—মলাটির হাতে তৈরি খিচুড়ি, গ্রামের ছেলেদের ঘুড়ি ওড়ানো, হীরণময়ীর পায়ের নুপুরধ্বনি—এসব যেন হয়ে ওঠে দৃষ্টির এক অদ্ভুত জ্যোতির্ময়তা। এটি অনেকটাই ভার্জিনিয়া উলফের To the Lighthouse–এর মতো: যেখানে দৃশ্যমান প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি মুহূর্ত—নিজস্ব ‘আলোকক্ষেত্র’ হয়ে ওঠে।
আবার, উপন্যাসের ফর্ম—এর অনুপম সরলতা, কিন্তু গভীর শাব্দিক মাধুর্য—তাতে শোনা যায় কাফকার The Castle–এরও প্রতিধ্বনি। কাফকার মতো বিভূতিভূষণও কখনও কখনও এমন এক সুরে কথা বলেন যেখানে চরিত্র, সমাজ, কাঠামো সবই ছায়াময়। জিতু যেমন কাফকার K–এর মতোই নিজের জীবনের বাস্তবতা বুঝে ওঠার চেষ্টায় ব্যস্ত, কিন্তু সে অনড় নয়—সে ধীরে ধীরে গ্রহণ করতে শেখে, ভালোবাসতে শেখে, আলো দেখতে শেখে।
দৃষ্টি-প্রদীপ–এর উপস্থাপন ও মনস্তত্ত্বীয় গতিবিধি অনেকাংশে পরাবাস্তব নয়, বরং অতিবাস্তব। বাস্তবের ভিতর থেকে এমন এক মনের চিত্র আঁকা হয়, যা একইসঙ্গে আধ্যাত্মিক ও প্রাত্যহিক। এ একধরনের ‘spiritual realism’—যেখানে বাস্তবতা কখনও ইন্দ্রিয়গত নয়, বরং ধ্যানমূলক। এই ধারাটি আমরা দেখি হুয়ান রুলফোর Pedro Páramo, কিংবা জেবালদ-এর Austerlitz–এর মতো কাজেও।
এই উপন্যাস পাঠে বিভূতিভূষণের অন্য কাজ—বিশেষত অপরাজিত কিংবা আরণ্যক–এর স্মৃতি জাগে। কিন্তু দৃষ্টি-প্রদীপ তার চেয়ে সংযত, তার আত্মজিজ্ঞাসা তীব্র কিন্তু প্রকাশে নিরুত্তাপ। সে কারণে এটি অনেকাংশে আত্মদর্শনের ডায়েরি—যেখানে শব্দ নয়, নিঃশব্দই মূল ভাষা।
শেষমেশ, দৃষ্টি-প্রদীপ উপন্যাসটি আত্ম-প্রত্যয়ের সেই ধীর অথচ অটল আলেখ্য, যেখানে একজন ব্যক্তি সমাজের নিচুতলা থেকে উঠে, শোক, ক্ষয় আর ঘন নৈঃশব্দের ভিতর দিয়ে, নিজের অন্তরলোকের আলো দেখতে শেখে। বিশ্বসাহিত্যের নানা আত্মজৈবনিক, আধ্যাত্মিক, প্রান্তিক চরিত্রদের সঙ্গে তুলনায় দেখা যায় যে বিভূতিভূষণ কেবল গ্রামীণতাকে বা গরিবত্বকে নয়, বরং সেই প্রান্তিকতাকে তুলে এনেছেন—যেখান থেকে আলো ফোটে।
এটি শুধু এক বাঙালি যুবকের কাহিনি নয়। এটি এক ধরণের চেতনার অভিসার। যে অভিসারে জীবন হয় দৃষ্টিসঞ্চারিত, আর সেই দৃষ্টি—দুঃখের মধ্যেও—প্রদীপ হয়ে ওঠে।
পথের পাঁচালি, অপরাজিত, আরণ্যক, চাঁদের পাহাড় , ইছামতী, আদর্শ হিন্দু হোটেলের পর প্রিয় বইয়ের তালিকায় সংযুক্ত হলো প্রিয় লেখকের আরও একটি অসাধারণ উপন্যাস - দৃষ্টিপ্রদীপ। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সবসময়ই যেন হৃদয় ছুঁয়ে যায়। তাঁর ভাষার সারল্য, বাংলার প্রকৃতির অপার্থিব বর্ণনা, লেখনীর জাদুকরী ভঙ্গিমা আমাকে আকর্ষণ করে সেই ছোটবেলা থেকেই । "দৃষ্টিপ্রদীপ" ও এর ব্যতিক্রম নয়। জিতু চরিত্রটি যেন আমারই প্রতিনিধি । সমাজের অন্যায় অবিচার , কুসংস্কার এবং সাম্প্রদায়িকতার নিষ্ঠুর স্বরূপ প্রকাশিত হয়েছে এখানে । এক কথায় অসম্ভব ভালো লেগেছে । সবাই অবশ্যই পড়বেন ।
চিরন্তন গ্রামবাংলার আকাশ, বাতাস, সবুজের প্রেমে মত্ত বিভূতিবাবুকে দেখা গেলো এখানে বাংলার সমতল ভূমিতে এসে 'বিরক্ত' হতে। ঠিক বিভূতিবাবু নয়; বরং তার এ বইয়ের চরিত্র 'জিতু'কে- জন্ম থেকে যে বড় হয়েছে পাহাড়ি চা বাগানে, আশৈশব যার কেটেছে আনন্দ আর বিলাসিতায়। কিন্তু ভাগ্যের কষাঘাতে পরিবারসহ তার আশ্রয় নিতে হয় বাংলার কোনো এক গ্রামে। একে তো অপরিচিত আবহাওয়া ওদিকে জ্যাঠামশাইয়ের বাড়ির লোকদের বিরূপ আচরণ, অপমান- সব মিলিয়ে বাংলার সমতল ভূমি জিতুর মনকে বিষিয়ে দেয়। এই বিষিয়ে ওঠা মন নিয়ে সে বড় হতে থাকে, উপলব্ধি করতে থাকে ধর্মের নামে কুসংস্কার আর নির্লজ্জ স্বার্থপরতা।
স্রষ্টার স্বরূপ কি? এই খোঁজে জীবন কেটে যায় জিতুর। ছোট্ট কাল থেকে বারবার পরাবাস্তব অনুভূতির সম্মুখীন হয় সে। ছেলেবেলায় মিশনারীদের হাত ধরে ধ্রিষ্টধর্মের দীক্ষা লাভ হয় তার। যিশুখ্রিষ্টের মানব প্রেম তত্ত্ব তার হৃদয়কে অভিভূত করে। পরবর্তীতে বাংলায় এসে যখন ধর্মকে নিছকই নিজের স্বার্থের একটা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেখে, তখন কষ্ট হয়। তথাকথিত ধর্মপ্রাণ সনাতনীদের দ্বারা বারবার বিক্ষত হয় যীশুর প্রতি তার অনুভূতি।
এই উপন্যাসের শুরু জিতুর ছেলেবেলা দিয়ে আর শেষ যৌবনে তার বিয়ের পর। এর মাঝেই বিস্তর 'জীবন' দেখা হয়ে যায় তার। মোটামুটি একটা ট্র্যাজেডি উপন্যাস বলা যায় একে, কিন্তু পরিপূর্ণ ট্র্যাজেডি বলা যায়না কেবল এজন্য যে শেষতক জিতুবাবুর একটা স্থায়ী নীড় বাঁধবার সুযোগ হয়।
ক্লাসিক উপন্যাসের সকল গুণই এর মধ্যে বিদ্যমান, কিন্তু দোষ-ক্রুটিমুক্ত নয়। বাংলার ক্লাসিক উপন্যাসে নায়িকা চরিত্রগুলোকে ন্যাকা ন্যাকা পুতুলে ধাঁচে গড়ে তুলতে দেখা যায়- এ বইতেও তা পরিপূর্ণ ভাবে উঠে এসেছে। জিতুবাবু যেখানেই গেছেন, সেখানেই কোনো না কোনো নারী তার প্রেমে পড়ে গেছেন- এই টাইপ ব্যাপার স্যাপার পুরুষতান্ত্রিক ফ্যান্টাসি মনে হয় আমার কাছে।
বিভূতিভূষণের প্রকৃতি বর্ণনা অসাধারণ। কিন্তু প্রকৃতি বর্ণনার ভিড়ে জিতুর জীবনের প্রতি ধাপের প্রকৃতি বর্ণনা করে এভাবে ব্যাথিত, আপ্লূত, এবং আবেগময় করে তুলতে পারে সেটা উপন্যাসের মাঝমাঝিতে এসেও বুঝিনি। জিতু যখন মালতি কিংবা হিরন্ময়ীকে ছেড়ে চলে যায় তখন মনে হচ্ছিল আমি রবীন্দ্রনাথের "শেষের কবিতায়" আছি। আবার যখন মালতির মৃত্যুর সংবাদ জিতুকে মালতির সাথে শত স্মৃতিতে নিমজ্জিত করে ফেলে তখন মনে হচ্ছিল, আমি তারাশঙ্করের "কবি" উপন্যাসটি পড়ছি। দার্জিলিং থেকে পূর্বপুরুষের ভিটেতে এসে দারিদ্রতার মধ্যে না পড়লে জিতুর জীবনের সে এডভেঞ্জার(!) মনে হয় আর হতো না। মালতীদের দ্বারবাসিনীর আখড়া থেকে হিরন্ময়ীদের গাঁ- জিতুর জীবনের অদৃষ্টের লেখা লেখক যে রূপে তুলে ধরেছে তা পড়ার পর উপন্যাসকে লক্ষ্য করে হয়তো বলতে ইচ্ছে করবে- “তোমার ব্যাথা দিয়ে, ব্যর্থতা দিয়ে তুমি আমাকে জয় করেছ। সে কি ভোলবার?”- যা জিতু মালতীর মৃত্যুর পর তার উদ্দেশ্যে বলেছিল।
বিভূতিভূষন এর লেখা পড়ে সাধারণত হতাশ হই না, আগে যে একেবারেই হইনি তা নয়, তবে দৃষ্টিপ্রদীপ নিয়ে আগ্রহ বা প্রত্যাশাটা বেশি থাকায় হতাশার মাত্রাটা বোধহয় একটু বেশিই। শুরুটা কিন্তু হয়েছিলো দারুণ। হিমালয়,চা বাগান আর জঙ্গলের বর্ণনার সাথে জিতুর অদ্ভুত ক্ষমতা সব মিলিয়ে একটা মায়া সৃষ্টি করেছিলো। সেই সাথে জেঠিমাদের বাড়ির ধর্মচর্চার কুৎসিত রুপটা, ধর্মের নামে ঈশ্বরকে ঘুষ দেয়ার ভক্তিহীন পুজা ভাবিয়েছিলো, নাড়া দিয়েছিলো ভীষণ, আশা করেছিলাম এরপর দারুণ একটা কিছু হবে, সে জিতুর অদ্ভুত ক্ষমতাকে কেন্দ্র করেই হোক বা অার কিছু হোক, সেই আশা করতে করতেই লেখা শেষ। হলো না আর তেমন কিছুই। যদিও জিতুর ক্ষমতাটা এরপরেও এসেছে অনেকবার। এ ঠিক অলৌকিক নয়, নক্ষত্রপারের কোন এক দূরের সভ্যতার সাথে জিতুর যেন যোগাযোগ আছে, তাদের পৃথিবী, জীবনের সাথে জিতুর কোথাও একটা সম্পর্ক আছে।অবশ্য মাঝে মাঝে অন্য কিছু দেখার অভিজ্ঞতাও জিতুর হয় তবে একটার সাথে আরেকটাকে ঠিক মেলাতে পারলাম না। কিন্তু সেই ক্ষমতার বিকাশ হলো কোথায়, জিতুর জীবন, ঘোরাঘুরি সব কেমন উদ্দেশ্যহীন, ব্যর্থ। বারবার একের পর এক মৃত্যুও এলো। ভালোবাসা এলো।কিন্তু শেষ দিকে কেমন যেন তাড়াহুড়া, হঠাৎ করেই টের পেলাম উপন্যাস শেষ। এ যেন প্রথম ওভারে বাউন্ডারীর ছড়াছড়ির পর এক মন্থর ইনিংস। শেষ পর্যন্ত লেখার কোন বক্তব্যও খুঁজে পেলাম না। ধর্ম, ঈশ্বর বা আধ্যাত্মিকতা নিয়ে জিতুর মনোভাব, কৌতুহলও যেন তেমন তীব্র হয়ে দেখা দিলো না, যে ক্ষমতা তার ছিলো তার কোন উত্তর খুঁজে পাওয়া গেলো না, উত্তর পাবার চেষ্টাটাও তেমন জোরালো লাগলো না, হয়তো বিভূতি ভূষন সে উত্তর পেয়েছেন বা পাননি, কিন্তু জিতু কি মাঝপথে হাল ছেড়ে দিলো? জিতুর অন্বেষনে আমিও যে সঙ্গী ছিলাম, মাঝপথে অভিযান শেষ, অামি হতাশ।আমি তিন তারা দিলুম।
বাবা মায়ের সাথে জিতু, তার বড় ভাই নিতাই ও বোন সীতাসহ দার্জিলিং-এ থাকে। জিতুর বাবার চাকরি সূত্রেই সেখানে থাকা। মিস নর্টন নামের এক খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারক মহিলার সাথে পরিচয় হয়, যিনি পড়ালেখা সেখাতেন এবং প্রায়ই নানা উপহার দিতেন সবাইকে। হঠাৎই জিতুর বাবার চাকরি চলে যাওয়ায় তারা গ্রামে তাদের জ্যাঠামশায়ের বাড়িতে আশ্রয় নেয়। সেখান থেকে শুরু হয় অন্য রকম এক এলোমেলো জীবন। দার্জিলিং-এ যে সুন্দর গোছানো একটা জীবন ছিল তা কিন্তু নয়।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায় যেমনটা থাকে- প্রকৃতি বর্ণনা। সূদুর দার্জিলিং এর প্রকৃতি, চা বাগান, কাঞ্চনজঙ্ঘা থেকে শুরু করে বন মাঠ, নদী, ঘাট, পাখি মিলে আলাদা রকম এক অনুভূতি। প্রকৃতির পাশাপাশি ভালোবাসা সূক্ষাতিসূক্ষ অনুভূতি, পরিবার ও সংসার জীবনের গোছানো এক ছবি। নতুন একটা দিক এই উপন্যাস অন্য অনেক উপন্যাসের থেকে আলাদা তা হলো ধর্মীয় অনুভূতি ও কুসংস্কার। যা সেই সময়ে দাঁড়িয়ে লেখক উপলব্ধি করেছিলেন তা জিতু চরিত্রের মাঝে প্রকাশ পেয়েছে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্য বইয়ের যতোটা আলোচনা দেখি "দৃষ্টি প্রদীপ " বইটার তেমন দেখি না, বইটা আরও একটু আলোচনায় আসতে পারতো, এতো ভালো একটা বই।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র, তার বিকল্প আজ পর্যন্ত কেউ হতে পারেনি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম, কিশোর থেকে বুড়ো পর্যন্ত সবাইকে মুগ্ধ করে চলেছে তার অনন্যসাধারণ গল্প-উপন্যাস। দৃষ্টি প্রদীপ তার শ্রেষ্ঠতম উপন্যাস কিনা, সেটা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। বিপুল জনপ্রিয় পথের পাঁচালী, আরণ্যক এবং আদর্শ হিন্দু হোটেল-এর ছায়ায় আড়াল পড়ে যায় এই উপন্যাসটি।
সর্বগ্রাসী কালস্রোত তার সব গল্পেরই খলনায়ক; সময় যেন থেমে থাকে না। বীজ থেকে যেমন গগনস্পর্শী গাছ তৈরি হয়, ঠিক তেমনি কালস্রোতের ঝাপটায় প্রতিনিয়ত পরিণত হতে থাকে তার গল্পের চরিত্রেরা। দৃষ্টি প্রদীপ-এ লেখক আলোকপাত করেছেন তার ধর্মীয় দর্শন এবং চিন্তাভাবনা নিয়ে; চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে চিন্তার খোরাক রেখে গিয়েছেন আগ্রহী পাঠকদের জন্য।
এতটা মায়া আর দরদ দিয়ে তিনি লিখেছেন, যেন মনে হবে ওই চরিত্রগুলোর সাথে আমরাও বেড়ে উঠছি; সঙ্গী হচ্ছি তাদের ছেলেমানুষীতে; বাস্তবতার চপেটাঘাতে বুঝতে শিখছি দুনিয়াটা। উপন্যাসের শেষ বাক্যে পৌঁছানোর পর মনে হবে, বহুকাল কেটে গেছে এর মধ্যে। জিতু আর সেই আগের ছোট্ট কিশোরটি নয়—জীবন-অভিজ্ঞতার ভারে নুইয়ে পড়া পর্বত যেন!
গভীর জীবনবোধে পরিপূর্ণ এই উপন্যাস বিভূতিভূষণ-পাঠকদের জন্য অবশ্যপাঠ্য।
এই বইটি আরো আগে পড়া উচিত ছিলো। আরো আগে পড়লে বইটি হয়তো আমার ভালোই লাগতো। গল্প বেশ ভালোই আগাচ্ছিলো শেষ দিকে এসে অতিরিক্ত আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ বিরক্তি উদ্রেক করে। জীবনের এমন পর্যায়ে এসে জীবন ও বাস্তবতাকে অতো সরল, আধ্যাত্মিক ঘরানায় দেখার দৃষ্টি বহু আগেই হারিয়ে ফেলেছি। বিভূতিভূষণ বাবুর সৃষ্ট অনেক চরিত্রেই বৈরাগ্য ভাবের উপস্থিতি রয়েছে। চরিত্রগুলোয় ভবঘুরে ভাব থাকেই।
ভবঘুরে চরিত্রের পাশাপাশি প্রকৃতি প্রেমী এই উপন্যাসের মূল চরিত্র জিতু। ছোটোবেলা থেকেই তার একপ্রকার আধ্যাত্মিক দৃষ্টিশক্তি রয়েছে। সে এই দৃষ্টিশক্তির মাধ্যমে অনেক সময় অলৌকিক অনেককিছু দেখে যা বাকিরা দেখতে পায় না। সেই অলৌকিক দৃষ্টির কারণটা বা ব্যাখ্যা সে দুইজন সাধুর কাছ থেকে জানার সুযোগ পেয়েও জিগ্যেস করে জেনে উঠতে পারে নি। দুইজন সাধু জিতুকে দেখে বলেছিলো সুলক্ষণযুক্ত ছেলে। কিন্তু সেই ইঙ্গিতের পূর্ণ পরিণতি আমরা উপন্যাসে দেখতে পাবো না। উপন্যাসে এই গুরুত্বপূর্ণ দিকটি অধরা রয়ে গেলো যা আমার ভালো লাগে নি।
পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল এটা হয়তো সামাজিক উপন্যাস হবে, কিন্তু শেষের দিকে সে ধারণা ভেঙে যায়। জিতুর চরিত্রটি আমার খুব ভালো লেগেছে। ওর ছোটো থেকে বড়ো হওয়া, ওর চোখ দিয়ে বাকি চরিত্রদের বোঝা, ওর ধর্মীয় চিন্তার ধীরে ধীরে পরিবর্তন; সবকিছু খুব নিখুঁত ভাবে লিখেছেন উনি। জিতুর সাথে আমি অপুর অনেক মিল পেয়েছি। আমার মনে হয় বিভূতিভূষণের অনেক চরিত্রই অপুর আদলে তৈরি। খুব সুন্দর ছিল পুরো বইটাই, যদিও শেষে জিতুর বিয়ে না হলেও হতো।
I was thinking of writing a long review but due to time constraints, it is not possible. How can I express my emotions towards this book in short words!
This book is about a spiritual journey of a boy named Jitu. The plot starts in Bengal where Jitu's family moved from the tea estate where his father used to work after his father lost his job due to excessive drinking habits. Losing his job, his father became more depressed and started acting abnormally. Jitu's paternal uncles never took their returning to Bengal with warm hearts rather they made jitu's family life very difficult. We saw Jitu growing up into an adult different from people around him. Jitu used to see a vision from his childhood for which her aunt used to call him a freak. With the passage of the story, we saw ups and downs in Jitu's spiritual journey. In this book, we saw a genuine sketch of the old Bengali Hindi Society where norms and customs were above emotions and a person's comfort. We saw Jitu and his family suffered because of different stigma and misconceptions prevalent in society. We also get the first-hand experience of using religion as a weapon to sabotage a person's identity. It is very hard to explain the whole book in a few short paragraphs.
However, I thoroughly enjoyed the book. I read it at a very slow pace because Bibhutibhushon loved to play with our emotions with his powerful usage of words. I felt like in front of my eyes Jitu grew up and led his life. So this book has the power to make its reader glued to it till the end.
I am rating it 5 stars but a masterpiece cannot be rated.
বিভূতিভূষণের লেখা এত বেশি ভালো লাগে, কারণ আমি যেমন করে দেখতে চাই ঠিক তেমন করেই উপন্যাসগুলো লেখা। মনে হয়, লেখাগুলো আমারই; কিংবা আমার কথাগুলোই কেউ লিখে রেখেছে। গল্প আর বাস্তবতার মধ্যে তালগোল পাকিয়ে ফেলি। দৃষ্টি-প্রদীপ নিয়ে ভিন্ন কিছু বলার নাই। ধর্ম বিশ্বাস আর প্রেম নিয়ে লিখা একটা অসাধারণ উপন্যাস; যার কেন্দ্রে রয়েছে দুঃখ-দারিদ্র।
লোকধর্ম পড়তে গিয়ে পড়েছিলাম।'ধৃ' ধাতু থেকে ধর্ম শব্দটি এসেছে যার অর্থ ধারন করা।সেই অর্থে মানুষের ধর্ম মনুষ্যত্ব হওয়ার কথা।কিন্তু মানুষের ধর্ম সব সময় ই এর বিপরীত। তাই তো বারবার জীতুর মনে প্রশ্ন এসেছে ধর্ম আসলে কি!
'সব মিথ্যে। ধর্মের নামে এরা করেচে ঘোর অধর্ম ও অবিচারের প্রতিষ্ঠা। বটতলার গোসাঁই এদের কাছে ভোগ পেয়ে এদের বড়মানুষ করে দিয়েছে, লক্ষ গরীব লোককে মেরে–জ্যাঠামশায়দের গৃহ-দেবতা যেমন তাদের বড় করে রেখেছিল, মাকে, সীতাকে ও ভুবনের মাকে করেছিল ওদের ক্রীতদাসী।'
'সত্যিকার ধর্ম কোথায় আছে? কি ভীষণ মোহ, অনাচার ও মিথ্যের কুহকে ঢাকা পড়ে গেছে দেবতার সত্য রূপ সেদিন, যেদিন থেকে এরা হৃদয়ের ধর্মকে ভুলে অর্থহীন অনুষ্ঠানকে ধর্মের আসনে বসিয়েছে।'
বলছিলাম জিতুর কথা।এক বোন তারা দুই ভাই আর মা-বাবা মিলে জীতুদের সংসার।চা বাগান,কাঞ্চনজঙ্ঘা, মিস নর্টন আর যিশু খ্রিস্টের মহানুভবতার সাথে পরিচয়ের দিন গুলো বেশ কাটছিলো জিতু।হঠাৎই এই বিরাট পর্বত প্রাচীর, ওক-পাইনের বন, অর্কিড, শেওলা, ঝর্ণা, পাহাড়ী নদী মেঘ-রোদ-কুয়াশার খেলা, রাঙা রডোডেনড্রন ফুলের বন্যা জীতুর জীবন থেকে মিলেয়ে যেতে শুরু করলো।জীতুর বাবার চা বাগানের চাকরিটা চলে গেলো। জিতুর দাদা বলতো–কেন বাবা অত মদ খেতেন, তা না হলে তো আর চাকরি যেত না–বাবারই তো দোষ!
জিতুরা বাংলাদেশে চলে এলো।তাদের ঠাঁই হলো তার বাবার ভাইয়েদের বাড়িতে।শুরু হলো জীতুর অন্য এক জীবন।যে জীবনে জীতু বুঝতে শিখলো অভাব কি,যীশু খ্রিস্টের মতো মহানুভবতার মান্য করার বিষয়টা খারাপ,বুঝতে শিখলো জ্যাঠাইমার ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি,বুঝতে শিখলো মা বোনের অক্লান্ত পরিশ্রম। এই সব কিছু নিয়ে জিতু বড় হলো।কিন্তু জীতুর জীবনটা যেমনটা হবার কথা ছিলো তেমনটা আর হয় নি।জীতু ধর্মের খোঁজ করেছে,সুখের খোঁজ করেছে,খোঁজ করেছে ভালোবাসার ও।জিতু কি পেয়েছিলো ধর্ম সুখ ভালোবাসা?
বিভূতিবাবু আমার ভীষণ ভীষণ প্রিয়।এই বইটা পড়ে তিনি আবার ও আমার প্রিয়ের তালিকায় নতুন করে জায়গা নিলেন।জীতু আর অপুর মধ্যে খুব একটা তফাৎ নেই।এই বইটা অনেকেই পড়েনি।যারা পড়েনি তারা বিভূতি বাবুর একটা মাস্টারপিস মিস করেছেন।সবাইকে পড়ার অনুরোধ রইলো।
কিছু প্রিয় লাইন-
'আমার মনের সঙ্গে যা খাপ খায় না, তা আমার ধর্ম নয়। ছেলেবেলা থেকে আমি যে অদৃশ্য জগতের বার বার সম্মুখীন হয়েচি, অথচ যাকে কখনও চিনি নি, বুঝিনি–তার সঙ্গে যে ধর্ম খাপ খায় না, সেও আমার ধর্ম নয়।
অথচ চারিদিকে দেখচি সবাই তাই। তারা সৌন্দর্যকে চেনে না, সত্যকে ভালবাসে না, কল্পনা এদের এত পঙ্গু যে, যে-খোঁটায় বদ্ধ হয়ে ঘাসজল খাচ্চে গরুর মত–তার বাইরে ঊর্ধ্বের নীলাকাশের দেবতার যে-সৃষ্টি বিপুল ও অপরিমেয় এরা তাকে চেনে না। '
'আর সুখ জিনিসটা কি অনির্দেশ্য রহস্যময় ব্যাপার–এই নির্জন রাত্রে মুক্ত অপরিচিত প্রান্তরের মধ্যে তারাখচিত আকাশের নীচে শুয়ে সবাই সুখের স্বপ্ন দেখছে–কিন্তু একজনের সুখের ধারণার সঙ্গে অন্য আর একজনের ধারণার কি বিষম পার্থক্য!'
'জীবনে মানুষ ততক্ষণ ঠিক শেখে না অনেক জিনিসই, যতক্ষণ সে দুঃখের সম্মুখীন না হয়।'
'সবাই সমান ভালোবাসতেও পারে না। প্রেমের ক্ষেত্রেও প্রতিভার প্রয়োজন আছে। খুব বড় শিল্পী, কি খুব বড় গায়ক যেমন পথেঘাটে মেলে না–খুব বড় প্রেমিক বা প্রেমিকাও তেমনি পথেঘাটে মেলে না। ও প্রতিভা যে যে-কোনো বড় সৃজনী-প্রতিভার মতই দুর্লভ। এ কথা সবাই জানে না, তাই যার কাছে যা পাবার নয়, তার কাছে তাই আশা করতে গিয়ে পদে পদে ঘা খায় আর ভাবে অন্য সবারই ভাগ্যে ঠিকমত জুটছে, সে ই কেবল বঞ্চিত হয়ে রইল জীবনে। নয়ত ভাবে তার রূপগুণ কম, তাই তেমন ক’রে বাঁধতে পারে নি।'
'মালতীও চলে গিয়েছে কত দিন হ’ল, পৃথিবী ছেড়ে কোন প্রেমের লোকে, নক্ষত্রদের দেশে, নক্ষত্রদের মতই বয়সহীন হয়ে গিয়েছে।
কেবল মাঝে মাঝে গভীর ঘুমের মধ্যে তার সঙ্গে দেখা হয়। সে যেন মাথার শিয়রে বসে থাকে। ঘুমের মধ্যেই শুনি, সে গাইছে—
মুক্ত আমার প্রাণের মাঠেধেনু চরায় রাখাল কিশোরপ্রিয়জনে লয় সে হরিননী খায় সে ননীচোর।
সেই আমার প্রিয় গানটা…যা ওর মুখে শুনতে ভালবাসতুম।
চোখাচোখি হ’লেই হাসি হাসি মুখে পুরনো দিনের মত তার সেই ছেলেমানুষি ভঙ্গিতে ঘাড় দুলিয়ে বলছে–পালিয়ে এসে যে বড় লুকিয়ে আছো? আখড়ার কত কাজ বাকী আছে মনে নেই?
তখন আমার মনে হয় ওকে আমি খুব কাছে পেয়েছি। দ্বারবাসিনীর পুকুরপাড়ের কাঞ্চনফুল-তলার ���িনগুল���তে তাকে যেমনটি পেতুম, তার চেয়েও কাছে। গভীর সুষুপ্তির মধ্যেই তন্দ্রাঘোরে বলি–সব মনে আছে, ভুলিনি মালতী। তোমার ব্যথা দিয়ে, ব্যর্থতা দিয়ে তুমি আমাকে জয় করেছ। সে কি ভোলবার?'
বিভূতিভূষণের বই পড়লে ভাই আমাকে এক ঝামেলায় পড়তে হয়।যখন যেই বই পড়ি,মনে হয়,নাহ,এর চেয়ে ভালো বই কী আর হতে পারে?এটাই সেরা।এইতো সেদিন।চাঁদের পাহাড় পড়লাম।ভাবলাম এ ই সেরা।তারপর হাতে নিলাম।পথের পাচালী,সেই ধারণা বদলালো।অপরাজিত পড়তে গিয়ে আবার মনে হলো অপরাজিত তে জীবনবোধ আরো বেশি।এখান থেকে শেখার অনেক কিছু আছে।এখন আবার দৃষ্টিপ্রদীপ পড়ে মনে হচ্ছে,বিভূতি রচিত অন্য কোনো বই আমাকে এতটা ভাবাতে,চিন্তা করতে বাধ্য করেনি।
গল্পের মূল চরিত্র জিতু।সে নানা রকম জিনিস দেখে,সেগুলো এ দুনিয়ার নয়।মানুষ কে সেসব কথা বললে হেসে কুটি কুটি হয়,জিতু কে পেতে হয় পাগলের সার্টিফিকেট।চা বাগান অঞ্চলে জন্ম নেওয়ার দরুণ জিতু ও তার ভাই বোনেরা হিন্দু ধর্মের দীক্ষা পায় নি।তারা যিশু খ্রিস্টের শিক্ষা পায়।জীবনের টানে,যখন জিতুদের স্বীয় আত্মীয় দের বাড়িতে গিয়ে উঠতে হয়,তখন জিতুরা আস্তে আস্তে পৃথিবীতে ধর্মের গুণাগুণ সম্পর্কে ধারণা পেতে থাকে।জিতুদের সেই আত্মীয়রা হিন্দু।তাদের ঠাকুর ঘরে ভুলে জিতুর পদচরণ পড়লে সে ঘর অপবিত্র হয়ে যেতো,সেদিন সারাদিন ঠাকুর কে খুশি করার জন্য জিতু ও তার ভাই বোনদের উপর চলতো অত্যাচার।আর ঠাকুরের মন রক্ষার্থে অপবিত্র জিতুর অপবিত্রতা মোচনে ঠাকুরঘরে ছিটানো হতো গোবর জল।জিতুর কাছে আবার ঠাকুর কে খুশি করার উপায় অন্য।তার মতে স্বর্গের সংগা হলো হাসপাতাল।কারণ সেখানে মানুষের সেবা করা হয়,হাসপাতালে কার্যরত মেথররাই সেই স্বর্গের দেব্দূত।সে বলেছে,মহাপুরুষেরা জাত,কালের উর্ধে।অন্য জাতের মানুষের স্পর্শে যে অপবিত্র হয়,সে কি আদৌ মহাপুরুষ?
একসময় জিতুর জীবনে এসেছে মালতী।মালতী আর জিতুর,জিতু আর মালতীর প্রেমের যেই চিত্র বিভূতিবাবু ফুটিয়ে তুলেছেন,আমি মুগ্ধ!একেবারে বই এর শেষ পৃষ্ঠায় গিয়ে বড়সড় একটা ধাক্কা খেয়েছি।যাই হোক,আর কথা বাড়াবো না,পরিশেষে লেখকের সাথে গলা মিলিয়ে বলতে চাই, 'হারানো বসন্তের জন্যে আক্ষেপ করে লাভ নেই।তার চলমান রূপের মধ্যেই তার স্বার্থকতা।'
আমার বিভূতিবাবুকে আর সবাই থেকে আলাদা করে দেখতেই ভালোবেসে এসেছি। কখনও তাঁকে নিয়ে এথলিপাথালি আলোচনা করতে পারিনি। আলোচনায় কোথাও যেন উনাকে হারিয়ে আমরা কেবল নিজেদের কথা বলি ঘুরেফিরে। বছর আট-নয়েক আগে, 'পথের পাঁচালি'র সাথে বিভূতিবাবুর জীবনবোধে প্রবেশ। তখন কী এতো কিছু জানতাম! না বুঝতাম! এখন জীবন দেখি নতুন চোখে। 'দৃষ্টি প্রদীপ' আজকে আবার চোখে আলো যোগালো। বিভূতিবাবুর উপন্যাস পড়তে গেলে আমি কখনোই তাড়া অনুভব করি না। পড়ি বেশ দিব্যি ধীরে সুস্থে, ঘুমিয়ে-আড়মোড়া চোখে। টানটান উত্তেজনা নেই, ছোটে বেড়ানো নেই। প্রতিটি পৃষ্টার ভেতর দিয়ে ধীরে-সুস্থে যাবো, একটু গাছের পাতায় খাত দেব, পিঠে রোদ মাখবো। খুব দ্রুত পড়ে গেলে তো পৃষ্টাগুলো একদিন শেষ হয়ে যাবে। তখন কোথায় যাবো? না সামনে যেতে পারবো, না পেছনে! পেছন ফিরে ফিরে একই বই বেশ কয়েকবার পড়া যদিও আমার স্বভাব। 'দৃষ্টি প্রদীপ'ও পড়ার চেষ্টা করেছি এর আগে। অর্ধেক, বেশঅর্ধেক, কয়েক পাতা উল্টে রেখে দিয়েছি এমন হয়েছে কয়েকবার। এবার এরকমই, তবুও শেষ করলাম। করতেই হতো। এর আগে সীতার দশা দেখে চোখে জল এসেছিলো! এবার মালতীর শেষখানি জিতেনের মতো জলে ভাসতে দিতে পারলাম না। ওর শেষ দেখে তবে আমার মুক্তি। প্রতিটা চরিত্রের সাথে জড়িয়ে গিয়েছিলাম। বিভূতিবাবুর সব উপন্যাসই ওই এক। পথে ঘাটে দূর্বাঘাসকে তুলে এনে নায়ক বানিয়ে দিলে। তাঁর লেখা বরাবরের মতো ভাসতে থাকা সময়ের গল্প, কেবলই পেছনের দিন মনে করা। কোথায় বসে মনে করছেন আমি আদৌ বুঝে উঠতে পারিনা। শেষে মনে হয়, জীবনের প্রান্তে এসে এসব গল্প এতদিনে মনে এলো! আবার জ্বালিয়ে নিলে স্মৃতি! জীবনের হিসেবনিকেশ চলে আজকাল! ছোট্ট জিতু চোখের সামনে বড় হয়ে উঠলো। সীতা বিকেলে বই কোলে নিয়ে রানী হওয়ার স্বপ্ন দেখলো। নিতুও সহজ সরল ভঙ্গিতে হনহন করে হেঁটে চললো। আমি দেখে বললাম, বারে এত শুভ্র ছেলে পাকদণ্ডীর দুর্গম পথে বন জঙ্গল ঠেলে উপরে উঠে গেলো! জিতুরদের বাবা ওদের সকলকে নিয়ে খেতে বসলেন। আরেকদিন রাতে মদ খেয়ে এসে মাকে ভীষণ মারলেন। এসব স্মৃতি আটঘরায় জ্যাঠামশায়ের রান্নাঘরে খেতে বসে শুরু হয়েছে। বিচার বুদ্ধিহীন মানুষগুলোর সাথে শিশুমনের জীবনযাপন, চোখে ব্যথা ধরিয়ে দিয়েছে। প্রতি পদে পদে তটস্ততা। ছোঁয়াছুঁয়ি, ঠেকাঠেকি নানান ছুঁতোয় একটা স্বাধীন মস্তিষ্ককে সমাজে পাগল বানিয়ে দেওয়া। কী বিশ্রী সব কিছু! উপাসনালয়ে মানসিক ভাবে অপবিত্র মানুষের ঠেলাঠেলি, অথচ মুড়ি খেয়ে সেই বাটিতে জল রাখলেই অনর্থ! বিভূতিবাবু কি নিখুঁত ভাবেই কুসংস্কারে আচ্ছন্ন গ্রাম বাংলার সঠিক চিত্রায়ন করলেন! তবে ভাবি, এ কি আসলেই কুসংস্কারে আচ্ছন্ন হয়ে থাকা নাকি অন্য কিছু! যাদের কিছু নেই তাদের সাথেই কেন আর মানুষের সম্বন্ধ থাকবে? এসব পড়তে বসলে আমার মার দিদিমার একটা কথা খুব মনে পড়ে, "আমার আছে তোমার আছে আইয়ো উড়াউড়ি, আমার আছে তোমার নাই যাও দূরদূরী।" যাদের সহায়সম্বল আছে তাদের আত্বিয়েতার জুড়ি নেই, যার এসব কিছু নেই তার জন্য গরুর সামান্য দুধও নেই। তাঁদের মুখের হাসি'কেও সমাজের মানুষ অলুক্ষুনে বলে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় কেবল। গল্প সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু বিভূতিবাবু কাউকেই ছেড়ে আসেন না পেছনে। সকলকে নিয়ে উনার পথ চলা। একেকটা দিনের অত্যন্ত গৌণ চরিত্রটাকে বেশ কয়েক পাতা পরেই কয়েক মুহূর্তের জন্য গল্পের মূল চরিত্র বানিয়ে দেয়ার মতো উদারতা একমাত্র তিনিই দেখাতে পারেন। প্রতিটি চরিত্র একটি একটি সাধারণ জীবনের গল্প, মানুষের কষ্টের গল্প, দুঃখ-দুর্দশার গল্প। জিতুর নিজস্ব ধর্ম মত। তাদের সমাজের প্রচলিত ধর্মের বাইরে গিয়ে বৃহৎ অর্থে সৃষ্টিকর্তাকে খোঁজা। কোনো ধর্মের প্রতি তাঁর কোনো দ্বেষ নেই, তাঁর পুরো মনস্তত্ব জুড়ে কেবল উদারতার ছড়াছড়ি। যীশুকে সে যেমন শ্রদ্ধা করে, তেমনি বুদ্ধ, তেমনই চৈতন্য। খুব স্পষ্টতই জিতু সবকিছুর ঊর্ধ্বে গিয়ে মানবিকতাকে নিজের ধর্ম বানিয়েছিলো। কী নিদারুন এক সাহসিকতা! আহা জীবন ! কেউ কেউ কী ভীষণ দুঃসাহস নিয়ে জন্মায় ! "সত্যিকার ধর্ম কোথায় আছে? কি ভীষণ মোহ, অনাচার ও মিথ্যের কুহকে ঢাকা পরে গেছে দেবতার সত্য রূপ সেদিন, যেদিন থেকে এরা হৃদয়ের ধর্মকে তুলে অর্থহীন অনুষ্ঠানকে ধর্মের আসনে বসিয়েছে।"