বুদ্ধদেব বসু, আমার কাছে, রবীন্দ্রনাথ-পরবর্তী সর্বত প্রতিভাযুক্ত লেখক। তাঁর লেখার সঙ্গে প্রথম পরিচয় মেঘদূতের ভূমিকা দিয়ে। মনে পড়ে, তাঁর স্বাদু গদ্যের অতল আহ্বানে কতবার যে মধ্যরাতে জেগে উঠে মশারীর ভেতরে লন্ঠনের আলোয় পড়েছি তার প্রবন্ধ, আত্মজৈবনিক রচনাবলী, অথবা প্রেমপত্রের মতো ছোট গল্প কিংবা রুকমীর মতো অনবদ্য উপন্যাস! আটের দশকে, মনজুরে মওলা- বাংলা একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক, ক্লাসে দেখিয়েছিলেন, কীভাবে বুদ্ধদেব বসু আত্মস্থ করেছিলেন ইংরেজি গদ্যের চলন তাঁর বাংলা গদ্যে। উদাহরণ হিশেবে নিয়েছিলেন সুধীন্দ্রনাথ দত্ত: কবি প্রবন্ধের এই লাইনটিকে: তাঁর সামনে (In front of him), রবীন্দ্রনাথের মতো (like Rabindranath), সুযোগ ছিল অপর্যাপ্ত (opportunities were unlimited), ...।
শব্দ, বিশেষ করে কবিতায়, শূন্য, ঈষদচ্ছ স্ফটিকের পেয়ালার মতো; প্রায়শই তার নিজস্ব কোনও অর্থ নেই, তুমি তাকে অর্থ দান করো- এই অনুভূতি যিনি জাগান, তিনিই মুর্ত করে তোলেন তাঁর সৃষ্টি- হোক সে গল্প বা কবিতা, এবং অবশ্যই প্রবন্ধ। এবং সেখানেও, অন্তত আমার কাছে, উত্তুঙ্গ শিখরস্পর্শী রবীন্দ্রনাথের পরেই আছেন বুদ্ধদেব বসু। উদাহরণ দেওয়ার প্রলোভন থেকে মুক্ত হওয়া গেল না। রবীন্দ্রনাথের: ফুল বলে ধন্য আমি মাটির 'পরে।কী ফুল ঝরিল বিপুল অন্ধকারে।তোরা কেউ পারবি নে গো, পারবি নে ফুল ফোটাতে।
আর বুদ্ধদেব বসুর ব্যাখ্যায় পাচ্ছি, "তিনটি পংক্তিতেই ফুলের উল্লেখ আছে, 'ফুল' থেকে অন্য কোনো আভিধানিক অর্থ কিছুতেই বের করা যাবে না, তার সরল অর্থ বাতিল হচ্ছে না কোনোখানেই, অথচ এক পংক্তি থেকে অন্যটিতে পৌঁছানোমাত্র আমরা অনুভব করি যে শব্দটির ইঙ্গিত বদলে-বদলে যাচ্ছে: কখনো তাতে মরত্বের ভাব পাচ্ছি, কখনো ব্যর্থতার কখনো বা সৌন্দর্যের।"
"যে-কোনো বিষয়ে যে-কোনো আলোচনায় বিষয়টাকে ছাপিয়ে ওঠে তাঁর স্বর, দ্যুতি, স্পন্দন, বেগ, তরঙ্গ- এক কথায় তাঁর ব্যক্তিস্বরূপ। অর্থাৎ, প্রবন্ধ যেমনটি হওয়া উচিত নয় বলে আমরা জানি- অন্ততপক্ষে পাঠশালায় যা শেখানো হয়ে থাকে-তার প্রবন্ধ ঠিক তা-ই। ... যেখানে পাঠকে স্বমতে টেনে আনা তার প্রকাশ্য অভিপ্রায় সেখানে তিনি তীক্ষ্ণ করে তোলেন তাঁর ইন্দ্রিয়গুলিকে; যেখানে বুদ্ধির কাছে প্রমাণ দিতে হবে সেখানে তিনি বেআইনিভাবে আমাদের হৃদয়ের আর্দ্রতা সম্পাদন করেন।" রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধ সম্পর্কে বুদ্ধদেব বসুর এই অনুধাবন ছবির মতো ছড়িয়ে আছে তাঁর "সব-পেয়েছির দেশে," বইয়ের প্রথম খন্ড: শান্তিনিকেতন, যার দীর্ঘ অংশ বর্ণনামূলক, সেখানে সুললিত গদ্যে এগিয়ে যাচ্ছে লেখা, কিন্তু যেখানে তিনি প্রকাশ করছেন তাঁর অন্তরতম অনুভূতি, সেখানেই ঝিলকিয়ে উঠছে তার লেখনী, অনির্বচনীয় বাক্য ও শব্দমালায় এক নিমিষে অনিন্দ্য এক ভুবনে আমাদের নিয়ে যান বুদ্ধদেব বসু।
"আমরা জানতে পারি কী-ভাবে এই জগত তাঁর চেতনার মধ্যে প্রবেশ করছে, কোথায় তাঁর প্রেম, কোন সংশয় তিনি দষ্ট, কোন গোপন বেদনাকে রচনার মধ্যে দিয়ে পরিপাক করে নিচ্ছেন। অর্থাৎ, বিষয় যা-ই হোক না, তিনি ব্যক্ত করছেন নিজেকে।" রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধ সম্পর্কে বুদ্ধদেব বসুর এই কথাগুলোর অধিকাংশই, বিশেষ করে শেষেরটুকু তো বটেই, তাঁর নিজের জন্যও প্রযোজ্য। আর তার জন্যই বুদ্ধদেব বসুর প্রবন্ধে, তাঁর নিজের কথাতেই, "ভাষা হ'য়ে ওঠে ভাবনার দ্বারা অন্তঃসত্ত্বা," আর তখনই ভাষার অন্তরে নতুন প্রাণের অস্তিত্ব অনুভব করতে পারি আমরা। যে কারণে বইয়ের দ্বিতীয় অংশ: রবীন্দ্রনাথ- যেখানে বাঙময় হয়ে উঠেছে বুদ্ধদেব বসুর অন্তরতম অনুভূতি, সে অংশটি বেশি ভালো লেগেছে বেশি।
সব-পেয়েছির দেশে লেখা হয় ১৯৪১ সালে। এসময়ের প্রবন্ধের স্বাদু ভাষা স্বাদুতর হয়ে পূর্ণতায় পৌঁছে যায়, অন্তত আমার পাঠ অনুযায়ী, ১৯৫৭ পরবর্তী সব লেখাগুলোয়।
এই বইটি ছাড়াও বুদ্ধদেব বসুর অনেকগুলো প্রবন্ধ আবার নতুন করে পড়া হলো। সে-ও বা কী কম আনন্দের!