'চোখ' কি সেই লগ্নভ্রষ্টা মেয়ে কমলার কাহিনী, সাতপাকের ঠিক আগের মুহূর্তে যার বরণ-করা বর গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়েছিল বিয়ের আসরে, আর সেই খুনের রক্তে আঙ্গুল ডুবিয়ে যে এঁকে নিয়েছিল সিঁথিতে রক্তিম-চিহ্ন? 'চোখ' কি সেই অসহায় বকুলের উপাখ্যান, স্বামীর চোখে যে কেবলই দেখত ভয়ঙ্কর এক দৃষ্টি, আবার খুন হবার ভয়ে স্বামীকে ছেড়ে গিয়েও যার একতিল শান্তি ছিল না? 'চোখ' কি সেই বিচিত্র জানকীর গল্প, মৃত মরদের খুনীকে একলা পেয়েও যে কিনা বাঘিনীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে টুটি চেপে ধরল না, উলতো অজানা জলে ভাসিয়ে দিল দু-চোখ? 'চোখ' কি সেই যীশু বিশ্বাস নামের এক অদ্ভুত মানুষের জীবনাখ্যান, যার চোখের দিকে তাকিয়ে কেন যে শিউরে উঠে সবাই, সে নিজেও জানত না? 'চোখ' এদের এবং আরো অনেকের কাহিনী। এক আশ্চর্য চাহনিকে কেন্দ্র করে তীব্র কৌতুহলের এক উপন্যাস 'চোখ'।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় একজন ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক।
তিনি ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত ময়মনসিংহে (বর্তমানে বাংলাদেশের অংশ) জন্মগ্রহণ করেন—যেখানে তাঁর জীবনের প্রথম এগারো বছর কাটে। ভারত বিভাজনের সময় তাঁর পরিবার কলকাতা চলে আসে। এই সময় রেলওয়েতে চাকুরিরত পিতার সঙ্গে তিনি অসম, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের বিভিন্ন স্থানে তাঁর জীবন অতিবাহিত করেন। তিনি কোচবিহারের ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। শীর্ষেন্দু একজন বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। বর্তমানে তিনি আনন্দবাজার পত্রিকা ও দেশ পত্রিকার সঙ্গে জড়িত।
তাঁর প্রথম গল্প জলতরঙ্গ শিরোনামে ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সাত বছর পরে সেই একই পত্রিকার পূজাবার্ষিকীতে তাঁর প্রথম উপন্যাস ঘুণ পোকা প্রকাশিত হয়। ছোটদের জন্য লেখা তাঁর প্রথম উপন্যাসের নাম মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি।
'বকুলের ভয় ছিল যীশু বলবে, কি চাই? লম্বা শক্ত কেঠো মানুষটা বারান্দার সিড়ি দিয়ে ধীর পায়ে নেমে এল নিচে। দুটো হাত বাড়িয়ে বলল, এসো।'
শেষের এ অংশটা পড়ে খুব ভাল লাগল। কেন জানি আমার কাছে মনে হয়েছে খুব ভাল একটা বড় উপন্যাস হতে পারত। অবশ্য এ অনূভুতি আমার অনেক গল্পেই লেখককে নিয়ে হয়৷ উনি মনে হয় অনেক অলস।
আমার দেখা অন্যতম একটি হাইপ সৃষ্টি করা বই.যীশু বিশ্বাস যাকে সৎ নির্ভীক দুঃসাহসী পুলিশের থেকে তার অদ্ভুত চোখের জন্য লোকে ভয় পায় তার মধ্যে নিজের বিবাহিত স্ত্রী বকুল, সামুর মৃত্যুর পর হল্লা করা জানকী ,কিংবা অন্য সাধারণ লোক কেউ বাদ যায় না,ব্যতিক্রম এক কমল ঘোষ,এমন এক মেয়ে না তার অবস্থা সধবার না বিধবার, অস্তিত্ব তার পিতৃকূল যেমন সংকটজনক বাইরের পৃথিবীতে আহামরি কিছু না.অন্যান্য চরিত্র প্রয়োজনে এসেছে আবার চলেও গেছে
কিন্তু যীশু বিশ্বাস ঐ সর্বগ্ৰাসী চোখের জন্য অনেক দিন মনের কোণে ঠিক থাকবে
মানুষের মন খুব সন্দেহপ্রবণ। হয়তো এর জন্যই বকুল তার স্বামীকে হারাতো। আবার সামুর মত একজন দুষ্কৃতীর লক আপে মৃত্যু নিয়েই এত জলঘোলা করল কেন জানকী? তার মনেই বা কী ছিল। মধ্যবিত্ত পরিবারে মেয়েদের বিয়ে হওয়া যে দায় সেটাকেই বা অস্বীকার করা যায় কীভাবে? শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের 'চোখ' আমাদের সে কথা বলে। কড়া বদরাগী অফিসার যীশুকে সমঝে চলে তার ওসি অব্দি। লকাপে অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটে দাগী আসামি সামুর, দায়ী হয় ইন্সপেক্টর যীশু বিশ্বাস। এই নভেলার প্রতি পরতে পরতে আছে মনস্তাত্বিক জটিলতার খেলা। এই হিসেবে বরাবরের মতোই চরিত্র বুননে অসাধারণ মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন শীর্ষেন্দু বাবু।
This entire review has been hidden because of spoilers.
'দূরবীন'-এর মতো শীর্ষেন্দুর 'চোখ' উপন্যাসটাকেও নির্দিষ্ট কোনো ধরণে ফেলা সম্ভব হলোনা। শীর্ষেন্দুর লেখার এই স্বভাবটা ভালো লাগে। থ্রিলার, রোমান্স, সাইকোলজিক্যাল সর্বোপরি একটা পারিবারিক উপন্যাস; কোনোটাই ছাড়া যায়না। একটা ফুল প্যাকেজ সবকিছুর। পুলিশ যীশু বিশ্বাসের স্ত্রী তাকে অনেক ভয় পেতো তার চোখের অস্বাভাবিক দৃষ্টির জন্যে। সে মনে করতো যীশু তাকে একদিন খুন করে ফেলবে। যীশুর চোখ নাকি ধকধক করতো। পুলিশের চাকরি করতে গিয়ে যীশুকে চারটা খুন করতে হয়েছিলো। মূল কাহিনী চতুর্থ ব্যক্তির মৃত্যু নিয়েই। সে জেলের ভেতরে খুন করেছিলো এই অপরাধীকে। এই খুনের পেছনে কার্যকারণ হিসেবে ধরা যায় আরেক নারীকে। যার সাথে যীশুর গড়ে উঠে এক অস্পষ্ট সম্পর্ক। লেখক এই সমস্ত কিছুর মধ্যে যীশুর চোখকে নিয়ে এসছেন। চোখের দৃষ্টি নিয়ে এক রোমাঞ্চের প্রকাশ ছিলো গল্পে। এই চোখের জন্যে যীশু বিশ্বাসের সঙ্গে একাধিক নারী চরিত্রের সম্পর্ক গড়ে উঠে। রাজনীতিগত অনেক অপ্রিয় সত্য আর অপরাধ জগতের লোকেদের জীবন উঠে এসছে গল্পে। উঠে এসেছে মানুষের প্রতিশোধপরায়ণতার চিত্রও। অবশ্য কিছু ক্ষেত্রে যীশু বিশ্বাসকে অতিমানব হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা লেইম লাগলো। সবমিলিয়ে চোখ উপন্যাস একটা দারুণ কিছু। আস্তে আস্তে ঘটনার জটিলতা বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু এই জটিলতাকে লেখক খুব সুন্দরভাবে সহজবোধ্য করে দিয়েছেন উনার লেখার ভঙ্গিমায়। চোখ উপন্যাসের সফর আনন্দদায়ক ছিলো।
শীর্ষেন্দুর বই খুব একটা পড়া হয় নাই আগে।তবে এই বইটা সে আফসোস কিছু হলেও কমাল।গৎবাঁধা জীবনের একেকটা চরিত্র একেক ভাবে কেন আসে তার একটা আবছা ছায়া সম্পূর্ণ বই জুড়েই আছে।বিশেষ করে জানকীদের জীবনের বাস্তবতা, যীশুর মত মানুষের জীবনের কঠোরতা, সব কিছুর পেছনে সমাজের যে নিষ্পেষণ, তার মাঝেই বকুলের মত অনভিজ্ঞ কারও বাস্তবতার উপলব্ধি,এইটাই মূলকথা।
"তোমার ফাঁসি হলে আমি সকলের সঙ্গে আবির নিয়ে হোলি খেলতাম। আর রাত্রিবেলা একা ঘরে কেঁদে বালিশ ভিজিয়ে ফেলতাম।"
মানুষের মন কত অদ্ভুত, না? যাকে ঘৃণা করার কথা তার জন্য মায়ার সৃষ্টিও হয়। আবার যাকে ভালোবাসে, তাকে দূরেও সরিয়ে রাখে। "চোখ" মূলত মানুষের মনস্তাত্ত্বিক এমন জটিল (কিংবা সাধারণ) বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। সাথে সমাজের শ্রেণি বৈষম্য ও ফাঁকফোকরগুলোও দেখিয়ে দিয়েছেন লেখক।
পুলিশ কর্মকর্তা যীশু বিশ্বাসের চোখের দিকে তাকালে অপরাধী, নিরপরাধ; প্রায় সব মানুষেরই ভয় হয়। সৎ ও সাহসী এস আই হিসেবে খ্যাত এ মানুষটির জীবন হঠাৎ এলোমেলো হতে শুরু করে একটি কেস থেকে। পরিবার ও সমাজের নানারকম চাপের মুখে যীশু নিজেকে নিয়ে দ্বিধায় ভুগতে থাকে।
ছোটখাটো এ বইটি গভীর জীবনবোধ ও মনের দ্বিপাক্ষিক দিকগুলো নিয়ে বেশ সাবলীল ভাবে কথা বলেছে। এমনকি খুব তীক্ষ্ণ কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি পাঠককে দাঁড় করিয়েও দিতে পেরেছে। মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা ও সমাজের প্রচলিত প্রথার সাথে চরিত্রগুলোর যোগসূত্র দেখানোটা ভালো ছিল। তবে নারী চরিত্রদের নিয়ে একটু অখুশি হয়েছি। যেমনটি শীর্ষেন্দুর "দূরবীনের" ক্ষেত্রেও হয়েছিলাম।
সমাজে প্রতিষ্ঠিত কিছু প্রথা যেসব আসলে মানুষ পরিচয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ঠিক আদর্শ নয়, সেসব নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হতে চাইলে এবং ভাবতে চাইলে বইটি পড়তে পারেন।
বকুলের ভয় ছিলো যীশু বলবে, কী চাই? লম্বা শক্ত কেঠো মানুষটা সিড়ি দিয়ে ধীর পায়ে নেমে এলো নিচে। দুটো হাত বাড়িয়ে বললো, এসো।
চোখ- শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
লগ্নভ্রষ্টা মেয়ে কমলা যার বর গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়েছিলো বিয়ের আসরে, অসহায় এক বকুলের কথা যে প্রচন্ড রকমের ভয় পায় তার স্বামীর চোখ দুটিকে। এরপরে জানকী নামের এক মেয়ের কথা যার মরদকে মেরে ফেলা হয়েছে জেলের ভেতর সবকিছু মিলিয়ে এক দারুন একটা উপন্যাস।
যীশু নামের সেই অদ্ভুত মানুষটি যার চোখের দিকে তাকিয়ে সবাই শিউরে কেন উঠে তার উত্তর সে নিজেও জানেনা।
ইন্সপেক্টর যীশু বিশ্বাসের চোখে কি এমন আছে যা দেখে ভয় পায় তার স্ত্রী বকুল। তার চোখে অন্য এক আগুন দেখতে পায় সকলেই। অগ্নিপাথর যীশু বিশ্বাসকে ভয় পায় বকুল। কিন্তু এই যীশু বিশ্বাসের আড়াল হলেই সকলে তাকে কঠিন কথা শোনায়, গালাগাল ক��তেও দ্বিধা করে না। ঢালস্বরূপ যীশু বিশ্বাসকেই একদিন বুঝতে পারে একদিন বকুল। তাই আবারও ছুটে যায় বাঘের মত ভয় পাওয়া স্বামীর কাছেই৷
শীর্ষেন্দুর লেখা আমার সবসময়ই ভালো লাগে। এটিও ভালো লেগেছে। ইদানীং রিভিউ লেখা অনেক কষ্টসাধ্য হয়ে ঠেকছে। তার উপর অসুস্থ শরীরে বইখানা পড়ে শেষ করেছি। ঠিকঠাক রিভিউ লিখতে পারছি না তবে পড়ে দেখবেন, ভালো লাগবে!
পুরনো বই দেখে আর প্রচ্ছদ দেখে বইটি হাতে নিলেও বইটি শেষ করলাম, যিশু নামের মানুষটার চোখ দেখতে ঠিক কেমন হতে পারে, বকুল মেয়েটা অমন ভয় কেন পায় ওই চোখ দেখে আর লগ্নভ্রষ্টা কমলার মনের অবস্থা কেমন ছিলো তা কল্পনা করে। জানকী আর সামুদের মতো মানুষদের রহস্যময় জীবনের গল্পও কিন্তু এই বই ভালো লাগার একটা কারণ।