Jump to ratings and reviews
Rate this book

নীল ময়ুরের যৌবন

Rate this book

Hardcover

First published January 1, 1982

14 people are currently reading
184 people want to read

About the author

Selina Hossain

154 books93 followers
Selina Hossain (Bangla: সেলিনা হোসেন) is a famous novelist in Bangladesh. She was honored with Bangla Academy Award in 1980. she was the director of Bangla Academy from 1997 to 2004.

সেলিনা হোসেন (জন্ম: ১৯৪৭) বাংলাদেশের অগ্রগণ্য কথাসাহিত্যিকদের অন্যতম। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বি এ অনার্স পাশ করলেন ১৯৬৭ সালে। এম এ পাশ করেন ১৯৬৮ সালে। তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমীর গবেষণা সহকারী হিসেবে। তিনি ১৯৯৭ সালে বাংলা একাডেমীর প্রথম মহিলা পরিচালক হন। ২০০৪ সালের ১৪ জুন চাকুরি থেকে অবসর নেন।

গল্প ও উপন্যাসে সিদ্ধহস্ত। এ পর্যন্ত ৭টি গল্প সংকলন, ২০টি উপন্যাস, ৫টি শিশুতোষ গল্প, ৫টি প্রবন্ধের বই প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেছেন বেশ কিছু বই। সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসাবে প্রাপ্ত উল্লেখযোগ্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক স্বর্ণপদক (১৯৬৯); বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৮০); আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮১); কমর মুশতরী স্মৃতি পুরস্কার (১৯৮৭); ফিলিপস্‌ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৮); অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৪)। তাঁর গল্প উপন্যাস ইংরেজি, রুশ, মেলে এবং কানাড়ী ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
30 (34%)
4 stars
38 (44%)
3 stars
14 (16%)
2 stars
2 (2%)
1 star
2 (2%)
Displaying 1 - 17 of 17 reviews
Profile Image for সন্ধ্যাশশী বন্ধু .
368 reviews12 followers
February 15, 2024
"মা আর মাতৃভাষা'র" তুল্য কিছু হয় না পৃথিবীতে। নিজের ভাষায় কথা বলতে পারার সুখ একটা স্বর্গীয় অনুভূতি। এই অনুভূতির, এই আবেগের স্বাদ মহাবিশ্বের  আর কিছুতে মেটানো সম্ভব না,হবেও না। 



"নীল ময়ূরের যৌবন" উপন্যাসে সেলিনা হোসেন যে আখ্যান শুনিয়েছেন,সেখানে ও "ডোম্বি, দেশাখ,কাহ্নপা" মত মানুষেরা রাজার বিরুদ্ধে লড়তে থাকতে থাকে,নিজেদের বেঁচে থাকার,নিজের ভাষায় কথা বলার অধিকার অর্জন করতে। নিজেদের অধিকারের জন্য কাহ্নপা,ডোম্বি'র অনেকের রক্ত ঝড়ে,এই রক্তের বিনিময়েই একদিন আসবে স্বাধীনতা আর মুক্তি। 


এই বাঙালি জাতিও একদিন  রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে ছিনিয়ে এনেছিলো " ভাষার অধিকার আর স্বাধীনতা "। আমাদের এই সংগ্রামের একমাত্র শক্তি ছিল এদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষ, যারা দেশকে মায়ের মত ভালোবাসতে পেরেছিল।



পাখিকে দেখলে মুক্তি'র স্বাদ বোঝা যায়। এ বড় মধুর ব্যাপার....
Profile Image for Khadiza Opu.
4 reviews3 followers
March 8, 2016
অষ্টম থেকে দশম শতাব্দীর চর্যাপদের সময়কালের পরিপ্রেক্ষিতে রচিত উপন্যাস। উপন্যাসটি চর্যাপদের কবিগনের যাপিত জীবনের আখ্যানভাগ।কাহ্নপা,কুক্কুরীপা,ভুসুকুপা,শবরী,ডোম্বি চর্যাপদের সাথে জড়িয়ে থাকা এই চরিত্র গুলোর মাঝেই আবর্তিত হয়েছে উপন্যাস
উপন্যাস জুড়ে বার বার ফুটিয়ে তোলা হয়েছে চর্যাপদ কবি ভুসুকুপা এর একটি পদ - আপনা মাংসে হরিণা বৈরাগী।হরিণ যেমন তার নধর শরীরের কারনে শিকারে পরিনত তেমনি মানুষও তার নিজ ক্ষুধা আর চাহিদার কারনেই শিকার হয় বৈরীতার।
এই উপন্যাসের মূখ্য বিষয় হলো ভাষা।
রাজা এবং তার পারিষদ্বর্গের সাথে সমাজের সাধারন মানুষের মুখের ভাষার পার্থক্য এবং এই জনগোষ্ঠীর ভাষাকে কোথাও স্থান দিতে অপারগ রাজস্প্রদায়। রাজরোষানল থেকে সাধারন মানুষের মুখের সহজ স্বচ্ছন্দ ভাষাকে টিকিয়ে রাখার নিরন্তর সংগ্রামের রূপরেখা এই উপন্যাস।এই সংগ্রাম যেমন চর্যাপদের সময়কালে ছিল তেমনি এখনো আছে।তার উদাহরন হলো আমাদের দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষার অবহেলিত এবং অবিকাশমান দশা।হাজার বছরের সংগ্রামী মানুষের সংগ্রামের শিল্পিতরূপ এ উপন্যাস।
Profile Image for Md Shariful Islam.
258 reviews84 followers
April 2, 2021
বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদার জন্য ১৯৫২ এর লড়াইটার কথা তো আমরা জানি কিন্তু আমরা কি এটা জানি যে একসময় আমাদের পূর্বপুরুষরা নিজের ভাষা নিজ মুখে বলতেও সংগ্রাম করতেন? আমরা কি জানি কিভাবে তাঁরা শাসকগোষ্ঠীরর শত অত্যাচার আর নিপীড়ন সহ্য করেও তাঁদের মুখের ভাষাকে রক্ষা করেছেন? জানলে তো ভালোই আর আগে না জানলেও খুব বেশি ক্ষতি নেই কেননা সুলেখিকা সেলিনা হোসেন তাঁর ‘ নীল ময়ূরের যৌবন ‘ উপন্যাসটির মাধ্যমে পাঠককে নিয়ে গিয়েছেন সেই সময়টায় যখন এই ভূমির আদি পুরুষরা তাঁদের মুখের ভাষার জন্য সংগ্রামরত ছিলেন।

বৌদ্ধ রাজা বুদ্ধমিত্র সিংহাসনে থাকলেও তখন কার্যত দেশ চালাচ্ছিল ব্রাহ্মণ মন্ত্রী দেবল ভদ্র। সমাজে ব্রাহ্মণদের সংখ্যা অতিক্ষুদ্র হলেও সমাজ নিয়ন্ত্রণ করছিল তারাই ; তাদের কথাই আইন, তাদের ভোগের বলি বাকি সমাজ। তারা যখন রাজধানীতে ভোগে লিপ্ত তখন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উনুনে আগুন জ্বালানো-ই দায়। এমন কোনো অত্যাচার না যা তখন তারা করছিল না ; দিনে ছায়া না মাড়ানো নারীদের ঘরে রাতে জোরপূর্বক প্রবেশ, সামান্য/বিনা অপরাধে চরমতম শাস্তি প্রভৃতি।

কিন্তু এসবের মধ্যেও জীবন থেমে ছিল না। তাইতো কাহ্নুপাদদের জীবনে প্রেম আসে, ভুসুকুরা জীবিকার জন্য দেশান্তরে যায়, দেশাখরা নতুন দিনের স্বপ্ন দেশে, কুক্কুরীরা সব দেখেশুনে নির্বাক হয়ে যায়। দেবল ভদ্রের বিরুদ্ধে প্রথম আঘাতটা করে কাহ্নুপাদ-ই। কবি কাহ্নুপাদের আজীবন লালিত স্বপ্ন ছিল সংস্কৃতভাষী রাজসভায় নিজ ভাষায় রচিত কবিতা পরিবেশন। কিন্তু যখন স্বপ্নটা হোঁচট খায় তখনই প্রথম কানু বুঝতে পারে ভাষা রাজসভায় বাঁচে না বরং ভাষা বাঁচে মুখে মুখে, ভাষা যখন প্রাণের আকুতি প্রকাশ করে, ভাষা যখন সর্বত্রগামী হয়। কানুর মুখের ভাষার প্রতি এই ভালোবাসাই ধীরে ধীরে সঞ্চারিত হয় ডোম্বি আর দেশাখের মাঝে। তখন ডোম্বি ব্রাহ্মণদের ফাঁকিটা ধরতে পারে, দেশাখ তরুণদের অস্ত্রচালনার প্রশিক্ষণ দিতে থাকে এক নতুন দেশের স্বপ্নে উজ্জীবিত হয়ে যেখানে রাজা-প্রজা সবই হবে তারা নিজেরাই।

ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস আমার বরাবরই প্রিয়। এই বইটা সেই কারণেই হাতে তুলে নেওয়া। জাকির তালুকদারের ‘ পিতৃগণ’ উপন্যাসের ভূমিকাতে যখন বইটার কথা প্রথম জানতে পারি, তখন থেকেই ইচ্ছা ছিল বইটা পড়ার। তাইতো এক প্রতিযোগিতায় জিতে পছন্দমতো বই বাছাইয়ের সুযোগ পেলে এই বইটা নিতে দেরি করি নি। বইটার প্লটটাই বইটার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে যথেষ্ট ; আমাদের পূর্বপুরুষদের ভাষা ও স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম। আমার এই আগ্রহকে বেশ ভালোভাবেই মিটিয়েছেন লেখিকা ; কাহ্নুপাদ, শবরী, ডোম্বি, দেশাখ, বিশাখা, ভুসুকু, ভৈরবী, সুলেখাদের মাধ্যমে লেখিকা আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন সেই সময়টাতে। বইটা পড়ার সময় যেন আমি সেই ক্রান্তিকালটাকে দেখতে পাচ্ছিলাম ; দেখতে পাচ্ছিলাম ব্রাহ্মণদের বর্ণবাদ-নিপীড়ন আর প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিবাদে ফেঁটে ওঠা। ‘ আপণা মাংসেঁ হরিণা বৈরী ‘ ভুসুকাপা'র এই লাইনটাকে অসাধারণভাবে ব্যবহার করে লেখিকা দেখিয়েছেন কিভাবে নিজের অস্তিত্বের জন্যই অত্যাচারের শিকার হতেন আমাদেন পূর্বপুরুষরা।

প্লট, বর্ণনাভঙ্গি, চরিত্রায়ন, কাহিনি বিন্যাস – প্রতিটা জায়গায় লেখিকা দারুণ করেছেন। ফলে উপন্যাসটিতে কোনো ফাঁক নেই। প্রিয় বইয়ের তালিকায় যুক্ত হওয়ার মতো একটা বই ‘ নীল ময়ূরের যৌবন ‘।
Profile Image for Mahmudur Rahman.
Author 13 books357 followers
December 18, 2018
আমাদের আজকের বাংলা, কবে থেকে বাংলা হলো? তার সূচনা কোথায়? সেই সময়ের মানুষেরাই বা কারা?

ভাষা বিষয়ে পণ্ডিতগণের অনেকেই বলেছেন, 'চর্যাপদ' হলো বাংলা ভাষার আদি রূপ। এবং সেই চর্যাপদের অন্তর্গত সর্বাধিক পদ রচয়িতা কাহ্নপাদ। সেই কাহ্নপাদই এই উপন্যাসের মূল চরিত্র।

রাজ্যে রাজা বৌদ্ধ, কিন্তু বৌদ্ধ ধর্মের দশা ক্ষয়িষ্ণু। কেননা প্রধানমন্ত্রী একজন হিন্দু ব্রাহ্মণ, তার কথাতেই রাজা বুদ্ধমিত্র চলেন। ক্ষমতার অপব্যবহারে দেবল ভদ্রের কোন ত্রুটি হয় না। সেই সঙ্গে নতুন নতুন নিয়ম জারি করে দাবিয়ে রাখেন প্রান্তিক মানুষদের। পান থেকে চুন খসলে তাদের শাস্তি দেওয়া হয়। নিয়মত্রান্ত্রিক ভাবে লুণ্ঠিত হয় তাদের সম্পদ, সম্ভ্রম।

এরই মাঝে জীবন। প্রেম আসে, সংসার হয়। পৃথিবীতে আসে নতুন প্রাণ। মানুষেরা নিজেদের বাঁচিয়ে রাখে। কখনও পরিশ্রম করে, কখনও মদে মাতাল হয়ে। দেশাখের মতো মানুষেরা স্বপ্ন দেখে, কাজ করে। ভুসুকুর অপেক্ষায় থাকে তাঁর স্ত্রী। কুক্কুরীপা ততদিনে নিঃসঙ্গবাসী।

এমন সময় মুখের ভাষায় গান/কবিতা রচনা করে কাহ্নপা। প্রথমে যদিও সে ভাবে রাজদরবারে কবিতাপাঠই হতে পারে তাঁর চরম সফলতা, কিন্তু পরে সে বুঝতে পারে আসলে মানুষের মুখে, মনে বেঁচে থাকার নামই কবিতা। আর সে সব কবিতা তখনই মানুষের মুখে�� গান হয়ে ওঠে, যখন তাতে প্রতিফলিত হয় সুখ দুঃখের বাস্তব রূপ।

তখনই খড়গ নেমে আসে কাহ্নপার উপর। প্রথমে বন্দি তারপর হাত কেটে শাস্তি দেওয়া হয়। ওদিকে গ্রামের আরেক প্রতিবাদী, ভিন্ন চিন্তার মানুষ দেশাখের মনে একটা সৈন্যবাহিনী করার চিন্তা। সে বাহিনি যুদ্ধ করবে রাজশক্তির বিরুদ্ধে। কিন্তু প্রবীণদের মাঝে সেই সাহস নেই। নবীনেরা চাইলেও তাদের দেওয়া হয় বাঁধা। এরই মাঝে বিপ্লবের মন্ত্র দেয় ডোম্বী। গ্রামের প্রান্তে বসবাস তাঁর। অন্ত্যজ বলে অস্পৃশ্য হলেও রাতের আঁধারে তাঁর শরীর চাটতে আসা ব্রাহ্মণের বুকে ছুরি বসিয়ে দেয় সে।

জ্বলতে থাকে গ্রাম। রাজরোষ বলে কথা। তবু দেশাখের পরিকল্পনায় পালিয়ে যায় কেউ কেউ। বাকিরা পুড়ে মরে। আর সেই চামড়াপোড়া গন্ধের মাঝেই কাহ্নপা স্বপ্ন দেখে নিজেদের এক দেশের, যার একদিকে বিশাল বন আর সেই বনঘেঁষে যাবে এক সমুদ্র।

চর্যাপদের সময় আর সেই সময়ের মানুষদের নিয়ে রচিত এই উপন্যাস। সেখানে ঐতিহাসিক তথ্যের কথা না ভেবে কেবল উপন্যাস হিসেবে দেখলে সুখপাঠ্য এক আখ্যান। কাহ্নপা-কে কেন্দ্র করে লেখা উপন্যাসে ডোম্বী, দেশাখ, শবরীর চরিত্র চিত্রন বেশ ভালো। স্বল্পদৈর্ঘ্য উপন্যাসে মোটামুটি একটা ভালো স্পষ্ট চিত্র অঙ্কিত। লেখিকা আমাদের নিয়ে গেছেন সুদূর এক সময়ে এবং একদম শেষে কাহ্নপার স্বপ্নের মধ্য দিয়ে নিয়ে এসেছেন বর্তমান বাংলাদেশে।

(জাকির তালুকদারের 'পিতৃগণ' উপন্যাস, এই বইটি থেকে যথেষ্ট অনুপ্রাণিত। কিছুটা লেখক নিজেও স্বীকার করেছেন তাঁর বইয়ের ভূমিকা অংশে)
Profile Image for Farzana Raisa.
533 reviews239 followers
May 13, 2020
একদম অন্যরকম, অন্যধারার একটা উপন্যাস। পড়তে গেলে মনে হবে টাইম মেশিনে করে পৌঁছে গেছি প্রাচীন বাংলায়। বৌদ্ধ রাজার দেশ, কিন্তু হুকুম চলে ব্রাক্ষ্মণ মন্ত্রীর। নানান রকম করের বোঝা, শাস্তি ও অন্যান্য সব যন্ত্রণায় অতীষ্ঠ সেখানকার অধিবাসী। রাজ দরবারে পাখা টানার কাজ করে কাহ্নুপাদ। পাখা টানার কাজ করলেও আপাদমস্তক সে একজন কবি। রাজদরবারের একটা অনুষ্ঠানে নিজের লেখা কবিতা পড়ার জন্য স্বয়ং রাজার কাছ থেকে অনুমতি নেয় কানু। অনুমতি পেয়ে সে কী খুশি! এলাকায় যারা যার জানে, ওরাও অনেক খুশী। কিন্তু সে কবিতা পড়ে আর শোনাতে পারলো কই? মন্ত্রীর নির্দেশ রাজভাষা ছাড়া অন্য কোন ভাষা যে চলবে না! প্রথমে ভেঙ্গে পড়ে কাহ্নপাদ। সে যে ভেবেই নিয়েছিল রাজ দরবারে কবিতা পড়তে পারার মাঝেই নির্ভর করছে তার কবি জীবনের সফলতা-ব্যর্থতা। কিন্তু বোধোদয় হয় পরবর্তীতে। সে বোঝে ভাষা বহমান নদীর মতো। এক জায়গায় আটকে রাখলে ভাষা আর ভাষা থাকবে না, বিলুপ্ত হয়তে বাধ্য। আর ওদের জীবনের শোষণ আর বঞ্চনার কথা, ওদের স্বপ্ন-আশা-ভরসা কিংবা ওদের নিজেদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার জন্য প্রচলিত ভাষার অবাধ ব্যবহার ছাড়া গতি নেই। আর একজন শিল্পীর আসল সফলতা তো সেখানেই... হাত কেটে ফেলার পরও স্বপ্ন দেখা শেষ হয়ে যায় না কাহ্নপাদের। সে স্বপ্ন দেখে সুন্দর একটা বাংলার স্বপ্ন।

বইটা পড়তে যেয়ে প্রথমে কিছুটা ধাক্কা খাই। খাইসে! চর্যাপদের কবি কাহ্নপার বউ কি শবরীপা ছিলো নাকি! আমি তো যদ্দুর জানি, চর্যাপদের একমাত্র নারী কবি লাড়িডোম্বিপা। শবরীপা তো পুরুষ :3 বইটা পড়তে পড়তে ভুল ভাঙ্গে। লেখিকা চর্যাপদের সেই কবিদের নাম ব্যবহার করেছেন কেবল। চর্যাপদের দুই একটা পদ ব্যবহার করা ছাড়া আদপে পুরো বইটাই লেখিকার মস্তিষ্কপ্রসুত। বইয়ে এসেছে আরও অনেক চরিত্র। সৌন্দর্যের আঁধার কবি কানুর স্ত্রী-শবরী, শিকার প্রিয় আরেক স্বপ্নবাজ তরুণ দেশাখ, তার যোগ্য প্রেমিকা বিশাখা, আছে মুখের উপর যখন তখন যা-তা বলে দেয়া পাটনী ডোম্বি, দুঃখী ভুসুকু, দুষ্টু মন্ত্রী দেবল ভদ্র ও আরও অনেক অনেক অনেক চরিত্র। বইটা মূলত শোষিত-বঞ্চিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে নিয়ে লেখা। হাজার হাজার বঞ্চনা সত্ত্বেও তারা হাসতে জানে, গাইতে জানে, ওরা প্রেম করে, প্রেমে পড়ে, সংসারী হয়, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে প্রতিবাদ করে... এমনকি সবকিছু শেষ হয়ে গেলেও ওরা স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন দেখে ধ্বংস স্তুপ থেকে জন্ম নিতে চাওয়া এক ফিনিক্স পাখির।


বই-নীল ময়ূরের যৌবন
লেখক-সেলিনা হোসেন


#happy_reading
#বই_হোক_অক্সিজেন
29 reviews7 followers
January 2, 2023
মধ্যযুগের চর্যাপদের কবিদের কবি জীবনীর পটভূমিতে রচিত এই নীল ময়ূরের যৌবন উপন্যাসটি। যারা শাস্ত্রীয় ভাষার বাইরে মানুষের মুখের ভাষাকে কবিতায় গানে রূপ দিয়েছিলেন। কিন্তু ব্রাহ্মণ পন্ডিত সমাজের থেকে এর স্বীকৃতি আদায় করার পথটা সহজ ছিল না। তেমনই এক কবি কাহ্নুপাদ। মে বুদ্ধো রাজার দরবারে পাখা টনার কাজ করে। নিজ সম্প্রাদায়ের নির্যাতিত অবস্থা দেখে তার মন কাঁদে। সে গানের ভাষায়, কবিতার ছন্দে প্রতিবাদ করতে চায়। তার স্বপ্ন থাকে অন্যরকম এক রাজার প্রতিষ্ঠার। যেখানে রাজার লোকেরা মেয়েদের জোর পূর্বক তুলে নিয়ে যেতে পারবে না। জমজ সন্তান হলে কুসংস্কারাচ্ছন্ন পন্ডিতদের চাপিয়ে দেয়া অপবাদে নিয়ে কারো সংসার ভাঙবে না। কাহ্নুপাদের দুঃসাহসী স্বপ্নের জন্যই তাকে শাস্তি ভোগ করতে হয়। হারাতে হয় দুটি হাত, তার হয়ে ডোম্বি প্রতিবাদ করে জীবন দেয়। এই গল্পটি বাংলার বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের কথা মনে করিয়ে দেয়। কাউকে নির্যাতন করার প্রথম হাতিয়ার বোধহয় তার মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়া।
Profile Image for প্রিয়াক্ষী ঘোষ.
364 reviews34 followers
April 3, 2023
যুগে যুগে দেশে দেশে মানুষ ভাষার জন্য প্রান বিসর্জন দিয়েছে কিন্তু নিজেদের মুখের ভাষাকে বিসর্জন দেয় নি।

রাজ--দরবার বা রাজার আইন কখনও ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে পারে না। যতই বড়াই করা হোক না কেন, ভাষা বেঁচে থাকে মানুষের মুখে। জন্মের পর থেকে যে ভাষায় কথা বলে তা কেড়ে নিয়ে অন্য ভাষাকে চাপিয়ে দিলে মানুষ তো লড়াই করবেই।

পাহাড়ের পাদদেশে ছোট ছোট টিলার গা ঘেঁসে গড়ে উঠেছে ছোট একটা পল্লী। বিচ্ছিন্ন ভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে টিলার পাদদেশে এক একটা বাড়ী। এখানে বেঁচে থাকার জন্য প্রথমেই লড়াই করতে হয় ক্ষুধার সাথে। এ পল্লীর প্রতিটি মানুষই শুধু খাদ্য সংগ্রহের জন্য বছরের প্রতিটি দিন লড়াই করে চলে।

নদী পার হয়েই রাজার প্রাসাদ। এপল্লীর মানুষ গুলো রাজার কাছ থেকে কোন সুযোগ সুবিধা না পেলেও রাজা প্রজাদের থেকে নিজের সকল সুবিধাই জোর করে আদায় করে নেয়।

চর্যাপদের কবি কাহ্নুপাদ স্বপ্ন দেখেন স্বাধীন ভূখণ্ডের। যেখানে ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রবল নিপীড়ন থাকবে না। সংস্কৃত নয় তার মুখের ভাষা হবে রাজ দরবারের ভাষা । তাঁর এ স্বপ্নের সাথে সে পল্লীর আর সকলেও সাথী হয়ে যায়। এ জন্য তারা গোপনে তারা প্রস্তুতি ও নিতে থাকে।

তাই অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হলে কেটে দেয়া হয় কাহ্নুপাদের দু'হাত, ডোম্বীকে ফাঁসী গাছে ঝুলিয়ে রাখে এবং রাজার লোকেরা মধ্যরাতে পুড়িয়ে দেয় ওদের পল্লী। যারা বাঁচতে পারে পালিয়ে যায় পাহাড়ের পাদদেশে গুহায়। এ পলায়ন শুধু আত্মরক্ষার জন্য নয়, নতুন করে শক্তি অর্জনের জন্যই।

ওদের নাকে আসে মানুষের মাংস পোড়া গন্ধ। এমন রক্ত-- আগুনের মধ্য দিয়েই তো কাহ্নুপাদের স্বপ্নের ভূখন্ড বাংলা��েশ হয়ে যায়।

লেখিকা সেলিনা হোসেনের " নীল ময়ূরের যৌবন" মূলত অষ্টম থেকে দশম শতাব্দীর মধ্যে চর্যাপদের পটভূমিতে রচিত বাংলা ও বাঙালির কথা। সেই সময়কালের মানুষের জীবন বা চর্যাপদ সৃষ্টির ইতিহাস এখানে সুন্দর ভাবে বর্ননা করা হয়েছে। তাই আমার মনে হয় যারা বাংলাতে পরে তাদের চর্যাপদটা ভালোভাবে বুঝতে এ বইটা পড়া দরকার। এই বইটা পড়ার পর চর্যাগীতিকা বইটা বুঝতে সহজ হবে।
Profile Image for Ahmed Reejvi.
78 reviews5 followers
October 9, 2023
ড. রিন্টু দাসের রিভিউ পড়েই এত ভালো লেগেছিলো যে নিজের মতো করে রিভিউ লেখার সাহস না করে সেটিই হুবহু তুলে দিলাম:
‘নীল ময়ূরের যৌবন' (১৯৮২) সেলিনা হোসেনের একটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। উপন্যাসটির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় দশম-দ্বাদশ শতাব্দীর চর্যাপদের যুগের কবিদের আঞ্চলিক ভাষার প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ঔপন্যাসিক চর্যাপদের সময়য়ের রূপকে ধরার চেষ্টা করেছেন। উপন্যাসটি ১১টি পরিচ্ছেদে বিন্যস্ত হয়েছে। প্রতিটি পরিচ্ছেদের শুরুতে ভুসুকুপাদ রচিত ৬ সংখ্যক চর্যার ‘কাহেরে ঘিণি মেলি অচ্ছুহ কীস' পদটির তৃতীয় চরণ ‘অপণা মাংসে হরিণা বৈরী' প্রবাদের মতো ব্যবহৃত হয়েছে। এই পদটির মধ্য দিয়ে ঔপন্যাসিক চর্যাপদের কবিসমাজের সামাজিক অবস্থানকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। হরিণের নিজের মাংস যেমন তার নিজেরই শত্রুতা বা দুঃখের কারণ, তেমনি কাহ্নুপাদের লেখনী ও কবিত্বশক্তি তাকে উচ্চবর্ণের শত্রু হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। অপরদিকে নিম্নবর্গের মানুষের মুখের ভাষা, সামাজিক অবস্থান তাদের দুঃখের মূল কারণ হয়ে উঠেছে। অস্পৃশ্য হলেও তাদের সমাজে নারীরা ক্ষমতাশীল উচ্চবর্গের পুরুষদের লালসার শিকার হয়। এখানে তাদের শরীর তাদেরই ‘বৈরী' বা শত্রু হয়ে দেখা দিয়েছে।
ক্ষমতালোভী ও স্বার্থপর ব্রাহ্মণসমাজ সমাজের নিচুতলার মানুষদের চিরকাল অবজ্ঞার চোখে দেখে এসেছে। তাই চর্যার কবিসমাজের কবিত্বগুণ তাঁদের কাছে চরম বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রাজতন্ত্রের আড়ালে ব্রাহ্মণসমাজ নিম্নবর্গের মানুষদের উপর নানা বিধিনিষেধ চাপিয়ে দেয়। পদ রচনার অপরাধে কাহ্নুপাদকে ভয়ানক শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার সহ্য করতে হয়। হাত দুটি হারিয়ে তাকে ব্রাহ্মণসমাজ ঘোষিত অপরাধের চরম মূল্য দিতে হয়। কোনো জাতির আত্মপ্রতিষ্ঠার ইচ্ছাকে যে এভাবে দমন-পীড়নের মাধ্যমে ঠেকিয়ে রাখা যায় না ইতিহাস তার সাক্ষী আছে। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। উচ্চবর্গের অত্যাচার সহ্য করতে করতে একসময় কাহ্নপাদের মধ্যেও প্রতিবাদের আগুন জ্বলে উঠেছে। সেই আগুন ক্রমশ সমগ্র সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাকে মাতৃভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা ও স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে মুক্তিকামী বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের তৎকালীন অগ্নিময় চিত্রকে সেলিনা হোসেন দশম-দ্বাদশ শতাব্দীর চর্যাপদের পটভূমিতে উপস্থাপন করে কাহ্নপাদের ভাষার জন্য লড়াই ও স্বাজাত্যবোধের সমান্তরাল করে দেখাতে চেয়েছেন। লেখিকার নিজের কথাতেই তা সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে,

““নীল ময়ূরের যৌবন’ উপন্যাসের পটভূমি দশম-দ্বাদশ শতকের বাংলাদেশ। উপন্যাসের নায়ক কাহুপাদের নিজ ভাষার জন্য লড়াই আমাদের বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের প্যারালাল। রাজার অত্যাচারে পালিয়ে গিয়ে গ্রামবাসী পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থান নিয়ে চামড়া পোড়ার গন্ধ বুকে টেনে নেয়। তখন নিজেদের ভূখণ্ড হবে এমন স্বপ্ন দেখে তারা। সেই স্বপ্নে বাংলাদেশের সীমানা বর্ণনা করি। অর্থাৎ তা হয়ে যায় স্বাধীন বাংলাদেশের প্যারালাল। ”

চর্যাপদের কালকে ঔপন্যাসিক এই উপন্যাসে পুনর্নির্মাণ করেছেন। চর্যাপদের বৌদ্ধ সহজিয়া ও গুহ্য সাধনপদ্ধতি নয়, লেখিকা গুরত্ব দিয়েছেন তৎকালীন সমাজকে। একদিকে উচ্চবর্গের সামাজিক অনুশাসন অন্যদিকে সমাজের প্রান্তিক মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও নিজস্ব ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রামী চেতনাকে যুগপৎ এই উপন্যাসে তুলে ধরেছেন ঔপন্যাসিক। ভোগবাদী ভাবনায় বিশ্বাসী রাজতন্ত্র ও ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র একে অপরের হাত ধরে চলত। রাজা বুদ্ধমিত্র ক্ষমতার শীর্ষে থাকলেও রাজ্যশাসন বিষয়ে তিনি মন্ত্রী দেবল ভদ্রের উপরই নির্ভর করতেন। রাজার এই অন্ধবিশ্বাস ও দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মন্ত্রী দেবল ভদ্র ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন। দেবল ভদ্রের তৈরি নিয়মে ব্রাহ্মণরাই সমস্ত সুযোগ সুবিধার অধিকারী হয়। বহু নিষ্কর জমি তারা ভোগদখলের সুযোগ পায়। অন্যদিকে রাজার অগোচরে নিম্নবর্গের মানুষদের জমি জবরদখল করে নেওয়া হয়। ব্রাহ্মণদের এই শোষণ ও অন্যায় অত্যাচার নীরবে সহ্য করা ছাড়া আর কোনো উপায় খুঁজে পায় না তারা। কিন্তু কাহ্নুপাদ এই অত্যাচারকে সহজে মেনে নিতে পারে না। তার বিদ্রোহী মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে কবিতায়,

“আলিএঁ কালিএঁ বাট রুন্দেলা । তা দেখি কাহ্নু বিমনা ভইলা।।”

রাজার অনুমতি পেলেও রাজসভায় কাহ্নুর কবিতা পাঠের সুযোগ হয় না। রাজসভার এক নিম্নশ্রেণির কর্মী হিসেবেই কাহ্নুর পরিচিতি। মন্ত্রী দেবল ভদ্রের কাছে কাহ্নুর কবিতাচর্চা আস্পর্ধার সামিল। রাজ্যের শাসনকার্য ও অনুশাসন সবকিছু যে দেবল ভদ্রের হাতে তা তার কথাতেই স্পষ্ট,

“রাজা কে? এই দেবল ভদ্র সব। এখানে রাজার অনুমতিতেও কোন কাজ হয় না। ভাগ, যতসব ছোটলোকের কারবার। লাই দিলে মাথায় ওঠে।”

তৎকালীন শ্রেণিদ্বন্দ্ব ও তার নিদারুণ পরিণামের চিত্র অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এই উপন্যাসে ফুটিয়ে তুলেছেন সেলিনা হোসেন।

রাজতন্ত্রের অন্যায় শাসন শুধু নয়, সমাজে নিম্নবর্গের মানুষের ওপর উচ্চবর্গের নিষ্পেষণ ও নিষ্ঠুরতা দীর্ঘকাল ধরে চলে এসেছে। কাহ্নু-শবরী, দেশাখ- বিশাখা, ভুসুকু সুলেখা, সুদাম, লোকী, গুণী, ছুটকী, ডোম্বী প্রমুখ নিম্নবর্গের মানুষের ওপরও রাজা ও ব্রাহ্মণ মন্ত্রী দেবল ভদ্রের অপশাসন এবং নির্মম অত্যাচারের চিত্রকে লেখিকা তাঁর উপন্যাসে তুলে ধরেছেন। বকেয়া করের জন্য বা অন্য কোনো সামান্য অপরাধে নিম্নবর্গের এই মানুষদের অকথ্য অত্যাচার ও শাস্তি ভোগ করতে হয়েছে। কখনো চুনের ঘরে দিনের পর দিন বন্দি করা, চর্মপাদুকা প্রহার করা প্রভৃতি দশ রকমের শাস্তি তাদের জন্য বরাদ্দ ছিল। নিম্নবর্গের মানুষেরা উচ্চবর্গের কাছে অস্পৃশ্য হলেও নিম্নবর্গীয় নারীরা এই তথাকথিত অভিজাত অত্যাচারী পুরুষদের লালসার শিকার হয়। শবরী, ডোম্বী, দেবকী, বিশাখা, সুলেখা –এরা প্রত্যেকেই যেন 'অপণা মাংসে হরিণা বৈরি'। রক্ষক যখন ভক্ষকে পরিণত হয় তখন নিজের অপরাধকে আড়াল করার জন্য নিয়মও তৈরি করে নিজের পক্ষেই। দেবল ভদ্রের তৈরি করা আইনও রক্ষকের অপকর্মকে উৎসাহিত করতে সাহায্য করেছে,

“ব্রাহ্মণ নিম্নবর্ণের স্ত্রীলোকের সঙ্গে যে কোনো ধরণের মেলামেশা করতে পারবে, সে যদি তার বিবাহিত স্ত্রী নাও হয় তবে তাতে কোনো ক্ষতি নেই। এমনকি তার গর্ভে সন্তান উৎপাদন করলেও সংসর্গদোষ ছাড়া অন্য কোনো নৈতিক অপরাধ হবে না।”

নিম্নবর্ণের স্ত্রীলোকের সঙ্গে সংসর্গদোষের ফলে সন্তান উৎপাদন করার ছাড়পত্র রয়েছে, কিন্তু নিম্নবর্ণের স্ত্রীলোককে বিয়ে করাটা 'অমার্জনীয় অপরাধ' হিসেবে গণ্য হয়। দেবল ভদ্রের মতো নিষ্ঠুর মানুষের কাছে এই নিম্নবর্গের মানুষেরা নিছক কীট মাত্র। সমাজের প্রতি এই পাশবিক আইনের বিরুদ্ধে সুধাকর পণ্ডিত সোচ্চার প্রতিবাদ জানালে মন্ত্রী দেবল ভদ্র অট্টহাসি হেসে বলেছিলেন,

“সমাজ ? সমাজ তো আমরাই। যাদের হাতে আইন তৈরি করবার ক্ষমতা আছে তারাই এ সমাজ। আমরা ভোগ করবো, ওড়াবো, তছনছ করবো, যা খুশি তা করবো, বাকি সব কীটানুকীট।”

সাধারণ প্রজাকে ‘কীটানুকীট' মনে করে যে রাজা ও তার পারিষদ, নারীর প্রতি প্রবল অসম্মান প্রদর্শন করে যে আইন, সাধারণের মুখের ভাষাকে মর্যাদা দেয় না যে রাজদরবার সেই রাজা ও রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে, সেই তথাকথিত অভিজাত ও উচ্চবর্গের বিরুদ্ধে সমবেত প্রতিবাদ জানিয়েছে কাহ্নু ও তার সমাজ।

এই উপন্যাসের অন্তর্বয়নে নানা ঘাতপ্রতিঘাত ও জটিলতা থাকলেও বাইরে নদীমাতৃক শস্যশ্যামল বাংলাদেশের চিত্র ফুটে উঠেছে। অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্�� হলেও অন্যান্য জীবিকার মানুষও দুর্লক্ষ্য নয়। চাঙারি বোনা, শিকার করা, কার্পাস বোনা, দুধ দোয়া, খেয়া পারাপার প্রভৃতি পেশার মানুষের মধ্যে বাঙালির জীবনযাপনের চিত্রকে আমরা দেখতে পাই। কাহ্নু ও শবরীর সংসার জীবনেও বাঙালির দৈনন্দিন ঘরকন্নার ছবি ধরা পড়েছে। কাগনি ধানের ভাত, মৌরলা মাছের ঝোল, হরিণের মাংস, শুক্তো, চিংড়ি দিয়ে সাদা ডাঁটার চচ্চড়ি প্রভৃতি আমাদের পরিচিত খাদ্যাভ্যাসের ছবি। রাজতন্ত্র ও ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের করাল ভ্রূকুটি সত্ত্বেও এরা পারস্পরিক বিশ্বাস ও সহযোগিতার মাধ্যমে নিজেদের দৃঢ় বন্ধনে বেঁধে রেখেছে।

সমাজ-বিবর্তনের ধারায় মানুষের সঙ্গে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক নানা জটিল আবর্তের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে। নরনারীর পারস্পরিক প্রেম-ভালোবাসা ও দাম্পত্যজীবনও সমাজের বিবর্তনে নানা
টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে। বর্তমান সময়ে নারীপুরুষের সম্পর্কের অসঙ্গতিগুলির প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন ঔপন্যাসিক। এই উপন্যাসে নারীপুরুষের সম্পর্ক অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র কাহ্নু ও শবরীর দাম্পত্য প্রেম প্রকৃতি চেতনার মধ্য দিয়ে একাত্মতা লাভ করেছে। কাহ্নুর চোখে শবরী প্রেম ও শান্তির প্রতীক। শবরীর প্রতি কাহ্নুর মনের অভিব্যক্তি প্রকাশ পেয়েছে এইভাবে,

“তুমি এক পবিত্র মন্দির শবরী। সারাক্ষণ সেখান থেকে আরতির ঘন্টা শুনতে পাই। এ একটা চমৎকার প্রার্থনার ভাষা। এর বাইরে আমি আর কোনোকিছু বুঝতে চাই না। বুঝি না ঈশ্বর, বুঝি না বেদ।”

প্রাকৃতিক পরিবেশ কাহ্নুর কবিমনে এক রোমান্টিকতার আবহ তৈরি করেছে। শবরী তার চোখে শুধুমাত্র একজন নারী নয়, তার জীবন-আকাশের ধ্রুবতারা, তার জীবনবীণার ঝংকার এবং জীবন যাপনের মূল চালিকা শক্তি।

একদিকে শবরীর সৌন্দর্য তাকে নতজানু করে, শবরীর প্রতি ভালোবাসা তাকে ঈশ্বর ও বেদকে ভুলিয়ে দেয় অন্যদিকে তার হৃদয়ের গভীরে এক দহন চলতে থাকে। এই দহনের ফলে সৌন্দর্য তার কাছে অর্থহীন মনে হয়। তার কাছে বড়ো হয়ে দেখা দেয় অর্থপূর্ণভাবে বেঁচে থাকা। আর এই অর্থপূর্ণ বেঁচে থাকা তখনই সম্ভব যখন অন্যের প্রভুত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে স্বাধীনভাবে বাঁচা যায়। আর তাই তার যন্ত্রনাকাতর হৃদয়ের প্রতিধ্বনি শুনতে পাই তারই কথায়,

“এই সৌন্দর্য অর্থহীন, যদি না বেঁচে থাকা অর্থবহ করা যায়, যদি না বেঁচে থাকার পরিবেশ

নিজের না হয়, যদি না পরিবেশ প্রভুত্বের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়।” কাহ্নু শবরীর সঙ্গে ঘর বাঁধলেও বাইরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাকে বেশি টানে। একদিকে শবরীর সৌন্দর্য তাকে বাঁধতে চাইলেও অর্থবহ বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা তাকে সৌন্দর্য-বিমুখ করে। অন্যদিকে শবরীর ঘরের বাঁধন তাকে বাঁধতে চাইলেও বাইরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাকে বন্ধনমুক্তির দিকে নিয়ে যায়। আসলে উচ্চবর্গের প্রভুত্ব থেকে মুক্তিলাভের আকাঙ্ক্ষা তার অন্তরে এক মুক্তিকামী সত্তাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আর তাই তার সৌন্দর্যবোধ বাঁধন থেকে মুক্তির পথে, সীমা থেকে অসীমের অভিসারী। শবরীর প্রতি তার বক্তব্যেও সেকথা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে,
“আমি বুঝি না এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ফেলে মানুষ কেন ঘরে যায়। ঘরে আমি আনন্দ পাই না সখি। মনে হয় চারপাশের বেড়াগুলো বাতাসের পথ আটকে দেবার জন্য, অন্ধকারের মোহন আকর্ষণ উপেক্ষা করার জন্য তৈরি।”

“অন্ধকারের মোহন আকর্ষণ' তার কাছে আরো উপভোগ্য হয়ে ওঠে শবরীর সান্নিধ্যে। শবরীর কোলে মাথা রেখে শুয়ে সে যেন প্রকৃতিকেই জড়িয়ে থাকে। শবরী ও প্রকৃতি তার কাছে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

ভৈরব-ধনশ্রীর দাম্পত্য সম্পর্কও গভীর প্রেম ও পারস্পরিক বিশ্বাসের ভিতের ওপর দাঁড়িয়েছিল। সমাজের চোখে ভৈরবী অসতী। কিন্তু সেই মিথ্যা অপবাদকে প্রশ্রয় দেয়নি ধনশ্রী। সমাজে লিঙ্গ-বৈষম্য সম্পর্কে সচেতন সেলিনা তাঁর সাহিত্যে নারীর সম্মানের দিকটির যথাযথ মূল্যায়ন করেছেন। এই উপন্যাসে ডোম্বী এক সামান্য পাটনী হলেও কাহ্নুর চোখে সে প্রেমচেতনার প্রতীক ও বিদ্রোহের জ্বলন্ত মশাল হয়ে দেখা দিয়েছে। ঔপন্যাসিক কাহ্নুর দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়ে নারীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন।
এই উপন্যাসে চর্যার সমকালকে সামনে রেখে সেলিনা ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রাম ও ইতিহাসকে মর্যাদা দান করেছেন। রাজতন্ত্র ও ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের কাছে চরম অপমান এবং নির্যাতন সহ্য করেও কাহ্নুপাদ আঞ্চলিক ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষে অবিচল থেকেছে। অভিজাত শ্রেণির অন্যায় অত্যাচার তার মনে প্রতিবাদের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। রাজসভায় কাহ্নু তার কবিতা পাঠের জন্য ব্যাকুল হয়েছে। তার এই আকাঙ্ক্ষার মধ্যে নিছক আত্মতুষ্টি নয়—ফুটে উঠেছে গভীর জীবনবোধ। মনেপ্রাণে জাতীয় ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাকে সে অন্তরে লালন করেছে,

“ও প্রবলভাবে অনুভব করে যে ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের রাশভারি সংস্কৃত ভাষার পাশাপাশি ওর লৌকিক ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে, এ ভাষাতেই কথা বলে ওর মত শত শত জন।” আঞ্চলিক ভাষা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি কাহ্নু স্বপ্ন দেখেছে একটা ছোট্ট স্বাধীন রাজ্যের। তার সেই স্বপ্নের রাজ্যে রাজাপ্রজা মোটা ভাত ও মোটা কাপড়ে এক হয়ে দিন কাটাবে। সেখানে উচ্চবর্গের নিপীড়ন থাকবে না। সে মনের সুখে গীত রচনা করতে পারবে। বিদ্রোহী কাহ্নু দেবল ভদ্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে রাজসভায় পাখা টানার কাজ ছেড়ে দিয়েছে। মন্ত্রী তাকে রাজ্যের স্তোত্রবাক্য রচনা করতে নির্দেশ দিলে সে তা প্রত্যাখ্যান করেছে। এর জন্য তাকে ভয়ানক শাস্তি পেতে হয়েছে। দেবল ভদ্র কাহ্নুকে ফাঁসিগাছে না ঝুলিয়ে গীত লেখার অপরাধে হাত দুটো কেটে নিয়েছে। কিন্তু এতকিছুর পরেও কাহ্নুর আশা-আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নকে শেষ করতে পারেনি। এক অব্যক্ত যন্ত্রনা ও অসহায়তা নিয়ে ভাষার বেঁচে থাকার অমোঘ সত্যকে সে প্রকাশ করেছে এভাবে,

“এতোদিনে আমার ভুল ভাঙলো দেশাখ। আমি এখন বুঝতে পারছি যে শুধু রাজদরবারই কোনো ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে পারে না। ওরা যতোই সংস্কৃতের বড়াই করুক ওটা কারো মুখের ভাষা নয়। বাঁচিয়ে রাখবে কে? আমাদের ভাষা আমাদের মুখে মুখেই বেঁচে থাকবে রে দেশাখ।” কাহ্নুর এই জাতীয় চেতনা সাধারণ মানুষের মধ্যে সংহতির বোধ গড়ে তুলেছে। রাজশক্তির প্রবল প্রতাপ ও নিষ্ঠুরতার প্রতিবাদে তারা একত্রিত হয়ে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছে। কাহ্নুপাদের সংগ্রামী মন, ভাষা চেতনা ও জাতীয়তাবোধকে সেলিনা বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী মানুষের চেতানার সঙ্গে একাত্ম করে দিয়েছেন। উপন্যাসের শেষে ঔপন্যাসিক যে দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশের বর্ণনা দিয়েছেন তা বাংলাদেশকেই চিহ্নিত করে। কাহ্নুপাদ তার কাঙ্ক্ষিত দেশের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছে,

“একটা ছোট্ট ভূখণ্ড আমাদের দরকার। সে ভূখণ্ডটুকু সবুজ শ্যামল আর পলিমাটি ভরা হলেই হয়। সে ভূখণ্ডে দক্ষিণে থাকবে একটা সুন্দর বিরাট বন আর তার পাশ দিয়ে বয়ে যাবে সাগর। ”

প্রবল প্রতাপ ও পরাক্রমের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ লড়াই করতে হলে আত্মত্যাগ যেমন দরকার তেমনি দরকার সে লড়াইকে পরিচালনা করার জন্য বলিষ্ঠ নেতৃত্ব। মধ্যরাতে রাজার অতর্কিত আক্রমণে বাড়িঘর সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এহেন পরিস্থিতিতে সকলের মনোবল ঠিক রাখতে, সকলের আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে রাখতে সচেষ্ট হয়েছে কাহ্নু। একজন প্রকৃত নেতার মতোই সে বলেছে,

“তোরা কেউ দুঃখ করিস না দেশাখ। আমাদের তেমন একটা জায়গা একদিন হবে। আমরাই রাজা হবো। রাজা-প্রজা সমান হবে। আমাদের ভাষা রাজদরবারের ভাষা হবে। তেমন দিনের জন্য , ১২ আমাদের প্রস্তুত হতে হবে দে��াখ।”

আপন ভাষাকে যোগ্য মর্যাদা দেবার লক্ষ্যে যে সংগ্রাম শুরু হয়েছিল তা শেষপর্যন্ত স্বাধীন রাষ্ট্র নির্মাণের স্বপ্নে পর্যবসিত হয়েছে। এমন এক রাষ্ট্র গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে যেখানে ‘আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে'। গভীর ভাষা চেতনা ও জাতীয়তাবোধ কাহ্নুর মনে অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদের আগুন জ্বালিয়ে তুলেছিল তা ক্রমশ সকল বিপন্ন মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এ লড়াই শুধু ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াই হয়ে থাকেনি— এ লড়াই পৃথিবীর সমস্ত শোষিত-বঞ্চিত-নিপীড়িত নিম্নবর্গীয় মানুষের আত্মপ্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে পর্যবসিত হয়েছে। উপন্যাসের শেষে কাহ্নুপাদ আর চর্যাপদের পদকর্তা হয়ে থাকেনি—সে হয়ে উঠেছে বিপন্ন জাতির প্রতিনিধি। ‘নীল ময়ূরের যৌবন' উপন্যাসটিও বিশেষ কালসীমার গণ্ডি অতিক্রম করে একটি বিশেষ জাতির ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতার স্বপ্নকে রূপ���ানের মধ্য দিয়ে বিশ্বের সমস্ত ভাষার মানুষের বিপন্নতাকে শাশ্বত করে তুলেছে।
Profile Image for Nabeel Onusurjo.
Author 4 books2 followers
June 11, 2017
A very well written fiction including characters and ingredients from Charyapada. Enjoyable for both who knows about it and who doesn't. Probably the best literary work by the author.
Profile Image for Agniva Sanyal.
24 reviews3 followers
May 19, 2023
'নীল ময়ূরের যৌবন' আসলে সমাজ পরিবর্তনের আখ্যান। যে সমাজ অত্যাচারের অভ্যাসে মূক হয়ে মাটিতে মিশে থাকে, নিজেদের শিকড়টুকুকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার সামান্য রসদে সন্ধান করে জীবনের অনির্বাণ আলো, সেই সমাজের সংবেদনশীল চেতনাই হল এই উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র কাহ্নপা। একক কবি সত্তায় তার অস্তিত্বের সৃজনবিভূতি। সমষ্টিচৈতন্যে সে আসলে অনন্ত প্রেম এবং দীপ্ত বিদ্রোহের প্রতীক। তাই বুকের মধ্যে 'সুখের হরিণ' খোঁজা শান্ত সংসারপ্রিয় শবরী আর নৌকার বৈঠা হাতে দৈনন্দিন সংগ্রামের বুক তোলপাড় করা দৃঢ়চেতা ডোম্বী আসলে একে অপরের পরিপূরক। কাহ্নপার শবরী আর মল্লারী-(ডোম্বী)র সমন্বয়েই জেগে উঠতে পারে পূর্ণ নারী। যে নারী একহাতে আয়ুধ অন্যহাতে আনন্দ নিয়ে হয়ে ওঠে কাহ্ন তথা সমগ্র জাতির প্রাণশক্তি। দেশে দেশে যুগে যুগে সমস্ত আগুন ঝরা বিপ্লবের দিন তারই সাক্ষ্য বহন করে। সাংস্কৃতিক আধিপত্য যতই কেড়ে নিতে চায় মুখের ভাষা, বুকের ভাষা, অভিজাত শৌখিনতা থেকে দূরে থাকা সাধারণ মানুষ ততই‌ শিকড়কে আরো শক্ত করে চেপে ধরে। এ উপন্যাসে ঘনিয়ে ওঠা বিদ্রোহ চর্যাপদের কালে হয়তো প্রচণ্ড বিস্ফোরণে ফেটে পড়েনি, কিন্তু সেই বিদ্রোহের বীজ হাজার বছর পেরিয়ে যেদিন বিস্ফোরিত হল, সেদিন সবাই সবিস্ময়ে দেখেছিল একটা জাতি নিজের মাতৃভাষাকে কতখানি ভালোবাসতে পারে। যতবার আধুনিক 'রাজদরবার' সাধারণ মানুষের কণ্ঠ রোধ করে দিতে তার ভাষাকে কেড়ে নিতে চাইবে ততবার সহস্র কাহ্নপার মুখে উচ্চারিত হবে -
"আমি এখন বুঝতে পারছি শুধু রাজদরবারই কোনো ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে পারে না।... আমাদের ভাষা আমাদের মুখে মুখেই বেঁচে থাকবে রে দেশাখ।... বংশ পরম্পরায় আমাদের মুখের ভাষা নদীর মতো বইবে। কোনোদিন তা মরে সেজে যাবে না।"
Profile Image for Yasir Arafat.
96 reviews
March 12, 2023
সেলিনা হোসেন-এর নীল ময়ূরের যৌবন উপন্যাসটি চর্যাপদের সময়কালের পটভূমিতে রচিত। বাংলা ভাষায় এর আগে বা পরে এই বিষয়ে অন্য কোনো উপন্যাস রচিত হয়নি বলেই জানি।

চর্যাপদের কয়েকজন পদকর্তার আমরা জানি। এই উপন্যাসে কাহ্নপাদ বা কানুপাকে প্রধান চরিত্র হিসেবে ধরে কাহিনী এগিয়েছে। বাকিরা প্রচ্ছন্নভাবে উপস্থিত আছেন। উপন্যাসটি মূলত বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসের কথা। কাহ্নপাদ স্বপ্ন দেখেন বাঙালির স্বাধীন ভূখণ্ডের। যেখানে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা হবে রাজদরবারের ভাষা। তাই ব্রাহ্মণ্যবাদের উৎপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হলে কেটে দেয়া হয় কাহ্নপাদের দুই হাত, ডোম্বীকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় ফাঁসিগাছে। রাজার লোকজন পুড়িয়ে দেয় তাদের গ্রাম। যারা বাঁচতে পারে তারা আত্মরক্ষার জন্য পালিয়ে যায় পাহাড়ের পাদদেশে, নতুন শক্তি অর্জন করে পুনরায় লড়াই করার জন্য।

উপন্যাসে বাঙালির লড়াকু চেতনা ও ভবিষ্যতের বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির একটি আভাস দেওয়া হয়েছে। যেমন কাহ্নপাদ তাদের স্বাধীন ভূখণ্ডের কল্পনা করেছে এভাবে, ‘সে ভূখণ্ডটুকু সবুজ, শ্যামল আর পলিমাটি ভরা হলেই হয়। সে ভূখণ্ডের দক্ষিণে থাকবে একটা সুন্দর বিরাট বন আর তার পাশ দিয়ে বয়ে যাবে সাগর’।

বই: নীল ময়ূরের যৌবন
রচয়িতা: সেলিনা হোসেন
প্রকাশক: ঐতিহ্য
প্রচ্ছদ: সৈয়দ ইকবাল
পৃষ্ঠাসংখ্যা: ১৪৩ পৃষ্ঠা
মুদ্রিত মূল্য: ৯০ টাকা।
Profile Image for Abdul Ahad.
59 reviews
March 3, 2025
উপন্যাসটার পটভূমি আমার কাছে বেশ ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছে। চর্যাপদের চরিত্র গুলোকে নিয়ে এর গল্প সাজানো। কাহ্নুপাদ ( কাহ্নপা ) এর কেন্দ্রীয় চরিত্র। পাশাপাশি ভুসুকু আর কুক্কুরীপাদের নাম কয়েকবার এসেছে।
কিন্তু গল্প এবং গল্পের গাঁথুনি আমার কাছে ভালো লাগেনি। ঐতিহাসিক চরিত্র নিয়ে লেখা কোন গল্প পড়তে গেলে তৎকালীন সমাজ সম্পর্কে জানার একটা আগ্রহ জন্মে। কিন্তু এখানে কাহ্নুপাদ - শবরী, কাহ্নুপাদ- ডোম্বি, দেশাখ - বিশাখা এদের মধ্যে প্রেমময় এবং ব্যক্তিগত আলাপই বেশিরভাগ জায়গা ধরে আছে যা সমকালীন উপন্যাসগুলো থেকে খুব একটা পার্থক্য করা যায় না। লেখক আর একটি বিষয় দেখাতে চেষ্টা করেছেন - তখনকার সময়ের উঁচু নিচু জাতের ফারাক। তবে এটাও খুব ভালোভাবে দেখাতে পারেননি।
এই উপন্যাসে চর্যাপদের গীত গুলোকে দেখানো হয়েছে সাধারণ মানুষের সুখে-দুঃখে গাওয়া গীত হিসেবে। কিন্তু হুমায়ুন আজাদের কত নদী সরোবর বইয়ে দেখেছিলাম যে এগুলো সাধারণ পাঠক বা শ্রোতাদের জন্য রচিত নয়। শুধুমাত্র দীক্ষিতদের জন্যই এ রহস্যময় গানগুলো।

সবকিছু মিলিয়ে বইটিকে আমি পাঁচে সাড়ে দুই দেবো।
Profile Image for Anupoma Sharmin Anonya.
72 reviews1 follower
December 30, 2024
"মল্লারী ঠোঁট ওলটায়। কাহ্নুপাদ মৃদু হেসে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। নৌকা মাঝনদীতে, তীরে আছড়ে পড়ছে ঢেউ। ছলাৎ ছলাৎ শব্দ ও দু-কান ভরে শোনে। ও চারদিকে তাকিয়ে বুক ভরে শ্বাস নেয়, আনন্দে চোখে জল আসে। বিধাতা ওদের জন্য প্রাণভরে ঢেলে দিয়েছে, কিন্তু রাজসভায় গেলে টের পায় কিছুই ওদের জন্য নয়। সব ওদের যারা উঁচু বর্ণের, ওরা ভোগ করবে, খাবে, ফেলবে, ছিটোবে। যেটুকু কাঁটাকুটো তা ওদের জন্য—যারা নীচু জাতের, যাদের শরীরে নীল রক্ত নেই। ওইটুকু চেটেই ওদের খুশি থাকতে হবে, কোনো কিছুই চাইতে পারবে না।"

Bold. Light to read.
Profile Image for Naima Ferdous.
15 reviews8 followers
November 24, 2019
কাহ্নপা, শবরী, মল্লারী, দেশাখ,বিশাখা,দেবল,ভুসুকু, ছুটকি,ভৈরবী।💜
Profile Image for Umma Jannat.
43 reviews14 followers
June 22, 2021
ভালো লেগেছে।নদী,বন,আদিবাসী সংস্কৃতি,তাদের সংগ্রাম।
4 reviews
March 24, 2022
অনেকদিন পর এক নিঃশ্বাসে কোনো উপন্যাস শেষ করলাম। একরাশ মুগ্ধতা।
Profile Image for Ahmed Reejvi.
78 reviews5 followers
October 12, 2023
আঙ্গিক, রচনাভঙ্গী ও বিষয়বিন্যাসে পাঠকের নিকট অতি সুখপাঠ্য একটি বই।
Displaying 1 - 17 of 17 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.