Ahmed Sofa (Bangla: আহমদ ছফা) was a well-known Bangladeshi philosopher, poet, novelist, writer, critic, translator. Sofa was renowned for his intellectual righteousness as well as his holistic approach to the understanding of social dynamics and international politics. His career as a writer began in the 1960s. He never married. On 28 July 2001, Ahmed Sofa died in a hospital in Dhaka. He was buried in Martyred Intellectuals' Graveyard.
Sofa helped establishing Bangladesh Lekhak Shibir (Bangladesh Writers' Camp) in 1970 to organize liberal writers in order to further the cause of the progressive movement.
Ahmed Sofa's outspoken personality and bold self-expression brought him into the limelight. He was never seen hankering after fame in a trivial sense. His fictions were often based on his personal experience. He protested social injustice and tried to portray the hopes and dreams of common people through his writing. Sofa always handled his novels with meticulous thought and planning. The trend of telling mere stories in novels never attracted him; he was innovative in both form and content.
আমার বিশেষণের অভিধান খুব সমৃদ্ধ নয়। 'অসাধারণ', 'দুর্দান্ত', 'চমৎকার' ইত্যাদি ক'টা দিয়েই কাজ চালিয়ে নেই মোটামুটি! সম্বল এই কয়খানা মাত্র, তাই বহু ব্যবহারে তারা জীর্ণও বটে। প্রায়ই দেখা যায় দ্রব্যের গুণাবলীর সঠিক পরিমাপ এই বিশেষণেরা দিতে পারছেনা। দাঁড়িপাল্লায় নিয়ে মাপলে দুদিকের পাল্লা সমান সমান ইদানীং আর হয়না (অভিযোগ আছে আমার বিরুদ্ধে, আমি নাকি কারচুপি করে আমার বিশেষণ এর 'বাটখারা' গুলোর ওজন কমিয়ে দেই, বিশেষত হুমায়ূন আহমেদের বই এর ক্ষেত্রে!) দীর্ঘ ব্যবহারে ক্ষয়ে ক্ষয়ে হোক আর 'সূক্ষ্ম কারচুপি'র কারণেই হোক, এক শব্দের বাটখারা তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। অতএব একটু ঘোরালো করে বলা যাক, আধুনিক সময়ে বাংলাদেশী তো বটেই, বাংলা সাহিত্যেই 'নিহত নক্ষত্র' বইয়ে সংকলিত ছোটগল্পগুলোর কাছাকাছি মানের গল্প বেশ দুর্লভ! বাটখারার ওজন নিয়ে এখন যাঁর সন্দেহ হবে তিনিই কষ্ট করে সব পড়ে দেখুন, আমার কি!
স্রেফ কাহিনী বলে যাওয়াটাই সাহিত্য নয় নিশ্চয়ই। সাহিত্য মানুষকে উঁচু এক পাহাড়ের চূড়ায় চোখে দূরবীন লাগিয়ে অলক্ষ্যে, নিঃশব্দে নিচের সবাইকে পর্যবেক্ষণ করবার অনুভূতিটা কেমন তার একটা ছোট্ট ধারণা দেয়, তাকে চিন্তা করতে শেখায়। চিন্তার উদ্রেককারী পর্যবেক্ষণের এই উপাদানগুলো এই বইয়ে বেশ ভালোভাবেই আছে। বইয়ে সংকলিত ৯টি গল্পের অন্তত ৬ টি গল্পে এ ব্যাপারটি খুব দৃঢ় ভাবে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে গুণ্ডামী, খুনী এক ডাকাতের বিপন্ন এক মুহূর্তের ভাবনা, ধর্মের নামে ভণ্ডামী, অকালে সন্তানহারানো মায়ের ক্ষোভ, চামড়ার নিচে সুপ্ত কামনা ইত্যাদি বিষয়গুলোই গল্পগুলোর উপজীব্য। এগুলো সবই আমাদের দৈনন্দিন জীবনে 'ক্লিশে' হয়ে গেছে, এই ঘটনাগুলোর নির্লজ্জ পুনরাবৃত্তি দেখে দেখে চোখও আমাদের পেকে গেছে হয়ত, তবু ভেতরের একটা গল্প থাকেই। বাংলা ১৩৭১-১৩৭৫ সালের মাঝে লেখা এই গল্পগুলো, আজ থেকে প্রায় পাঁচ দশক আগে। তখন যেমন ছফা সদর্পে লিখে গেছেন "মুসলমান সমাজ এখনও চিন্তা-ভাবনার দিক থেকে রামমোহনের স্তর অতিক্রম করেনি। যাঁদের ভয়ঙ্কর প্রগতিশীল মনে করে সভা করে গলায় মালা দুলিয়ে দেই, তারাও কুসংস্কারাচ্ছন্ন। ভালো করে টিপে দেখুন, দেখবেন, মানুষ-পঁচা গন্ধ বেরোয়। ভেতরে নোংরা, ওপরের চটকদার চেহারাটুকুই চোখে পড়ছে। রাজনীতিবিদেরা যুবকদের সমাজ পরিবর্তনের কাজে না লাগিয়ে, তোষামোদে কাজে লাগিয়েছে। তাতে করে যুবশক্তির মেরুদন্ড ভেঙ্গে দিয়েছে।" আজকের বাংলাদেশের ভয়াবহ রাজনৈতিক দুরাবস্থা কিংবা মসজিদ থেকে চাঁদে সাঈদীর চেহারা দেখতে পাবার ঘোষণা এই কথাগুলোকেই প্রতিফলিত করে। ঘটনাগুলো ক্লিশে কিন্তু কী চিরন্তন! ছফা কোন নির্দিষ্ট ধর্মে সরাসরি বিশ্বাসী হয়ত ছিলেননা কিন্তু তাঁর লেখায় ধর্মের প্রতি অশ্রদ্ধা কখনো আসেনি, এসেছে ধর্মকে বদলে দেয়া সুবিধাবাদী মানুষগুলোকে মুখ ভ্যাংচানী। ছফা ভয়ানক সাহসী ছিলেন, কোন লুকোছাপাই ছিলোনা তাঁর মাঝে। মানুষকে কথার হুল যেমন ফোটাতে পারতেন, সম্মানও তেমনই করতেন। আজকের 'প্রগতিশীল' লেখক-বুদ্ধিজীবী মহল কি শিক্ষা নেবেন এখান থেকে?
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এর 'প্রাগৈতিহাসিক' গল্পটি পড়ার অনুভূতি অনেকখানিই ফিরিয়ে দিলো 'গন্তব্য' গল্পটি। ভীষণ ভালো লেগেছে 'পদাঘাতের পটভূমি' (সংলাপ গুলো চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায়), 'নিহত নক্ষত্র', 'আস্বাদ', 'প্রতিপক্ষ', 'কবি' আর শেষে অবশ্যই ছফার বিটকেলে সেন্স অফ হিউমার এর সামান্য পরিচয়বাহক গল্প 'কাজলী'।
আহমদ ছফা গত হয়েছেন বেশ আগে কিন্তু তাঁর সৃষ্টি তাঁকে নক্ষত্র বানিয়ে রেখেছে। খুব বড় নক্ষত্র যখন 'মারা যায়' তা পর্যায়ক্রমে প্রচণ্ড উজ্জ্বল মহাজাগতিক বিস্ফোরণ 'সুপারনোভা' তে পরিণত হয়। আমাদের মার খেতে অভ্যস্ত, নিঃস্পৃহ, নিরুদ্যম সমাজেও এমন একটি বিস্ফোরণ এখন খুব দরকার। সময়ের জন্য কিছুই থেমে থাকেনা। একসময় নিশ্চয়ই এমন একটি সুপারনোভীয় বিস্ফোরণ হবে। ততদিন পর্যন্ত ছফার 'গাভী বিত্তান্ত' কিংবা 'একজন আলী কেনানের উত্থান পতন' কিংবা 'বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা' ইত্যাদি রচনাগুলোর মধ্যে দিয়ে বিস্ফোরণের বারুদ জমতে থাকুক।
'নিহত নক্ষত্র' একটা গল্পগ্ৰন্থ। সব জায়গায় দেখছি, বইটাতে আছে ১১টা গল্প। তবে আমি যেটা পড়লাম, তাতে আছে ৯টা। কী আর করা? 😒
▪️▪️▪️
"আমরা শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিকেরা সকলেই তোষামোদের জগতের বাসিন্দা। আমরা যা পড়ি, তোষামোদ, যা লিখি তাই তোষামোদ, ওতে শক্ত কিছু ঘন কিছু গভীর কিছু নেই।"– নিহত নক্ষত্র আহমদ ছফার কলমের ধার সম্পর্কে অল্পবিস্তর পরিচয় ছিল। গল্পগুলো পড়ে সেটা আরো কিছুটা পাকা হলো। তবু নিরীক্ষার আলোকে পড়তে পারলাম না বলে ব্যবচ্ছেদও না করি.. তোষামোদি হয়ে যাবে সেটা আবার!
খুব কম কথায় বলে ফেলি– নিহত নক্ষত্র এবং কবি এ দুটো গল্প বুক হু হু করা বেদনায় বোনা। শুধু এ দুটোর গভীরতাতেই আমি ভীষণভাবে ডুবে গেছি। এছাড়া 'প্রতিপক্ষ' গল্পটা পড়ে অনেক হেসেছি। স্যাটায়ার খুব কম পড়ি বলেই বোধহয় মজা পেয়েছি বেশি!
অপূর্ব কিছু গল্পের সমন্বয়ে এ গল্পের সংকলন। বইটি পড়ার পর বুঝলাম,মহৎ সাহিত্য বুঝি এভাবেই মানুষকে অভিভূত করে! আহমদ ছফার বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালে। তখন উনার বয়স মাত্র ২৬ বছর! এত অল্প বয়সে এত গভীর জীবনবোধের লেখা একমাত্র কালজয়ীদের পক্ষেই সম্ভব।
"জাফর, নক্ষত্রের চোখে জল কেনো? আমি চেয়ে দেখলাম কুয়াশা। আবার বলল, নক্ষত্রের চোখ বেয়ে লাল লাল জল ঝরছে। আমার বুকেও তেমনি লাল লাল জল ঝরেছে। আহ, একটিবার আমি বলতে পারিনি, আমি তোমাকে ভালোবাসি তহুরা। প্রেমের চেয়ে জীবনকে দামী মনে করেছিলাম। সে জীবনকে খুঁজলাম- পেয়েছি। তহুরা ছিলো আমার, প্রাণ আমার। একবার একটা কবিতা লিখে দিয়েছিলো :
'পৃথিবীর সুর আমি পৃথিবীতে বাস করি সবকিছু ছুয়ে ছুয়ে গতিময় করি।'
আমাকেও ছুয়েছো তহুরা। আমার পাখায় লেগেছে গতি। আমি পেরিয়ে যাচ্ছি, জীবনের সীমানা পেরিয়ে যাচ্ছি। কোথায়? অন্ধকার-অকুল অন্ধকার। জাফর, নক্ষত্রের চোখে জল। আমার বুকে জল, লাল-লাল জল।"
আহমদ ছফার 'নিহত নক্ষত্র' একটি অবশ্যপাঠ্য গ্রন্থ। আমি জানিনা এটা কোন শব্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব কিনা যে এই বইটা কতখানি চমৎকার আর কত অসাধারণ! সম্ভবত উনার সেরা কাজগুলোর একটা! বিশেষ করে "নিহত নক্ষত্র" গল্পটা স্বয়ং। আমি পরপর ২বার পড়েছি এটা, নিজের মনের তৃষ্ণা মেটাতে!এত মন খারাপ করা ভয়াবহ সুন্দর!
"হলে থাকার সময়ে মুনতাসীরের সঙ্গে পরিচয়। সে আমার রুমমেট ছিল।" - এই বাক্য দেখেই বইমেলায় আগ্রহ ভরে বইটি কিনেছিলাম। এটা একটা গল্প সংকলন। অন্যগুলোর কথা বলছি না। শুধু নিহত নক্ষত্র নিয়েই বলবো। আচ্ছা, বাদ দেন। এইটা নিয়েও বলার কিছু নাই। এত শক্তিশালী লেখা নিয়ে আমি বলার কেউ না। আমি শুধু মুনতাসীরের মৃত্যুর ব্যাপারটা মাথা থেকে সরাতে পারছি। শুধু নামের কারণে না। তার স্বপ্নগুলোর মৃত্যুর মাঝেও যে নিজেকে দেখেছি...
এই গল্প সংকলনের আর যেই গল্পটি অসাধারণ লেগেছে, সেটি হল "হাত।"
জীবনধর্মী গল্প হিসেবে 'নিহত নক্ষত্র' এবং স্যাটায়ার হিসেবে 'প্রতিপক্ষ' গল্পটা উঁচুদরের। আর বাদবাকি গুলো? বাদবাকি গুলো পড়ে মনে হইছে আহমদ ছফার পোড় খাওয়া, অসমাপ্ত, অসম্পাদিত লেখা গুলি ওনার কোনো শুভাকাঙ্ক্ষী নিজের পকেট খরচের জন্য ঝেপে দিয়ে প্রকাশককে দিয়ে আসছে। ছোটগল্প হওয়া উচিত রবীন্দ্রনাথের 'শেষ হইয়াও হইলো না শেষ' এর মত। শেষ করার পর মনে হবে যেন কাটকাট কিছু পড়লাম। সেইখানে এই বইয়ের গল্প গুলো হইতেছে 'শুরু না হইতেই হইলো শেষ' টাইপের। 'গন্তব্য' নামে এই বইয়ে একখান গল্প আছে মাইরি, গল্পে ডাহাইতের বাচ্চা রোস্তমে তার কর্মালয় থেকে পলাইয়া ভাগতেছে। তো ভাগতেছে ভালো কথা, একটা সুন্দর পরিণতি দিবে না? সেটা না দিয়ে গল্পের শেষে সূর্যের আলো দেখাইয়া স্টার জলসা-প্লাস এর সিরিয়াল গুলোর মত ঠা ঠা করে শেষ করে দিছে। আর 'পদাঘাতের পটভূমি' লেখছে আঞ্চলিক ভাষায়, যার ভয়ে আমি হরিসংকর জলদাশের লেখা ধরি না। এরপর আসে 'কবি', 'হাত', 'আস্বাদ' নামক গপ্পো। এগুলোর শুরু ভালো হইলেও শেষ্টা হইছে বাংলা বিশ্রী এডিটিং আর বিশ্রী সাউন্ডের নাটক গুলোর মত ধুম করে। ওভারঅল দু-একখানা গল্প ছাড়া তেমন উপভোগ করতে পারলুম না।।
আহমদ ছফাকে আমার কাছে খাপখোলা তলোয়ারের মতো মনে হয়। নির্মোহ, মেদহীন তাঁর কলম। উপন্যাস, প্রবন্ধ, স্মৃতিচারণের সাথে আগে পরিচিত ছিলাম, এই প্রথম পড়লাম ছোট গল্প। আর জানলাম, তিনি এখানেও নিজ নামেই ভাস্বর। ছোট গল্পকে আমার কাছে তুলনামূলক কঠিন সাহিত্য মনে হয়, কারণ অল্প কথায় এখানে একটা রস সৃষ্টি করা কঠিন। কিন্তু আহমদ ছফার প্রতিটা ছোট গল্পই সার্থক। নিহত নক্ষত্র, হাত,পদাঘাতের পটভূমি, আস্বাদ কিংবা প্রতিপক্ষ, কোনটা কম ভালো বলি! শহর-গ্রাম, রাজনীতি-যৌনতা-মানব মনের গভীর রহস্য সব বিষয়কে ছুঁয়ে গেছেন ছফা তাঁর অনবদ্য গদ্যে। আহমদ ছফাকে পুরোপুরি চেনার জন্য 'নিহত নক্ষত্র' একটি অবশ্যপাঠ্য গ্রন্থ।
দীর্ঘ প্রায় তিনমাস রিডার্স ব্লকে ভোগার পর মাত্রই পড়ে শেষ করলাম আহমদ ছফা’র ‘নিহত নক্ষত্র’। মাত্র ১১১ পৃষ্ঠার বই, ৯ টি ছোটগল্পের সংকলন। যারা বাংলা সাহিত্যের প্রেমী, যারা সাহিত্য নিয়ে অল্প হলেও নাড়াচাড়া করেন তারা ছফা’র লেখা পছন্দ করবেন না এমন হতেই পারেনা। আহমদ ছফা’র লেখা একদমই অন্যরকম, তাঁর লেখায় আছে সম্পূর্ণ স্বাতন্ত্র্য প্রাতিস্বিক একটা বৈশিষ্ট্য! যারা এই বৈশিষ্ট্য ধরতে পারবেন, তারাই মজে যাবেন ছফা’র লেখায়। তাঁর লেখা পরে মাঝে মাঝে মনে হয় হয়তো কোন কন্টিনেন্টাল বোধি বা তত্ত্বের প্রেক্ষিতে বিশেষ মেরুকরণের দিকে যাচ্ছেন লেখক, কিন্তু আদতে তা নয়। আহমদ ছফা’র লেখা সবসময়ই ছুটে শেকড় বাকরের সন্ধানে, দেশের ইতিহাসের আরো আরো অনেক গভীরে। একটু মনযোগ দিয়ে পড়লেই বোঝা যায়। ‘নিহত নক্ষত্র’ বইটির প্রতিটি গল্প আলাদা আলাদা অভিঘাতের সৃষ্টি করে মনে। বইয়ের নামগল্পটি মুনতাসীর নামে এক যুবককে নিয়ে, অদ্ভুত অরাজকতার এক কালে মুনতাসীরের মত মেধাবী, শান্ত শিষ্ট, নীরব প্রেমিক এক যুবকও হাতে তুলে নেয় প্রতিবাদের কলম। শোষিত শ্রেনীর পাশে গিয়ে দাঁড়ায় সে, কিন্তু এর চরম মূল্য শোধতে হয় মুনতাসীরকে, পরিবার ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিতাড়িত মুনতাসীরের প্রতিবাদী স্বর নৈরাজ্যের যাঁতাকলে চাপা পড়ে একাকী মৃত্যুকে বরণ করে নেয়।নিহত নক্ষত্র ছাড়াও বইয়ের ‘গন্তব্য’, ‘আস্বাদ’, ‘হাত’, ‘কবি’ প্রতিটি গল্পই গল্পের গাঁথুনি আর শব্দশৈলীতে নিজস্বতায় ভাস্বর! সমাজের বিভিন্ন স্তরে বসে থাকা মানুষগুলো ও তাদের পলায়নপর মধ্যপন্থী মনস্ততত্ত্বের খুঁটিনাটি ফুটে উঠেছে প্রতিটি গল্পে। আহমদ ছফা যা লিখতেন তা নিজের মধ্যেও ধারণ করতেন, কথিত আছে তার অধিকাংশ লেখাই নাকি নিজের জীবনের কাহিনী ও বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে নেয়া, এজন্যই হয়তো তার প্রতিটি লেখাই এমন জীবন্ত মনে হয়। আধুনিক ছোটগল্প পড়ে পড়ে যারা হাঁপিয়ে গেছেন, একটু ভিন্নতার স্বাদ নিতে তারা পড়ে ফেলতে পারেন ‘নিহত নক্ষত্র’।
বেশ চমৎকার গল্পের বই এটি। ছফার অল্প বয়সে লেখা। পরবর্তীকালে তার লেখা আরও উন্নত হয়েছে, গভীরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এই আবেগময় গল্পগুলো অন্যরকম হলেও ভাল লাগে।
প্রতিটা গল্পই জীবনের নির্মম বাস্তবতা নিয়ে লেখা হয়েছে তাই গল্পগুলো বেশ হৃদয়স্পর্শী। আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছ নিহত নক্ষত্র গল্পটা। সত্যিই মুনতাসির হওয়া যেমন কষ্টকর তেমনি কোনো প্রকার প্রাপ্তি ছাড়াই মুনতাসিরে��� প্রেমিকার মতো অপেক্ষা করাটাও কষ্টকর!!
৯টি গল্পের ৯টিই দুর্দান্ত। স্বাভাবিক রক্ত-মাংসের মানুষেরই কাহিনী। তবে কোথায় যেন একটা গা শিরশিরানো ব্যাপার আছে। কিছুটা ভয় পাইয়ে দেয়, আর মনে অনেকখানি বিষন্নতা ভর করায়।।
ছোটগল্পগুলো বেশ ধাঁরালো। ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত বইটিতে মূলত ছফার তরুন বয়সের লেখা গল্পগুলোর সংকলন। মাত্র ২৬ বছর বয়সে এমনসব গল্প লিখতে পারার মুন্সীয়ানাই প্রমাণ করে তিনি কত বড় মাপের লেখক ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ছাত্র সমাজের জীবনকে খুব নিগূঢ়ভাবে আঁকতে চেয়েছিলেন বলেই হয়তো নিহত নক্ষত্রের মত পরবর্তীতে গাভী বৃত্তান্ত কিংবা অর্ধেক নারী অর্ধেক ইশ্বরীর মত গল্পও পাই তার লেখায়। কিছু কিছু গল্প পড়ে স্থম্বিৎ হয়েছি, তার মাঝে হাত এবং পদাঘাতের পটভূমি অন্যতম।
এই প্রথম আহমেদ ছফার লেখা একটা বই পড়লাম। কয়েকটা ছোটগল্প মিলে বইটি যার মধ্যে প্রথম গল্পটির নাম 'নিহত নক্ষত্র'।
প্রতিটা গল্পই আলাদা আলাদাভাবে সুন্দর। সমাজের বিভিন্ন মানুষের কথা এখানে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া স্বপ্ন দেখা যুবকের কথা আছে, তেমনি ভয়ংকর অপরাধীর মনের ফিসফিস আছে। ধনী ও সম্ভ্রান্ত মানুষের মনবাসনার কথা যেমন আছে, তেমন এক বেকার যুবকের ব্যর্থতার কথা আছে। গল্পের কাহিনীগুলো সাধারণ, হয়তো আমারা জানি, সবাই দেখি, কিন্তু লেখনিতে এত অসাধারণভাবে ফুটি তোলার জন্য ছফার ভক্ত হলাম। তার লেখা আরও বই পড়ার ইচ্ছা জাগল।
আমার নামে বই দেখে আগ্রহ করে পড়া শুরু করেছিলাম... স্কুলে নতুন করে খোলা লাইব্রেরীতে সবচেয়ে পুরনো বইগুলর আলমারি ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে পেয়েছিলাম। আলমারির সামনে দাঁড়িয়েই পড়া শুরু করে দিলাম। প্রথম গল্পটা পড়া শেষ করে লাইব্রেরীতেি বললাম, আমার এই বই চাই। পিডিএফ হোক বা বাঁধানো। এই বই পড়েই বুঝতে পারলাম, একটা ছোটো বিষয়কেউ সাহিত্যিকরা চমৎকার করে তুলতে পারেন।
গল্প তো সবাই বলতে পারে কিন্তু সেটাকে সাহিত্যের মর্যাদা দিতে পারে কয়জন? জীবন থেকে তুলে আনা ছোট গল্পগুলো একেকটা যেন মাথায় চিন্তার পোকা ঢুকিয়ে দেয়। সময় ও কাল ছাপিয়ে গেছে একেকটা গল্প। সাহিত্যের পূর্ণতা তো এখানেই!
এই বইটি আহমদ ছফার কিছু উল্লেখযোগ্য গল্পের সংকলন। সবগুলো গল্পই কমবেশি চমৎকার। তবে তার চেয়েও চমৎকার 'নিহত নক্ষত্র' গল্পটি। তৃষ্ণা মেটাতে পরপর দুইবার পড়েছি একই গল্প। এছাড়া 'হাত ' গল্পটিও দারুণ লেগেছে!
ছোটগল্পের ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের একটা বক্তব্য আছে। শেষ হয়েও হইলো না শেষ- এই যেন ছোটগল্পের পরিণত। আমাদের আধুনিক যুগের কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদও ছোটগল্প রচনার ক্ষেত্রে অনেকটা এই লাইনেই হেঁটেছেন।
তবে আহমদ ছফা এই দিক থেকে ব্যতিক্রম। তার কিছু কিছু ছোটগল্প শেষ হয়েছে কাহিনীর চূড়ান্ত পরিণতির মধ্য দিয়ে। আবার কিছু গল্প পড়লে মনে হয়, গল্প শুরু হবার আগেই যেন পরিণতির ভারে কাহিনী নুয়ে পড়েছে। মাঝে মাঝে মনে হয়, আহমদ ছফা যদি তার পুরো লেখকজীবনে শুধুমাত্র কথাসাহিত্য নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন, তবে তারা লেখনীর ঔজ্জ্বল্যে সমসাময়িক কথাসাহিত্যিকদের অনেকেই বোধহয় নিষ্প্রভ হয়ে থাকতেন। এত পরিণত তার শব্দচয়ন, এত গভীর তার বাক্য সম্ভার! পড়তে পড়তে যেন মর্মে গিয়ে আঘাত হানে। অমর কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মতে, ছফা খুব অল্পবয়সেই গল্প বলার কলা রপ্ত করেছে। তাই পাঠক তার ডাকে সাড়া দেয়।
ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেও সাড়া না দিয়ে পারিনি। "নিহত নক্ষত্র" মূলত ছোটগল্পের একটি সংকলন। বইটির নামগল্প, অর্থাৎ নিহত নক্ষত্র নামের ছোটগল্পটি পড়ছিলাম বাসে চড়ে শ্রীমঙ্গল যেতে যেতে। এক নিঃশ্বাসে গল্পটি পড়া শেষ করে আমি কিছুক্ষণ নিথর হয়ে বসে ছিলাম। কাহিনী ও চরিত্রের পরিণত যেন আমাকে আমূল বিদ্ধ করেছিল।
গোগ্রাসে পড়ে ফেললাম বইয়ের পরবর্তী আটটি গল্প। মুমূর্ষু অবস্থাতেও মানুষের বেঁচে থাকার তীব্র ইচ্ছাশক্তি মানুষকে কতটা তাড়িত করতে পারে, তা প্রকাশ পেয়েছে তার লেখায়। সন্তানহারা মায়ের ব্যথিত হৃদয়ের আর্তনাদ, উদ্দেশ্যহীন জীবনের প্রতি অর্থহীন ভালোবাসা, কামের কাছে জাত-মান কিংবা ধর্মীয় মূল্যবোধের পরাজয়, অনুভূতির তীব্র স্রোতে অবগাহন করে একজনের গ্রাম্য মধ্যযুবার কবি হয়ে ওঠার গল্প, একজন শোষিত লেখকের চোখে শোষকশ্রেণীর মূল্যমান, প্রিয়জনকে কাছে পাবার আকুলতা- মানবমনের এই সমস্ত জটিল অনুভূতির খেলাকে তিনি শব্দের মধ্য দিয়ে করে তুলতে চেয়েছেন ছবির মতই জীবন্ত।
জনপ্রিয় ধারার সাহিত্যচর্চার বাইরে গিয়ে যেসকল পাঠক নিজের পাঠকসত্তাকে নতুন করে আবিষ্কার করতে চান, তাদের জন্য "নিহত নক্ষত্র" একটি উৎকৃষ্ট গল্প সংকলন।
গত কয়েকমাসে বেশ কয়েকটা ছোটগল্পের বই পড়েছি। ছোট গল্পের ব্যাপারে আমার একটা খুঁতখুঁতে ভাব আছে। কেবলই মনে হয় আরো ভাল হতে পারতো। গল্প আরো শক্তিশালী হতে পারতো। প্রেজেন্টেশন আরো সুন্দর হতে পারতো। বিভিন্ন লেখকের ছোটগল্প সংকলন পড়ি, কিছু বই ভাল লাগে। কিন্তু মন ভরেনা! মন ভরানোর মতো একটা বই পড়লাম! "নিহত নক্ষত্র"!
ছফা এমনিতেই আমার প্রিয় লেখক কিন্তু উনার ছোটগল্প আগে পড়িনি ! একজন লেখক এতো শক্তিশালী প্রবন্ধকার, অসাধারণ ঔপন্যাসিক, তাই তাঁর ছোট গল্প কেমন হবে এটা দেখার আগ্রহ ছিল।
বইটার কথা একটু বলি। কোনো কোনো বই পড়ে মনে হয়, এই বইটা সম্পর্কে লিখতে গেলে এটা যতো ভাল, লিখে ততটা বোঝানো যাবেনা। এই বইটার ক্ষেত্রেও তাই মনে হয়েছে।
প্রথম গল্পটা, নিহত নক্ষত্র। এতো শক্তিশালী ভাষা! প্রতিটা লাইন যেন বারুদ! প্রতিটা লাইন দাগিয়ে রাখার মতো। বারবার পড়ার মতো। মুগ্ধ হওয়ার মতো। খুব ভাল লেগেছে। গল্পটা শক্তিশালী। সবসময়ই মনে হবে প্রসঙ্গটা সমসাময়িক! উপস্থাপনা খুব ভাল। বাকী গল্পগুলোও সুন্দর। একেকটা গল্পের কাহিনী একেকধরণের। গল্পগুলোয় জীবন আছে। লেখক যেন ঠিক সেই জীবনটায় ছিলেন কখনো...এমন সাবলীল বর্ণনা!
একশব্দে যদি উত্তর দিতে বলা হয় আমাকে, কেন বইটা ভাল লেগেছে এতো? আমি বলবো উপস্থাপনা! লেখকের সুন্দর উপস্থাপনা আমাকে সবচেয়ে বেশি টানে। কখনো গল্পের চেয়ে বেশি! আর গল্পগুলোও যদি ভাল হয়, তাহলে তো কথাই নেই। এ বইয়ের গল্পগুলো ভাল!
যারা ছোটগল্প পড়তে পছন্দ করেন, তাদের জন্য অবশ্যপাঠ্য!
পড়া বইটার নাম নক্ষত্র ছিল না। আহমদ ছফার ছোটগল্প নামে সংবলিত দেখে কিনেছিলাম। দুই পার্টে বিভক্ত বইটার ফ্ল্যাপে লেখা গল্পগুলো কিশোরদের জন্য। নিহত নক্ষত্র পড়ে প্রশ্ন জাগল আসলেই কিশোরদের জন্য লেখা! দ্বিতীয় পার্টে অবশ্য সত্যিকারের কিশোরদের জন্য লেখা গল্প গুলোই ছিল। শুধু নিহত নক্ষত্র গল্পটার জন্যই বইটার আলাদাভাবে সমাদৃত হবে।
বেশি কিছু বলার নেই।
"পুরােনাে কবিতার রসে নাকানি চুবানি খেয়ে খেয়ে, পুঁথিসাহিত্যের মরা ঘেঁটে ঘেঁটে, ইসলামি আদর্শের মৃতবৎসা গাভীকে মাথায় করে বয়ে রয়ে, রবীন্দ্রনাথের জীবনদেবতা অন্বেষণের মৃগয়া করে করে, অধ্যাপকবৃন্দের মুখস্থ করা ভোতা লেকচারের নােট লিখে লিখে, আমরা সকলে এক ছাঁচের, এক মাপের হয়ে পড়েছিলাম। কেউ যদি বলে হুক্কা, কেউ বলতুম হুয়া।"
" শুধুমাত্র ভাতের লােভ দেখিয়ে লােক ক্ষেপানাের নাম মানবতার মুক্তি ঘােষণা নয়। সে কাজ দ্বিতীয় শ্রেণীর মােল্লার লােককে ক্ষেপিয়ে রায়ট লাগানাে যায়, কিন্তু কোন চিরকালীন কল্যাণ ব্রতে টেনে আনা যায় না। লােভী মানুষেরা চিরকাল ক্ষমতার লােভে অজ্ঞ মানুষকে চেতিয়ে আসছে। সাহিত্যিকের কাজ মানুষের সমষ্টিগত জীবনের পূর্ণাঙ্গ একটা ধারণা দেওয়া। সে কাজ অনেকটা নির্মোহ বিজ্ঞানীর।"
এরকম কিছু বাক্যদিয়ে পাঠকমনে কয়েকটা প্রশ্নের জাগ্রত হয়েছে।
নিহত নক্ষত্র একটি গল্প সমগ্র। আহমদ ছফার লেখায় তো বরাবরই জাদু থাকে। তো,সবগুলো গল্পই সুন্দর। তবে 'নিহত নক্ষত্র' মানে নাম ভূমিকায় যে গল্পটা আছে সেটা মনে বেশি দাগ কেটে গিয়েছে।
বাংলা সাহিত্যের একজন বিদ্রোহী লেখকের নাম আসলে কাজী নজরুল ইসলামের সাথে আমার মনে আসে আহমেদ ছফার নাম। নিহত নক্ষত্র অনেকদিন লিস্টে থাকা বই। এটি মূলত একটা গল্পগুচ্ছ। প্রথম গল্প নিহত নক্ষত্র। অসাধারণ একটা গল্প। এইটা স্কুলের পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। আমাদের সমাজটা পচে গেছে। এর শুরু করতে হবে আবার গোড়া থেকে। সেজন্য খোলা চোখে সমালোচনার জুড়ি নেই। তোষামদের ভুবনে আমারা নিজেদের কিভাবে মানিয়ে নেই সেটা খোলাখুলিভাবেই প্রকাশ করেছেন লেখক। এই গল্পের কথাগুলা আমার একবারে মনের কথাই। বাকি গল্পগুলো সবই আমাদের ঘুনে খাওয়া সমাজের নষ্ট হয়ে যাওয়া মানুষ আর সমাজব্যবস্থা নিয়ে লেখা। আহমেদ ছফার লেখার স্টাইল অসাধারণ। সহজেই মনে ঢুকে যায়। বাক্যরীতি একজন শক্তিশালী লেখকের অস্তিত্বকে জানান দেয়।