তসলিমা নাসরিন বনাম আহমদ ছফা দ্বৈরথ নিয়ে ছফা অনেক লিখেছেন। প্রাথমিক পর্যায়ে "লজ্জা" উপন্যাসটির মাধ্যমে বাংলাদেশকে চূড়ান্ত সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রমাণের বিপক্ষে তসলিমা নাসরিন ও আনন্দবাজার গোষ্ঠীর কীর্তিকলাপের সমালোচনা করাই ছিল ছফার ভূমিকা। পরবর্তীতে তসলিমা ছফাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেন। সাক্ষাৎকারে ছফাকে তিনি ''ইতর, লিবিয়া,ইরানের দালাল" ইত্যাদি বিশেষণে অভিহিত করেন। ছফা মূলত তসলিমার ব্যক্তিগত আক্রমণের জওয়াব দিতে ছফা "আনুপূর্বিক তসলিমা বৃত্তান্ত" লিখেছেন।
আওয়ামী লীগের এককালীন এমপি চিত্তরঞ্জন সুতার ও তার সহযোগী ডা. কালীদাস বৈদ্য ভারতের সীমান্তবর্তী কয়েকটি জেলা নিয়ে হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের জন্য স্বাধীন বঙ্গভূমি আন্দোলন শুরু করেছিলেন। এই দাবির অসারতা এবং বাঙালি মুসলমানের মানসে সাম্প্রদায়িক ভাবধারা সৃষ্টি নিয়ে চমৎকার বিশ্লেষণ করেছেন৷ পুরো পাকিস্তান আমলে বাঙালি হিন্দু সংখ্যালঘু হিসেবে শির উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধের পর তারা নিজেদের সেই মানসিক দীনতা থেকে মুক্তি পেয়েছিল। বাঙালি মুসলমানের মতো সে-ও নিজেকে রাষ্ট্রের প্রথম শ্রেনির নাগরিক জ্ঞান করতে শুরু করে এবং সকল পর্যায়ে নিজেদের হক দাবি করে। তাতেই বাঁধে বিপত্তি। একপক্ষ মনে করতে শুরু করে পাশের দেশ ভারতের বলে হিন্দুরা জোর দেখাচ্ছে। অথচ সত্যিটা এমন ছিল না।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জাতির প্রাণশক্তির কেন্দ্র। কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যায়তনগুলোর ধস্ত-বিধ্বস্ত দশা ছফার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছিল।
হঠাৎ দেখা গেল কয়েক হাজার মাদরাসা শিক্ষার্থী মওলানা সাহেবদের নেতৃত্বে জনৈক নগেন্দ্রনাথ বসুর ফাঁসির দাবিতে মিছিল করছে। কে এই নগেন্দ্রনাথ বসু কিবা তার বিত্তান্ত তা ছফা জানার চেষ্টা করলেন। জানা গেল, এই বসু নবিকে অবমাননা করে কেতাব লিখেছে। তাই তারা কল্লা চাইছেন মোল্লারা। পরে আরও জানতে পারলেন এই নগেন্দ্রনাথ বসু মারা গেছেন ১৮৮৪ সালে! তার বইটা কলকাতা থেকে রিপ্রিন্ট হয়েছিল। মোটকথা, মোল্লারা বইতে নবি মুহাম্মদকে অসম্মান করা হয়েছে শুনেই তার কল্লার দাবিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। কে এই ব্যক্তি, আদৌ সে জীবিত না মৃত তা জানার চেষ্টা কেউ করেনি!
রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত মহত্তম মানুষ ছিলেন। তাঁর বিরাটত্বের প্রশংসা করতে গিয়ে ছফা বলেছেন, হিমালয়কে আরও পাঁচ কিলোমিটার উঁচু করলেও তা রবিঠাকুরকে স্পর্শ করতে পারবে না। তবু রবীন্দ্রনাথ কেন বাঙালি মুসলমানের দুঃখ-সুখ নিয়ে কোনো বড়ো গল্প কিংবা উপন্যাস লিখলেন না তা জানতে চেয়েছেন ছফা। প্রাবন্ধিকের এই জিজ্ঞাসার কোনো সদুত্তর এখনো কেউ দিতে পেরেছেন বলে মনে হয় না।
একাত্তরের আগে এদেশের বেশির ভাগ বুদ্ধিজীবী ক্ষমতার ননী-মাখনের লোভ ছাড়তে পারেনি। তরুণ তুর্কির দলকে থামানোর অনেক চেষ্টাই তারা করেছেন। যেমন, আইয়ুবের পোষা বুদ্ধিজীবির সংগঠন "রাইটার্স গিল্ডের" পূর্বাঞ্চল শাখার সভাপতি ছিলেন ড. এনামুল হক, যিনি স্বাধীনতার পরে বিরাট মুজিববাদী হয়েছিলেন এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, জনাব চৌধুরী তো জন্মগত বিপ্লবী!
ছফার লেখা সবসময় নতুন করে ভাবায়। প্রচলিত মতের বাইরে চিন্তা করতে প্রেরণা জোগায়। এই বইতেও তার ব্যত্যয় হয়নি।