'যে সমস্ত বাংলার পন্ডিতেরা মাঠে-ময়দানে বাংলা ভাষার স্বপক্ষে বিস্তর চিল্লাচিল্লি করেন, তাদের ছেলেমেয়েদের ইংরেজি স্কুলে পড়াশোনা করতে পাঠান। এমনও দেখা গেছে, জুচ্চোর ঠিকেদার, চূড়ান্ত সমাজ বিরোধী, কালোবাজারি, শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রতি যাঁদের একফোঁটা অনুরাগ নেই তারাও ছেলেমেয়েদের ইংরেজি স্কুলে পাঠাচ্ছে। ইংরেজ শাসন নেই অথচ ইংরেজির প্রসার বাড়ছে ___এর কারন কি? '
'বাংলাভাষা: রাজনীতির আলোকে' আহমদ ছফার গ্রন্থটিতে মোটে চারটি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। যা পূর্বে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। চারটি প্রবন্ধ যথাক্রমে,
১: বাংলাভাষা : রাজনীতির আলোকে
২:বাংলা সাহিত্যাদর্শ
৩:জীবনানন্দ দাশ: তাঁর কাব্যের লোকজ উপাদান : সাম্প্রতিক নিরিখ
৪: ভাষাবিষয়ক চিন্তাভাবনা
মূল আলোচনায় আসা যাক....
১. বাংলাভাষা : রাজনীতির আলোকে
'বাংলা ভাষা চালুর কর্মসূচির সঙ্গে সে রাজার দুধের দীঘি খনন করার গল্পটির সঙ্গে তুলনা করা যায়। রাজা একবার ভাবলেন একটা দীঘি খনন করিয়ে রাজ্যের সমস্ত প্রজার কাছে নির্দেশ দিবেন স্বেচ্ছায় এক এক ঘটি বিশুদ্ধ গোদুগ্ধ তারা যেন দীঘিতে ঢেলে দেয়। রাই কুড়িয়ে বেল। এমনি করে সকলের দানে সমৃদ্ধ হয়ে দুগ্ধের ধবল সরোবর থলথল করে জেগে উঠবে।
পরদিন সকালে প্রথম জন ভাবল অন্য সকলে খাঁটি দুধই নিয়ে যাবে, অতএব আমি এক ঘটি জল নিয়ে যায় না কেন। লক্ষ লক্ষ ঘটি খাঁটি দুধের সঙ্গে আমার একঘটি জল পরম নির্বিবাদে মিশে থাকতে পারবে। অত আর দেখে কে? ঐ রাজ্যের সকলে মহামানব ছিল কিনা বলতে পারব না, ঐ এক নম্বর প্রজার মতো ভেবেছিল। বাংলাভাষা চালুর প্রহসনও মোটামুটি একই রকম। তবে মাঝে মাঝে দুমূর্খের আক্ষেপ শোনা যায়, বাংলাভাষায় কোন জ্ঞানগর্ভ বই প্রকাশিত হচ্ছে না। সুতরাং বাংলার মাধ্যমে পড়াশোনা করে একটি অকাট মূর্খ যদি থেকে যেতে হয় তার চাইতে একেবারে পড়াশোনা না করাই ঢের উত্তম।
আজকের বাংলাদেশের জনগণকে ভাষা এবং সংস্কৃতিগতভাবে বিচার করলে দুটি সুস্পষ্ট ভাগে ভাগ করা যায়। একদল সবদিক দিয়ে ঔপনিবেশিক শাসনে-শোষণে উৎপীড়িত এবং লাঞ্ছিত হয়েছেন। অন্যদল ঔপনিবেশিক শোষণের ফলে লুট করার সুবিধে পেয়েছেন। যাঁরা উৎপীড়িত হয়েছেন, তাদের মুখের ভাষা আদিম যুগের বাংলা ভাষায় থেকে গেছে, এখনো সেই ভাষা তাদের মুখে মুখে জীবিত রয়েছে। আর যাঁরা ঔপনিবেশিক সরকারের সহায়তা করেছেন তারা শিক্ষা- দীক্ষার অধিকারী হবার সুযোগ পেয়েছেন। নিজেদের মুখের ভাষা আধুনিক ছাঁচে ঢালাই করার যাবতীয় প্রয়োজনীয় সুবিধা লাভ করেছেন। এইভাবেই ব্রিটিশ শাসনের পক্ষপুটে বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণীটির সৃষ্টি। তাঁরা শহর কলকাতা এবং কলকাতা শহরের আশেপাশের মানুষের কথ্যবুলিকে লেখ্যভাষায় উন্নীত করে তা বাংলাভাষা-ভাষীর একমাত্র ভাষা হিসেবে চালু করতে সক্ষম হয়েছেন।
প্রকৃত গণমুখী শিক্ষা, বাংলাভাষার মাধ্যমে সকল স্তরে সকল বিষয়ে শিক্ষাদান, সকল সরকারি বেসরকারি কর্মে মাতৃভাষার ব্যবহারের জন্য সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পাশাপাশি একটি রাজনৈতিক এবং সামাজিক আন্দোলনের প্রয়োজন অপরিহার্য। সেই আন্দোলনের লক্ষ্য হবে সকল শোষিত এবং নির্যাতিত মানুষকে অর্থনৈতিক দাসত্ব থেকে মুক্তি প্রদান, অতীতের ঔপনিবেশিক সরকারের কাছ থেকে যে শ্রেণীবিভক্ত সমাজ বাংলাদেশের মানুষ উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছে এবং বিদেশী শোষকদের স্থলে সাম্রাজ্যবাদী সম্প্রসারণবাদী শক্তির সহায়তায় শোষণ করে যাচ্ছেন। সেই শ্রেণীভিত্তিক সমাজকে সম্পূর্ণরূপে ভেঙে ফেলা এবং শোষিত মানুষের সাংস্কৃতিক চেতনার মান উন্নত করে তাদের সামনে একটি সমৃদ্ধ সমাজের ছবি তুলে ধরা; যাতে করে এই পচা ঘুনে ধরা সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে ফেলার জন্য শরীরে মনে পূর্ণ প্রস্তুতি তারা গ্রহণ করতে পারেন।
গায়ের জোরে, অর্থনৈতিক নিষ্পেষণে একটি জাতির ভাষাকে ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব ___যদি না আপনার থেকে সানন্দে সে ভাষা বর্জন করতে স্বীকৃত হয়। একেকটি ভাষা একেকটি জাতির চিন্ময় সত্তাকেই ধারণ করে। জাতির জাগরণের প্রথম স্পন্দনও ভাষার শরীরেই অনুভূত হয়। ধর্মীয় গোড়ামী, সামাজিক জাড্যতা,কূর্মবৃত্তি, কূপমুণ্ডুকতা, অর্থনৈতিক পশ্চাদপদতা, সাংস্কৃতিক অনগ্রসরতা ইত্যাদি যে সকল অনড়-স্থবির বন্ধন জাতিকে বৃক্ষের মত অচল এবং প্রণোচ্ছাসহীন করে রাখে সেগুলোর বিরুদ্ধে ভাষাকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। অতীতের এবং বর্তমানের যে ভাষাগুলো মনন ও চিত্তসম্পদে সমৃদ্ধ বলে বিবেচিত হয়ে থাকে সেগুলোর একটা পর্যায়ে ভাষাকে সামাজিক সংগ্রামের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। '
বাংলাভাষাকে সকল ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে হলে জাতির যথেষ্ঠ সদিচ্ছার প্রয়োজন।
২. বাংলার সাহিত্যাদর্শ
মোটাদাগে এখানে চারজন সাহিত্যিকের কথা উল্লেখ করেছেন ছফাসাহেব। মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর , কাজী নজরুল ইসলাম।
'মাইকেল মধুসূদন দওই হলেন বাঙালি বুর্জোয়া শ্রেণীর যথার্থ প্রতিনিধি। এই বাংলা সাহিত্যে প্রচলিত পয়ার ত্রিপদী ছন্দকে তার প্রতিভার অযোগ্য মাধ্যম মনে করলেন। তাঁর অন্তর্লোকের আগ্নেয়-বার্তা বহন করার জন্য বাংলা ভাষায় আরেকটি নতুন ছন্দের প্রয়োজন তিনি তীক্ষ্ণভাবে অনুভব করলেন। কোন খেয়াল কিংবা অগভীর রুচিবোধ দ্বারা তাড়িত হয়ে তিনি বাংলাভাষায় অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তন করেননি। জানতেন যে, তিনি এক মহাবীর্যবতী সংগীতকে মুক্তি দিচ্ছেন, বিরসুলভ যন্ত্রণা ও বেদনাবোধ থেকে বুকে অঙ্কুরিত হয়েছে এই মহান সঙ্গীত। এতে মাইকেল সমস্ত সত্তা ডুবিয়ে দিয়েছিলেন। বীরত্বব্যঞ্জক বেদনাবোধ তাকে উপযুক্ত বসন পড়াতে হবে। কোন বসনে মানায়, তাই বাংলা ভাষায় এল গুরুগম্ভীর ধ্বনী সৌষ্ঠবে সমৃদ্ধ অমিত্রাক্ষর ছন্দ।
মাইকেলের পরে বঙ্কিম হলেন সাহিত্যের আদর্শ নির্মাতাদের একজন। তিনিও ছিলেন প্রতিচীর শিক্ষায় সুশিক্ষিত মানুষ। তাঁর প্রথম উপন্যাস 'রাজমোহনস ওয়াইফ ' ইংরেজিতেই প্রকাশিত হয়। যাদের জন্য লেখা ' রাজমোহনস ওয়াইফ ' সে ইংরেজ এবং ইংরেজি শিক্ষিত এ দেশীয়দের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই পারল না। এই অবহেলা বঙ্কিমচন্দ্র এবং বাংলা সাহিত্যের জন্য শাপেবর হয়েছিল।
বঙ্কিমের বিরুদ্ধে একটি সাধারণ অভিযোগ হল তিনি ইতিহাসকে বিকৃত করেছেন ___কথাটি সত্যি। কিন্তু তা সত্বেও তিনি যে বাংলাভাষার শ্রেষ্ঠতম সন্তানদের একজন সে বিষয়ে কারো সন্দেহের অবকাশ থাকা উচিত নয়। ছফাসাহেব রবীঠাকুরের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি নজরুল ইসলাম সম্পর্কে বলেন, "নজরুল ইসলাম যেমনটি পেরেছেন অন্য কোন মুসলমান কবি বাংলা সাহিত্যে ইসলামিক ভাবধারা নিয়ে সার্থক কবিতা লিখতে পারেননি। অন্যকোন বাঙালি কবি হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার মিলন ঘটাবার এমন একনিষ্ঠ চেষ্টা করেননি। এই উপমহাদেশের অন্য কোন মার্কসবাদী কবি নির্যাতিত গণমানুষের মুক্তির সংগীত এমন উদাত্ত আবেগে গাইতে পারেননি।"
আমাদের সাহিত্যের এ পর্যন্ত সর্বশেষ আদর্শ নির্মাতা এবং শ্রেষ্ঠতম কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য কর্মের পূর্ণ মূল্যায়ন এখনো হয়নি।
৩. ভাষাবিষয়ক চিন্তাভাবনা
'বাংলাদেশের স্বাধীনতা হাতে-নাতে প্রমাণ করেছে, আদতে ভাষা এবং সংস্কৃতির সংগ্রাম জাতীয়তার সংগ্রামের প্রাথমিক পর্যায়। ভাষাগত অধিকারের দাবিতে এর প্রারম্ভিক অনুভুত্থান ঘটলেও পরিধি অনেকদূর প্রসারিত। অর্থনীতির মধ্যেই নিহিত তার আসল কার্যকারণ সম্পর্ক। ভাষা এবং সংস্কৃতির দাবি অর্থনীতির স্বায়ত্তশাসনের পূর্বশর্ত। '
৪. জীবনানন্দ দাশ: তার কাব্যের লোকজ উপাদান: সাম্প্রতিক নিরিখ
জীবনানন্দ দাশ রবীন্দ্রোত্তর কবি। মানুষ ইতিহাসে বাঁচে। জীবনানন্দ দাসও এই ইতিহাসবোধকে এড়াতে পারেননি। গৌড়বাংলার রাজন্যবর্গ, বল্লাল সেন, রায়গুনাকরের জগৎ থেকে তাঁর অনুভূতি তাঁর সকাল স্পর্শ করেছে, এটি যেন ঘটে গেছে কবরি অজ্ঞাতে যেমন ___
'মধুকপি ঘাস খাওয়া ধলেশ্বরী টির পাড়ে বাংলার এবার বল্লাল সেন আসিবে না জানি আমি রায়গুনাকর আসিব না দেশবন্ধু আসিয়াছে খরধার পদ্মার এবার'
__রূপসী বাংলা
বাংলাভাষার ক্রান্তিলগ্নে এমন প্রবন্ধ আরও পড়া প্রয়োজন। দেশ স্বাধীন হবার পরেও আমরা ভাষাগত বৈষম্যের স্বীকার হয়ে চলেছি প্রতিনিয়ত । এমন এক অবস্থা দেখে মুখে আমার শুধু একটি কথায় আসে, 'দেশ আজ বিশ্ব বেহায়াদের খপ্পরে।'