'সংকটের নানান চেহারা' গ্রন্থে সংকলিত প্রবন্ধগুলো নব্বইয়ের দশকের বিভিন্ন ইস্যুতে রচিত৷ রাজনীতি, ইতিহাস, শিক্ষা, ধর্ম এবং সাহিত্যবিষয়ক লেখা এই বইতে স্থান পেয়েছে।
নেহেরুর আমলে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়৷ তখন যুক্তি দেখানো হয়েছিল কলকাতা বন্দরকে বাঁচাতে এই বাঁধ নির্মিত হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের প্রভূত উপকারের কথা তৎকালীন ভারত সরকার প্রচার করেছিল। কিন্তু সেইসব প্রচারণায় সত্যের চাইতে মিথ্যা বেশি ছিল৷ কপিল ভট্টাচার্য ছিলেন ফারাক্কা বাঁধের প্রধান স্থপতি। ভদ্রলোক বিচার করে দেখলেন, এই বাঁধে পশ্চিমবঙ্গের উপকার হবে না বরং আগামীতে সংকট সৃষ্টি করবে৷ তিনি এ বাঁধ নির্মাণের প্রতিবাদ করলেন। ফলশ্রুতিতে ভারত সরকার তাঁকে জেলে পুরে দিয়েছিল এবং সাবধান করেছিল কেউ যেন এ বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে না দাঁড়ায়।
গঙ্গা রাজশাহী দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এই নদীকে ছফা 'বাংলাদেশের প্রাণ প্রবাহের প্রতীক' হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অথচ ফারাক্কা বাঁধের কারণে প্রাণের প্রতীক পদ্মার প্রাণ ওষ্ঠাগত। মুক্তিযুদ্ধে ঐতিহাসিক ভূমিকার কারণে ভারতের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। ভারতের সহযোগিতা আমরা আজীবন স্মরণ রাখব। ছফাও ভারতের ভূমিকা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেছেন৷ এরপর ফারাক্কায় বাঁধের পরিণতি নিয়ে দুঃখে লিখেছেন,
' একটি বন্ধুপ্রতিম জনগোষ্ঠী আরেকটি বন্ধুপ্রতিম জনগোষ্ঠীর এরকম সমূহসর্বনাশ সাধনের ষড়যন্ত্র কোথাও করেছে, এমন ইতিহাস আমাদের জানা নেই। '
একটি বন্ধু রাষ্ট্রের সাথে আরেকটি বন্ধু রাষ্ট্রের এমন আচরণ নিঃসন্দেহে ইতিহাসে বিরল। ছফা আফসোস করেছেন আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর নতজানু নীতি দেখে, ক্ষুব্ধ হয়েছেন এদেশের বুদ্ধিজীবিদের নীরবতায়।
ফারাক্কা বাঁধের প্রতিবাদে অশীতিপর জননেতা মওলানা ভাসানী লং মার্চ করেছিলেন। তিনি তখন গুরুতর অসুস্থ। তবুও অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে দ্বিধা করেননি। সেই ঐতিহাসিক লং মার্চে ছফা অংশ নিয়েছিলেন৷ নিজে মওলানা ভাসানীর স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন,
' তাঁর শরীরের এই অবস্থা, তার ওপর তুমুল বৃষ্টি। এই ধরনের আবহাওয়ায় মাওলানাকে সীমানা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। তাই সকলে গড়িমসি করছিলেন। মওলানা সাহেবকে ব্যাপারটি জানানো হলে তিনি সেই প্রকাণ্ড হুংকারটি ঝেড়ে দিলেন - ' কি মনে কর মিয়া, তোমাগে শরীরে মানুষের রক্ত নি আছে! চল, সামনে চল। '
মওলানার নেতৃত্বে লং মার্চ অনুষ্ঠিত হলো। ছফা মওলানার বক্তৃতা উদ্ধৃত করেছেন। ভীষণ হৃদয়স্পর্শী সেই বক্তৃতা। বক্তব্যের শেষে শিশুর মতো কেঁদে উঠলেন এবং আকাশের দিকে হাত তুলে বললেন, ' নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের বাঁচার একটা পথ করে দেবেন। '
ওয়াহাবি তথা কওমি মাদরাসা দীর্ঘদিন আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে ছিল। মোটকথা, ব্রিটিশ আমল থেকেই শাসকের বিরোধিতা করার সংস্কৃতি কওমি মাদরাসারগুলোর ছিল। বিশেষত, দেওবন্দের নাম তো উল্লেখ না করলেই নয়। সম্প্রতি সরকার কওমি শিক্ষাব্যবস্থাকে স্বীকৃতি স্বরূপ দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স সমমানের ডিগ্রি ঘোষণা করেছে। ছফা তাঁর লেখায় চমৎকারভাবে কওমি শিক্ষাব্যবস্থা বনাম প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতির দ্বন্দ্বের বিশ্লেষণ করেছেন। এই প্রবন্ধটি বর্তমানে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সোভিয়েট লেখক আন্তন মাকারেংকো ' Road To Life' নামে একটি বই রচনা করেছিলেন। মূলত, ছিন্নমূল শিশুদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার কৌশল নিয়েই বইটি লেখা। ছফা মাকারেংকোর লেখা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। শাহবাগের ছিন্নমূল শিশুদের জন্য তিনি এবং সাংবাদিক নাজিমুদ্দীন মাস্তান একটি স্কুল খুলেছিলেন। সরকারি চাপ এবং বিভিন্ন কারণে স্কুলটি মাত্র আট মাস পর বন্ধ হয়ে যায়। সেই স্মৃতিকে ভিত্তি করেই একটি প্রবন্ধ লেখা হয়েছে।
১৯৯৫ সালের বইমেলা। খালেদা জিয়ার আমল। প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়া মেলা উদ্বোধন করতে আসবেন৷ ছফা আগেই পৌঁছে গিয়েছিলেন। দেখেন সামনে-পেছনে, ডাইনে-বামে সকল ভালো আসন আমলা, তিন বাহিনী এবং রাজনীতিবিদদের দখলে। অথচ মেলার মূল আকর্ষণ লেখক, পাঠক এবং প্রকাশক হলেও অপাংক্তেয়। ছফা তা সহ্য করতে পারেননি। লিখেছিলেন একটি অনলবর্ষী প্রবন্ধ।
' তাবত বাঙালির ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধের চেয়ে বড় ঘটনা নেই। ' এই মুক্তিযুদ্ধ যে কারণে হয়েছিল তা অর্জনে আমরা ব্যর্থ হয়েছি বলে মনে করেন ছফা। এই ব্যর্থতার ব্যবচ্ছেদ করেছেন নিজস্ব ভাষায়।
বাংলাদেশের গ্রাম এবং মাইজভাণ্ডার নিয়ে লেখা দুটি এই বইয়ের সম্পদ নয়, উল্টো বোঝা। পড়তে একদম ভালো লাগেনি৷ স্বভাবসুলভ ছফাকে এখানে পাইনি।
এই বইয়ের চমৎকার লেখা হলো ফারাক্কা বাঁধ এবং বইমেলা নিয়ে রচিত প্রবন্ধগুলো।