Ahmed Sofa (Bangla: আহমদ ছফা) was a well-known Bangladeshi philosopher, poet, novelist, writer, critic, translator. Sofa was renowned for his intellectual righteousness as well as his holistic approach to the understanding of social dynamics and international politics. His career as a writer began in the 1960s. He never married. On 28 July 2001, Ahmed Sofa died in a hospital in Dhaka. He was buried in Martyred Intellectuals' Graveyard.
Sofa helped establishing Bangladesh Lekhak Shibir (Bangladesh Writers' Camp) in 1970 to organize liberal writers in order to further the cause of the progressive movement.
Ahmed Sofa's outspoken personality and bold self-expression brought him into the limelight. He was never seen hankering after fame in a trivial sense. His fictions were often based on his personal experience. He protested social injustice and tried to portray the hopes and dreams of common people through his writing. Sofa always handled his novels with meticulous thought and planning. The trend of telling mere stories in novels never attracted him; he was innovative in both form and content.
আহমদ ছফা তখনো শিক্ষার্থী। ' লিটারারি আইডিয়াজ অব বেঙ্গল' শিরোনামে একটি প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন। বাংলা একাডেমির জার্নালে প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিল। এই প্রবন্ধখানা লেখার সময়েই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে পুরানো আগ্রহের নবজন্ম ঘটে।
ছফার স্কুলের শ্রেণি শিক্ষক ছিলেন শিবপ্রসাদ সেন। শিববাবুর বিরাগভাজন হলে চপেটাঘাত এবং নানাবিধ উত্তম-মাধ্যম লাভ হতো। আবার, শিববাবুর প্রিয়ভাজন হওয়া সুখকর ছিল না। কেননা প্রিয় শিক্ষার্থীদের আদর করে তিনি শ্যালক সম্বোধন করতেন! ছফা সেই শ্যালক শ্রেণির উচ্চতম পদে অধিষ্ঠিত হতে পেরেছিলেন। স্কুল লাইব্রেরির চাবি রক্ষার দায়িত্ব তিনি ছফাকে দিয়েছিলেন এবং বাংলা সাহিত্যের রত্নভাণ্ডার উন্মোচন হয়েছিল ছফার সামনে। সেই সুযোগে প্রভূত সাহিত্য পাঠের সৌভাগ্য ছফা অর্জন করেন। অপরাপর সাহিত্যিকের লেখনীর সাথে বঙ্কিমবাবুর সান্নিধ্যেও ছফা পান। তিনি লিখেছেন,
' বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সীতারাম, রাজসিংহ, দেবী চৌধুরানী, আনন্দমঠ পাঠ করতে গিয়ে আমি একটা অপ্রত্যাশিত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হই। '
এই অপ্রত্যাশিত অভিজ্ঞতায় দেখেছেন মুসলমানদের নিয়ে বঙ্কিমচন্দ্রের নিষ্ঠুর এবং অকরুণ মন্তব্যের প্রতিশোধ নিতে বাঙালি মুসলমান পাঠক তাকে 'শালা বঙ্কিম', 'মালাউন বঙ্কিম'সহ অশ্রাব্য গালাগাল করেছে। একদল বঙ্কিমবাবুকে গালাগাল দিচ্ছে, আরেকদল তাকে ' সাহিত্য সম্রাট, 'ঋষি' ইত্যাদি বিশেষণে অভিহিত করছে। প্রকৃতপক্ষে বঙ্কিমবাবু কেমন সাহিত্যিক ছিলেন তা বিচার করাই এই প্রবন্ধের মূল লক্ষ্য।
ফরাসি বিপ্লবে রুশোর 'সোশ্যাল কন্ট্যাক্ট' গ্রন্থ যে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছিল, সেই একই ভূমিকা পালন করেছে বঙ্কিমবাবুর আনন্দমঠ। ভূমিকা একই হলেও প্রেক্ষাপটে ভিন্নতা ছিল। রুশোর গ্রন্থের রাষ্ট্রচিন্তা অসাম্প্রদায়িক সমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছে। পক্ষান্তরে, বঙ্কিমবাবুর আনন্দমঠের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। একটি আদর্শ হিন্দুরাষ্ট্রের জন্ম, কাঠামো এবং শুদ্ধতার রূপরেখা বঙ্কিম তার লেখার মাধ্যমে দিয়েছেন। একইসাথে বাঙালি মুসলমানকে উপেক্ষা, ততোধিক অবজ্ঞা এবং তাদেরকে প্রতিবেশী হিন্দুর শত্রু হিসেবে চিত্রিত করার অসৎ কাজটি চমৎকারভাবে সমাধা করেছেন বঙ্কিমবাবু। উনবিংশ শতক সাম্প্রদায়িকতার রঙে রাঙানো৷ উভয় সম্প্রদায়ের লেখকদের মধ্যেই অপর সম্প্রদায়কে হেয় করার উপাদান লক্ষণীয়। হিন্দু লেখকদের রচনার মধ্যে এই উপাদান বেশি চোখে পড়ে, কারণ তারা লেখালিখির জগতের দিকপাল ছিলেন। বাঙালি মুসলমান তখন কলম হাতে নিচ্ছে মাত্র। তাই এককভাবে কোনো সম্প্রদায়কে দায়ী করা হবে যুগধর্মকে অস্বীকার। রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম মানুষ - এ বিষয়ে কোনো দ্বিধা ছফার নেই। তবে বঙ্কিমবাবুর লেখা তৎকালীন বাঙালি হিন্দুর মানসপট যেভাবে প্রভাবিত করেছিল তা রবিঠাকুর করতে পারেন নি। এই প্রভাবিতকরণ প্রক্রিয়াটি বড় বিশুদ্ধ ছিল না। তাই ছফা পাঠকের কাছে প্রশ্ন রেখেছেন,
' বাংলা বিভাগের জন্য যদি কোন মানুষকে একক দায়ী করতে হয়, বঙ্কিমচন্দ্র ছাড়া আর কোন মানুষকে খুঁজে পাওয়া যাবে, যাঁর কাঁধে এই দায়ভার চাপানো যাবে? '
কী ভীষণ অনুযোগ! এই অনুযোগের তীব্রতা নিয়ে তর্ক-বিবাদ করা যাবে। মূল সত্যটি অস্বীকার করা যাবে কী? আজকে যে হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র হওয়ার পথে হাঁটছে ভারত তার দায়ভার বঙ্কিমচন্দ্র এড়াবেন কীভাবে? কেননা এই পথের দেবতা তো তিনি নিজে।
বঙ্কিমচন্দ্রকে নির্জলা 'গালাগাল' দিয়েছেন ছফা এমনটি ভাবার কারণ নেই। এই মানুষটি তাঁর যুগের কৃতবিদ্যা ব্যক্তিদের মধ্যে মেধা, মনন এবং সৃজনশক্তিতে শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করতে পারেন অনায়সে। কারণ তিনি যখন তার কলমের মাধ্যমে রাষ্ট্রচিন্তার রূপরেখা আঁকছেন, লিখছেন সাম্য, বঙ্গদেশের কৃষকের মতো প্রবন্ধ, তখন বাঙালি মুসলমান ব্যস্ত গুলে বকাওলি কিংবা পিরের মাজারে শিন্নির ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে। আবার, আনন্দমঠের প্রতিবাদ করতে ইসমাইল হোসেন সিরাজী 'রায়নন্দিনী' লিখলেন। এটিকে ঠিক প্রতিবাদ বলতে রাজি নন ছফা। বড়জোর সবলতম শত্রুর কলমের জওয়াব দুর্বলতম লেখক দিচ্ছেন এটি বলা যায় কিংবা এক ধর্মান্ধের বিরুদ্ধে আরেক ধর্মান্ধ কলম ধরেছে তা বলা চলে।
বঙ্কিমবাবু বাংলার ইতিহাস লেখার ভার যখন সাধারণ মানুষের হাতে তুলে দিচ্ছেন, তখন নিজেই আবার গণকন্ঠের বাণীস্বরূপ বাংলার কৃষক, সাম্যের মতো গ্রন্থকে অস্বীকার করছেন। এমন আদর্শিক দ্বৈরথ পুরো বাংলা সাহিত্যে দুইটি খুঁজে পাওয়া যাবে না।
আগেই বলেছি 'রায়নন্দিনী' লিখে সিরাজী সাহেব বঙ্কিমকে দেখে নিতে চেয়েছেন। কিন্তু তার লেখার সাহিত্যগুণ বিবেচনায় তৃতীয় শ্রেণির। ত্রিশের দশকে যখন পাকিস্তান আন্দোলন জমে উঠছে, তখন মুসলিম লীগের কট্টরপন্থী গ্রুপের পাণ্ডা মওলানা আকরম খাঁ প্রকাশ্যে আনন্দমঠ পুড়িয়ে বঙ্কিমের সাম্প্রদায়িকতাকে মোকাবেলা করতে চেয়েছে। এক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমানের চেষ্টাগুলোর দিকে নজর দিতে বলব। এরা বঙ্কিমকে শায়েস্তা করতে অখাদ্য পুস্তক লিখছে, বহ্ন্যুৎসব করছে। কিন্তু আনন্দমঠের সমমানের একটি কেতাব লেখার যোগ্যতা কারো হচ্ছে না। ছফা শুধু ফ্যাক্ট উল্লেখ করেছেন। বাঙালি মুসলমানের বঙ্কিমবিষয়ক প্রতিবাদকর্মের এই বড় অযোগ্যতার বিচার তিনি করেননি। করলে ভালো হতো।
বাংলার ইতিহাস নেই - বলে আফসোস করেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র। কথাটি মিথ্যা নয়। উনিশ শতকে তারা রাজপুতানা থেকে কাহিনি ধার করেছে, পূর্ণ শ্রীকৃষ্ণকে বাদ দিয়ে আধা শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে অখণ্ড হিন্দুরাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছে। প্রতিবেশী মুসলমানকে ঘৃণা করতে শিখেছে। অপরদিকে, বাঙালি মুসলমান নিজেকে রাজার জাত হিসেবে ভাবতে গিয়ে চিন্তারাজ্যে রিক্ত হয়েছে, প্রতিবেশীর নৈকট্য লাভ করতে পারেনি ও আক্রমণের প্রত্যুত্তরে দুর্বল এবং বিশ্রী ভঙ্গিতে প্রতিআক্রমণ করেছে।
২০০১ সালে বঙ্কিমচন্দ্রের প্রবন্ধ সমগ্র হাতে আসে। পরবর্তীতে উনার ৫/৬ টা উপন্যাসও পড়েছি। বিজ্ঞান নিয়ে, ধর্মতত্ত্ব নিয়ে, গীতার শ্লোকের ব্যাখা নিয়ে, হাস্য-ব্যঙ্গাত্মক লেখাগুলোয় মুগ্ধ হয়েছি। কিন্তু উনার লেখার রাজনৈতিক দিকটা মাথায় আসেনি। আহমদ ছফার এই বইটি বঙ্কিমবাবুর লেখাগুলোকে ভীন্ন দৃষ্টিতে বিচার করতে শেখাচ্ছে। ভাবনার খোরাক পেলাম প্রচুর।
প্রিয় লেখক আহমদ ছফার "শতবর্ষের ফেরারি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়" পড়া শেষ করলাম। নাম দেখে মনে হতে পারে শুধু বঙ্কিম সম্পর্কে বইটি লেখা হয়েছে। তবে আদতে তা নয়। মূলত বঙ্কিমকে নিয়ে লেখা হলেও তাঁর পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথসহ আরো অন্যান্য সাহিত্যিকদেরকে নিয়েও সংক্ষেপে নিজের মত জানিয়েছেন আহমদ ছফা।
শুরুতে বঙ্কিমের প্রতি লেখক কেন বইটি লেখার উৎসাহবোধ করেছেন সেটি ব্যাখ্যা করেছেন লেখক। "যদ্যপি আমার গুরু"র অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের পূর্বেই ছফা শিববাবুর সংস্পর্শে এসে বই পড়ার অভ্যাসটি রপ্ত করেছিলেন। শিববাবুর কল্যাণেই বঙ্কিমসহ আরো অন্যান্য সুলেখকদের সাহিত্যপাঠ শুরু করেন ছফা। তখন থেকেই বঙ্কিমের উপর লেখার ইচ্ছে পোষণ করে আসছিলেন তিনি। বইটি লেখার পটভূমি এটাই।
বইটিতে বঙ্কিমকে দেখানো হয়েছে হিন্দুরাষ্ট্র গঠনের নেপথ্যদানকারী হিসেবে। তবে সেই সাথে মুসলমানদের ভূমিকা যথাযথভাবে তুলে না ধরার জন্য বঙ্কিমের সমালোচনাও করেছেন লেখক। এককথায় বলা যায়, ততকালীন সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার জন্য উৎকৃষ্ট একটি বই " শতবর্ষের ফেরারি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়"। আহমদ ছফা ভক্তরা মিস করবেন না যেন :)
একজন বঙ্কিম বিদ্বেষী এবং ভক্তের কিছু কথাঃ বইটিতে সফা সাহেব প্রতিটি বাক্য আমার জন্য লিখেছেন। এর চেয়ে শান্তির আর কিছুই হতে পারে না। . আমিও ছিলাম বঙ্কিম ভক্ত এবং বিদ্বেষী দুটোই। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্রের সাম্প্রদায়িক লেখা-লেখির পিছনের কথা কখন ও আমাকে ভাবায় নি। এবার ভাবিয়েছে। . একসাথে কিভাবে ভক্ত এবং বিদ্বেষী হওয়া যায় তা আমিও জানি না। কিন্তু কিছু করার নেই। যখন আমি সমরেশ মজুমদারের "কালবেলা" পড়ি, তখন অনিমেষ (প্রধান চরিত্র) কে তার শিক্ষক বঙ্কিমের "আনন্দমঠ" পড়ার জন্য উৎসাহ জাগায়। "আনন্দমঠ" নিয়ে আমার কিছু বলার নেই কারন এটি অনেক আগে থেকেই সমালোচিত। যারা পড়েছেন তারা জানেন কি কারণে আমি আলোচনায় যেতে চাচ্ছি না। . যে জিনিসটা আমাকে ভাবিয়েছে তা হচ্ছে বঙ্কিমের হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতি গভীর আকাঙ্ক্ষা। অনেক সাহিত্যিকরা বা গবেষকরা মনে করেন বাংলা বিভক্ত বা ভারত বিভক্ত হওয়ার বীজ বঙ্কিম রোপন করে দিয়ে গেছেন। কিন্তু আহমদ সফা সাহেবের মতে তখনকার আমলে কয়জনই ছিলো যারা সাহিত্য দিয়ে রাজনীতির উপর ও এত সুন্দর প্রভাব ফেলতে পারে?? . আমি ক্রোধে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম যখন "আনন্দমঠ"-এ খুব সুন্দর ভাবে ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছিলো। মুসলমান ফকিরদের সরিয়ে রাখা হয়েছিলো। কিন্তু সফা সাহেব এই দিকটি খুব সুন্দর ভাবে বর্নণা করেছেন। যা কিনা সম্পূর্ন যুক্তি-যুক্ত। . বঙ্কিমের অবদান বাংলা সাহিত্যে বিরল। আমি যা দেখলাম যে কিছু কিছু জায়গায় শুধু ঔপন্যাসিক হিসেবে বঙ্কিম কে ধরলে খুবই ঠান্ডা থাকা যায়। আবার সব ক্ষেত্রে শুধু ঔপন্যাসিক হিসেবে ধরে বসে থাকলেও তা অন্যায় করা হবে বঙ্কিমচন্দ্রের উপর। . আমার মতে বইটি বঙ্কিম ভক্ত এবং বঙ্কিম বিদ্বেষী দুই পক্ষেরই জন্য মাস্ট রিড।
ঠিক প্রবন্ধ না আবার শুধু সমালোচনাও না । এ বইয়ে আহমদ ছফা বঙ্কিমচন্দ্রের সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে আলোচনা ও মত ব্যক্ত করেছেন । বঙ্কিম কিভাবে তার লেখায় মুসলমান বিদ্বেষ আর হিন্দু সমাজ গড়ার প্রচারণা চালিয়েছিলেন তার কথাবার্তা । অবিভক্ত ভারতবর্ষের সাম্প্রদায়িকতার ইতিহাস বেশ পুরানো । অক্ষরজ্ঞানী কিন্তু সুশিক্ষিত নয় অথবা নানান মানবিক কুসংস্কার দোষে দুষ্ট, এমন কলম ব্যবসায়ী কিভাবে প্রকৃত লেখক, সমাজ ও পরিবেশের জন্য ক্ষতি তা দেখিয়েছেন ।
বিষয়বস্তু তৈরি হয়েছে মূলত লেখকের ছোটবেলায় বঙ্কিম পড়তে গিয়ে সৃষ্ট এক অদ্ভুত পরিস্থিতি এবং তা থেকে উদ্ভুত একটি প্রশ্নকে আবর্তিত করে। সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর লেখা আনন্দমঠের মতো বেশ কিছু রচনায় কোন না কোন জায়গায় মুসলমান সমাজকে নিষ্ঠুরভাবে কটাক্ষ করে গেছেন। কোথাও অত্যন্ত সচেতনতার সাথে মুসলমানদের অবদান গেছেন এড়িয়ে। এ সমস্ত কারনে মুসলমান ছাত্ররা তার বইগুলোর পাতায় অত্যন্ত অশ্লীল ভাষায় গালাগাল লিখে রাখতো (এখনো রাখে) যা লেখককে দুটো প্রশ্নের সম্মুখীন করেঃ
১. সহজাত সাম্প্রদায়িক অনুভূতিবশতই কী ছাত্ররা তাঁকে এতোটা গালাগাল করে? এমন সাম্প্রদায়িক লেখক তো আরো রয়েছেন, তাঁদের প্রতি এতোটা আক্রোশ চোখে পড়ে না কেন?
প্রসঙ্গত এখানে বলে রাখি নিছক এই দুটো প্রশ্নের উত্তরমালা এই বইটি নয়। বইটি এর থেকে আরো বেশি কিছু। বঙ্কিমচন্দ্র চট্ট্যোপাধ্যায় আর দশজন সাহিত্যিকের মতনই শুধুই লেখালেখির ভুবনের মানুষ হলে লেখক আহমদ ছফা হয়তো তাঁকে নিয়ে এতোটা মাথা ঘামাতেন না। বঙ্কিম তৎকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রভাব বিস্তারকারী আশ্চর্য পুরুষ। লেখকের ভাষায় তাঁর মধ্যে রাজা রামমোহন রায়ের সমাজচিন্তা, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বাংলা ভাষার চর্চা এবং অক্ষয় দত্ত প্রমুখের বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তা-চেতনা অত্যন্ত সচেতনভাবেই ছিল। তার লেখা "সাম্য" "বাংলার কৃষক" এধরনের রচনাগুলি তাঁর স্বচ্ছ চিন্তা-ধারার পরিচায়ক। এমনকি ইতিহাস নিয়ে তার যে বিজ্ঞাননিষ্ঠ মনোভাব রয়েছে তা এতোটাই অভিনব যে উনিশ শতকে এসব ক্ষেত্রে তাঁর সমকক্ষ কাউকে পাওয়াটাই দুষ্কর।
তবুও বঙ্কিমচন্দ্রের বড় দুর্বলতা তার এই সাম্প্রদায়িক মনোভাব। সেসময়কালে সর্বপ্রথম রাষ্ট্রচিন্তার ধারনা পোষণকারী বঙ্কিম ছিলেন একটি হিন্দুরাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নে বিভোর। তাঁর এই চিন্তা কুমিরের খাঁজকাঁটা গল্পের মতনই তাঁর সাহিত্যকর্মে বার বার এসেছে যা তাঁর উজ্জ্বল ভাবমূর্তি বেশ কিছুটা ম্লান করে দেয়।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গ ছাড়াও লেখক আহমদ ছফা মুসলিমপ্রধান দেশে বাঙালিয়ানার যথার্থতা প্রমাণে বাঙালিয়ানার নতুন সংজ্ঞা প্রদানের উপর জোর দিয়েছেন এবং প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন বিষয়ের অবতারনা করেছেন।
পুরো বইটিতে লেখকের বঙ্কিমের প্রতি এক ধরনের সহানুভূতিই চোখে পড়ে। এমন ক্ষণজন্মা মহাপুরুষের প্রতি আক্ষেপ পোষণ করে তিনি মন্তব্য করেছেনঃ "আহা কি আশ্চর্য মানুষ! কি করতে পারতেন,আর কী করলেন।"
বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে নির্মোহ বিশ্লেষণ তেমন পড়া হয় নি। ছফার লেখায় পেলাম। কেনো বঙ্কিমকে নিয়ে স্বাধীনতার পূর্বযুগের মুসলিম বিদ্বেষ সেটার একটা ব্যাখ্যা পাওয়া গেলো।
বঙ্কিমচন্দ্র সম্পর্কে বলতে আমাদের মনে যা ভেসে উঠে বাংলা সাহিত্যের প্রথম সফল ঔপন্যাসিক। বাংলার মুসলমানরা এই একদিকে মনে রাখলে ও, কিন্তু বেশিরভাগ মুসলমানরা তাকে অপছন্দই করে। হয়ত তার বলার ধরণ অথবা তার মুসলমানদের নিয়ে নিষ্ঠুর ও অকরুণ মন্তব্য এর জন্য দায়ী। তবে আহমদ ছফা এই বিষয়বস্তুকে খোলামেলা ভাবে আলোচনা করেছেন এই বইয়ে। তিনি একক ভাবে বঙ্কিমকে ও দোষারোপ করেননি । কিন্তু কিছু ক্ষেতে বঙ্কিমকে পুরোপুরি দোষারোপ করেছেন এবং আলোচনা করেছেন কেন। বঙ্কিমের সাহিত্যের প্রতিভা নিয়ে ছফা কোন সন্দেহ নেই, তেমনি বঙ্কিমের ইতিহাস সম্পর্কে যে অগাধ জ্ঞান তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু ইতিহাস অনেককে অনেক রকমভাবে শিক্ষা দেয়, কেউ ইতিহাসের খারাপ দিকটাই গ্রহণ করে, কেউ ভাল। বঙ্কিম পুরোদস্তুর শিক্ষিত হলে ও, তিনি যে সাম্প্রদায়িকতা(আসলে কি তাই) থেকে বের হতে পারেননি। বঙ্কিমের "আনন্দমঠ" বা "দেবী চৌধুরানী" উপন্যাসে এগুলো প্রবল৷ ইতিহাসে মুসলমানের শাসন দেখে তার প্রবল আকাংখা হল হিন্দু শাসনের। আর তিনি লিখলেন এই উপন্যাসদ্বয়। বঙ্কিমের এই আকাংখার জন্ম ইতিহাস থেকে। ছফা সাহেব এই অংশকে কতটা নিখুত ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা বইটি পড়লে বুঝা যায়। তবে সমসাময়িক সাহিত্যে বঙ্কিম ছিলেন অগ্রজ , এইটা মানতে হবে বাংলা সাহিত্যের উপন্যাস শিল্পের জনয়িতা তিনি। কিন্তু যে বিষয়টি বঙ্কিমকে অন্যান্যদের থেকে আলাদা করেছে তা হল বঙ্কিমের রাষ্ট্র ও সামাজিক চিন্তা । আর এ জন্য তিনি মানুষের মনে গেঁথে দিতে পেরেছেন একটি মৌলিক হিন্দু রাষ্ট্রের চিন্তা। যা এই উপমহাদেশের ভাঙনে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে। তার আর কয়েকটি বই যেখানে তিনি বাংলার কৃষক, শোষিতশ্রেণীর সম্পর্কে লিখেছেন।তার সমসাময়িক কেউ অতটা কাছে থেকে পারেনি। বইটি পড়ার পর অনেকের ভুল ভাঙবে, বঙ্কিমকে নিয়ে একপেশে চিন্তা চলে যাবে। তখন চিন্তা আসবে " বঙ্কিম কি আসলে সাম্প্রদায়িক লেখক ছিলেন?"
বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে নানান কন্ট্রোভার্সি আছে। কারো মতে তিনিই সর্বাধিক প্রভাবশালী বাঙালি লেখক আবার কারো মতে তিনি একেবারে যাচ্ছেতাই, সাম্প্রদায়িক একজন লেখক। এই থিমের উপর ভিত্তি করেই আহমদ ছফার নাতিদীর্ঘ এই রচনাটি। নানান রচনা এবং প্রবন্ধ পাঠ করে আহমদ ছফা তাঁর নিজের মতামতটি বেশ গুছিয়ে লিপিবদ্ধ করেছেন এই বইয়ে। এক অর্থে বঙ্কিমচন্দ্রকে জাতিভেদের ভিত্তিতে দেশভাগের এক সুপ্রাচীন পথিকৃৎ বলা যেতে পারে। তাঁর সাহিত্যও সময়ের সাথে সাথে বেশ পরিবর্তিত হয়েছে এবং শেষদিকে তাঁর মধ্যে হিন্দু জাত্যাভিমানটাই বড় হয়ে উঠেছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের পাশাপাশি অল্প পরিসরে রবীন্দ্রনাথ, মীর মোশাররফ হোসেন, দীনেশচন্দ্র সেন আলোচিত হয়েছেন৷ আহমদ ছফার লেখা নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই। সবমিলিয়ে আবারো একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং মননশীল পাঠ করে ঋদ্ধ হলাম।
মৌলভী আহমদ ছফার 'যদ্যপি আমার গুরু' বইটি পড়ে লেখকের বইয়ের প্রেমে পড়ে যাই।এর পর 'গাভি বৃত্তান্ত' পড়ি। এর পর এই বইটি।বইটিতে শুধু বঙ্কিমকে নিয়ে আলোচনা করা হয়নি। রবি,শরৎচন্দ্র সম্পর্কে অল্প বিস্তর বলা হয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'আনন্দমঠ'উপন্যাসটি পড়ে প্রচুর পরিমান রাগ হয়েছিল তার উপর। সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক লেখা ছিল বইটিতে এবং মুসলমানদেরকে বেদম হারে গালিগালাজ দেয়া হয়েছিল উপন্যাসটিতে। বলা হয়েছিল মুসলমানদেরকে এ দেশ থেকে তাড়াতে হবে। তা নাহলে হিন্দুদের ধর্ম রক্ষা হবে না।তখন বঙ্কিমের উপর রাগ কমানোর জন্য তার বিরুদ্ধে লিখা'ইতিহাসের নিরিখে নজরুল রবিন্দ্র চরিত'. বইটি কিনি। বইটি পড়ে রাগ কিছুটা কমে। কিন্তু মনে মনে বঙ্কিমকে গ্রহন করতে পারি নি।
বঙ্কিমকে নিয়ে সমালোচনামুলক আর একটা বই এইটা।
প্রিয় কিছু লাইন তুলে ধরা হলঃ ০১."একটি রচনা পাঠ করার পর আমার চমক ভাঙ্গে । শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মুসলমান ছাত্রদের সম্পর্কে আলাপ করতে গিয়ে জোড়হাত করে একটা আবেদন রেখেছেন, 'বাবারা বঙ্কিমের বইয়ের পাতায় তোমরা যেভাবে 'শালা বঙ্কিম' লিখো,,দোহায় বাবারা আমার বইতে সেরকম কিছু কিছু যেন না লেখ।"
০২."খুব সম্ভবত কৃষ্ণ চরিত্র রূপায়ণে হযরত মুহাম্মদ এর জীবন চরিত্র বঙ্কিমকে অনেকখানি সহায়তা করেছে। বঙ্কিম যে হযরত মুহাম্মদ সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান রাখতেন তার ধর্মতত্ত্বের একটি বাক্যের মধ্যে তার প্রমাণ মিলে। বঙ্কিম তার পর্যায়লোচনা এক জায়গায় বলেছেন হিন্দুরা যদি আমার কথাগুলো মনোযোগ সহকারে শুনে এবং অনুসরণ করে মোহাম্মদের সময় আরব জাতি এবং ক্রমওয়েলের সম্য ইংরেজ জাতি যে শক্তির অধিকারী হয়েছিল হিন্দুরাও জাতি হিসেবে সেরকম শক্তির অধিকারী হয়ে উঠবে। কথাগুলো নিজের জীবনে প্রকাশ করলাম।"
০৩."শ্রী ভগবত গীতার আধ্যাত্মিক অর্থ যাই হোক না কেন ব্যবহারিক অর্থ এই দাঁড়ায় যে জন্মগতভাবে কিছু মানুষ উৎকৃষ্ট কিছু মানুষ অপকৃষ্ট এবং অপকৃষ্ট কর্তব্য হলো উৎকৃষ্ট মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করা।"
এক্সসিলেন্ট থিংকিং। বঙ্কিমের উপন্যাস থেকে বর্তমান উপমহাদেশের রাজনীতির এক চেইন রিয়াকশন। বইটির সবথেকে চমকপ্রদ তথ্য হলো বঙ্কিমের উপন্যাসের কৃষ্ণ চরিত্রের বর্ণ্না, যেটা কিনা আসল কৃষ্ণের সাথে মিলে না।ছফার পর্যবেক্ষণে, বঙ্কিমের চরিত্রের বর্ণনায় যে অতিরিক্ত অংশ পাওয়া যায় ,সেটিও আরেকটি লেবেলিং এর মধ্যে ফেলে দেয়। তাহলে বিদ্যাসাগরের বহুবিবাহ কিংবা রাজা রামমহনের সতীদাহ সংস্করন, ছফার সেই একই ইকুয়েশনের মধ্যে পড়ে কিনা?.... ১টা স্টার কম দেওয়ার কারন মুলত ,লেখকের শেষোক্ত সমাধান অনেকটাই বেখাপ্পা ... Looking for the absolute Solution.
বাঙ্গালী মুসলমান পাঠক বঙ্কিমের বইয়ে নোট হিসেবে কেন গালাগাল করে থাকে, তাঁর একটা সমাধান খোঁজার বড় প্রচেষ্টা বইটার অনেকগুলো পৃষ্ঠা অধিকার করে নিয়েছে। আর অল্পে ব্যাপারটি সাড়া যেত। অবশ্য সেক্ষেত্রে বঙ্কিমকে এত ভালভাবে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যে কিনা সন্দেহ। প্রশ্নটির সমাধানে পড়তে হবে বইটি। বঙ্কিমকে এই বইয়ে দেখানো হয়েছে একটি হিন্দু রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে। হিন্দু মানস জাগিয়ে তোলায় সফল একজন প্রবাদ পুরুষ হিসেবে ধীরে ধীরে উম্মোচিত হয়েছেন তিনি। বয়সকালে আধুনিক বঙ্কিম একজন ধর্মানুরাগি ব্যাকটিতে পরিণত হয়েছিলেন। যার প্রভাব খুব বেশি সুললিত হয়নি। বাঙ্গালী মুসলমানের গাত্রদাহের কারণ হয়ছিল বৈকি! সেই সমাধানে আহমদ ছফা, বঙ্কিম ও তাঁর পরের সাহিত্যিকদের পর্যালোচনা করেছেন বইটির শেষ দিকে। যাদের মধ্যে একমাত্র রবীন্দ্রনাথ কলি থেকে ফুল পর্যন্ত যেতে পেরেছিলেন। অন্যেরা কলিতেই ঝড়ে গেছেন। ফুল হয়ে ওঠার জন্য লেখক সময় দেননি বা সময় পাননি। সুপাঠ্য বই। এক বসায় পড়ে উঠতে হলে প্রবন্ধ হিসেবে ঘেমে উঠতে হয় না। পড়তে পারেন।