দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য ও ওলে তালাবি সম্পাদিত সমসাময়িক আফ্রিকান স্পেকুলেটিভ ফিকশন গল্পের সংকলন। আগামী রাত্রির উপাখ্যান এর পর আফ্রিকান স্পেকুলেটিভ ফিকশন নিয়ে দ্বিতীয় বই।
WOLE TALABI is an engineer, writer, and editor from Nigeria. He is the author of the novel SHIGIDI AND THE BRASS HEAD OF OBALUFON (DAW books/Gollancz, 2023). His short fiction has appeared in places like Asimov’s Science Fiction, Lightspeed Magazine, Tor.com and is collected in CONVERGENCE PROBLEMS (DAW books, 2024) and INCOMPLETE SOLUTIONS (Luna Press, 2019). He has been a finalist for the Hugo, Nebula, Locus and Nommo awards, as well as the Caine Prize for African Writing. He has edited five anthologies including a 2-volume translation anthology in Bengali, AFRICANFUTURISM (Brittlepaper, 2020) and the forthcoming MOTHERSOUND: THE SAUÚTIVERSE ANTHOLOGY (Android Press, 2023). He likes scuba diving, elegant equations, and oddly shaped things. He currently lives and works in Malaysia. Find him at wtalabi.wordpress.com and at @wtalabi on Twitter, Instagram, Bluesky and Tiktok.
আফ্রিকা বলতে প্রথমেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে নানান রকমের বুনো জন্তুজানোয়ারে ঠাসা জঙ্গলাকীর্ণ এক আদিম মহাদেশের ছবি। এই মহাদেশের মানুষদের গায়ের চামড়ার রং কালো। সেই কোন অনাদিকাল থেকে এই মহাদেশ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের শোষকদের লোভের শিকার হয়ে আসছে। নতুন গোলার্ধ আবিষ্কারের পর এই মহাদেশই সেখানে ক্রীতদাসের যোগান দিয়ে এসেছে। দ্বিতীয় বিশযুদ্ধ স্বাধীনতা নিয়ে এলেও, যুদ্ধ পরবর্তী পঞ্চাশ বছরে প্রায় কোনো অর্থনৈতিক উন্নতির মুখ দেখে নি এই মহাদেশ, শোষণের রূপ বদল হয়েছে মাত্র। সঙ্গত কারণেই আফ্রিকা তাই এখনো সারা পৃথিবীর কাছে দারিদ্যের প্রতীক। বাঙালির সাথে এই আফ্রিকার সম্পর্কটি কিন্তু একটু জটিল। শিক্ষিত বাঙালি রবীন্দ্রনাথের “আফ্রিকা” আবৃত্তি করতে ভালোবাসে। বিভূতিভূষণের শঙ্করের মতন কল্পনায় সে আফ্রিকার জঙ্গলে জঙ্গলে অভিযাত্রী হয়ে হীরার খনির সন্ধানে ঘোরাফেরা করে দিয়েগো আলভারেজের সঙ্গে। আবার কখনো বা আফ্রিকার কালো মানুষদের একের পর এক দূরপাল্লার দৌড়ের বিজয়ে সমস্ত রকমের অবিচার আর দারিদ্রের সাথে লড়বার অনুপ্রেরণা খুঁজে পায়। তবু সহানুভূতি থাকলেও, বাঙালি কিন্তু এই আফ্রিকাকে নিজেদের চেয়ে বেশি হতভাগ্য মনে করতে ভালোবাসে। নিজেদের অর্থনৈতিক এবং মানসিক দারিদ্রের জন্য হয়তো এই মনে করার পিছনে এক ধরণের নিষ্ঠুর অনুকম্পাও কাজ করে। বিগত পঁচিশ তিরিশ বছরে বদলে গেছে অনেক কিছু। পৃথিবী বদলেছে, আমরা বদলেছি আর সাথে সাথে বদলেছে আফ্রিকাও। গ্লোবালাইজেশনের ফলে সারা পৃথিবী এখন অনেক কাছাকাছি এসেছে। ইন্টারনেটের দৌলতে জ্ঞানের এক নতুন জানলা খুলে গেছে সারা পৃথিবীর সামনে। চীন বা ভারতের মতন না হলেও, আফ্রিকার অনেক দেশই আজ অর্থনৈতিক উন্নতির মুখ দেখেছে অনেকটা। এই উন্নতির ফলে প্রায় সারা আফ্রিকা জুড়ে উঠে এসেছে একটি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী। এই শ্রেণী শুধু শারীরিক শক্তিসমৃদ্ধ খেলাধুলোয় নয়, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতি এবং অন্যান্য নানান বিষয়ে নিজেদের ক্রমাগত উন্নততর করে তুলছে। আফ্রিকার এই দিকটি, বিশেষ করে সাহিত্যের দিকটি, বাঙালির কাছে প্রায় অজানা বললেই চলে। সাহিত্যের জগতে আফ্রিকান স্পেকুলেটিভ ফিকশন এখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তোলপাড় করছে। আফ্রিকার অনেকগুলি নামকরা ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়ে চলেছে একের পর এক ভালো ভালো গল্প। টিম জয়ঢাককে বাঙালির একটি বড় ধন্যবাদ জানানো দরকার বর্তমান আফ্রিকান সংস্কৃতির একটি বিশেষ দিককে অনুবাদের মাধ্যমে বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে পরিচিত করে দেবার জন্য। প্রথমেই বলে রাখি আমি নিজেও এই অনুবাদ টিমের সাথে যুক্ত। তাই যা লিখছি সেটাকে আত্মপ্রচার মনে হওয়া খুব স্বাভাবিক। বিশ্বাস করুন, আমার ব্যক্তিগত অবদান এই কাজটিতে নিতান্তই অল্প। দুটি খণ্ডের বিশাল কাজ। তার মধ্যে কেবলমাত্র একটি গল্প অনুবাদ করলে পুরো কাজটির কতটুকুকে আর নিজের বলে দাবি করা যায়? কাজটির কৃতিত্ব তাই সম্পূর্ণভাবে জয়ঢাকের যারা এই গল্পগুলি প্রথম পড়েছেন, অনুবাদ করার কথা ভেবেছেন এবং সম্পাদনা করার মতন একটি বিশাল দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। দুটি খণ্ডই সাড়ে তিনশ পৃষ্ঠার উপরে। প্রথম খণ্ডের নাম “আগামী রাত্রির উপাখ্যান” আর দ্বিতীয় খণ্ডের নাম “আলো আঁধারের উপাখ্যান”। স্পেকুলেটিভ ফিকশনে আফ্রিকান লেখকদের অনেক ভালো গল্প থাকলেও সবগুলিকে এই দুই খণ্ডেও ধরা সম্ভব হয় নি। বেছে বেছে প্রায় কুড়িটি গল্পের ঠাঁই হয়েছে এই দুটি খণ্ডে। এই দুই খণ্ডেরই একেকটি গল্প একেকটি রত্নখনি। অনেক গল্পই কর্পোরেট দস্যুদের বিরুদ্ধে আফ্রিকার সাধারণ মানুষদের লড়াইয়ের প্রতীকী কাহিনী। এর কোনো গল্পে পরিবেশদূষণে ভারাক্রান্ত পৃথিবীতে শ্বাস নেবার অক্সিজেনকে পণ্য করে কর্পোরেট দস্যুরা। ক্যান্সারে আক্রান্ত প্রিয়ার প্রাণ বাঁচানোর জন্য পয়সা জোগাড় করতে নিজের প্রাণ পণ করে প্রাণঘাতী এক লড়াইয়ে প্রতিপক্ষকে খুন করতে বাধ্য হয় নায়ক। কোনো গল্পে কেমিক্যাল ফ্যাক্টরিতে ঘটে যাওয়া এক দুর্ঘটনায় সারা শহরে ছড়িয়ে যায় বিষ। প্রথমে শহর ছেড়ে পালাতে গেলেও, পরে এক অদ্ভুত নিস্পৃহতা গ্রাস করে গল্পের নায়িকাকে। কোন গল্পে আবার জাদুবাস্তবের ছোঁয়া। কাগজ দিয়ে আকাশে-ওড়া দেবদূত বানানোর এক অলৌকিক আত্মক্ষয়ী খেলায় মাতে স্কুলের দুটি শিশু। সাফল্য আসে, কিন্তু কতটা দাম দিতে হয় এই খেলায়, শিল্পের চরম স্তরে নিজেদের নিয়ে যেতে? প্রায় সব গল্পেই নাটকের সিনারির মতন নিঃশব্দ উপস্থিতি থাকে আফ্রিকার, তার রক্ত ঝরানো যন্ত্রণার, তার মিথের, তার গানের, আর থাকে সবকিছু ছাপিয়ে, সব যন্ত্রণা অতিক্রম করে তার বেঁচে থাকার প্রয়াস। বেশি বলবো না। বাকিটা না হয় নিজে পড়েই জানলেন। দুই খণ্ড মিলিয়ে প্রায় বারোশ’ টাকা দাম – শপিং মলের ঝাঁ চকচকে দোকানগুলিতে বিক্রি হওয়া একটা প্যান্ট বা একটা শার্টের চেয়েও কম! একটা ভালো প্যান্ট বা শার্ট হয়তো আমাদের দেহকে একটা আবরণ দেয় – দু’ খণ্ডের এই সংকলনের গল্পগুলি কিন্তু আপনার অজান্তেই আপনার চোখের উপরের একটি আবরণকে সরিয়ে দেবে, কারণ পড়ার শেষে আপনি আফ্রিকাকে সম্পূর্ণ নতুন চোখে দেখবেন।