এত এত সম্পর্ক আমাদের, তবু কেন কেউ কেউ এমন গভীর নিঃসঙ্গতায় ভোগে? কেন কিছু মানুষ জীবনের নানা কোলাহল আর আনন্দের বিবিধ উপকরণ থেকে চোখ ফিরিয়ে খুঁজে বেড়ায় অলৌকিক সুর-ছন্দ-বর্ণ-শব্দ-গন্ধ? কেন সবার মধ্যে থেকেও কেউ কেউ আলাদা হয়ে যায়? এই উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র কায়সারও হয়তো সেই ধরনেরই মানুষ। সে তো জানেই, বিবিধ সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে জীবন কাটে আমাদের। এর কিছু প্রকৃতিপ্রদত্ত আর কিছু স্বনির্মিত। এই সম্পর্ক যেমন মানুষের সঙ্গে মানুষের, তেমনি মানুষের সঙ্গে তার পরিপার্শ্বেরও। প্রকৃতির নানা উপাদান বা উপকরণ, এমনকি জড়বস্তুর সঙ্গেও নানাভাবে সম্পর্কিত হয় মানুষ, আর নিজের অজান্তেই এসব সম্পর্ক বহন করে বেড়ায় জীবনভর। এতকিছু জেনেও সে কেন কোথাও নিজেকে মেলাতে পারে না? এ উপন্যাসে এ ধরনের কিছু মানুষকে তুলে এনেছে গভীর মমতা আর ভালোবাসা দিয়ে আর গল্প বলার ফাঁকে ফাঁকেই ক্রমশ উন্মোচিত হয়েছে জীবন ও জগতের অনেক অচেনা অঞ্চল, আবিষ্কৃত হয়েছে নিসর্গজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিবিধ সুর-ছন্দ-বর্ণ-গন্ধ-শব্দ দিয়ে তৈরি এক অদ্ভুত জাদুময়তার জগৎ। তবে এটুকু বললে এ উপন্যাস সম্পর্কে আসলে কিছুই বলা হয় না। নিছক একটি গল্প বলেই শেষ হয়নি এটি, বরং আখ্যান বর্ণনার প্রচলিত ধরন থেকে বেরিয়ে এসে এই উপন্যাসে লেখক উপহার দিয়েছেন এক অভিনব আঙ্গিক, মুছে ফেলেছেন ফিকশন-ননফিকশনের ভেদরেখা। এ ধরনের আঙ্গিক বাংলা উপন্যাসে আর কখনো দেখা যায় না।
আহমাদ মোস্তফা কামালের জন্ম মানিকগঞ্জে। তার বাবার নাম মুহাম্মদ আহমাদুল হক এবং মায়ের নাম মেহেরুন্নেসা আহমেদ। পাঁচ ভাই এবং তিন বোনের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ। মানিকগঞ্জের পাটগ্রাম অনাথ বন্ধু সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৮৬ সালে এসএসসি, ১৯৮৮ সালে ঢাকার নটরডেম কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন আহমাদ মোস্তফা কামাল। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৯২ সালে স্নাতক, ১৯৯৩ সালে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তিনি। ২০০৩ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে এম ফিল এবং ২০১০ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। পেশাগত জীবনের শুরু থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। বর্তমানে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন তিনি।
লেখালেখির শুরু '৯০ দশকের গোড়া থেকেই। প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘দ্বিতীয় মানুষ’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৮ সালে, এরপর আরো ছ’টি গল্পগ্রন্থ, ছ’টি উপন্যাস ও চারটি প্রবন্ধগ্রন্থ বেরিয়েছে। তাঁর চতুর্থ গল্পগ্রন্থ ‘ঘরভরতি মানুষ অথবা নৈঃশব্দ্য’ ২০০৭ সালে লাভ করেছে মর্যাদাপূর্ণ ‘প্রথম আলো বর্ষসেরা বই’ পুরস্কার, দ্বিতীয় উপন্যাস ‘অন্ধ জাদুকর’ ভূষিত হয়েছে ‘এইচএসবিসি-কালি ও কলম পুরস্কার ২০০৯’-এ, তাঁর তৃতীয় উপন্যাস ‘কান্নাপর্ব’ ২০১২ সালের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে লাভ করেছে ‘জেমকন সাহিত্য পুরস্কার ২০১৩’।
ছোটগল্পকার হিসেবে প্রিয় হলেও ঔপন্যাসিক আহমাদ মোস্তফা কামালের ভক্ত নই কোনোকালেই। তার উপন্যাসে নির্দিষ্ট কোনো অভিষ্ট বা লক্ষ্য থাকে (যে কোনো ঔপন্যাসিকেরই থাকে)।সমস্যা হয় তখন যখন লেখক সেই অভিষ্টে যে কোনো উপায়ে পৌঁছতে চান এবং তার চরিত্রদের স্বাধীনভাবে বিকশিত হওয়ার কোনো সুযোগ দেন না। লেখকের প্রায় সবগুলো উপন্যাস পড়ে ফেললেও "অন্ধ জাদুকর " পড়লাম সবার শেষে এবং এই প্রথম তার কোনো উপন্যাস সত্যিকার অর্থে ভালো লাগলো (হৃদয় স্পর্শ করলো, মন উদাস করলো, মুখে এক চিলতে হাসি এনে দিলো, দীর্ঘশ্বাসে বুকটা ভার করে দিলো।)
তবে বইটা আদৌ উপন্যাস কি না সন্দেহ আছে।কিছুটা আত্মজীবনী, কিছুটা কল্পনা, কিছুটা প্রিয় লেখক ও লেখার স্মৃতি মিলে "অন্ধ জাদুকর" অসাধারণ সাহিত্যকর্ম হিসেবে উদ্ভাসিত হয়েছে এটাই বিবেচ্য বিষয়। লেখার মূলে আছেন এক লেখক, তার পরিবার, প্রেমপর্ব, তার প্রিয় লেখক মাহমুদুল হক ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, তার জীবনদর্শন, লেখক হিসেবে নিজের অবস্থান, লিখতে পারার বা না পারার কারণ, সঙ্গ নিঃসঙ্গতা, সম্পর্ক বা সম্পর্কহীনতার দায়ভার, সম্পর্ককে নির্দিষ্ট ছকে চিহ্নিত করার বিপদ আর আছে লেখকের জলের মতো সরল কিন্তু হেমন্তের ঘোরলাগা মায়াবী জ্যোৎস্নার মতো হৃদয় স্নাত করা গদ্য। পড়া শেষে এক অদ্ভুত ভালোলাগা ও আবেশে মন ভরে যায়।
আহমাদ মোস্তফা কামালের নিজ জীবনের কিছু অংশের স্মৃতিচারণ মনে হইল "অন্ধ জাদুকর" বইটাকে। অন্ধ জাদুকর নামটি গল্পকথকের নিজ বোনের দেয়া। কেননা সাহিত্যিক বা কথাশিল্পীরা সৃষ্টির পর তা নিয়ে তার পাঠকের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে অনেকাংশেই অন্ধ।
হবু লেখক হবার ইচ্ছে পোষণকারী যেকোন লেখকের কাছেই বইখানা দুর্দান্ত লাগবে কেননা তাতে উঠে এসেছে উদীয়মান লেখক হিসাবে প্রথমদিকের জনপ্রিয়তা, পরিস্থিতির চাপে লেখালেখিতে ব্যাঘাত এবং তা নিয়ে হতাশাটুকু। আধুনিক যুগে লেখকের ও তার পরিপ্বার্শের মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ে পোস্টমর্টেম করেছেন লেখক।
বইয়ে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, মাহমুদুল হক ওরফে বটু ভাইয়ের কথা এসেছে। মাহমুদুল হকের অংশটুকু দুর্দান্ত লেগেছে। বইটিকে পরিপূর্ণতা দেয়ার ব্যাপারে যার জুড়ি নাই। আহমাদ মোস্তফা কামালের বঙ্গদেশে ফ্যানের তালিকা করলে আমি খুব সম্ভবত উপরের দিকে থাকব। জয়তু কামাল সাহেব।
সাধারণত আমি খুব বিখ্যাত এবং মোটামুটি পুরোনো লেখক না হলে এবং পুরান আমলের ক্লাসিক না হলে একেবারে নিজে থেকে কোন তুলনামূলক নতুন লেখকের ফিকশন কিনি না। কারো থেকে ভালোমন্দ শুনে হয়ত কখনো কখনো কেনা হয়। কিন্তু একেবারে বই বা লেখক সম্পর্কে কিছুই না জেনে কখনো কোন ফিকশন লেখকের উপন্যাস কিনেছি বলে খুব একটা মনে পরে না। এবারের বইমেলায় প্রথমবারের মত এই এক্সপেরিমেন্টটা করার চেষ্টা করেছি। তার মধ্যে একটা বই ছিল এই অন্ধ জাদুকর। লেখকের নাম আগে অল্পবিস্তর শুনে থাকলেও তার লেখনীর ধরন, তার বই বা তার কোন কিছু নিয়েই তেমন কিছু জানতাম না। কিন্তু বইটা পড়ে একটা মোহে জড়ায়ে গেসি।
বেশি কিছু লিখব না। তবে এটুকু বলতে পারি এধরনের বই আগে খুব একটা পড়িনি। ব্যাপারটা লেখকের লেখনির না। ব্যাপারটা আঙ্গিকের। বইয়ের ফ্ল্যাপে লেখা ছিল এ বই ফিকশন আর নন ফিকশনের সংমিশ্রনে লেখা। একটা ফিকশনাল চরিত্রের ভিতর দিয়ে লেখক আমাদের ঘুরিয়ে আনেন মানব সম্পর্কের কানাগলি। তার চরিত্রের সাথে পথ চলতে চলতে জীবন্ত হয়ে ওঠেন বাংলা গদ্য সাহিত্যের দুই মহীরুহ আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আর মাহমুদুল হক। উপন্যাসের প্রধান চরিত্রই যখন একজন লেখক তখন সেখানে লেখকের দ্বান্দ্বিক জীবনের পটভূমি আমাদের সামনে চলে আসে।
যে লেখক তার লেখনীতে দৃষ্টিসীমাকে নানা ভাবে এড়িয়ে অন্যজীবনের গল্প শোনায়, সে নিজে কি তার জীবন থেকে পালিয়ে যেতে পারে শেষমেশ? না, পারেনা। তাই সে হয়ে ওঠে জাদুকর, অন্ধ জাদুকর। যে কিনা পাঠককে বাস্তবতা থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে নিজেই আর নিজের সম্মুখপানে দেখতে পায় না। নিজের আবেশ যখন ছিড়ে যেতে চায় তখন লেখকের চেয়ে শূন্যতা, রিক্ততা আর অবসাদগ্রস্ততা বোধহয় আর কেউ অনুভব করে না!
গুডরিডসের পাচতারা রেটিঙে একে ঠিক কত রেটিং দেয়া যায় তা বুঝতে পারতেসি না। উপন্যাস শেষ করে কেমন যেন হাহাকার থেকে যায়! শেষ পাতায় এসে আর আগাতে ইচ্ছে হয় না, শেষ লাইনটুকু আর পড়তে ইচ্ছে হয় না!
আহমাদ মোস্তফা কামালের লেখাগুলো প্রবলভাবে তার আত্মজীবন প্রভাবিত৷ ব্যাপারটার ভালো এবং খারাপ উভয় দিকই আছে। ভালোর মধ্যে গল্পটাকে অনুভব করা যায়, কাছের মনে হয়। তাই কেউ যদি লেখকের অন্যকিছু না পড়ে শুধু এই বই হাতে নেয় তবে ভালো লাগার সম্ভাবনা বেশ।
কিন্তু, সমস্যাটাও আসলে ওখানেই তৈরি হয়। একটা মানুষের জীবনে বলার মতো অসংখ্য গল্প থাকেনা। তাই গল্প ফুরিয়ে এলে সে একই গল্প বারবার বলে। এই পুনরাবৃত্তিটা বিরক্তির উদ্রেক করে। ইতোপূর্বে লেখকের ছোটগল্প এবং মুক্তগদ্য মিলিয়ে কিছু বই পড়া হয়েছে৷ সেসব বইয়ের কথাগুলো হুবহু অবলীলায় ঢুকে পড়েছে এতে। এই ব্যাপারটা ঘটেছে বহুবার এবং আমি বিরক্ত হয়েছি৷
এমনিতে উপন্যাস হিসেবে এটা ভিন্নধর্মী লেখা। আদৌ কতোটুকু উপন্যাস তা নিয়েও চাইলে তর্ক করা যায়৷ বইতে প্রায়ই প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে উপলব্ধির কথা উঠে এসেছে, তার ফলে চরিত্রগুলোর চেয়ে ঘটনাগুলোই আলাদা করে মূখ্য হয়ে উঠেছে। মূল চরিত্র কায়সারকে লেখক সাজিয়েছেন অনেকটা নিজেরই আদলে। লেখক হতে চেয়েও ভিন্ন জীবন বেছে নেয়া, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কর্মকাণ্ড কিংবা ছোটোবেলার গল্পগুলোর সাথে লেখকের নিজের জীবনের মিল প্রচুর। তবে দিনশেষে যেটা জরুরি তা হচ্ছে পড়তে ভালো লাগা এবং সেখানে "অন্ধ জাদুকর" সফল।
(ধ্রুব এষ অসংখ্য বাজে প্রচ্ছদ করেছেন। এই বইয়ের প্রচ্ছদও তন্মধ্যে একটা। না আছে লেখা বা প্লটের সাথে কোনো মিল, না আলাদা করে কোনো সৌন্দর্য। কেউ প্রচ্ছদের দাবি করল আর ইচ্ছামত একটা মেরে দিলাম এমন!)
পড়ার মাঝে বেশ কয়েকবার বিষণ্ণ হয়ে গেছি। তখন বইটাকে পাশে রেখে চোখ বন্ধ করে রেখেছি। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র একজন লেখক। তারই জীবনের যাবতীয় সম্পর্কের টানাপোড়েন, জীবনজুড়ে ছড়িয়ে থাকা নিত্য জটিলতা মিলেমিশে আছে পুরো বই জুড়ে। গল্পের খাতিরে বইয়ে আছেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, মাহমুদুল হকও। সবমিলিয়ে এক ঘোর লাগা অনুভূতি নিয়ে শেষ করলাম।
আমি খুবই নিম্ন শ্রেণীর পাঠক। খুব বেশি গুরুগম্ভীর বই আমার পড়া হয় না। একটানে শেষ করে ফেলা যায় এমন বই পড়া হয় সবচেয়ে বেশি। কিন্তু এই বই আমি কয়েক পাতা করে পড়ার পর বিরতি নিয়েছি, নিজেকে কায়সারের জায়গায় বসিয়ে চিন্তা করেছি, তার দৃষ্টিভংগি বুঝার চেষ্টা করেছি। অনেক কিছু বুঝতে পারি নাই। এত কিছু বুঝার জন্য যেই চিন্তনশক্তি দরকার তা হয়ত আমার এখনো হয়ে উঠে নাই। কিন্তু অনেকদিন পর কোন একটা বই পড়ে আমি ভাবতে শুরু করেছি। এটাই হয়ত আমার জন্য সবচেয়ে বড় পাওয়া
বেশ ভালো একটা বই৷ বিশেষত মাঝ থেকে শেষ পর্যন্ত। অনেকটা আত্মজৈবনিক মনে হলো। অন্তত মাহমুদুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এদের সাথে উপন্যাসের মূল চরিত্রের ব্যক্তিগত সম্পর্ক গুলো যে খোদ লেখকের সাথেই ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিবরণ, তা তো আমাদের জানা।
তিনটা উপন্যাস পড়লাম আহমাদ মোস্তফা কামালের। প্রতিটাতেই শেকড়ে ফেরার তীব্র আকাঙ্খা, শৈশবের প্রতি প্রগাঢ় মমতা।
অদ্ভুত ধরনের একটা বই। বিষয়বস্তু খুবই সাধারণ, মানব সম্পর্ক। সম্পর্ক কি, মানুষ কেন সম্পর্ক গড়ে তোলে, মানুষ ছাড়াও পরিবেশের সাথে মানুষের সম্পর্কের স্বরূপ কেমন এইসব আরকি।
বিষয়বস্তু সাধারণ হলেও লেখক যে আঙ্গিকে বইটা লিখেছেন আর যে ভাষা ব্যবহার করেছেন তা খুবই অসাধারণ। শুরুতেই যেমনটা লেখক বলেছিলেন যে তিনি ফিকশন আর নন-ফিকশনের ভেদরেখা মুছে ফেলতে চান, সেটা তিনি দক্ষতার সাথেই করেছেন। কায়সার বা আদিত্যর গল্প শুনতে শুনতে যখন আমরা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বা মাহমুদুল হকের সম্পর্ক ও মৃত্যু নিয়ে বিস্তারিত ধারণা শুনি তখন এটা ভেবে অবাকই হতে হয় যে উপন্যাসে ইনারা কি করছেন! কিন্তু পরক্ষণেই কায়সারের সম্পর্ক নিয়ে উপন্যাস লেখার চেষ্টার কথা মনে পড়লে মনে হয় ইনারা তো থাকবেনই। এভাবে লেখক কল্পনার কায়সার আর বাস্তবের মাহমুদুল হকদের একবিন্দুতে মিলিয়েছেন।
কায়সারের সাথে তার বাবা-মায়ের সম্পর্ক, বোন কাজলের সম্পর্ক, মৃন্ময়ী আর বীথির সাথে সম্পর্ক ইত্যাদি নানা সম্পর্ককে সামনে এনে লেখক দেখিয়েছেন কেন মানুষ সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং সাথে এটাও দেখিয়েছেন হাজারও সম্পর্কের মধ্যে থেকেও মানুষ কিভাবে একাই রয়ে যায়।
আঙ্গিকগত দিক থেকে নিরীক্ষা , অদ্ভুত মায়াময় এক ভাষারীতির প্রয়োগ, খুবই চেনা অথচ অচেনা একটা বিষয়বস্তু আর পুরো বইজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এক বিষণ্ণতা ও দুঃখবোধ – এই মিলিয়ে বইটা ভীষণ উপভোগ্য। লেখককে প্রথমবার পড়লাম কিন্তু এটা যে শেষবার হচ্ছে না সেটা তিনি তাঁর লেখনী দিয়েই নিশ্চিত করেছেন।
মানুষের মনে অনেক রকম দুঃখ হয়। একরকম দুঃখ আছে,যেটা মানুষকে দুঃখবিলাসের আনন্দ দেয়। মানুষ এক চলচ্চিত্র বার বার দেখে,এক বই বার বার পড়ে দুঃখ পায়। দুঃখ পেয়ে কাঁদে । কেঁদে আনন্দ পায়। এ তাদের দুঃখ আনন্দ মেশানো কান্না। দুঃখের জন্য কান্না। দুঃখকে অনুভব করতে পারার আনন্দ।
আমার মনে অন্য পৃথিবীর এক দুঃখের জন্ম হয়েছে মুস্তফা কামালের 'অন্ধ জাদুকর' পড়ার পর। বইটা পড়ার পর যে ভয়াবহ বিষাদের অনুভূতি আমার পৃথিবী নীল করে রেখেছে। এই বিষাদ চোখে কান্না আনে না,কান্নাকাটিকে সিরিয়াস ধরনের ফাইজলামি মনে হয়। এই বিষাদ নিয়ে দুঃখবিলাস করা যায় না,সে এতো সস্তা না । উপন্যাসে কায়সারের 'লেখক' না হতে পারার কষ্ট, মৃন্ময়ী-বিথিকে না পাওয়ার কষ্ট,বোন কাজলকে হারানোর কষ্ট, এই শহরে কায়সার নিজেকে অনাকাঙ্ক্ষিত বহিরাগত মনে করার কষ্ট আপনাকে বিষন্ন করেই ছাড়বে। ভালো উপন্যাস; একটুও সময়ের অপচয় মনে হবে না।