প্রিয় কথাসাহিত্যিক মাহমুদুল হক একবার বলেছিলেন, বাংলা কথাসাহিত্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে অতিক্রম করা প্রায় অসম্ভব। মাহমুদুল হক নিজে একজন সংবেদী লেখক এবং মানুষ ও তার জীবনের গভীরতর অবগুণ্ঠনের ভাষ্যকার ছিলেন বলেই হয়তো পূর্বসূরি মানিক সম্পর্কে একদম অকপটে এমন বলতে পেরেছিলেন। 'অহিংসা' উপন্যাস পড়ে আবারো বুঝতে পারলাম কতোখানি বাস্তব এবং সৎ মূল্যায়ন ছিল এটি।
মানুষের অন্তর্লোকের এতো গভীরে পৌঁছে গিয়েছিলেন মানিক এবং একজন নিপুণ শিল্পীর ক্রমাগত সফল চেষ্টা দিয়ে সেই পর্যবেক্ষণকে ভাষা দিয়েও তুলে আনতে পেরেছেন যে, উপন্যাসে গল্পের ঘনঘটার আড়ালে শুধু স্রষ্টা এবং সৃষ্টি একে অপরকে প্রতি লাইনে আরেকটু বেশি জীবন্ত করে দিচ্ছে, সেদিকেই ঝোঁক ছিল পুরোটা।
যুক্তির শৃঙ্খলা দিয়ে হয়তো উপন্যাসের কিছু কিছু ঘটনাকে মেলানো যাবে না। বরং, সদানন্দ, বিপিন, মাধবীলতা, মহেশ এদের কোন কোন কর্মকাণ্ড অতি আকস্মিক, লেখক আরোপিত, নাটকীয় মনে হতে পারে। কিন্তু, তাদের অন্তর্বাস্তবতায় লেখক নানা জটিল পথ পরিভ্রমণ করেছেন, তাদের মুখোমুখি তাদের নিজেদেরই দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। এত কুটিল, এত বৈচিত্র্যময় মানবমনের রহস্য উদঘাটনই ছিল মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরাধ্য। অবশ্য কোন উদ্দেশ্য ছিল না, পরিণতি দেওয়ার তাড়াও, শুধু বাস্তবতার গতিশীলতার ভেতরেই বিরাজমান নৈরাজ্য, কখনো পশ্চাৎবেগ, কখনো সম্ভাব্য ধারাবাহিকতাকে নস্যাৎ করে দেওয়া নতুন সম্ভাবনা, সবকিছুকে মানিক অনুসরণ করে গেছেন, যদিও এগিয়ে দিয়েছেন নতুনতর যাত্রায়।
উপন্যাসের নাম 'অহিংসা' সম্পর্কে লেখকের নিজস্ব মত ছিল এরকম যে, কোনরূপ আদর্শ না নীতির বশবর্তী না হয়েও অহিংসাকে মানুষ অজ্ঞাতসারেই অপরাপর গুণাবলির মতো নিজের ভেতরে প্রতিপালন করে এবং এই অহিংসাই তাকে নিজ চরিত্রের অন্যান্য দিকগুলোর সাথে অদ্ভুত মিথষ্ক্রিয়া ঘটায়।
যদিও, কখনো মনে হয় 'অহিংসা'র মানুষগুলো শোচনীয়ভাবে অদৃশ্য কোন নিয়তিতাড়িত, কিন্তু নিয়তির নির্মম আখ্যান রচনা মানিক করেন নি, মানুষের বৈচিত্র্যময় মানসলোক সম্ভবত নতুন করে আরেকবার নিজেই ভ্রমণ করতে চেয়েছিলেন।
সমালোচকদের মধ্যে কেউ কেউ এই উপন্যাসকে বলেছেন অহেতুক জটিলতায় আক্রান্ত, লক্ষ্য। আবার কেউ বলেছেন, আশ্রমের সমূহ ভণ্ডামি পাঠকের কাছে তুলে ধরার জন্যই মানিক 'অহিংসা' রচনা করেছেন। যৌনতার অভিযোগবাহী সমালোচনাও বিদ্ধ করেছে।
কিন্তু এই উপন্যাস পাঠ, কোন পাঠককে রিপুতাড়িত করে না। যৌনতা এখানে বিচ্ছিন্ন কোন ব্যাপার নয়। সমগ্রতার সাথে প্রাসঙ্গিক হিসেবেই এসেছে। এমনকি, মাধবীর সাথে সদানন্দের কয়েকটি মুহূর্তে মানিকের বাক সংযম এটাই প্রমাণ করে যে, উপন্যাসের জন্য পরবর্তী লাইনটিই তিনি লিখতে চান। যৌনতার মোড়কে এই উপন্যাস আচ্ছন্ন নয়। মানিকের অন্যান্য রচনার সাথে যারা পরিচিত, এই উপন্যাসের জটিলতাও মেনে নিয়েই এগোবেন। আবার, নিছক ভণ্ডামির মুখোশ উন্মোচনই যদি লক্ষ্য হবে তবে, আশ্রম প্রধান সন্দানন্দের ভেতরে অন্যান্য স্বাভাবিক মানবীয় আচরণগুলি উদঘাটনে মানিক এতোটা মনোযোগী হতেন না।
এই আন্তরিকতার কারণে এবং পূর্বারোপিত কোন উদ্দেশ্যে জর্জরিত না হওয়ায় 'অহিংসা' যেন অহিংসুকের মতোই নিজস্ব গতিতে এগিয়েছে। কখনো নমনীয় ভঙ্গিতে, কখনো কঠিনতম অনমনীয়তায়, কিন্তু সব সময়ই সাবলীল জীবনবোধের পথে।