Jump to ratings and reviews
Rate this book

সঙ্গ নিঃসঙ্গতা রবীন্দ্রনাথ

Rate this book
কবি বুদ্ধদেব বসুর আশ্চর্য গদ্যে জব্দ হয় হৃদয়, চমকে ওঠে মেধা। ‘সঙ্গ: নিঃসঙ্গতা রবীন্দ্রনাথ’, তারই উজ্জ্বল উদাহরণ। দুটি পর্বে বিভক্ত এই গ্রন্থ। ‘সঙ্গ ও নিঃসঙ্গতা’ পর্বে কোনও এক নিঃসঙ্গতার প্রহরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক প্রবন্ধের পরেই আছে হেমন্তের প্রকৃতির কথা, যাকে বুদ্ধদেব দেখেছেন ‘ম্লানায়মান, ক্ষয়িষ্ণু, বিষণ্ণ কিন্তু সুন্দর’ রূপে। অভিনব অনুভবের পাশে এরপর তিনি ছুঁয়েছেন আধুনিক কবিতা, বরিস পাস্টেরনাক, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, রাজশেখর বসু, শিশিরকুমার ভাদুড়ী প্রসঙ্গ।দ্বিতীয় পর্ব ‘রবীন্দ্রনাথ’। রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধ, গদ্যশিল্প, পদ্য, রচনাশৈলী কিংবা সমাজচিন্তা—বিবিধ বিষয় নানা বিচিত্রতায় রূপ পেয়েছে তাঁর বৌদ্ধিক গদ্যে। সিগনেট প্রেস প্রকাশিত বুদ্ধদেব বসুর এই গ্রন্থটি ভাবে চিরন্তন, প্রভাবে গভীর।

228 pages, Hardcover

First published January 1, 1963

2 people are currently reading
52 people want to read

About the author

Buddhadeva Bose

105 books122 followers
Buddhadeva Bose (also spelt Buddhadeb Bosu) (Bengali: বুদ্ধদেব বসু ) was a major Bengali writer of the 20th century. Frequently referred to as a poet, he was a versatile writer who wrote novels, short stories, plays and essays in addition to poetry. He was an influential critic and editor of his time. He is recognized as one of the five poets who moved to introduce modernity into Bengali poetry. It has been said that since Tagore, perhaps, there has been no greater talent in Bengali literature. His wife Protiva Bose was also a writer.

Buddhadeva Bose received the Sahitya Akademi Award in 1967 for his verse play Tapaswi O Tarangini, received the Rabindra Puraskar in 1974 for Swagato Biday(poetry) and was honoured with a Padma Bhushan in 1970.

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
5 (33%)
4 stars
6 (40%)
3 stars
4 (26%)
2 stars
0 (0%)
1 star
0 (0%)
Displaying 1 - 5 of 5 reviews
Profile Image for Harun Ahmed.
1,668 reviews433 followers
December 8, 2023
বুদ্ধদেব বসু'র প্রবন্ধ আমি "পড়ি" না বলে "গিলি" বলাই শ্রেয়। "সঙ্গ নিঃসঙ্গতা রবীন্দ্রনাথ" বইতে কিছু ফরমায়েশি লেখা আছে কিন্তু লেখকটি বুদ্ধদেব বসু; তার স্বভাবসুলভ অন্তর্দৃষ্টি আর সরলভাবে নিজের বক্তব্য ফুটিয়ে তোলার অসীম দক্ষতার কারণে দারুণ সময় কেটেছে বই পড়তে গিয়ে। সবচেয়ে ভালো লেগেছে "হেমন্ত" আর "পাস্টেরনাক প্রসঙ্গে" প্রবন্ধ দুটি। পরের প্রবন্ধটি পাস্টেরনাককে নিয়ে লেখা কিন্তু বুদ্ধদেব দস্তয়েভস্কিকে আলোচনায় নিয়ে এসে তার রচনাশৈলীর গূঢ় মর্মার্থ এতো অল্প কথায় ফুটিয়ে তুলেছেন যে আমি বিমোহিত-

'অমুক ব্যক্তি খারাপ'—এই উক্তির মধ্যেই অন্য একটি কথা প্রচ্ছন্ন থাকে—'আমি কিন্তু ভালো'; অন্যকে উন্মাদ বা অপরাধী বলে ঘোষণা ক'রে নিজেদের আমরা প্রকৃতিস্থ বা সাধু জেনে নিশ্চিন্ত হই: এই আত্মপ্রসাদের জন্যই নিন্দা অথবা পরচর্চা মানুষের পক্ষে অন্তহীনরূপে তৃপ্তিকর, এবং আইনকানুন ও সামাজিক বিধান— যার সাহায্যে অঙ্ক ক’ষে ‘অপরাধ’ নির্ণয় করা যায়— নিতান্ত প্রয়োজনীয়। এবং এই আত্মপ্রসাদ ধ্বংস ক'রে দিয়ে ডস্টয়েভস্কি জাগিয়ে তোলেন আত্মজিজ্ঞাসা; এক বিস্ফোরক মুহূর্তে আমরা উপলব্ধি করি যে আমরা, সাংসারিক ভালোমানুষের দল, আমরাও পাপী অথচ নিজেদের সাধু ব’লে জেনেছি, কিন্তু ডস্টয়েভস্কির পাপীরা নিজেদের পাপী ব'লেই জানে, তা জানে ব'লেই পুণ্যের জন্য আকাঙ্ক্ষা তাদের জ্বলন্ত, এবং সেই হিশেবে তারা আমাদের চাইতে উন্নত মানুষ, চৈতন্যে উন্নত, এবং চৈতন্য মানেই আধ্যাত্মিকতা।


বইয়ের "রবীন্দ্রনাথ" অংশটি "সঙ্গ নিঃসঙ্গতা" অংশের তুলনায় কিঞ্চিৎ ম্লান। এ অংশে রবীন্দ্র সাহিত্যের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য, বিশেষত উপন্যাস, নাটক এবং সামগ্রিক গদ্যের নির্মাণকৌশল ও মূল প্রবণতা শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে বিশেষ পারদর্শিতা দেখিয়েছেন লেখক। যেমন-

কাল্পনিক চরিত্রের মুখে চরিত্রশোভন ভাষা বসাতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ অনেক সময়ই ব্যর্থ হয়েছেন, নাটকরচনায় এইটেই তাঁর বিঘ্ন ছিলো; ‘ডাকঘরে' ক্ষুদ্র আয়তনের মধ্যে তা প্রকট হয়নি, কিন্তু ‘রাজা’ থেকে ‘রক্তকরবী” পর্যন্ত যেখানেই আছে জনতা বা প্রাকৃতজন সেখানেই তাদের কথা শুনে আমাদের সন্দেহ হয় যে এদের কোনো নিজস্ব সত্তা নেই, এরা কর্তার হাতের ক্রীড়নক মাত্র। বস্তুত, রবীন্দ্রনাথের গদ্য সবচেয়ে প্রামাণিক ও স্বচ্ছন্দ হ’য়ে ওঠে, যখন তিনি নিজের জবানিতে কথা বলতে পারেন; তাই তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনার মধ্যে অবশ্যমান্য তাঁর ‘গল্পগুচ্ছ’, তাঁর উপন্যাসের বর্ণনার অংশ, এবং তাঁর প্রবন্ধ পর্যায়, চিঠিপত্র ও আত্মজৈবনিক রচনাবলি।


কবি বুদ্ধদেব বসু আমার প্রিয়, প্রাবন্ধিক বুদ্ধদেব বসু প্রিয়তর। এবছর একটানা তার প্রবন্ধ পড়ে সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহই নেই।
Profile Image for Shotabdi.
820 reviews203 followers
September 30, 2024
৩.৫/৫
বুদ্ধদেব বসুর প্রবন্ধ আমার খুব পছন্দের। এইটাও অনেক তথ্যসমৃদ্ধ। তবুও অন্যান্য বইয়ের তুলনায় একটু কম ভালো লাগল যেন।
Profile Image for Kripasindhu  Joy.
547 reviews
February 12, 2025
বুদ্ধদেব বসুর প্রবন্ধ লেখার হাত দুর্দান্ত। এত যত্ন করে লেখা যে উপভোগ না করে পারা যায় না।
এই বইয়ে রবীন্দ্রনাথের সাথে সংশ্লিষ্ট নয় এমন কিছু লেখা আছে। এদের মধ্যে রুশ লেখক বরিস পাস্তেরনাক-কে নিয়ে যে প্রবন্ধটি সেটিই সবচেয়ে ভাল লেগেছে।
Profile Image for Sujan.
106 reviews42 followers
April 26, 2017
বইটি দুই ভাগে বিভক্ত; প্রথম ভাগের বিষয় বিভিন্ন, দ্বিতীয় ভাগে কেবল রবীন্দ্রনাথ। বুদ্ধদেবের শাণিত মণীষা এবং একই সাথে ক্রিয়ারত অসাধারণ কাব্যিক সংবেদনশীলতা, যার যুগপৎ সম্মিলনকে মনে হয় তার প্রবন্ধের মৌল চারিত্র, তার নিদর্শন এই বইটিতেও যথেষ্ট পেয়েছি। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তার বেশ ক'টি আলোচনা এতটাই আলোকোজ্বল যে যার কবিতা পড়ার শখ বা প্রণোদনা কখনোই হয়ে ওঠেনি, সেই রবীন্দ্রনাথের কবিতাসাগরে নিমজ্জন করার এক প্রবল দুর্দম ইচ্ছেও এই বইটি পড়তে পড়তে হঠাতই পেয়ে বসলো।

রবীন্দ্রনাথের অমানুষিক ঋষিসুলভশিল্পিতা হয়তো তার পক্ষে অতিক্রম করা সম্ভব হয়নি; তবে সম্ভবত যেহেতু তিনি সময় এবং অনুভবের দিক থেকে আমাদের অনেক কাছের, সেহেতু বুদ্ধদেবের হৃদয়ের কথাকে মনে হয় আমার হৃদয়েরই এক অনুচ্চারিত প্রতিধ্বনি। রবীন্দ্র প্রবন্ধ পড়ার পর মনে হয় যেন এক সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের নীচুভূমিতে বসে শুনছি তার অমোঘ নির্দেশ; আর, বুদ্ধদেবকে মনে হয় আমার পাশে বসা ঘনিষ্ট স্বজন, যাকে লোকে বলে আত্মার আত্মীয়।
Profile Image for Preetam Chatterjee.
6,901 reviews370 followers
August 7, 2025
বাইশে শ্রাবনের লেখা : ২২ শ্রাবন, ১৪৩২

বুদ্ধদেব বসুর লেখা এক অভিজ্ঞতা—যা পাঠকের চিন্তাভাবনাকে কেবল আলোড়িতই করে না, তাকে প্রায় কাব্যিকভাবে আলোড়নের গভীরে টেনে নিয়ে যায়। তাঁর প্রবন্ধের ভাষা যেন কোনও অনবদ্য রচনার হাত ধরে ধরা পড়ে—যেখানে যুক্তি ও আবেগ, বিশ্লেষণ ও অনুভব, মস্তিষ্ক ও হৃদয় একসঙ্গে কথা বলে। তিনি কাগজে লেখেন, আর শব্দেরা যেন জলরঙে ধোয়া কোনো ছবির মতো পাতায় পাতায় ছড়িয়ে পড়ে। সেই রকমই এক উজ্জ্বল শিল্পরূপ তাঁর ১৯৬৩ সালের প্রকাশিত গ্রন্থ ‘সঙ্গ: নিঃসঙ্গতা রবীন্দ্রনাথ’—যেখানে বুদ্ধদেব শুধু লেখেন না, অনুভব করেন, খুঁটিয়ে দেখেন এবং স্মৃতির রঙে রাঙিয়ে দেন পাঠকের মননকে।

এই বই নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রবন্ধশৈলী আর স্মৃতিরেখা—দুটো ধারাকেই আলাদা করে দেখা যায় না। কেননা, রবীন্দ্রনাথ এখানে কেবল বিশ্লেষণের বিষয় নন, তিনি বুদ্ধদেবের কাছে একান্ত, প্রাত্যহিক, একধরনের অন্তর্লোকের বাসিন্দা। এক সাক্ষাতে কবিকে তিনি দেখেছিলেন দক্ষিণের ঢাকা বারান্দায়—গায়ে সাদা জামা, পাশে থালাভরা বেলফুল, শরীরের আগুনরঙ একটু ফ্যাকাশে হলেও চোখে তখনও দীপ্তি। ঘণ্টাখানেক কথোপকথনের সেই মুহূর্তকে বুদ্ধদেব মনে রেখেছিলেন গভীর শ্রদ্ধা আর বিস্ময়ে—রবীন্দ্র-কথন যেন তাঁর কাছে এক “গীতিনিঃস্বন ইন্দ্রধনু।” এমন সাক্ষাৎ কেবল মনকে সমৃদ্ধ করে না, জীবনকে সম্পূর্ণ করে।

এই সংবেদনশীল সংলাপ, এই পারস্পরিক বোঝাপড়া—এই সবকিছুই পরে প্রতিফলিত হয় তাঁর প্রবন্ধগুচ্ছে, বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে লেখা অংশে। লেখকের কাছে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন বিশ্লেষণের নয়, উপলব্ধির বিষয়। আর সেই উপলব্ধি এতটাই ঘনিষ্ঠ যে অনেক সময় পাঠক বিভ্রমে পড়ে যান—এটি কি প্রবন্ধ, না স্মৃতিচারণ? সাহিত্যিক পাণ্ডিত্যের সঙ্গে মিশে থাকে এক গভীর ব্যক্তিগত ব্যথা ও মুগ্ধতা।

এই অনুভূতির চূড়ান্ত মুহূর্ত এসেছিল ১৩৪৮ সালের ২২ শ্রাবণ। রবীন্দ্রনাথ প্রয়াত হয়েছেন। কলকাতা স্তব্ধ, কিন্তু তারই মধ্যে ঘটছে অন্য এক বাস্তব। বুদ্ধদেব বসু নিজের উপন্যাস তিথিডোর-এ বর্ণনা করেছেন সেই দিন, সেই মুহূর্ত—যেখানে মিশে রয়েছে শোক, শ্রদ্ধা, আর বিস্ময়ের পাশাপাশি একধরনের অসহায় ক্ষোভ। কবির নিথর দেহ ঘরে, পা দু’টি দৃশ্যমান, আর এক ‘কবিতাপ্রয়াসী’ তরুণ কবিকে বলতে শোনা গেল, “আমার বিয়ের পরে এক বছর কাটেনি, আমি মড়া ছোঁবো না— কিছু মনে করলেন না তো?” বুদ্ধদেব বিস্মিত, আহত, এবং সম্ভবত এই মুহূর্তেই বুঝে যান—সবাই যে রবীন্দ্রনাথকে ‘পেয়েছে’, তা নয়। আর যারা পেয়েছে, তারা কেবল তাঁকে বিশ্লেষণ করে না, বুকে টেনে নেয়।

এই অভিমান, এই অনুরাগ, এমনকি এই ক্ষোভ—সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছে বুদ্ধদেব বসুর রবীন্দ্র-চিন্তার জগৎ। তাই ‘সঙ্গ: নিঃসঙ্গতা রবীন্দ্রনাথ’ নামটি কেবল এক শৈল্পিক চয়ন নয়; এটি সেই দ্বৈত অনুভবের প্রতিফলন, যা রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে বুদ্ধদেবের মনে যুগপৎ আশ্রয় ও অভাব তৈরি করেছে। পাঠকের জন্য এই বই তখন শুধু প্রবন্ধসংকলন নয়, এক আভ্যন্তরীণ নৈবেদ্য।

প্রায় পাঁচ দশক পর যখন সিগনেট প্রেস এই বইটি নতুন সংস্করণে প্রকাশ করে, তখন এক নতুন প্রজন্মের পাঠক হাতে পান এমন এক গদ্যভুবন, যা অনেকের জন্য ছিল অনাস্বাদিত। যাঁরা বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পড়েছেন কিন্তু গদ্যের সঙ্গে তেমন পরিচিত নন, তাঁদের জন্য এই বই হয়ে ওঠে এক বিস্ময়ের চাবিকাঠি। আর যাঁরা তাঁর প্রবন্ধ ‘গিলে’ খেতে ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য এই সংকলন একটি অমূল্য ধন।

‘সঙ্গ: নিঃসঙ্গতা রবীন্দ্রনাথ’ তাই কেবলমাত্র গদ্যের দীপ্তি নয়, এটি সাহিত্যিক অনুরাগ, অভিমান, আত্মসমীক্ষা ও প্রণয়ের এক সংহত প্রকাশ। বুদ্ধদেব বসুর কলমে রবীন্দ্রনাথ শুধুই এক কবি নন—তিনি এক অনুভব, এক চেতনা, এক গোপন আলো, যাকে দেখা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায় প্রতিটি শব্দের ফাঁকে।

এই গ্রন্থকে এককথায় বলা যায়—প্রবন্ধের ছায়ায় আত্মজিজ্ঞাসার অন্তঃস্বর। বইটি মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগে ‘সঙ্গ ও নিঃসঙ্গতা’ নামে রচনাসংকলন, দ্বিতীয় ভাগে ‘রবীন্দ্রনাথ’ কে কেন্দ্র করে আটটি রচনার সমাহার। প্রথম অংশে রয়েছে লেখকের একাকিত্ববোধ, ঋতুচিন্তা, আধুনিক কবিতার ধারা, এবং পাশ্চাত্যের বরিস পাস্তেরনাক ও বাংলার সুধীন্দ্রনাথ দত্তকে ঘিরে সুচিন্তিত প্রবন্ধসমূহ। দ্বিতীয় অংশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গদ্য, কবিতা ও চিন্তাধারার বহুস্তরীয় বিশ্লেষণ।

প্রথম পর্বে ‘সঙ্গ ও নিঃসঙ্গতা’ প্রবন্ধটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ—মহীশূরে একটি কর্মসূত্রে তিন মাসের একাকিত্বকালের স্মৃতি এই রচনার ভেতর দিয়ে চূড়ান্ত ভাবে প্রকাশ পায়। তারপরে ‘হেমন্ত’ প্রবন্ধে বুদ্ধদেব বসু হেমন্তকালকে দেখেন এক ম্লান, ক্ষয়িষ্ণু কিন্তু পরমভাবে নান্দনিক অবয়বে—এক অর্থে এটি তাঁর অনুভবের এক রঙীন রূপকথা। এরপরে তিনি প্রবেশ করেন আরও গভীর আলোচনায়—আধুনিক কবিতায় প্রকৃতির ভূমিকা, যেখানে চেতনা বনাম বস্তুজগৎ নিয়ে তাঁর পরিচিত এক বিতর্ক গড়ে ওঠে। এই লেখার এক প্রান্তে আবু সয়ীদ আইয়ুবের সঙ্গে মতবিরোধের সম্ভাবনাও পরবর্তীকালে তৈরি হয়, বিশেষ করে ‘আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধের সূত্র ধরে।

পাশাপাশি রয়েছে বরিস পাস্তেরনাক ও সুধীন্দ্রনাথ দত্তকে নিয়ে বিশদ আলোচনা। পাস্তেরনাকের প্রসঙ্গে দস্তয়েভস্কিকে টেনে এনে লেখক মানুষের আত্মপ্রসাদের ধ্বংস এবং আত্মজিজ্ঞাসার উন্মোচন প্রসঙ্গে দার্শনিক বীক্ষা তৈরি করেন। “অন্যকে পাপী বলে আমরা নিজেদের সাধু মনে করি”—এই সাধারণ প্রবণতাকে চ্যালেঞ্জ করে লেখক দেখান, দস্তয়েভস্কির চরিত্রেরা নিজেদের পাপ স্বীকার করে বলেই পুণ্যের আকাঙ্ক্ষায় মহৎ হয়ে ওঠে। এই বিশ্লেষণ শুধু পাস্তেরনাকের সাহিত্য নয়, পাঠকের আত্মজিজ্ঞাসাও ঘনীভূত করে।

সুধীন্দ্রনাথ দত্তকে নিয়ে লেখা দুটি প্রবন্ধ যথাক্রমে একটি শোকগাথা এবং কাব্যসংগ্রহের ভূমিকা। সেখানে লেখকের অন্তরের আবেগ ও কবি-বান্ধবের স্মৃতিচারণ একইসঙ্গে উপস্থিত। এখানে জীবনানন্দ ও সুধীন্দ্রনাথকে দুই বিপরীত মেরুর আধুনিক কবিতার ‘অর্ধদেবতা’ রূপে কল্পনা করে তিনি বাংলা কাব্যধারার এক চিত্ররূপ আঁকেন।

এই পর্বে আরও দুটি প্রয়াণলেখ গুরুত্বপূর্ণ—রাজশেখর বসু ও শিশিরকুমার ভাদুড়ীকে নিয়ে। একজন সাহিত্যের সুবর্ণমধ্যমের প্রতিভূ, অন্যজন নাট্যকলার উত্থান-পতনের যাত্রিক। রাজশেখরের গদ্য অনুবাদ ‘মেঘদূত’ লেখককে অনুপ্রাণিত করেছিল একই পথে; শিশিরকুমারের অভিনয়-দর্শন তাঁকে টেনেছিল নাট্যচর্চায়, যদিও তাঁর ‘রাবণ’ নাটক রূপায়িত হয়নি।

দ্বিতীয় পর্বে পাঠক প্রবেশ করেন এক বৃহৎ বৌদ্ধিক ভূগোলে—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আটটি প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের গদ্য, কবিতা, গান, নাটক ও সমাজচিন্তা সম্পর্কে বুদ্ধদেব বসুর বিশ্লেষণ রয়েছে একেবারে গভীরে। সবচেয়ে দীর্ঘ এবং অনুরণিত প্রবন্ধটি শুরুই হয় এক কবিত্বময় ঘোষণায়:
“রবীন্দ্রনাথ গদ্য লিখেছেন কবির মতো; তাঁর গদ্যের গুণ কবিতারই গুণ।”

এই একটি লাইন যেন সারগ্রাহী। রবীন্দ্রনাথের গদ্যের দেহে কবিতার আত্মা—এই প্রতিপাদ্য ধারণ করে লেখক দেখান কীভাবে তাঁর প্রবন্ধগুলি যুক্তিপরম্পরা নয়, বরং অনুভব-প্রসূত; কল্পনার আঁচড়ে চিত্রিত। মালার্মে-ভক্ত না হয়েও বুদ্ধদেব তাঁর ভাবনার অগ্রপথিক হিসেবে মালার্মে-র বক্তব্য উদ্ধৃত করেন—“গদ্য বলে কিছু নেই”—এই জিজ্ঞাসার জায়গা থেকেই। সুধীন্দ্রনাথ একসময় মন্তব্য করেছিলেন, বুদ্ধদেবের গদ্যই আসলে রবীন্দ্রনাথীয়—এই প্রেক্ষিত যেন তাঁর এই পর্যবেক্ষণের সম্পূর্ণতা।

তিনটি দীর্ঘ প্রবন্ধের মধ্যে একটি রবীন্দ্রসঙ্গীতের ছন্দ ও গদ্যনির্মাণ বিষয়ক, একটিতে রয়েছে ‘মানসী’ কাব্যগ্রন্থের বিশ্লেষণ, অন্যটিতে রবীন্দ্রনাথের কবিতায় বিশ্বত্ব ও বাঙালিত্বের দ্বন্দ্ব ও সমন্বয়। বিশেষত ‘মানসী’ নিয়ে তাঁর বক্তব্য অত্যন্ত সূক্ষ্মদর্শী। তিনি একে বলেন ‘বাংলা কবিতার স্বপ্নভঙ্গ’, যার মধ্যে ধরা পড়ে রবীন্দ্র-কবিতার পরিপক্বতা। বুদ্ধদেব যেন জয়েসীয় অর্থে এক ‘epiphany’ অনুধাবন করেন এখানে—যেখানে কবিতা আর জীবন একে অপরকে প্রতিফলিত করে।

‘বিশ্বকবি ও বাঙালি’ নামক প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের তুলনা তিনি করেন গ্যোটের সঙ্গে। দুজনেই জাতীয় ও বৈশ্বিক; দুজনের চিন্তাভাবনার পরিসর কেবল ভাষার সীমানায় থেমে যায় না। গ্যোটের ‘বিশ্বসাহিত্য’ ধারণাকে রবীন্দ্রনাথে বাস্তব রূপ নিতে দেখেন তিনি।

এই অংশে চারটি সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধের মধ্যেও এক গভীর অনুরণন রয়েছে। একটি রিভিউধর্মী, দুটি রেডিও বক্তৃতা ও একটি বহুচর্চিত বিতর্ক-প্রসূত রচনা—যার ভুল ব্যাখ্যায় বুদ্ধদেব বসুকে ‘রবীন্দ্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। এই বিতর্কের প্রেক্ষিতে যে প্রবন্ধটি উঠে এসেছে—‘রবীন্দ্রনাথের উপমা’—তা পাঠকের জন্য একটি উন্মোচন, রবীন্দ্র-চিন্তার শেষ আলো, যা আসলে এক নতুন সূর্যের আলো হয়ে দাঁড়ায়।

সব মিলিয়ে, বইটি যেন বাংলা প্রবন্ধসাহিত্যের এক কালজয়ী সুর। ভাব, ভাষা, বিশ্লেষণ আর কাব্যিক সৌন্দর্যের এক চমৎকার সংমিশ্রণ। প্রবন্ধগুলি কখনও আত্মদর্শনের, কখনও পর্যালোচনার, আবার কখনও গভীর আবেগের বহিঃপ্রকাশ। পাঠক যেন শুধু ‘পড়েন’ না, একরকমভাবে ‘সঙ্গী’ হয়ে ওঠেন লেখকের—সেই সঙ্গ যেখানে সত্তার গভীরে হেঁটে বেড়ানো যায়, নিঃসঙ্গতার দাহেও উষ্ণতা খোঁজা যায়।

তাই বলা যায়—‘সঙ্গ: নিঃসঙ্গতা রবীন্দ্রনাথ’ কেবল প্রবন্ধসংকলন নয়; এটি এক মননের যাত্রা, যেখানে রবীন্দ্রনাথ ও বুদ্ধদেব বসু মুখোমুখি বসে বাংলা ভাষার সবচেয়ে সূক্ষ্ম কথোপকথনে মেতে উঠেছেন।

অলমতি বিস্তরেণ।
Displaying 1 - 5 of 5 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.