ছলনা আর মিথ্যার আশ্রয়ে ইডিসের রাজতস্কর এবারে চুরি করে নিয়েছে অ্যাটোলিয়ার রাজসিংহাসন। রাজনৈতিক এই বিয়েতে রাজ্যের জনগণ মোটেও খুশি নয়। সিংহাসন দখলের স্বপ্ন ওদিকে হাতছাড়া হয়ে যাওয়া ক্ষিপ্ত ব্যারনরা। নতুন রাজাকে সরানোর জন্য তাই শুরু হয়েছে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র! এই ক্ষোভ থেকেই রাজকীয় সেনাবাহিনীর সাধারণ এক সৈনিক কস্টিস হঠাৎই অপমান করে বসলো নতুন রাজাকে। রাজদ্রোহের দায় মাথায় নিয়ে সেও জড়িয়ে পড়লো জটিল রাজনীতির জালে। চোখের সামনে যা ঘটে চলেছে, আদতে তার কতটুকু সত্যি, নাকি পেছনে লুকিয়ে রয়েছে আরো কোন রহস্য?
♨️অ্যা কন্সপিরেসি অভ কিংস
ইডিসের রানিকে বিয়ের প্রস্তাব দেবার অপরাধে নির্জন এক দ্বীপে নির্বাসিত সুনিসের যুবরাজ। এমনিতেও রাজ্য পরিচালনার চেয়ে কাব্যচর্চার দিকেই ঝোঁক বেশি তার। ওদিকে রাজ্যের আকাশে দেখা দিয়েছে বিদ্রোহের ঘনঘটা। ষড়যন্ত্রের বেড়াজাল ছিঁড়ে সে কি ফিরে পাবে তার অধিকার? আরেকদিকে মধ্যম সাগরের ওপার থেকে ক্ষুদ্রত্তর উপদ্বীপের রাজ্যগুলির দিকে ধেয়ে আসছে সাম্রাজ্যবাদী মিডিয়ানদের হুংকার।
Megan Whalen Turner is the author of short stories and novels for children, teenagers and adults. She has won the LA Times Book Award for Young Adult LIterature, a Boston Globe/ Horn Book Honor and a Newbery Honor. She won the Mythopoeic Award and was shortlisted twice for the Andre Norton Award.
কাহিনি সূত্র- রাজতস্কর ইউজেনিডিস হ্যামায়থিসের রত্ন চুরি অভিযানের পরে করে বসলেন জীবনের সেরা চুরি- অ্যাটোলিয়ার রানীকে চুরি। উত্তাল মাঝ দরিয়ায় নৌকায় রাজতস্কর জেনের হুমকির সামনে জীবনের চরম সিদ্ধান্ত নেন রানী অ্যাটোলিয়া। রানী অ্যাটোলিয়া ভাবছিলেন তার প্রজাদের নিয়ে। তিনি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন তার রাজ্যকে, তার রাজ্যের প্রজাদের। রানী ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি যে রাজতস্করকে তিনি গুপ্তচরবৃত্তির শাস্তিস্বরূপ হাত কেটে দিয়েছিলেন, সেই রানীকে বিয়ে করার জন্য এই মাঝ দরিয়া নিয়ে এসে রাজতস্কর জেন হুমকি দিতে পারেন! বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে জেনের সাথে আবদ্ধ হন রানী। আর এর মাঝেই হয়ে যায় ভবিষ্যত রাজার সাথে দেশের কল্যাণকামী রানীর চুক্তি।
রাজতস্করের রাজা হয়ে ওঠার কাহিনিঃ
অ্যাটোলিয়ার শহর আজ নির্ঘুম। পুরো শহরজুড়ে চলছে সুরা, গান, আর আনন্দের মোচ্ছব। রানীর বিয়ে বলে কথা! যদিও এ বিয়েকে পুরোপুরি ডিপ্লোমেটিক বিয়ে বলেই ধরে নেয় রাজ্যের ব্যারনরা। যে রানীর প্রস্তর কঠিন মুখে কেউ কোনোদিন হাসি দেখেনি, মুহুর্তের সিদ্ধান্তে যিনি শত্রুকে দিতে পারেন মৃত্যুদন্ডের আদেশ, বিয়ের রাত্রে স্বামীকে বিষ পানে হত্যা করতে পারেন, তিনি আর যাই হোক, প্রেমে পড়তে পারেন না। এ বিয়েতে কোনো ভালোবাসা নেই, এইটুকু মনে করে যেন তারা নির্ভাবনায় শান্তির নিঃশ্বাস ফেলে৷ শত্রুদেশের রাজতস্করের সাথে বিয়ে বলে কথা!
বিয়ের পরে ইউজেনিডিসের কাছে আনুগত্য স্বীকার করে নেন রানী আইরিন। ফলে, অ্যাটোলিয়া রাজ্যের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা জেনই। কিন্তু তার ব্যারন থেকে শুরু করে রাজ্যের সামান্য সেপাই পর্যন্ত কেউ রাজাকে রাজা হিসেবে মেনে নিতে পারেনি। জেন যে বহিরাগত! আর রাজ্যের সভায় রাজকীয় কাজের সিদ্ধান্তের ভার দিয়ে রেখেছেন রানীর কাছেই। রাজসভায় বসে পড়ে পড়ে ঘুমানো ব্যতীত কোনো কাজ খুঁজে পান না জেন। যখন একটা রাজ্যে রাজা নিষ্ক্রিয় থাকেন, রাজ্য তখন স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই অস্থিতিশীল হয়ে যায় সিংহাসনের দিকে মোহ নিয়ে বসে থাকা আমলাদের জন্য। আর তাই ব্যারনরা তলে তলে বিদ্রোহ আর বিরোধী পক্ষের শত্রুর সাথে হাত মিলিয়ে রাজদ্রোহ করা সময়ের ব্যাপার মাত্র। একটাই সমাধান রাজা জেন কে পূর্ণ রাজার দায়িত্ব পালন করা। কিন্তু তার পথে যে কাঁটা হয়ে আছে সকলেই। একমাত্র রানী ছাড়া কেউই তাকে মেনে নিতে পারেনি।
তাই, কুইন্স থিফ সিরিজের চতুর্থ বই ❝দ্য কিং অব অ্যাটোলিয়া❞ মূলত এই সিরিজের ম্যাট্রিক্স। এই বইয়ে জেন রাজা হয়ে ওঠেন। তবে, সেই পথ ছিল বন্ধুর।
❝আমাদের রানি কিছুতেই এই ফালতু লোকটাকে ভালোবাসেন না,❞ ❝ঠিকই বলেছে, পুরোটাই একটা সাজানো নাটক। নইলে আমাদের রানি কোন দুঃখে ইডিসের একটা চোরকে ভালোবাসতে যাবেন? তাও আবার চুরি করে তার সিংহাসন দখল করেছে, সেই রকম একজনকে। পাগল নাকি?❞
এই রকমই ভাবনা ছিল অ্যাটোলিয়ার সৈন্যদের মাঝে।
কিন্তু রাজা তো ইউজেনিডিস।। ইডিসের প্রাক্তন রাজ তস্কর। কাকে ভালোবাসা দিয়ে বশে আনা যায় আর কাকে হুমকি বা শাস্তি দিয়ে বশ করা যায়, এগুলো সবচেয়ে ভালো জানে জেনই।
অ্যাটোলিয়া - রাজ্যের সমস্ত মানুষের বিরোধিতা সত্ত্বেও জেনকেই স্বামী হিসেবে গ্রহণ করে। কিন্তু সমস্ত কঠোরতার মুখোশের নিচে সেই আইরিন কোথায়? মানুষ শুধু তার কঠোরতারই সমালোচনা করে এসেছে। জেনের সিংহাসনের প্রতি নিস্পৃহতায় ব্যারনদের যে অসন্তোষ ফুটে উঠছে, কি করে সামাল দেবে অ্যাটোলিয়া?
কস্টিস- সাধারন এক দেহরক্ষীর চোখে বর্নিত হয়েছে কাহিনি।আসলে যা দেখা যায়, পর্দার পেছনেও তো ঘটে চলেছে অনেক কিছু। আর পাঠকরা বুঝতে পারবে মূল চরিত্রদের উদ্দেশ্য, কিন্তু চরিত্ররা জানে না কিছুই। এই লুকোছাপার খেলা উপভোগ করবেন পাঠক
সিংহাসন ঘিরে থাকা এই পুরো জগতের বাসিন্দাদের মনঃবিশ্লেষণ করে কাহিনির যে পরত সাজিয়েছেন লেখক, তা অনবদ্য।
এ কন্সপিরেসি অব কিংস
কাহিনি সূত্র-
প্রথম বই ❝দ্য থিফ❞ এর ছোটো অকম্মা সুনিসের যুবরাজ সোফোস। রাজ্যের সিংহাসনের চেয়ে যার কাছে একটা কবিতা বেশি প্রিয়, যুদ্ধের সহিংসতায় যার চোখ অশ্রুসিক্ত হয়, সেই সোফোসকে ইডিসের রানীকে গোপনে বিয়ের প্রস্তাব পাঠানোর শাস্তি হিসেবে তাকে লেটনোস দ্বীপে নির্বাসন দেওয়া হয়। আর এর মধ্যেই সুনিসে শুরু হয় বিদ্রোহ, তার চাচা সুনিসরাজ সিংহাসনে বসে। মিডিয়ানরা সুযোগ খুঁজতে থাকে, কখন সুনিসকে করায়ত্ত করা যায়! সুনিসের ব্যারন ষড়যন্ত্র করে মিডিয়ানদের সাথে। পলায়নপর সোফোস হয়ে যায় নামহীন এক ক্রীতদাসে। সোফোসের পরিবারের ওপর নেমে আসে অবর্ননীয় দুর্ভোগ। মিডিয়ানদের ষড়যন্ত্রে ঘনিয়ে আসছে সুনিসের দুর্যোগের কাল। সোফোসের স্বদেশপ্রেম কি তাকে নিয়ে যেতে পারবে সকল বাধা অতিক্রম করে নিজের ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখতে? নাকি বেছে নেবেন ঝঞ্ঝাটহীন জীবন? যেখানে শুধু কবিতা পড়া যায়, আর নিজের মতো করে নিজের জীবন বাঁচা যায়?
সোফোসের ভাগ্যে কী আছে? জানতে হলে অবগাহন করতে হবে কুইন্স থিফের মায়াবী জগতে।
ভালো লাগাঃ দারুণ রেসিং গতিতে আগায় পুরো বইটি। বইয়ের প্রথম দিকে হিউমার, স্যাটায়ার থাকলেই গল্প যত আগায়, কাহিনি আরও জমে ওঠে। রাজনীতি, সমরনীতি, আর কুটচালে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে৷ তড়তড় করে পড়েছি বইটি। কোনো জনরা হিসেব না করে পড়লেও শুধুমাত্র কথাসাহিত্য হিসেবে পড়া যায় বইটি। কারণ এখানে যে ফ্যান্টাসি বলা আছে, তা একেবারেই কম মাত্রায়। ফ্যান্টাসির পরিচিত সব উপাদানও নেই এখানে। এখানে যা আছে, তা হলো, পরিপূর্ণ এক গল্প, যে গল্পে কোনো ফাঁকি নেই।
সমালোচনাঃ গল্পের কোথাও কোথাও ধীর গতি লাগতে পারে, যেখানে রাজনীতি, ডিপ্লোম্যাসির মারপ্যাঁচ আছে। কিন্তু এও গল্পের অংশ।
অনুবাদ সম্পর্কে:
❝আগুনের ফুলকির মতো মহারাজের চারপাশ ঘিরে নেচে চলেছেন তিনি। পুরো জগত যেন এই বৃত্তের মাঝে বন্দি। আর সেই বৃত্তের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে শুধু এক খামখেয়ালি রাজা। উদ্দাম নৃত্যের সাথে সাথে উড়ছে তার খোলা চুল, বাদ্যের তালে তালে দুলছে তার রক্তবর্ণের পোশাক। রাত বাড়ার সাথে সাথে বাদ্যের তালও আরো উদ্দাম হতে শুরু করেছে। দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছে নাচের লয়। বাজনার শেষ তালের সাথে সাথে ইউজেনিডিস স্ত্রীকে একবার কাছে টেনে নিলো, এরপরই ছেড়ে দিলো আবার। বাজনার সাথে সাথে নাচেরও এখানেই সমাপ্তি। গোছা গোছা কালো চুল এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে অ্যাটোলিয়ার মুখের উপরে। চুলগুলো একত্র করে ঘাড়ের উপর আলগা একটা খোঁপা বেঁধে নিলেন তিনি।❞
উপন্যাসের প্রিয় একটা দৃশ্য।
পুরো বইয়ে এমনই স্বাচ্ছন্দ্যময়, সাবলীল, অনবদ্য অনুবাদ করেছেন অনুবাদক ঝিলম বিশ্বাস। বইয়ে কোথাও কৃত্রিমতা নেই। নেই ইংরেজি শব্দ। অনুবাদক যথেষ্ট দক্ষতার সাথে শুদ্ধ ও প্রচলিত বাংলা শব্দের ব্যবহার করেছেন। তাই মৌলিকই মনে হয় পুরো গল্পকে। আর চমৎকার ভাষারীতিতে করা এই অনবদ্য অনুবাদ পড়লে মনে হয় যেন হারিয়ে গিয়েছি দূর দেশের মধ্যম সাগরীয় অ��্চলের সেই ফ্যান্টাসির দেশগুলোতে। আর এই চরিত্রগুলোর সাথে এমনভাবে সম্পৃক্ততা তৈরি হয়,, খুব কাছের মানুষ মনে হয়, আর পুরো গল্পকে চোখের সামনে দেখা যায়, আর সে কাজের কৃতিত্বের দাবিদার মূল লেখকের সাথে অনুবাদকেরও। তাই আলাদা করে অভিনন্দন প্রাপ্য অনুবাদকের। পূর্বের কুইন্স থিফ সিরিজের প্রথম বইয়ের মতো ঝরঝরে, প্রাঞ্জল, মিষ্টি অনুবাদ প্রতিনিধিত্বশীল চিরায়ত সাহিত্য হিসেবে টিকে রইবে এই অনেক অনেক বছর, আশা করছি। বেনজিন প্রকাশন কে ধন্যবাদ এরকম চমৎকার প্রডাকশনের জন্য। অসাধারণ প্রচ্ছদ করেছেন লর্ড জুলিয়ান, বইয়ের বাঁধাই, কাজ চমৎকার।
This entire review has been hidden because of spoilers.
বইয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং টুইস্টপূর্ণ অংশ ছিল "দ্য কিং অব অ্যাটোলিয়া" ইডিসের প্রাক্তন রাজতস্কর জেন অর্থাৎ ইউজেনিডিস'র সত্যিকার অর্থেই "ব্যাসিলিয়াস" বা জনগণের রাজা হয়ে উঠার চরম এক অগ্নি-পরীক্ষা এবং সে তা উতরে গেছে যদিও এই যাত্রা সহজ ছিল না। অ্যাটোলিয়া'র রাজা হয়েও সে পুরো দেশের মানুষের চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছিল, কেউ তাকে বিশ্বাস করেনি বা করতে চাইনি। জেন শুধুমাত্র তার ভালোবাসার মানুষ অ্যাটোলিয়া'র রাণী "আইরিন" কে পাওয়ার জন্য রাজা হওয়ার মতো এক কঠিন দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিল।
অ্যাটোলিয়া'র এক মনীষী'র ভাষায়...
"ইউজেনিডিস রাজা হওয়ার জন্য অ্যাটোলিয়া'কে বিয়ে
করতে চাইনি বরং অ্যাটোলিয়া'কে বিয়ে করার জন্য
রাজা হওয়ার এক কঠিন ভারী বোঝা গ্রহণ করেছে।"
এমন মুহূর্তে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে, ভালোবাসার জন্য মানুষ কত অকল্পনীয় বিষয়ের অবতারণা করে; বিনা দ্বিধায় নিজের প্রাণ দিতেও কার্পণ্য বোধ করে না, যার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বয়ং ইউজেনিডিস। যে নারী তার চিরশত্রু হওয়ার কথা সেই নারী'কে সে ভালোবেসেছিল, প্রেমে পরেছিল উভয়েই একে অপরের।
বইয়ের ৪র্থ খন্ড "এ কন্সপিরেসি অব কিংস" বইয়েও দেখা যায় জেন'র বন্ধু সোফোস'র শান্তিপ্রিয় বালকের না চাওয়া স্বত্বেও সুনিসরাজ হওয়ার দীর্ঘ কন্টকাকীর্ণ এক যাত্রা।