বাংলায় ইতিহাস-বিষয়ক প্রবন্ধাবলির সংকলন এখন নিতান্তই দুর্লভ। মাঝেমধ্যে যে-সব বই প্রকাশিত হয় তাদের প্রত্যেকটির পেছনে থাকে গৈরিক বা পেট্রোডলার-পুষ্ট নানা এজেন্ডাকে প্রতিষ্ঠা করার আপ্রাণ প্রয়াস। ফলে সারস্বত সাধনার অন্যান্য ধারার মতো ইতিহাস-চর্চার ক্ষেত্রটিতেও আমের বদলে মাকালদেরই রাজত্ব দেখা দিয়েছে। এই পটভূমিতে চল্লিশ বছর আগে প্রকাশিত বইটি পড়ে নতুন করে মুগ্ধ হলাম। একটি নির্ভার 'ভূমিকা'-র পর এতে আছে~ প্রথম ভাগ: সামাজিক ও গার্হস্থ্য জীবন— ১. সামাজিক ইতিহাসের চর্চা; ২. গোমিনীর কথা; ৩. নারীর গোত্রান্তর; ৪. দ্রাবিড় ব্রাহ্মণসমাজে কন্যাপণ প্রথা; ৫. আদিশূরের কাহিনি; ৬. কৌলীন্যপ্রথার উৎপত্তি; ৭. উড়িষ্যায় স্ত্রীরাজ্য; ৮. অম্বষ্ঠ জাতি; ৯. বিচারের ঘণ্টা; ১০. কয়েকটি বিচারের কাহিনি; ১১. সময় নিরূপণ; ১২. উপজাতীয় সংস্কৃতি। দ্বিতীয় ভাগ: আর্থিক অবস্থা ও শাসনব্যবস্থা— ১৩. গৌড়বাসীর সমুদ্রযাত্রা; ১৪. কাশ্মীরে দুর্ভিক্ষ; ১৫. কৃষিসংগ্রহ; ১৬. ডাকের বচন; ১৭. ভূমি-পরিমাণ; ১৮. পরিমাপ রীতি; ১৯. মুদ্রানীতির সমস্যা ২০. 'দণ্ডবিবেক' গ্রন্থে মুদ্রার কথা; ২১. গুপ্তরাজবংশের স্বর্ণমুদ্রা; ২২. ত্রিপুরারাজ্যের কয়েকটি মুদ্রা; ২৩. পয়সা; ২৪. স্ত্র্যধ্যক্ষ-মহামাত্র; ২৫. ঢক্কা; তৃতীয় ভাগ তথা পরিশিষ্ট— (১) পুরাতাত্ত্বিক গবেষণার অগ্রগতি; (২) অখণ্ড ভারত রাষ্ট্রের কল্পনা; (৩) রাজ্যশ্রীর বিবাহ। শেষে আছে প্রমাণপঞ্জি, গ্রন্থকার-পরিচিতি এবং নির্ঘণ্ট। পত্রপত্রিকার আহ্বানে লিখিত বলে এই লেখাগুলো কিছুটা সংক্ষিপ্ত আকারেই রচিত হয়েছিল। কিন্তু তথ্যনিষ্ঠা, প্রাসঙ্গিকতা এবং নিরপেক্ষতার দিক দিয়ে এরা যেকোনো আধুনিক ইতিহাস-চর্চাকারীর কাছে মডেল বলে সাব্যস্ত হতে পারে। ডক্টর সরকার বস্তুবাদী প্রমাণ— সে প্রত্নতাত্ত্বিক হোক বা লিখিত— ছাড়া আর কিছুর ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিতেন না। তাই বাংলার ইতিহাসের কালানুক্রম থেকে শুরু করে অন্য নানা বিষয়ে তিনি সবিনয়ে, অথচ দৃঢ়তার সঙ্গে পূর্বসূরিদের নানা দাবিকে নস্যাৎ করতে পেরেছিলেন। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গিটিই প্রয়োগ করে বাংলার ছাত্রছাত্রীদের কাছে তাদের দেশ তথা মাতৃভূমির প্রকৃত সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাস এক-না-একদিন তুলে ধরা হবে— এই আশাই রাখি। অসাধারণ বই। এখন পাবেন কি না জানি না। পেলে অবশ্যই পড়বেন।