এপার বাংলায় শিশু-কিশোর সাহিত্যের পাঠক মাত্রেই আনন্দমেলা, কিশোর ভারতী, শুকতারা এবং অন্যান্য পত্রিকায় প্রকাশিত গল্পের মাধ্যমে হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্তের আধুনিক, গতিময়, এবং বুদ্ধিদীপ্ত লেখার সঙ্গে পরিচিত| পরশপাথর প্রকাশনার সৌজন্যে আমরা এবার পেলাম তাঁর এক ঝাঁক রোমাঞ্চকর গল্প|
যেসব গল্প এই বই-এ আছে তারা হল: ১. মানুষ কুমির: শারদীয়া আনন্দমেলায় প্রকাশিত এই কল্পবিজ্ঞান-নির্ভর বড়োগল্পটি তার হিংস্রতা আর উত্তেজনা দিয়ে এই বই-এর সুর বেঁধে দেয়| তবে গল্পটা পড়ার পর কেমন যেন “শেষ হয়েও হইল না শেষ” অনুভূতিই হয়| লেখক কি আমাদের আর একবার নিয়ে যাবেন সুন্দরবনের ওই ভয়ঙ্কর সুন্দর পরিবেশে, গল্পটা সত্যিই শেষ করতে? ২. তেজকাৎলিপোকার পিরামিড: আজটেক আর মায়াদের রক্তিম ইতিহাসের সঙ্গে আমাদের পরিচয় সীমিত| কিন্তু এই রুদ্ধশ্বাস গল্পটি শেষ অবধি আমাদের ছুটিয়ে নিয়ে যায় কিংবদন্তী, কুসংস্কার, আর কল্পবিজ্ঞানের গা-ছমছমে মিশ্রণ দিয়ে| লেখক অবশ্য এই নিষিদ্ধ জগতে আবারও ফিরেছিলেন তাঁর “সূর্যমন্দিরের শেষ প্রহরী” উপন্যাসে (পারুল প্রকাশনী), তবে তার কথা আলাদাভাবে লেখা যাবে| ৩. নেকড়ের নিমন্ত্রণ: মানুষের লোভ আর রিরংসা দিয়ে রাঙানো দুটো লেখার পর বেশ একটা স্বাদ-বদলের অনুভূতি হয় এই গল্পটা পড়ে| ৪. রামেসিস রা-এর রক্তধারা: ছোটোগল্পের অতি সংক্ষিপ্ত পরিসরেও লেখক যে নিপুণতার সঙ্গে আমাদের উড়িয়ে নিয়ে গেছেন মিশরের রহস্যময় অতীতে তা পড়ার পর যদি কোন পাঠক লেখকের হাতে এই থিমের আরও পূর্নাঙ্গ চিত্রণের অভিলাষী হন, তবে তাঁকে আমি “রানি হাটশেপসুটের মমি” উপন্যাসটি (শিশু সাহিত্য সংসদ) পড়তে অনুরোধ করব| ৫. রেডিয়োর বন্ধু: কল্পবিজ্ঞান-নির্ভর এই ছোটো গল্পটা পড়ে নিলে মন ভালো হয়ে যাওয়া নিশ্চিত, তবে এই থিম নিয়েও আমরা এবার লেখকের কাছ থেকে একটা বিস্তৃততর উপন্যাস চাইতে পারি| ৬. হিরোহিতোর গবেষণা: “প্রফেসর শঙ্কু ও রোবু” গল্পের পাঠক মাত্রেই আন্দাজ করতে পারবেন এই গল্পের কী পরিণতি হতে চলেছে, তবে এতে হিংস্রতা বড়ো বেশি| ৭. দেবতার চাবি: কল্পবিজ্ঞানের এই গতিময়, তবে প্রেডিক্টেবল গল্পটি দিয়ে শেষ হয় এই সংকলন|
সামগ্রিকভাবে এটাই বলার যে এই সময়ের শিশু-কিশোর সাহিত্যের ধারাটিকে যাঁরা সজীব রেখেছেন তাঁদের অন্যতম এই লেখকের এক ঝাঁক গতিময় গল্প নামমাত্র মূল্যে সংগ্রহ করার এই সুযোগ হারাবেন না| পড়ুন ও পড়ান, প্লিজ|
এইসব বই শুধু প্রচারের অভাবে পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে না, হে পাঠকগণ এসব বই একবার হাতে নিয়ে দেখুন, ধরলে ছাড়তে পারবেন না।গতিময় এই গল্পগুলো পড়ে দেখুন অন্তত একবার, ছোটো গল্পও যে এত সুন্দর গোছানো হয় তবে বুঝবেন। রোমাঞ্চকর কিছু গল্প দিয়ে সাজানো এই বই।এখানের প্রত্যেকটা গল্পই ভালো,তবে এর মধ্যে আমার সবথেকে ভালো লেগেছে মানুষ কুমির, রামেসিস রা এর রক্তধারা, দেবতার চাবি । কি কি গল্প আছে এতে ?
১)মানুষ কুমির : কল্পবিজ্ঞান নির্ভর এই গল্পটি এই বইএর সবচেয়ে বড় গল্প।গল্পের চরিত্র দুটি - প্রোফেসর নীলকান্ত সোম ও তার আশ্রয়ে পালিত সন্দীপ। প্রোফেসর একজন জীববিজ্ঞানী। গবেষণার জন্য তিনি গিয়ে হাজির হন সুন্দরবনের চামটা দ্বীপে,যেখানে আসল অর্থে "জলে কুমির ডাঙায় বাঘ" থাকে, আবিষ্কার করেন এক কৌশল যার মাধ্যমে এক প্রাণীকে আরেক প্রাণীতে রূপান্তরিত করা যায়। এরপর ?
২)তেজকাৎলিপোকার পিরামিড : প্রোফেসর জুয়ান ও দীপঙ্কর সেন মেক্সিকো সিটি হয়ে পিরামিড নগরী তিওতিহুকান যায় ঐতিহাসিক দ্রষ্টব্য পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে। কিন্তু সেখানে গিয়ে তারা এক দুর্লভ অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়। জড়িয়ে পড়ে তেজকাৎলিপোকা মন্দিরের বলির সামগ্রী হয়ে।কিভাবে মুক্তি পাবে তারা ?
৩)নেকড়ের নিমন্ত্রণ : নিউরো সার্জেন প্রোফেসর হ্যারল্ডের কাছে মিঃ উলফের নাম শোনে সদ্য নিউরো সার্জারি বিভাগে পাশ করা ছাত্র সুজয়।মিঃ উলফ লন্ডনের শ্রেষ্ঠ স্নায়ু শল্য চিকিৎসক। সুজয় তাঁর সাথে যোগাযোগ করলে তিনি সুজয়কে হ্যালোইন ডে এর দিন ডেকে পাঠায়। পথে সে নানান ভয়ংকর দৃশ্যের মুখোমুখি হয়, যা নিজের চোখে দেখেও বিশ্বাস করা সম্ভব হয় না।
৪) রামেসিস রা-এর রক্তধারা : গল্পের প্রেক্ষাপট মিশর।পুরতত্ব গবেষক হাবার্ট ফারাও দ্বিতীয় রামেসিস এর বংশধর, রামেসিস রা এর কবর উদ্ধারের উদ্দেশ্যে এক অভিযান চালায়।তবে তার আসল উদ্দেশ্য ফারাও এর এক পুঁথির খোঁজে, তাতে যা লেখা আছে তাতে হাজার হাজার বছর পরও মানুষকে বিস্মিত করবে।কি এমন আছে সেই পুঁথিতে ??
৫) রেডিয়োর বন্ধু : ক্লাস সেভেনে পড়া সোহম তার বাবার সাথে কলকাতা থেকে কোপেনহেগেন আসে। যদিও তার বাবা কর্মসূত্রে এলেও, সোহম আসে তার চিকিৎসার জন্য, তার ডান পা টা ছোটো থেকেই দুর্বল,জোর নাই। যেই বাড়িতে তারা ওঠে, সেখানে সোহম একটি রেডিও মতো যন্ত্র পায়, যেটি আসলে হ্যাম অপারেটর, যার মাধ্যমে দেশ বিদেশের মানুষের সাথে যোগাযোগ করা যায়। এর মাধ্যমেই সোহমের বন্ধুত্ব হয় দূরদেশের এক জনের সাথে। কে সেই দূরদেশের বন্ধু? সোহমের পা কি ভালো হয়ে উঠবে ?
৬) হিরোহিতোর গবেষণা : প্রোফেসর আকিরা হিরোহিতো এক অভূতপূর্ব আবিষ্কার করেন, যা কিনা রোবট বিজ্ঞানের সেরা আবিষ্কার "নেক্সি" কেও হার মানাবে। কি সেই আবিষ্কার ? এর পরিণতি খুবই দুঃখজনক।
৭) দেবতার চাবি : একজন জিওলোজিস্ট কিছু ভূতাত্ত্বিক নমুনা সংগ্রহের জন্য জনহীন নুবিয়ান মরু অঞ্চলে এসে ডেরা গাড়ে, এই জায়গা মৃতের নগরী নামে পরিচিত।এখানেই তিনি এক ধাতব চাকতি খুঁজে পান। পরে টিরেক্স নামক এক ব্যক্তির সাথে পরিচয় হয়। সেই ব্যক্তি এই ধাতব চাকতির দেখে চিনতে পারে, সেটি আসলে দেবতার চাবি।টিরেক্স নামক ব্যক্তি এই চাবির মাধ্যমে তাকে এক নৈশ অভিযানে সামিল করেন।