সোমনাথ ভদ্র ঘরের ততধিক ভদ্র ছেলে। বাবা রিটায়ার্ড অফিসার, মা-হারা সোমনাথই ছোট, অগ্রজ দুই ভাই বেশ উচ্চপদের চাকরিতে আছে। সে যখন পড়াশোনা শেষ করে একটা চাকুরির খোঁজে নেমেছে সময়টা বড় ঝঞ্ঝাটময়। দুশো’বছর শুষে নিয়ে বৃটিশরা এ ভারতবর্ষের ছোবড়া ফেলে রেখে গিয়েছে। সেই ছোবড়াকে আকড়ে ধরে বেঁচে থাকতে হচ্ছে শতকোটি মানুষকে। লক্ষ লক্ষ বেকার, সবাই ছুটছে সোনার হরিণের পেছনে। ঠিক সেইসময়ে সোমনাথও ছুটছে। পারিবারিক শিক্ষা, মার্জিত রুচি, প্রবল ব্যক্তিত্ব অথবা বিশাল মন, কিছুই কাজে আসছে না সে অসম, অসুস্থ প্রতিযোগিতার সামনে আগানোর বেলায়।
সোমের ভাগ্য তবুও কিছুটা ভালো, মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে, বড় দু-ভাই চাকরি করে, মা না থাকলেও মাথার উপরে আছেন বড় ভাইয়ের জীবনসঙ্গীনি কমলা বউদির মত মমতাময়ী কেউ একজন। কিন্তু তার বন্ধু সুকুমার? বাড়িতে অসুস্থ শয্যাশায়ী মা, তার নিচে ছোট দু-তিনটে বোন, আর আগামী দুই মাসের মাথায় চাকরি থেকে অবসরে যেতে থাকা বৃদ্ধ বাবা। একটা চাকরি না হলে যে সে বাড়িতে দুমাস পর দুটো চালও ফুটবে না! জীবনের রুঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সদা হাস্যোজ্জ্বল সুকুমার হন্যে হয়ে খুঁজছে একটা চাকরি, কেরানি কিংবা টাইপরাইটার কোন ব্যাপার না, তার যে একটা চাকরি চাইই-চাই! বইয়ের প্রথমাংশ মোটামুটি এই দুই চরিত্রের একটা চাকুরির জন্যে প্রাণান্তকর চেষ্টা আর হাহাকার নিয়েই কেটে যায়।
মাঝের দিকে আবির্ভাব ঘটে তপতীর। সুদর্শনা, সুভাষী এবং স্বমহিমায় উদ্ভাসিত তপতীর আরেকটি পরিচয়, ব্যক্তিত্ববান সোমনাথকে সে ভালোবাসে, সেই কলেজের সময় থেকেই। নিজের ক্যারিয়ারেও সে যথেষ্ট স্টেবল, পড়ালেখা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, স্কলারশিপ পাচ্ছে, গবেষণার দিকে ঝুঁকছে, তার জীবনে সবই হচ্ছে, শুধু পাওয়া হচ্ছে না সোমকে।
ঐ যে সোমের ব্যক্তিত্ব, প্রচন্ড মায়া বোধ করলেও তপতীর বাড়িয়ে দেয়া হাত ধরে সে মায়াজালে বাঁধা পড়ার পথে অন্তরায় হয়ে উঠছে সেই ব্যক্তিত্ব। এ সমাজ যে এখনো মেনে নিতে পারে না কোন সংসার চলবে স্ত্রীর আয়ে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এখানকার ছেলেরা ভরণপোষণ করে আসছে মেয়েদের। এ স্রোতের বিপরীতে যাবার মত কোন বলই যে নেই সোমের, এ সমাজ যে বেকারদের জন্যে নয়… এই অংশে এসে মাত্র কয়েক পাতার মধ্যে হন্যে হয়ে দুবন্ধুর চাকরি খোঁজার কাহিনী যেন নিমিষেই হয়ে উঠে প্রেমকাহিনী। অথচ একটিবারের জন্যেও তা খাপছাড়া মনে হয় না। তবে বইয়ের সবচেয়ে শক্তিমান অংশ আমার মতে এরপর থেকে শেষঅব্দি।
কাহিনী শেষ হবার পর দু-তিন পাতাজুড়ে শংকর এই উপন্যাসের পেছনের তার অনুপ্রেরণার গল্প লিখেছেন। বেশিরভাগই নিজের জীবন থেকে নেয়া, অল্প বয়সে বাবাকে হারিয়েছিলেন, বেকারত্বের রাহুর গ্রাস তাকে ঘিরে ছিল বহুদিন, বেশিরভাগ চরিত্রাঙ্কনেই তাই নিতে হয়নি খুব বেশি কল্পনার আশ্রয়। একটা জায়গায় তিনি লিখেছেন, এই গল্পে তিনি কোন সুগারকোটিং করতে চাননি, বরং সে সময়ের প্রতিটা বেকার যুবকের ভেতরের হতাশা, দূর্দশা, মানবেতর দিন কাটানো, সামাজিক মানসিক অকল্পনীয় চাপ এসবকিছুই একটা দলিল হিসেবে রাখতে চেয়েছেন। এবং আমার মতে তাতে লেখক শতভাগ সফল। প্রথম দিকে চলতে থাকা এক চমৎকার গল্প যে শেষদিকে এসে আমার নার্ভের উপর এমন প্রেসার ফেলবে, ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারিনি।
ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেকে প্রচন্ড ভাগ্যবান মনে করি সবসময়। তারই একটা প্রমাণ হয়ত এই যে, আমাকে আজঅব্দি একটা দিনও বেকার থাকতে হয় নি। ২০১৭ সালের ৩০ জুলাই ছিল আমার ভার্সিটি জীবনের শেষ পরীক্ষা, তার ঠিক আগেরদিন, ২৯ জুলাই আমার একটা (সে যেরকমই হোক) চাকরি নিশ্চিত হয়। আবার ২০২০ এর জানুয়ারিতে যখন শিরদাড়া সোজা রাখতে গিয়ে হুট করেই চাকরি ছেড়ে দিলাম, অফার আসলো পার্ট টাইম থাকবার, একই সাথে কীভাবে কীভাবে যেন প্রজেক্ট মিষ্টান্ন নিয়েও মেতে থাকলাম। ভবিষ্যতে কী লেখা আছে জানিনা কিন্তু পাশ করার পড়ে তো বটেই, মাত্র বছর পাঁচেকের চাকুরি জীবনেও আমাকে কখনো বেকার থাকতে হয় নি। তাই বহুল ব্যবহারে ক্লিশে হয়ে যাওয়া “বেকারত্বের অভিশাপ” যে কী ভয়ংকর একটা অনুভূতি, তা আমি পাইনি।
শংকর শক্তিমান লেখক, তার লেখা একই সাথে প্রাঞ্জল এবং ঘোরলাগা। জন-অরণ্যে তিনি নিশ্চিতভাবেই আমাকে সেই অনুভূতির খুব কাছে ঠেলে দিয়েছেন। খুব করে ভাবতে বাধ্য করেছেন, যে জীবনে এখন আছি তা ঠিক করে উপভোগ করছি কই? হুট করে যে জীবনের মধ্যে যেকোন দিন পড়তে পারি, তা এড়াতে ঠিকমতো প্রস্তুতি নিচ্ছি কি?
আমার হৃদয়ের খুব কাছের একজন একবার বলেছিল, অন্য বই পড়ে আমার মাথায় যখন গিট্টু লেগে যায়, শংকরের লেখা পড়ে তখন আমি সেই গিট্টু ছুটাই। ফেব্রুয়ারির শেষদিকে বইমেলায় গিয়েছিলাম ��ণ করে, ��ইবারে কিছু কিনবো না। জন-অরণ্য সেবারই ইউপিএল-এর স্টল থেকে কেনা! যখন কোন না কোনভাবে মাথায় গিট্টু লাগতে নিয়েছে, জন-অরণ্যে আশ্রয় নিয়েছি। তাড়াহুড়ো করে একেবারে সবটুকু শেষ না করে একটু একটু করে স্বাদ আস্বাদন করেছি। টপ-ক্লাস লেখার শক্তিই বোধহয় এমন, যে বই একমাসেরও বেশি সময় লাগিয়ে শেষ করেছি, চাইলে এক বসায় শেষ করা যায় তাকে!