দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে বাংলা(১৩৪৯-৫০ সাল) সংঘটিত মন্বন্তরের প্রেক্ষাপটে রচিত একটি বিখ্যাত নাটক "নেমেসিস" । ১৯৪৪ সালে নাটকটি "শনিবারের চিঠি" পত্রিকায় প্রকাশিত হয় । ১৯৪৮ সালে এটি গ্রন্হাকারে প্রকাশিত হয় । নাটকটি চোরাকারবারীর শিকার সুরজিত নন্দীর অনুশোচনা,যন্ত্রণা,দ্বন্দ্ব এবং এর থেকে আত্মমুক্তির বিষয়বস্তু । সম্পূর্ণ নাটকটি এক চরিত্র বিশিষ্ট ।
নুরুল মোমেন,যিনি নাট্যগুরু হিসেবেও পরিচিত, ছিলেন একজন বাংলাদেশী অধ্যাপক, শিক্ষাবিদ, নাট্যকার ও নির্দেশক, এবং প্রাবন্ধিক। আধুনিক বাংলা নাটকে অগ্রণী ভুমিকার জন্য তাকে "নাট্যগুরু" হিসেবে সম্বোধন করা হয়।
প্রাথমিক জীবন ও শিক্ষা নুরুল মোমেন নভেম্বর ২৫, ১৯০৮ সালে তৎকালীন যশোর জেলা বর্তমান ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা নুরুল আরেফিন ছিলেন একজন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক। তিনি কলকাতায় প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে ১৯১৬ সালে খুলনা জিলা স্কুলে ভর্তি হন। দশ বছর বয়সে তার প্রথম পদ্য "সন্ধ্যা" ১৯১৯ সালে সেসময়কার "ধ্রুবতারা" নামক সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯২০ সালে তিনি ঢাকা মুসলিম হাই স্কুল-এ ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই ১৯২৪ সালে ম্যাট্রিক, "ঢাকা ইন্টারমেডিয়েট কলেজ" থেকে ১৯২৬ সালে আইএ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২৯ সালে বিএ পাস করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএল ডিগ্রি লাভ করে ১৯৩৬ সালে কলকাতা হাইকোর্টে ওকালতি শুরু করেন।
রেডিওতে কাজ ১৯৩৯ সালে ঢাকায় "অল ইন্ডিয়া রেডিও" প্রতিষ্ঠা হলে, মোমেন নতুন এই মাধ্যমের সুযোগ গ্রহণ করেন এবং তার প্রথম মুসলিম লেখক হয়ে ওঠেন। ১৯৪১ রেডিওর জন্য রচনা ও নির্দেশনা দেন কমেডি নাটক "রুপান্তর"। এই নাটকের প্রগতিশীল প্লট এবং প্রধান চরিত্র নারী হওয়ার কারণে প্রথাগত মুস্লিম বাংলা নাটকের মধ্যে নতুন ধারার উন্মেষ ঘটে যার ফলশ্রুতিতে কবি ও সাহিত্য সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার তার প্রশংসা করেন এবং পরবর্তিতে আনন্দবাজার পত্রিকা তাদের পূজা সংখ্যায় নাটকটি প্রকাশ করেছিল।
কর্মতালিকা রূপান্তর (রচনা, মঞ্জচায়ন এবং সম্প্রচার - ১৯৪১।বই আকারে প্রকাশিত হয় ১৯৪৮ সালে, প্রকাশক- শেখ ব্রাদার্স, ঢাকা। আনন্দবাজার পত্রিকা প্রকাশ করে ১৯৪৩ সালে।) নেমেসিস (রচনা কাল-১৯৪৪, বই আকারে প্রকাশিত হয় ১৯৪৫ সালে, প্রকাশক-মোমেন পাবলিশিং হাউজ, ঢাকা।) যদি এমন হতো ( প্রকাশকাল - জুলাই ১৯৬১, প্রকাশক-মোমেন পাবলিশিং হাউজ, ঢাকা।) নয়া খান্দান (রচনা- সেপ্টেম্বর, ১৯৬১; প্রকাশকাল - ১৯৬২, প্রকাশক- বাংলা একাডেমি, প্রচ্চদ কামরুল হাসান) আলোছায়া (রচনা - ১৯৬২ ; প্রকাশকাল - অক্তোবর, ১৯৬২, প্রকাশক-মোমেন পাবলিশিং হাউজ, ঢাকা।) শতকরা আশি আইনের অন্তরালে রুপকথা ভাই ভাই সবাই এইটুকু এই জীবনটাতে যেমন ইচ্ছা তেমন আদিখ্যাতা লন্ডন প্রবাসে হ-য-ব-র-ল অন্ধকারটাই আলো (১৯৬৪) ঠিক চলার পথ
পুরষ্কার বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬১) একুশে পদক (১৯৭৮)
প্রখ্যাত নাট্যকার এবং ব্যারিস্টার নুরুল মোমেনের 'নেমেসিস' এক জিঘাংসার অকৃত্রিম চিত্র। যেখানে লোভের কাছে বন্ধক দেওয়া বিবেক তার প্রতিশোধ নেয়। বড় তিক্ত, অনেকবেশি কঠোর সেই প্রতিশোধ। সেই কারণেই গ্রিক পুরাণের প্রতিশোধের দেবীর নামে এই নাটকের নামকরণ করেছেন 'নেমেসিস'।
সুরজিৎ নন্দী দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়কার এক কালোবাজারি। কুখ্যাত তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষে লাখো প্রাণ কেড়ে নিয়েছে ক্ষুধা। একটুকু খাবারের জন্য বাবা-মা সন্তান বিক্রি করেছে, স্বামী স্ত্রীকে ফেলে পালিয়েছে, কতো মেয়ে নেমেছে পতিতাবৃত্তিতে তার হিসাব হয়তো কারো কাছে নেই। ঠিক এই সময়েই একদল লোক লাইসেন্স, পারমিট বাগিয়ে নিয়েছে। সিণ্ডিকেট করে দেদারসে মুনাফা লুটেছে। তাদেরই একজন সাবেক গরিব মাস্টার আর বর্তমান কালোবাজারি সুরজিৎ নন্দী। যে তার ভালোবাসার সুলতাকে বিয়ে করতে অসৎ শ্বশুরের প্রলোভনে পড়ে কালোবাজারিতে নামে। তাতে পয়সা অনেক অর্জন করলেও বিসর্জন দিতে হয়েছিল নিজের আত্মাকে। ঠিক ক্রিস্টোফার মার্লোর 'ডক্টর ফস্টাস'-এর মতো। শেষ রক্ষা হয়নি। প্রতিশোধের দেবী শোধ নিয়ে তবেই ছেড়েছেন। কেমন ছিল সেই শোধ? জানতে হলে পড়তে হবে তেতাল্লিশের মন্বন্তর নিয়ে লেখা অনবদ্য নাটক 'নেমেসিস'।
কলেবরে ক্ষীণকায়া। অথচ ভাষার গাম্ভীর্য আর বাক্যের বাঁধুনি মুগ্ধ হওয়ার মতোই।
১৯৪৩ খ্রীষ্টাব্দ, বাংলা ১৩৫০। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন পরিণীত পর্যায়ে চলে গেছে। চারদিকে বাজছে যুদ্ধের দামামা। সেই যুদ্ধের আঁচ এসে লাগল বাংলায় যেখানকার অধিকাংশই জানে না কি নিয়ে এই যুদ্ধ, কিইবা এতে তার স্বার্থ। যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ব্রিটিশ সৈন্যদের রসদের সিংহভাগ দেওয়া হত তৎকালীন ব্রিটিশ উপনিবেশিত ভারতীয় উপমহাদেশ হতে। দেশের উৎপাদিত শস্যের ভাগ পেত না তার উৎপাদনকারী খেটে খাওয়া মানুষেরা। তাদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য বার্মা (এটাও ব্রিটিশ শাসনাধীন ছিল) থেকে আমদানী করে আনা হত চাল,ডাল ইত্যাদি। যখন জাপান ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া সহ বার্মা দখল করে নিল তখন সেই আমদানিও হয়ে গেল বন্ধ। মড়ার উপর খাড়ার ঘা দেবার জন্যও প্রকৃতির বোধহয় কিছুটা সন্মতি ছিল। এর ঠিক আগের বছর দেখা দিয়েছিল প্রবল বন্যা। আমন ধান হয়ে গেল নষ্ট। খাদ্যের মজুদ গেল একেবারে কমে। দেখা দিল দুর্ভিক্ষ। যা পঞ্চাশের মন্বন্তর নামে বাঙ্গালী জাতি আজীবন মনে রাখবে। যে বাংলাকে বলা হত "সুজলাং সুফলাং শস্যে শ্যামলাং" এবং কথিত ছিল শায়েস্তা খাঁর আমলে যেখানে এক টাকায় চল্লিশ মণ চাল পাওয়া যেত, সেখানকার প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষ মরল, না খেয়ে ও অপুষ্টিতে। এর মত নির্মম পরিহাস আর কি হতে পারে!
সেই পরিহাসের নির্মমতা এখানেই শেষ নয়। দুর্ভিক্ষকে সামাল দেবার জন্য যখন পার্শ্ববর্তী প্রদেশগুলো হতে খাদ্য, ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছিল বাংলায়, তখন একশ্রেণির ঘৃণ্য পশু তা অবৈধভাবে গুদামজাত করা শুরু করল বেশি মুনাফা লাভের আশায়। সরকারী রসদ হতে চোরাকারবারির মাধ্যমে হাতিয়ে নিল মণকে মণ চাল। অষুধের মধ্যে দিল ভেজাল মিশিয়ে। ফলাফল, চরম মানবিক বিপর্যয়।
সুরঞ্জিত নন্দী সেই দলেরই একজন। ছিল একজন গরিব স্কুল শিক্ষক। ভালবেসেছিল তারই এক ছাত্রীকে। কিন্তু সে জানত না তার শ্বশুর একজন নরপশু। তার মেয়েকে সুরজিতের হাতে তখনি তুলে দিবে যখন সে তার হাতে পাঁচ লক্ষ টাকা দিবে এবং সে পথও সে বাতলে দিল। সরকারী গুদাম হতে চাল সরিয়ে ফেলতে হবে। কি করবে সুরজিত? ভালবাসার কাছে হেরে যাবে তার মানবিকতা? হায়, তাই যে ঘটল। সভা সমিতিতে মূল্যবোধের অবক্ষয় নিয়ে রক্তগরম করা বক্তৃতা, আর তারপরই বিবেকের সেই খোলস থেকে বেরিয়ে কালোবাজারে রিলিফের চাল বিক্রি করে লাখটাকা হাতিয়ে নেওয়া। বিবেকের টানাপোড়েন যে চলছিল না তা নয়। কিন্ত সর্বদাই জয়ী হল প্রলোভন, মাথা নুয়ালো হল মনুষ্যত্ব।
গ্রীক পুরাণের দেবী নেমেসিস। তাকে বলা হয়, The Goddess of vengeance. সমাজে অন্যায়,অবিচার যখন চরম মাত্রায় ছেয়ে যায়, বিবেক হয়ে যায় অন্ধ তখন সেই মানুষকে সমুচিত শিক্ষা দেবার জন্য নেমে আসে নেমেসিস। নেমেসিস ছাড়েনি সুরঞ্জিত নন্দীকে। প্রতিবার যখন সে নেমেসিসকে ফাঁকি দেবার চেষ্টা চালিয়েছিল, ততবারই সে যেন আরও বেশী করে তার চালে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেই প্রতিহিংসার দেবীর কাছে হার মেনে যখন মৃত্যুর মুখে পতিত হল, তখন সে ক্ষমা চাইল ভগবানের কাছে। তার সকল কালোটাকা গরিবদের জন্য দান করে গিয়ে।
ভগবান পরম দয়াশীল। সৃষ্টি জগতের সকলের উপরই তার মায়া। হোক তারা পাষণ্ড, হোক তারা বর্বর। কিন্তু যখনই নিচের মত ছবি চোখে ভেসে আসে তখন সত্যি মনের মধ্যে সংশয় জেগে উঠে,
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো, তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ?, তুমি কি বেসেছ ভাল?
"স্নেহলতা, আজ দুর্ভিক্ষ ও মহামারির সব চাইতে নগ্ন রূপ তুমি। কিন্তু আমি আজও চোখ বুজলে তোমাকে দেখতে পাই আমার জননী জন্মভূমির আদিম মানস-কন্যারূপে। Sneha, you had been the very picture of virtue। সেই তুমি এই হতে পারলে? তবে নীলরক্তের-বীজ সুলতা আমাকে ত্যাগ করতে পারবে না কেন?"
মাত্র পড়ে শেষ করলাম, নুরুল মোমেনের লেখা 'নেমেসিস' নাটক। ভয়াবহ প্রজ্ঞা, দর্শন আর জীবনবোধের পরিচয় দিয়েছেন লেখক। সেইসাথে কৌতুকরসও ছিলো। মূল চরিত্র সুরজিতের সেন্স অব হিউমার যেকোনো পাঠককে তার প্রতি আকৃষ্ট করবে। তবে এই কৌতুকের পাশাপাশি লেখক খুব সূক্ষ্মভাবে জীবনকেও তুলে ধরেছে। মার্লোর বিখ্যাত ডক্টর ফস্টাসের ভাবছায়া ছিলো এই বইয়ে, লেখক নিজেই নাটকে হিনটস দিয়েছেন। মূলত মানুষের আত্ম উপলব্ধি, পাপবোধ, বিবেক, এই বিষয়গুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে শেষকালে পরিণতি কি হতে পারে, তারও একটা বাস্তবিক চিত্র দিয়েছেন। খোদার পাশার দান কখন কিভাবে আমাদের জীবন ঘুরিয়ে দেয়, তা বোঝা যায় সুরজিতের প্রতিহিংসার দেবী নেমেসিসকে উদ্দেশ্য করে বলা এই সংলাপে: "You stabbed me in the back - this is the most unkind cut of all."
বইটি ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষের সময়ের চিত্রপটে লেখা। যেখানে খাদ্যের চেয়েও প্রকট ছিলো মানুষের বিবেক, রূচি, সততার দূর্ভিক্ষের প্রভাব। আর মূল্যবোধের এই স্বল্পতাই জনজীবনে ডেকে এনেছিলো দূর্ভিক্ষের গ্লানি। এই মেসেজটুকু দিতেই এই কাল্পনিক নাটক।
পরিশেষেঃ আমি রেটিং দিচ্ছি ৫/৫। একটু সময় নিয়ে পড়লে বুঝতে পারবেন। নয়ত মনে হবে কোনো মাথামুণ্ডু নেই। যাদের বই পড়ার অভ্যাস আছে, তাদেরকে আমি সাজেস্ট করব পড়ে দেখার। খুবই ছোটো বই কিন্তু গভীর দর্শন আছে।