"এসে গেছেন! আচ্ছা এক মিনিট, আপনি বরং এখানেই বসুন।” অনুরোধ নয়, যেন নির্দেশ। তরুণ সাংবাদিক ঢোক গিলে ঘাড় নাড়ল এবং নড়বড়ে লোহার চেয়ারটায় বসে সপ্রতিভ হবার জন্য রুমাল দিয়ে ঘাড়-গলা মুছে, পায়ের উপর পা তুলে প্যাকেট থেকে সিগারেট বার করল, তারপর কী ভেবে সিগারেটটা আবার প্যাকেটে ভরে রাখল। তার দশ গজ দূরেই ছড়িয়ে রয়েছে হাফপ্যান্ট-পরা, কতকগুলো আদুড় দেহ। তারা ঘাসের উপর চিত হয়ে, উপুড় হয়ে বা পা ছড়িয়ে বসে। ঘাম শুকিয়ে এখন ওদের চামড়ার রঙ ঝামা ইটের মত বিবর্ণ, খসখসে। সন্তর্পণে তারা শ্রান্ত হাত পা বা মাথা নাড়ছে। চোখের চাহনি ভাবলেশহীন এবং স্থির।
Moti Nandi was a sports journalist and worked as a sports editor in Anandabazar Patrika. He was awarded the Lifetime Achievement award (2008) at a glittering ceremony to mark the grand finale of the maiden edition of the Excellence in Journalism Awards.
In his novels, he is noted for his depiction of sporting events and many of his protagonists are sports-persons. His first short story was published in Desh weekly on 1957. His story for Pujabarshiki was in Parichoy Magazine on 1985.
“আগে ডিফেন্ড করো তারপর কাউন্টার অ্যাটাক। সর্বক্ষেত্রে এটাই সেরা পদ্ধতি। জীবনেরও।”
“আমরা সবাই-ই স্টপার। প্রতিনিয়ত-ই ঠেকাচ্ছি। কেউ ফুটবল মাঠে, কেউ জীবনে।”
কলকাতা লীগের এক নিচের দিককার ক্লাবের এক পোড় খাওয়া ফুটবলারের গল্প স্টপার। উঠে এসেছে শত বাধাবিপত্তি, যন্ত্রণা সহ্য করার পরও ফুটবলের প্রতি ভালোবাসার গল্প, চ্যালেঞ্জ জয়ের গল্প। লেখক মতি নন্দী ছিলেন ক্রীড়া সাংবাদিক। অনেক কিছু কাছ থেকেই দেখেছেন তিনি। ফলে তার স্পোর্টস ফিকশন বেশ বাস্তবিকই। ম্যাচের বিবরণগুলোতেও উত্তেজনার রেশ পাওয়া যায়। সবার জন্য রিকমেন্ডেড।
এ হলো এক ফুটবলা খেলোয়াড়ের গল্প, যার নাম 'কমল', সে 'ডিফেন্স' পজিশনে খেলে, যাদের বলা চলে স্টপার, বিপরীত পক্ষের গোল ঠেকিয়ে দেওয়া যাদের কাজ।। শুধু কি খেলার মাঠেই উনি স্টপার?? কমলের একটা কথা বেশ মনে থাকার মতো, "আমরা সবাই তো স্টপার ঘোষদা, কেউ মাঠের মধ্যে, কেউ মাঠের বাইরে। ঠেকাচ্ছি আর ঠেকাচ্ছি" ফুটবল ই যেন তার প্রাণ, তার শ্বাস-প্রশ্বাস।। এই ফুটবলের জন্যই সে তার বউ মারা যাওয়ার সময়ও শেষ দেখা দেখে যেতে পারেনি, যার কারণে ছেলে 'অমিতাভর' এর কাছে সবসময় প্রশ্নবিদ্ধ হতে হয় তাকে।। জাতীয় দলে খেলা, অলিম্পিকে খেলা অমলের বাস্তবিক জীবনেও কত বাধা, কত অপমান, কত তাচ্ছিল্যের মুখোমুখি হতে হয়েছে।। ফুটবলকে যে এতকিছু দিয়েছে তার কি এসব প্রাপ্য ছিল, সেটাও একটা প্রশ্ন...
মতি নন্দী নিয়ে আলাদা করে আর কিছু বলার নেই। আমি উনাতে মুগ্ধ হয়ে অনেককে এখন পর্যন্ত সাজেস্ট করেছি উনার বই। খেলাধুলা বিষয়ে উপন্যাস লিখে উনি যেন এক নিজস্ব জায়গা দখল করে রেখেছেন বাংলা সাহিত্যে, কারণ এত smartly আর এত নিখুঁতভাবে খেলাধুলা নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন বা কয়জন। উনি হয়তো জানতেন খেলাধুলা নিয়ে কিভাবে একটা গল্প বললে পাঠককে ধাক্কা দেওয়া যাবে.....
আচ্ছা?? আমরা তো ঠিকই অমলের মতোই তাইনা?? জীবন নামক খেলার মাঠে শত কষ্ট আসছে, শত বাধা আসছে, এসবকে আমরা ডিফেন্স করেই যাচ্ছি......
একটা অংশে কমলের কিছু কথা বেশ মন খারাপ করে দিয়েছিল------ "কমল একটু হাসল। "সারা জীবন পারফেক্শন খুঁজেছি, কিন্তু পাইনি। যে যার নিজের ক্ষেত্রে পারফেক্ট হতে চায়; আমার ক্ষেত্রটা ফুটবল। আমি মানুষ হতে পারব না জেনে ফুটবলার হতে চেয়েছি। কিন্তু দুঃখের কথা কী জানো, ফুটবলারের সময়টা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। তার শরীর, তার যৌবনই তার সময়, কিন্তু বড্ড ছোট্ট সময়টা। আমার মতো তৃতীয় শ্ৰেণীর ফুটবলার অল্প সময়ের মধ্যে কী করতে পারে যদি না খাটে, যদি না পরিশ্রম করে?""
মতি নন্দী'র সেরা বই 'স্ট্রাইকার', 'স্টপার', নাকি 'বুড়ো ঘোড়া', সেই সিদ্ধান্ত নিতে সবসময়ই আমার বেশ কষ্ট হয়। যেহেতু আমার ক্রিকেটের দিকে পক্ষপাত আছে, তাই শেষমেশ 'বুড়ো ঘোড়া'-কেই ভগ্নাংশের ব্যবধানে এগিয়ে রাখি। তবে যাদের ফুটবলের দিকে ঝোঁক আছে, তারা হয়তো 'স্টপার'-কেই প্রথমে রাখবেন। স্থানীয় খেলার রাজনীতি, আনন্দ-বেদনা, আশা-নিরাশা, নোংরামি, বয়স্ক হয়ে যাওয়া খেলোয়ারদের উপেক্ষা আর অবজ্ঞার কঠিন জীবন, আর সবকিছু ছাপিয়ে টিকে থাকার লড়াই--দুই বাংলার ক্রীড়াঙ্গন মিলিয়ে মতি নন্দী'র চেয়ে বাস্তব লেখা আর কেউ লেখেননি। পশ্চিমা সাহিত্যে খেলা নিয়ে অনেক দারুণ দারুণ বই আর সিনেমা আছে, সে তুলনায় বাংলা সাহিত্যে নন্দী-ই আমাদের সবেধন নীলমণি (অন্য যারা লিখেছেন, যথাযোগ্য সম্মান সহকারেই বলি, সেগুলো একেবারেই পাতে দেয়ার মত নয়)। সম্ভবত জাতি হিসেবে আমরা স্পোর্টসম্যান নই, কাজেই খেলা নিয়ে খুনোখুনি প্রচুর হলেও খেলার স্পিরিটটা আমাদের মাঝে আছে বলে মনে হয় না। মতি নন্দী'র সেরা এই কাজটা তাই খেলাপ্রেমীদের জন্য অবশ্যপাঠ্য, আর খেলা নিয়ে যাদের বাড়তি উচ্ছ্বাস নেই, জীবনঘনিষ্ঠ উপন্যাস হিসেবে পড়লে তাদেরও নিশ্চিতভাবে ভাল লাগবে।
বইটা অনেক বেশি ভালো লাগলো।♥️ একজন ফুটবলারের গল্প যিনি তার নিজের সময়ে দুর্দান্ত এক ফুটবলার ছিলেন কিন্তু বয়সের ভারে ক্যারিয়ারের একদম শেষ সময়ে, যে সময়ে অন্যরা রিটায়ার্ড করে ফেলে সেই সময়েও খেলা চালিয়ে যাওয়ার কারনে নানা অপমান সহ্য করতে হয়। কিন্তু তিনি ফুটবল ভালবাসেন। এই বয়সেও শুধুমাত্র ফুটবল ভালোবেসে চ্যালেঞ্জ নেয়া এবং সেই চ্যালেঞ্জ নিয়েই বইটি।
লীগে ধুঁকতে থাকা ক্লাব শোভনবাজারের ডিফেন্ডার কমল গুহ। 'স্টপার' নামটা ওখান থেকেই এসেছে। রক্ষণ-ভাগ সামলান যিনি, সেই সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার বা সেন্টার ব্যাকের অপর নাম স্টপার। পোড় খাওয়া এই খেলোয়াড় পৌঁছে গেছেন ক্যারিয়ারের গোধূলিবেলায়। একসময় জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চড়ানো কমলের খেলায় নেই দশ বছর আগের সেই ক্ষীপ্রতা। শোভনবাজারেও খেলেন কালেভদ্রে; এখনো খেলা চালিয়ে যাচ্ছেন ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা আর লয়ালটির খাতিরে। তাছাড়া নবীন খেলোয়াড় তৈরী করার ইচ্ছেটাও আছে। নিজ হাতে গড়ে তুলেছেন একেবারে নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা সলিলকে, ঠিক যেমনটি তার গুরু পল্টুদা গড়ে তুলেছিলেন তাকে। একদিকে চাকরির ঝামেলা, পল্টুদার মৃত্যু, ছেলের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন, অন্যদিকে সাবেক ক্লাব যুগের যাত্রীর সঙ্গে পুরোনো দ্বন্দ্ব, চারদিক থেকে ধেয়ে আসা নানা বিপত্তি, অপমান, তাচ্ছিল্য—সবমিলিয়ে কমল গুহকে যেন খেলার মাঠের মত জীবন-সংসারের ময়দানেও নিতে হচ্ছে একজন খাঁটি স্টপারের ভূমিকা। মাঠে এবং মাঠের বাইরে রক্ষণ-ভাগের সেনানী কমল গুহের জীবনের গল্পটাই শোনাচ্ছে 'স্টপার'। লেখক মতি নন্দী শুনলাম ক্রীড়া সাংবাদিক ছিলেন। গল্পটা পড়তে গিয়ে বোঝা যাচ্ছিল সেটা। বইটা কলেবরে ছোট, বড়জোর নভেলা বলা যেতে পারে। তবু খেলার নানা দিক, খেলোয়াড়ের মনস্তত্ব, ঘরোয়া ফুটবলের পলিটিক্স দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। আপনি ফুটবল ভালোবাসলে এই বইটা আপনার পড়া উচিত। না বাসলেও আমি রিকমেন্ড করবো-আশা করি সময়টা ভালোই কাটবে।
পোড় খাওয়া এক ফুটবল খেলোয়াড়ের দাঁতে দাঁত চেপে খেলে যাওয়ার গল্প উঠে এসেছে মতি নন্দীর 'স্টপার' এ। হাজারো অপমান, ফুটবলকে ভালোবেসে জীবনে না পাওয়া হিসাবের ভীড়ে গল্পের নায়ক কমল গুহর কানে শুধু একটা কথাই বেজেছে, 'ব্যালেন্স হারানো যাবে না'। শেষ পর্যন্ত সে কি পা��ে ফুটবলের সাথে জীবনের ব্যালেন্স করতে? নাকি জীবনের না পাওয়ার তালিকায় যোগ হয়ে এই ফুটবলও? স্পোর্টস রিপোর্টার মতি নন্দী দারুণ ভাবে তা তুলে ধরেছেন এই ফিকশন বইটিতে।
সকল পাঠকের জন্য রিকমেন্ডেশন থাকলো ১২৪ পৃষ্ঠার ছোট এই বইটি।
সুকান্তের কবিতার এই দুই লাইনের একটা জ্বলন্ত প্রমাণ এই বইটা বহন করে চলেছে। কি অসাধারণ একটা গল্প। সবকিছু শেষেও আশার, ভালোবাসার কিছু না কিছু থেকে যায়। যাকে আঁকড়ে ধরে বাঁচা যায়, নতুন করে স্বপ্ন দেখা যায়। বইটা যেন এই কথাই বলল বার বার।
ফুটবল নিয়ে বেস্ট পিস অভ ফিকশন হিসেবে জাপানিজ মাঙ্গা Aoashi-কে কন্সিডার করতেই হয়। এই বই নানা দিক থেকে Aoashi-কেও ছাড়িয়ে গিয়েছে! কি দারুণ লিখনি আর তাঁর মাধ্যমে উপমহাদেশের ফুটবলের কি নিদারুণ দশাই না ফুটে ওঠল।
আমার ক্লাব লেজেন্ড মো সালাহকে নিয়ে টানাটানি শুরু করেছে কোচ স্লট। কমলবাবুর পড়ে যাওয়া ক্যারিয়ারের স্ট্রাগলটা তাই দাগ কাটল ভীষণ। কিন্তু এই বই শুধু রিটায়ারমেন্টের ডিলেমাটা এক্সপ্লোর করেই থেমে থাকে নি, বরং বাংলার সমাজ ব্যবস্থারও এক প্রামাণ্য দলিল হয়ে থাকবে। আনপ্রফেশনালিজম শিরায় শিরায় বইছে সবার, সেখানে কমল গুহ একাই এক স্টপার।
ডিফেন্ড করে গেছেন গোল, নিজের আত্মমর্যাদা, পরিবার এবং চাকরি - সবকিছু একসাথে; যাকে মতি নন্দী বলেন ব্যালেন্স করে চলা।
শুরুতে Aoashi-র কথা বলেছিলাম। যাদের মাংগা/এনিমেটি ভালো লেগেছিল, তারা স্টপার পড়তে পারেন। অন্য এক ডিফেন্ডার, এবং তাঁর জীবনের শেষ গেইমের গল্প। যার ক্লাব বিল্ডিং নেই, বরং আছে মাঠে পাতানো এক তাবু। ক্লাব দেয় না পয়সা, তাই আছে ফুল্টাইম নাইন টু ফাইভ চাকরি। আর এত কিছুর পরও সে স্টপার, বাংলার সেরা ডিফেন্ডার।
একটা খেলোয়াড়ের জীবন কতোই বিচিত্র! বাংলাদেশের ক্রিকেটার লিটন দাশের কথাই ধরুন না। একসময় কী ভয়াবহ কটুক্তির স্বীকার হয়েছেন। তিনি যতো রান করবেন ততো ডিস্কাউন্ট! এমন দিনও দেখতে হয়েছে। অথচ সেই লিটনই এখন বাংলাদেশ দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যান। এখন তাকে যারা মাথায় তুলে নাচছে কয়েক ম্যাচ বাজে খেললে আবার তারাই গাল পাড়বে। অদ্ভুত জীবন বইকি!
ফুটবলে এখন স্টপার শব্দটা তেমন একটা ব্যবহার হয়না। তার বদলে সেন্টার ব্যাক কিংবা ডিফেন্ডার বলা হয়। সেরকম একজনের গল্প নিয়েই এই বই। মতি নন্দীর অন্যান্য বইয়ের মতোই এখানেও দারিদ্রতা, অন্যায় এবং ভাগ্যের সঙ্গে লড়তে হয় স্টপারকে। সেই প্রসঙ্গেই একটা লাইন আসে, "স্টপার, কোন দিকের তুমি আক্রমণ সামলাবে!"
স্টপার আর স্ট্রাইকার প্রায় একই ধাচে লিখা। পার্থক্য বলতে স্ট্রাইকারে উদীয়মান তরুণের উত্থান এর গল্প বলা আছে অন্যদিকে স্টপারে যার গল্প আছে তার ক্যারিয়ার একদম শেষদিকে। বুড়িয়ে যাওয়া ওই বয়সে গিয়েও তাকে লড়তে হয়। যতোটা না মাঠে তার চেয়েও বেশি মাঠের বাইরে আশেপাশের মানুষের সঙ্গে। আমার আবার মনে পড়ে যায়,
মূলত ক্রীড়া সাংবাদিক হলেও মতি নন্দী যে অসাধারণ উপন্যাসও লেখেন সেটা প্রথম জানতে পারি তাঁর লেখা ‘ সাদা খাম' উপন্যাসটি পড়ার সময়। ঝরঝরে ভাষায় ছোট্ট পরিসরে লেখা উপন্যাসটা তখনই উঠে গিয়েছে প্রিয় বইয়ের তালিকায়। আর কিছুদিন আগে যখন জানলাম ক্রীড়া সাংবাদিক সাহেব খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে বেশকিছু উপন্যাসও লিখেছেন তখনই গুডরিডসে ‘টু রিড' এর তালিকায় ঢুকিয়েছিলাম বইটি। আর আজ পড়াও হলো দারুণ এই উপন্যাসটি।
উপন্যাসের নায়ক স্টপার কমল গুহ। ফুটবলে যারা প্রতিপক্ষের আক্রমণ প্রতিহত করে এবং দলের সদস্যদের বলের জোগান দেয় তারাই ডিফেন্ডার বা স্টপার। স্টপার কমল গুহ একসময় বেঙ্গল এবং ভারতীয় দলের অপরিহার্য অংশ থাকলেও এবং লাখো মানুষের ভালোবাসা পেলেও ক্যারিয়ারের পড়ন্ত সময়ে তার স্থান হয়েছে অখ্যাত, অবনমন এড়াতে আপোষে পয়েন্ট ভাগাভাগি করা দল শোভাবাজারে যেখানে তার সম্বল শুধুই কটু কথা আর সমালোচনা। কিন্তু প্রতিপক্ষের আক্রমণে সে যেমন ভয় পায় না তেমনি ভয় পায় না জীবনের চলার পথের নানা বাধাবিপত্তিকে। তাইতো যুগের যাত্রীর সাথে ম্যাচটা যখন নিজের সম্মানের, সন্তানের কাছে নিজেকে প্রমাণের, গুরু-কন্যার চাকুরির জন্য বাঁধা হয়ে দাঁড়াল তখন আর পিছু হঠার কোনো উপায়-ই রইল না কমলের।
বলা হয় ফুটবল বাঙালির প্রথম প্রেম আর বাদবাকি যা কিছু বাঙালি ভালোবাসে তার সবই এই প্রথম প্রেমকে ভুলতে! আজকের বাস্তবতায় কথাটা কতটুকু সত্যি সে প্রশ্ন উঠলেও ফুটবলের প্রতি বাঙালির যে একটা তীব্র আকর্ষণ আছে সে কথা না মেনে কোনো উপায় সেই। তাইতো ক্রীড়া সাংবাদিক লেখক যখন ক্লাব ফুটবলের নানা ইতিবৃত্তসহ এক লড়াকু, হার-না-মানা স্টপার নায়ক হিসেবে উপস্থাপন করেন তখন আর বইটাকে দূরের কিছু মনে হয় না, মনে হয় আশেপাশের কারও কথাই যেন উঠে আসছে বই থেকে! আর সাথে যখন লেখক জীবনকের নানা বাধাবিপত্তি ‘স্টপ’ করার দীক্ষা দেন মাঠের স্টপারের মাধ্যমে তখন তা আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
বইটার প্রথম ভালো লাগার বিষয়টা হলো বাস্তব জীবনের সাথে মিলিয়ে লড়াই করার অনুপ্রেরণা দেওয়ার বিষয়টা। গুরুর মুখে শোনা, ‘ ব্যালান্স, কমল, ব্যালান্স। কখনও ব্যালান্স হারাসনি।‘ কথাটাকে কমল যেমন জীবনের আপ্তবাক্য বানিয়ে ফেলেছিল, লেখক বারবার ইঙ্গিত করেছেন আমাদেরও বিষয়টা থেকে শিক্ষা নিতে। প্রকাশ ও গোপনীয়তার, উৎযাপন ও এড়িয়ে যাওয়ার, মেনে নেওয়া ও মানিয়ে নেওয়ার, রাগ আর ভালোবাসার, বিশ্রাম আর পরিশ্রমের – জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে যে ব্যালান্সটাই আসল কমলের মাধ্যমে লেখক সে কথা বলে গিয়েছেন বারবার। আর ‘ ফুটবলের মতো জীবনেও আমরা স্টপার। শুধু ঠেকাচ্ছি আর ঠেকাচ্ছি।‘ লাইনটার মাধ্যমেও লেখক সে কথাই বলেছেন। সাথে ‘ ফুটবলের মতো জীবনেও আগে ডিফেন্স পরে কাউন্টার অ্যাটাক।‘ লাইনটার মাধ্যমে লেখক বলেছেন জীবনে আগে প্রস্তুত ওয়ার কথা। ডিফেন্স লাইন ছেড়ে সবাই মিলে অ্যাটাকে যাওয়া যেমন অর্থহীন এবং বোকামি তেমনি জীবনে প্রস্তুত না হয়ে, পরিকল্পনা না করে অগ্রসর হওয়াও তেমনি নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক। তাইতো কমল যেমন প্রথমে শুধুই ডিফেন্স করে, ডিফেন্স করতে করতে অ্যাটাকের পরিকল্পনা করে এবং সুযোগ বুঝে অ্যাটাক করে প্রতিপক্ষকে বেকায়দায় ফেলে তেমনি বাস্তব জীবনেও লেখকের পরামর্শ প্রথমে যোগ্য হওয়া, তারপরে পরিকল্পনা করা এব্য তারপরেই প্রতিযোগিতায় নামা।
দ্বিতীয় যে বিষয়টা ভালো লেগেছে তা হলো লেখক নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন ক্লাব ফুটবলের ইতিবৃত্ত। প্রথমেই যে বিষয়টা বলতে হয় তা হলো লেখক দেখিয়েছেন কিভাবে বড় দলগুলো রেফারিদের হাতে রেখে ম্যাচের ফলাফল নিজেদের দিকে নেয় আর ছোট দলগুলো লীগে টিকে থাকতে আপোষে পয়েন্ট ভাগাভাগি করে। বই প্রকাশের এতদিন পরেও যে বিষয়টা পাল্টায়নি তার প্রমাণ পাওয়া যায় কিছুদিন পরপর দেশের ঘরোয়া লীগে এসব নিয��ে হৈচৈ দেখে। সাথে স্পট ও ম্যাচ ফিক্সিংয়ের মতো বিষয়গুলোও দারুণভাবে তুলে ধরেছেন লেখক। এসব বিষয়ও খুব একটা বদলায় নি আজ পর্যন্ত। বইয়ের সত্য,বলাই, শম্ভুরা যেখানে ভরপুট খাওয়া বা ফ্যান্সি ড্রেসের জন্য ইচ্ছাকৃত ম্যাচ ছাড়ত এখন হয়তো সেসবের স্থান দখল করেছে দামী প্লট বা গাড়ি। সাথে কোচ-খেলোয়াড়ের দ্বন্দ্ব, খেলোয়াড়দের পারস্পারিক ঈর্ষা, মালিকপক্ষ-কোচের দ্বন্দ্ব ইত্যাদি বিষয়ও চমৎকার��াবে উঠে এসেছে বইটাতে।
এছাড়া আর যে দুইটা চমৎকার দিক উঠে এসেছে বইটাতে তা হলো খেলোয়াড়দের গুরুভক্তি এবং পরিবারের সাথে তাদের সম্পর্ক। কোচ বা গুরুদের প্রতি খেলোয়াড়দের যে একটা তীব্র ভালোবাসা এবং সম্মান থাকে সেটা যখনই পল্টুদার কথা এসেছে তখনই কমলের মাধ্যমে উঠে এসেছে। বিখ্যাত হয়ে গেলেও খেলোয়াড়রা যে তাদের কোচদের কাছে সেই ছোট্টটিই থাকে, তখনও যে আদর-শাসনে মেশা এক অদ্ভূত সম্পর্ক থাকে সেটা কমল-পল্টুদার অংশগুলো থেকে স্পষ্ট। আর খেলোয়াড়দের একটা অংশকে যে নিজেদের পরিবারের সাথেও যুদ্ধ করতে হয় খেলার জগতে আসতে বা খেলা চালিয়ে যেতে সেটা স্পষ্ট হয়েছে সলীলের সংগ্রামে বা কমলের দাম্পত্য জীবন থেকে।
এত দারুণ সব অনুপ্রেরণার পাশাপাশি বইটা একদিকে হাসিয়েছে আবার অন্যদিকে চোখে পানিও এনে দিয়েছে। যুগের যাত্রীর সমর্থকটির ‘ এত মাংস এখন খাবে কে?’ ডায়ালগটা বা অফিসার্স ক্লাবের খেলায় দাম্ভিক অনুপমকে কমলের নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরানোর অংশগুলোতে পেট চেপে যেমন হেসেছি তেমনি শেষদিকে কমলের খেলা দেখে ছেলে অমিতাভ যখন ‘ আমার বাবা' বলে গর্বে দাঁড়িয়ে পড়ে তখন চোখে পানিও এসে গিয়েছে।
বিষয়বস্তু, সত্যকে তুলে ধরা বা অনুপ্রেরণা দেওয়া সবক্ষেত্রেই বইটা সফল। তাইতো সহজ ভাষায় লেখা ছোট আকারের বইটাও মনে থাকবে অনেকদিনই।
এমন বই আমি এর আগে কখনো পড়িনি। একেবারে মন ছু্ঁয়ে গেছে। পাঁচ তারকাও মনে হয় কম হয়ে গেলো...
বইটা মূলত একজন ফুটবলারের তার জীবনের সাথে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে টিকে থাকার গল্প। । বইটা সম্পর্কে কিছু লেখার জন্য রীতিমতো শব্দ স্বল্পতায় ভুগছি। নাঈমদা পড়তে না বললে হয়তো আরো অনেক পড়ে পরিচয় হতো লেখকের সাথে। ধন্যবাদ নাঈমদা।
ফেসবুকে নাইম ভাইয়ার পোস্ট দেখার পর মতি নন্দীর খোঁজ পাই৷ তিনি ছিলেন ওপার বাংলার ক্রীড়া সাংবাদিক। খেলাধুলার সাথে তাঁর সম্পর্ক ছোটবেলা থেকেই ছিল। বলা হয়, বাংলা ক্রীড়াসাহিত্য তাঁর হাতেই তৈরি হয়েছে। যার কারণে ফুটবল, ক্রিকেট, বক্সিং, সাঁতার, দৌড়- সব খেলা সম্পর্কেই তাঁর অগাধ জ্ঞান। এই জ্ঞান আর খাসা লেখনশৈলী মিলিয়ে চমৎকার কিছু বই লিখেছেন তিনি৷ তারই একটা হলো 'স্টপার'৷ . . বাইরের ক্লাব ফুটবলের ম্যাচগুলো যেমন দেখা হয় বা খোঁজ রাখা হয়৷ বাংলাদেশের ক্লাব ফুটবল কখনোই দেখা হয়নি। একবার শুধু মাঠে বাবার সাথে আবাহনীর খেলা দেখতে গিয়েছিলাম। তবে পেপারের বদৌলতে প্রায়ই নানান (কু)কীর্তিকলাপের কথা চোখে পড়ে। বাংলাদেশে ক্লাব সংস্কৃতির যে কোনো উন্নতি হচ্ছে না, সেটা সবাই জানে। বিদেশি খেলোয়াড়দের প্রতি ঝোঁক, ফিক্সিং, জুয়া, প্রাপ্য বেতন না দেওয়া- সব মিলিয়ে ক্লাবগুলো জরাজীর্ণ। ক্লাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিজেদের স্বার্থেই ক্লাবের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেন।
ছবিতে আর্জেন্টিনা দলের পাশাপাশি মেসির পোস্টার রাখলেও, মেসি কিন্তু স্টপার না। স্টপার হচ্ছে তারাই যারা নিজ দলের খেলোয়াড়কে বল পাস করে এবং নিজেদের জালে প্রতিপক্ষের আক্রমণকে বাঁধা দেয়৷ খেলোয়াড়দের জীবন তাদের মাঠের পারফর্মন্সের মতই। ভালো খেললে সবাই প্রশংসা করে, খারাপ খেললে দুয়ো দেয়৷ তাছাড়া বয়স ত্রিশ পেরোলেই আনফিট তকমা দিয়ে বেঞ্চে বসিয়ে রেখে আস্তে আস্তে ক্লাব থেকে বের করে দেয়৷ কমল গুহ একটা সময় প্রতিপক্ষের মনে ত্রাস সৃষ্টি করলেও আস্তে আস্তে তার ধার কমে আসে। বড় ক্লাব থেকে ছোট ক্লাবে কোনোরকমে ঠাঁই মেলে। 'যুগের যাত্রী' দলের সাথে তার ম্যাচটা শুধু নিজের সম্মান বাঁচানোর ম্যাচ ছিল না, সেটা ছিল সন্তানের কাছে নিজেকে প্রমাণেরও লড়াই, যেখানে ব্যালেন্স ধরে রাখাটা খুব জরুরি। খেলার মাঠে প্রতিপক্ষের আক্রমণ যেভাবে স্টপ করেন, সেভাবেই নিজের জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতগুলো থামাতে হবে কমলবাবুকে।
তাই তো লেখক বলেছেন, "ফুটবলের মতো জীবনেও আগে ডিফেন্স পরে কাউন্টার অ্যাটাক।" বইটা যেন ফুটবল দিয়ে জীবনের দর্শন বর্ণনা করেছে। বইয়ের আকার ছোট হলেও, অনেক ভারী একটা বই। লেখক খুব সুন্দরমতো ক্লাব ফুটবলের অবস্থা, গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক, বাবা-সন্তানের সম্পর্ক, ফুটবলীয় উপমা এখানে তুলে এনেছেন৷ আমি বলবো, মতি নন্দীর অন্তত একটা বই পড়ে দেখুন, হতাশ হবেন না। আমি লেখকের স্ট্রাইকার, শিবা আর নারান পড়েছি, ভালো লেগেছে।
মনে হচ্ছে অদ্ভুত এক খাঁচার মধ্যে ঢুকে পড়েছি। চারিদিকেই খোলা, অথচ বেরোতে পারছি না!
বিভিন্ন কারণেই সময়টা অস্থির। রাগ ক্ষোভ হতাশায় যখন মাথাটা ভার হয়ে আসে, তখন ঘন্টা দেড়েকের জন্য মতি নন্দীর "স্টপার" নিয়ে বসে পড়াটা নিশ্চয়ই দারুণ একটা সিদ্ধান্ত!
মতি নন্দী এখানে মুলত কমল নামে একজন স্টপারের গল্প বলেন, একজন ডিফেন্সের। একজন স্টপারকে সবসময় সতর্ক থাকতে হয় তার সামনে আসা ফরোয়ার্ডদের আটকে দেওয়ার জন্য। কিন্তু সবসময় কি পারা যায়? যায় না। কখনো কখনো বিপর্যয় আসে, গ্লানি, হতাশাবোধ আষ্ঠেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখে, তীব্র তুচ্ছতাচ্ছিল্য বিঁধে আসে বুকে। সবচেয়ে বেশি বাধা আসে বয়সের, সময়ের। ফুটবলারদের জীবনে বয়সটায় যেন নির্ধারণ করে দেয় খেলার গতি, ধরণ আর টিমের ভরসা! কমলের জীবনেও বিপর্যয় আসে, গ্লানি হতাশাবোধ তাকেও আষ্ঠেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখে ভীষনভাবে, ক্লাব পলিটিক্স আর প্যাশনের প্রতি অতি অবসেসড তাকে ফ্যামিলির কাছ থেকেও বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। সাথে বয়সের বাধা তো আছেই, সবাই যখন চায় কমল রিটায়ার্ড করে ফেলুক তখন সে ফুটবলটাকে আরও বেশি আঁকড়ে ধরে। আসলে তার জীবনে ফুটবল ছাড়া আছেই বা কী! কিন্তু কমল মাথা নোওয়াবার নয়। নিজের সাধ্যের সবটুকু উজাড় করে দিয়ে সে ফুটবলটাকেই ধরে থাকে, আর আটকে দেয় ফরোয়ার্ড এবং উইংদের।
ইদানীং কি জানি হইসে আমার, যা পড়তেছি সবকিছুতেই পাঁচ তারকা পড়তেছে! এটাতেও দিলাম। অন্ধকার জেনেও আশার, ভালবাসার এই গল্পগুলো এখন পড়তে বেশ ভালোলাগে। কারণ এখন আমি জানি, সূর্য-ডোবা শেষ হল কেননা সূর্যের যাত্রা বহুদূর।
যে মানুষ একা যার কেউ নেই সে তখন সফল হবার জন্যে কি করতে পারে? সে লড়তে পারে। লড়ে যেতে হবে! এই পৃথিবীটা ঘুরছে ব্যালান্সের ওপর। মানুষ হাঁটে ব্যালান্সে, দৌড়োয়, ড্রিবল করে, এমনকী মানুষের মনও রয়েছে ব্যালান্সের ওপর। চালচলনে, ব্যবহারে ও চিন্তাধারায় কখনও ব্যালান্স হারালেই সব শেষ তাই লড়তে হবে। লড়ে যেতে হবে যাতে হারলেও যেনো জিতার তীব্রতা থাকে!
ফুটবল আর জীবনে যে তফাৎ নেই। আগে ডিফেন্ড করো, তারপর কাউন্টার অ্যাটাক। সর্বক্ষেত্রে এটাই সেরা পদ্ধতি, জীব���ের ক্ষেত্রেও।"
মতি নন্দী এককালে ক্রীড়া সাংবাদিক ছিলেন তাই খুব কাছ থেকে দেখেছেন ফুটবলের আদ্যোপান্ত আর সেটাই কলমে প্রকাশ করে দিয়েছেন। দুর্দান্ত এক্সিকিউশান। শেষ ম্যাচটার বর্ণনা যেনো এল-ক্লাসিকো ম্যাচ দেখবার মতোই!
প্রিয় বইয়ের তালিকায় "স্টপার" কে জায়গা করে দিলাম। আজীবন প্রিয় হয়ে থাকবে।
এক ফুটবলারের ফুটবল আর জীবনের দ্বন্দ নিয়ে ছোট্ট সুন্দর একটা উপন্যাস। “ব্যালান্স রাখতে হবে!” আসলেই... ব্যালান্স রাখতে হবে জীবনের, তালগোল পাকালে চলবে না।
”প্র্যাকটিসটা আরও ভাল করে কর। হতাশা আসবে, তাকে জয় করতেও হবে। ইন্ডিয়া টিমে খেললেই কি বড় প্লেয়ার হয়? বড় তখনই হয়, যখন সে নিজে অনুভব করে মনের মধ্যে আলাদা এক ধরনের সুখ, প্রশান্তি। সেখানে হতাশা পৌঁছোয় না। তুই খেলা ছেড়ে দিবি বলছিস, তার মানে তুই বড় খেলোয়াড় হতে পারিসনি।”
শোভাবাজার স্পোর্টিংয়েই প্রথম দু’বছর, তারপর ভবানীপুর, দু’বছর পর এরিয়ানে, সেখানে এক বছর কাটিয়ে যুগের যাত্রীতে চার বছর, মোহনবাগানে এক বছর,আবার যুগের যাত্রীতে দু’বছর, তারপর আবার শোভাবাজারে।
গত পনেরো বছরে কমল দু’বার চাকরি, ছয় বার বাসা এবং ছয় বার ক্লাব বদল করেছে। শোভাবাজার স্পোর্টিং, ভবানীপুর, এরিয়ান, যুগের যাত্রী, মোহনবাগান এবং আবার যুগের যাত্রী হয়ে এখন শোভাবাজারে আছে। এই সময়ে সে দর্জিপাড়া, আহিরিটোলা, শ্যামপুকুর, কুমারটুলি, আবার শ্যামপুকুর হয়ে এখন বাগবাজারে বাসা নিয়েছে। ক্লাবের জন্ম শোভাবাজারে এবং নাম শোভাবাজার স্পোর্টিং হলেও তার কোনও অস্তিত্ব জন্মস্থানে এখন আর নেই, যেমন কমলের জন্ম ফরিদপুরে হলেও, তিন বছর বয়স সেখান থেকে চলে আসার পর আর সে দেশের মুখ দেখেনি। শোভাবাজার স্পোর্টিং এখন ময়দানের তাঁবুতে আর বেলেঘাটায় কেষ্টদার অর্থাৎ কৃষ্ণপ্রসাদ মাইতির বাড়িতেই বিদ্যমান।
স্ত্রী শিখা দশ বছর আগে মারা গেছে, কমলের খেলার জীবনের সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারেনি একদিনও। ছেলে অমিতাভ তার মা’র কাছ থেকেই ফুটবলকে ঘৃণা করতে শিখেছে। পলিটিক্সের কথা বলে, তাই নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে তর্ক করে, গান গায়, কবিতা লেখার চেষ্টা করে, কিন্তু ফুটবল সম্পর্কে একদিনও একটি কথা বলেনি। একতলায় দুটি ঘর নিয়ে কমল থাকে। একটিতে সে, অপরটিতে অমিতাভ।
দুটি লোকের এই সংসারের যাবতীয় কাজ ও রান্না করে দিয়ে কালোর মা রাতে চলে যায়। দশ বছর আগে শিখা মারা যাবার পরই সাত বছরের অমিতাভকে তার দিদিমা গৌহাটিতে নিয়ে চলে যান। দু’বছর আগে সে বাবার কাছে ফিরেছে। প্রথমে দু’জনের সম্পর্কটা ছিল স্কুলে ভর্তি হওয়া নতুন দুটি ছেলের মতো। দু’বছরেও কিন্তু ওদের মধ্যে ভাব হয়নি। ওরা কথা কমই বলে, দু’জনে দু’জনকে যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলে। কেউ কারোর ঘরে পর্যন্ত ঢোকে না।
কমলের বর্তমান ক্লাব শোভাবাজারের অবস্থা খুবই শোচনীয়। ভালো কোনো প্লেয়ার নেই দলে। অথচ দল চালাতে হাতির খোরাক যাচ্ছে। কোচ সরোজ ঠিকঠাক খেলাতে পারছে না নাকি ফিটনেসের অভাব প্লেয়ারদের এটাও একটা প্রশ্ন। কারণ এরা মাঝমাঠে বলের দখল রাখতেই পারছে না। সিনিয়র প্লেয়ার হিসেবে কমল গুহ তবুও চেষ্টা করছে। যদি একজনকেও গড়ে তোলা যায়। সলীলকে নিয়ে বড় আশা। গরীবের ছেলে তবুও খেলায় খুব ঝোঁক। কমল গুহ একসময় রাইট ইন ছিল। পল্টুদা তাকে স্টপার পজিশনে আনে। কিন্তু এখন শোভাবাজার বলা যায় নিয়ম করেই ম্যাচ হারছে। একা কমল কী করবে?
হঠাৎ করেই খবর এলো পল্টুদা স্ট্রোক করেছেন। একশোটা টাকা নিতে তাকে শেষমেশ রথীনের কাছে তার শেষ ক্লাব যুগের যাত্রীর তাঁবুতেই যেতে হচ্ছে এখন। কমল যুগের যাত্রীর তাঁবুতে শেষ বার পা দিয়েছিল সাত বছর আগে। মোহনবাগান থেকে যাত্রীতে আসার জন্য ট্রান্সফার ফর্মে সে সই করে এক হাজার টাকা আগাম নিয়ে। কথা ছিল পাঁচ হাজার টাকা যাত্রী তাকে দেবে।
বছর শেষে সে মোট পায় চার হাজার টাকা। দিল্লিতে ডুরান্ডে কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে আসার পরই সে গুলোদার কাছে বাকি টাকাটা চায়। যুগের যাত্রীর সব থেকে ক্ষমতাশালী গুলোদা অর্থাৎ ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রতাপ ভাদুড়ি। গুলোদা নম্রস্বরে বিনীতে ভঙ্গিতে কথা বলে।
”সে কী, তুই টাকা পাসনি এখনও!” গুলোদার বিস্ময়ে কমল অভিভূত হয়ে যায়।
”ছি ছি, অন্যায়, খুব অন্যায়। আমি এখুনি তপেনকে বলছি।” গুলোদা অ্যাকাউন্ট্যান্ট তপেন রায়কে ডেকে পাঠাল। সে আসতেই ঈষৎ রুষ্টস্বরে বলল, ”একী, কমলের টাকা পাওনা আছে যে? না না, যত শিগগিরি পারো দিয়ে দাও, কমল আমাদের ডিফেন্সের মুল খুঁটি, ওকে কমজোরি করলে যাত্রী শক্ত হয়ে দাঁড়াবে কী করে!” তপেন তিন দিন ঘুরিয়ে টাকা দেয়নি।
আজকে এত সময় পর কমলকে দেখে সবাই বেশ অবাক। কমল গুহ একসময় যুগের যাত্রীর কত ভালো প্লেয়ার ছিলো। কমল পুরনো কথা গায়ে না মেখে ছুটলো টাকা নিয়ে। অবশ্য রথীন তাকে নামিয়ে দিয়েছিল গাড়ি করে। যাবার সময় হুঁশিয়ারি দেয় অফিস থেকে দুপুর তিনটার পর যেন বের না হয় হুটহাট। অফিসের একটা নিয়ম আছে। খেলোয়াড় কোটায় এই ব্যাংকের চাকরিটা কমলকে রথীনই পাইয়ে দিয়েছিল। ব্যাংকের হয়ে অফিস লীগে খেলতে হয় তাকে। কিন্তু শোভাবাজারের ম্যাচ ও বা কীভাবে হেলাফেলা করে কমল! জীবনটাকে বড় অসাড় লাগে কমলের।
প্রতিনিয়ত সবার থেকে কটুক্তি কানে আসে কমল গুহ এবার ফুরিয়ে গেছে। বুড়ো ঘোড়া বাদ দিয়ে শোভাবাজারের উচিত নতুন কম বয়সী ছেলে নিয়ে দল গড়া। ম্যাচ যতগুলো খেলা হয়েছে লীগে এবার সবচেয়ে বেশি অপমানিত হয়েছে কমল যুগের যাত্রীর সাথে ৫-০ তে হেরে। গ্যালারি থেকে দর্শকদের ইট এসেও লেগেছে। হতাশা ঘিরে ধরে কমলকে। নাহ আর নয়। এই স্টপার এবার ফুরিয়ে গেছে। আর সে ডিফেন্স আগলাতে পারে না। তার জন্যই নাকি এত গোল হয়েছে দোষারোপ শুনতে হলো খোদ শোভাবাজারের কিছু প্লেয়ার থেকে।
কিন্তু হঠাৎ করেই যেন আলোর একটা বিন্দু জাগিয়ে দিলো কমলকে। লীগের খেলায় শোভাবাজারের শেষ ম্যাচ আছে যুগের যাত্রীর সাথে। ছেলে অমিতাভ যে জীবনে ফুটবল নিয়ে আগ্ৰহ দেখায়নি আজকে বাবার খেলা দেখতে চায়। সলীল আবার ফিরে এসেছে। সে শোভাবাজারের বিধ্বস্ত দলের হয়ে চার ম্যাচ খেলে ফেলেছে। কমলের মধ্যে হঠাৎ করেই উদ্দাম ফিরে আসে। নিয়ে নেয় এই স্টপার কঠিন শপথ। জীবনের শেষ ম্যাচ সে খেলবে এবার। এমন করে খেলবে যাতে জীবনে যা হারিয়েছে শেষবেলায় কিছু যাতে পায়। স্টপারের জীবনের শেষ ম্যাচের সাক্ষী হবেন নাকি?
🍨পাঠ প্রতিক্রিয়া 🍨
এই বইটি কিশোর উপন্যাস হলেও আমার বেশ ভালো লাগলো। মতি নন্দীর লেখা আগেও পড়া হয়েছে। ওনার বই থেকে তৈরি হয়েছে সিনেমাও। একজন ক্রিড়া সাংবাদিক হবার সুবাদে তিনি খেলা বিষয়ক বেশ কয়েকটি লেখা লিখেছেন। সহজ ভাষায় ঝরঝরে লেখা। এবং একটা বিষয় খেয়াল করলাম উনি ওনার খেলা বিষয়ক বইগুলো একটা থিম ধরে লিখেছেন। আজ "স্টপার" পড়ে রীতিমতো অবাক হয়েছি। এই বইটিও থিম অনুযায়ী কিন্তু দারুণ। খেলোয়াড়ি জীবনে যে চড়াই উৎরাই থাকে সেটা তিনি অনুধাবন করতে সাহায্য করেছেন। এবং কিছু কিছু লাইন মোটিভেশনাল লেগেছে। অন্তত স্টপার, যে রুখে দেয় বিপক্ষ দলের রক্ষণভাগ তাকে ভেঙে পড়লে চলে না। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাকে অবিচল হতে হয়।
কমল গুহ যেন এক অদৃশ্য প্রতীক হিসেবে উঠে এসেছেন জীবনের প্রতিক্ষেত্রে স্টপার হয়ে আমাদের যেভাবে রুখতে হয় প্রতিকূলতা, তেমনি বয়সকে পাশ কাটিয়ে কম বয়সী প্লেয়ারদের টেক্কা দিয়ে কমল গুহ খেলার মাঠেও হয়ে উঠেছেন স্টপার হিসেবে এক দূর্ভেদ্য দেয়াল হিসেবে। এত সহজে ভাঙা যায় না তাকে।
আমি মতি নন্দীর লেখা সবসময়ই পছন্দ করি। খেলা বিষয়ক ছাড়াও ওনার আরো বিখ্যাত বই রয়েছে। চেষ্টা করবো সবগুলোর স্বাদ নেয়ার।
Awesome book. Truly inspirational. Remembered Sourav Ganguly throughout the book. "ব্যালান্স রাখতে হবে... ব্যালান্স"... an awesome teaching that we should learn. Agility and brilliance is nothing without balance. Looking forward for other books of Moti Nandi. The film "koni" I saw in my childhood made me enjoy. But this book made me a fan of Moti Nandi.
❛আমি মানুষ হতে পারব না জেনে ফুটবলার হতে চেয়েছি। কিন্তু দুঃখের কথা কি জানো, ফুটবলারের সময়টা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। তার শরীর, তার যৌবনই তার সময়, কিন্তু বড্ড ছোট্ট সময়টা।❜
কমল গুহ। এক সময়ের ডাকসাইটে স্টপার। ছয়টি ক্লাবের হয়ে খেলেছে। ইন্ডিয়ার হয়ে খেলেছে। ফুটবলের জন্য ত্যাগ করেছে অনেক কিছু। কিন্তু ফুটবল তাকে কী ফিরিয়ে দিয়েছে সেটা এক বিশাল প্রশ্ন। ছয়বার ক্লাব বদল, যুগের যাত্রীর মতো ক্লাবে দাপুটে খেলুড়ে হয়ে খেলার পরেও সঠিক সম্মান না পাওয়া আর এর গ্লানি নিয়ে তার ক্যারিয়ারের শেষ সময়টুকু কাটছে। বন্ধু রথীনের জন্য পাওয়া ব্যাংকের চাকরি আর শোভাবাজার ক্লাবে ফুটবল খেলে তার সময় কাটছে। পরিবারে ছিল স্ত্রী শিখা আর পুত্র অমিতাভ। স্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনায় গত হয়েছে এগার বছর আগে। সেজন্য আছে অপরাধবোধ, আছে রাগ। পুত্রের সাথে অস্বাভাবিক সম্পর্ক। যে বাবাকে খুব একটা পছন্দ করেনা। বাবার খেলার ধারেকাছেও সে যায় না। সাহিত্যচর্চা করে। খেলায় কোনো আগ্রহ নেই। সেটা হয়তো মায়ের এই প্রয়াণও এক কারণ। পারিবারিক জীবনে তার অবস্থা ভঙ্গুর। সেই ভঙ্গুরতা আছে বাইরের জীবনেও। এক সময়ের মাঠ মাতানো খেলোয়াড়কে এখন প্রায়ই কটূক্তি শুনতে হয়। বয়সের ভারে খেলতে পারে না, কিংবা এইসব বুড়ো ভাম এখনো অবসর নেয়না বলেই নতুনেরা সুযোগ পায়না জাতীয় কথা হরদম শুনতে হয়। আছে অফিসেও কটু কথা বলার লোক। তরুণ উঠতি ফুটবলারের সাথে তুলনা কটূক্তি সব মিলে জীবনটা তার শান্তির মধ্যে নেই। আছে রাগ, অভিমান। যুগের যাত্রীর প্রতারণা, প্রাপ্য না দেওয়া, স্ত্রীর মৃ ত্যু সংবাদ আড়াল করে তাকে খেলিয়ে যাওয়া এসব সে ভুলতে পারে না। গুরু পল্টুদার দেয়া শিক্ষাকে কমল গুহ আঁকড়ে ধরে আছে। আর মনে আছে সেই জেদ যা শেষবার যুগের যাত্রীকে বলেছিল। কমল মাঠ কাঁপাবে তাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু তা আর হচ্ছে কই? বর্তমানে শোভাবাজারের হয়ে খেলা কমল জানে এই ক্লাবের অবস্থা শোচনীয়। নেই ভালো খেলোয়াড়, আবার যে একটু ভালো খেলে সে দারিদ্র্যের কড়াল গ্রাসে আচ্ছন্ন। খেলা তার কাছে বিলাসীতা। যেমন, সলিল। পরিবারের আটজন সদস্য না খেয়ে থাকলে সলিল যদি ফুটবলে লাথি দেয় তো পেট ভরবে? কমল বুঝে পায় না নিজের ভেতরের এই জেদ, অভিমান সে কী করে নিয়ন্ত্রণ করবে। প্রতিটা খেলাতেই তারা শোচনীয় ভাবে হারছে। এদিকে লীগের খেলায় যুগের যাত্রী শীর্ষে। এ নিয়েও টিকা টিপ্পনী খাচ্ছে সে। মিথ্যে অবসরের গুজবও রটছে। শীর্ষে থাকতে যুগের যাত্রী রাজনীতি, নোংরামি আর দুর্নীতি করছে কিন্তু এ নিয়ে বলার কেউ নেই। কমলের এই অস্থির জীবনে পল্টুদা ছিলেন। কিন্তু বার্ধক্যে পতিত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ফেলে তিনিও চলে গেলেন। কিন্তু যাওয়ার আগে তার বলা কথাটা কমল মনে গেঁথে নিয়েছে, ❛ব্যালেন্স, কমল ব্যালেন্স করতে হবে।❜ কমল উত্তেজিত হলেও মনে রেখেছে সেটা। বাটা আর যুগের যাত্রীর সাথে বিগত খেলায় শোচনীয় ভাবে হেরেছে তারা। দলের কোচ সরোজ চায়না কমল খেলুক। বয়স তো হলো আর কত? কিন্তু লীগের শেষ খেলা কমল খেলবে। তাকে খেলতে হবে তার করা ওয়াদা পূরণ করতে। খেলতে হবে কারণ তার ছেলে জীবনে প্রথমবার তার খেলা দেখবে। খেলতে হবে কারণ প্রতিপক্ষের কটূক্তির জবাব সে মাঠে দিবে। কিন্তু ফুটবল তো একার খেলা নয়। দলের বাকিদের নিয়ে জেতা কিংবা ড্র করাই প্রায় অসম্ভব এমন ম্যাচে মুখ ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কী কমল? ম্যাচ শুরু। দেখা যাক স্টপার কমল জীবনের যুদ্ধে আর মাঠের যুদ্ধে প্রতিপক্ষকে স্টপ করিয়ে দিতে পারে কি না!
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
❝স্টপার❞ মতি নন্দীর লেখা কিশোর উপন্যাস। তবে কিশোর উপযোগী হলেও খেলা প্রিয় পাঠকের পড়তে ভালো লাগবে বইটি ১২৪ পৃষ্ঠার উপন্যাস। লেখকের লেখার ধরন খুবই দারুণ। ক্রীড়া সাংবাদিক হওয়ায় তার লেখার মধ্যে এই বিষয়ের উপস্থিতি থাকে বেশি। অন্যান্য লেখাও খেলা বিষয়ক। আমি লেখকের একটি সামাজিক উপন্যাস পড়েছিলাম। বেশ ছিল। এই বইটাও আমার বেশ লেগেছে। রাজনীতি, কূটনীতি আর আপন সুবিধা জীবনের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে বিদ্যমান। উপন্যাসে লেখক পঞ্চাশ থেকে আশির দশকের দিকে ফুটবল খেলার উন্মাদনা, ক্লাব ফুটবল আর ভেতরের নোংরামি, দুর্নীতি, ফিক্সিং তুলে ধরেছেন। তুলে ধরেছেন একজন খেলোয়াড়ের নিজেকে খেলোয়াড় পরিচয় ধরে রাখার সংগ্রাম। কটূক্তি, বিদ্রুপ, উপহাস সহ্য করেও নিজের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হওয়া ক্যারিয়ারের শেষপ্রান্তে আসা এক খেলোয়াড়ের গল্প লেখক দারুণভাবে তুলে ধরেছেন। একজন খেলোয়াড় কিংবা কোনো পেশার মানুষের মূল্যই তার কাজে। যতদিন কাজ দেখিয়ে যেতে পারবে কদর আছে। এরপর কেউ মনে রাখে না। এজন্যই রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ❛ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই - ছোটো সে তরী আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।❜ কমল গুহ হয়তো সেসব খেলোয়াড়দের প্রতিনিধিত্ব করে যারা প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও স্বজনপ্রীতি কিংবা রোষানলের শিকার হয়। এতকিছুর পরেও ওরা দমে যায় না। মাঠের খেলা থেকে ড্রেসিং রুম কিংবা কমিটির খেলা আরও অনেক কঠিন। যেখানে মস্তিষ্কের সা��েও খেলতে হয়। উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ পুরোটাই উপভোগ্য ছিল। খেলার প্রায় বিস্তারিত কিংবা চুম্বক অংশের বর্ণনা যেভাবে লেখক দিয়েছেন মনে হচ্ছিল মাঠে বসে আমিই খেলা দেখছি। সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে শেষ অংশের বর্ণনা। একটা উত্তেজনা টের পাচ্ছিলাম মনের মধ্যে। গোগ্রাসে শেষ অংশ পড়েছি। দারুণ ছিল। তৃপ্তিদায়ক একটা উপন্যাস পড়েছি।
❛জীবনে ব্যালেন্স করে চললে অনেক প্রতিকূলতাই পাড়ি দেয়া যায়। হয়তো পথটা বন্ধুর হয়, কণ্টকাকীর্ণ হয় কিন্তু শেষ পথ এতে মসৃণ হয়। বিজয়ীর হাসি মুখে শোভা পায়।❜
মতি নন্দীর স্টপার শুধু এক ফুটবলারের গল্প নয়—এটি এক মানুষের ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু আলো-ছায়ার পথচিত্র, যেখানে সাফল্য ও অবহেলা ঢেউয়ের মতো এসে আবার মিলিয়ে যায়।
কমল গুহ—যার সামনে একসময় থেমে যেত প্রতিপক্ষের দৌড়—আজ দাঁড়িয়ে আছে নিজের অস্তিত্বের কিনারায়। ছয়টি ক্লাবে খেলা, দেশের জার্সি গায়ে ওঠানো, মাঠজুড়ে দাপট—সবই যেন এখন অতীতের ধুলোমাখা ট্রফি। জীবনের শেষভাগে এসে সে টের পায়, গৌরবের সঙ্গে যে সম্মান আসার কথা ছিল, তা কোথাও আড়ালে সরে গেছে। অবহেলা আর উপহাসে ক্লান্ত প্রবীণ স্টপার দাঁড়িয়ে আছে নতুন প্রজন্মের দাপুটে পদধ্বনির সামনে।
ব্যক্তিজীবনের ক্ষত আরও গভীর। স্ত্রী শিখার অনুপস্থিতি তাকে অপরাধবোধে আচ্ছন্ন করে, আর ছেলে অমিতাভের সঙ্গে দূরত্ব তার নিঃসঙ্গতাকে আরও গাঢ় করে তোলে। অমিতাভের সাহিত্যচর্চা ও খেলাধুলায় অনাগ্রহ যেন বাবা–ছেলের মধ্যে এক অদৃশ্য প্রাচীর তৈরি করেছে।
ক্লাবজীবনও অস্থিরতার দোলাচলে দুলছে। শোভাবাজার ক্লাবের করুণ অবস্থা যেন কমলের ক্লান্ত জীবনের প্রতিচ্ছবি—প্রতিভা আছে, কিন্তু তাকে টিকিয়ে রাখার মতো পরিবেশ নেই। সলিলের মতো খেলোয়াড়রা দারিদ্র্যের কাছে হার মানে; ফুটবল তাদের কাছে স্বপ্ন নয়, বিলাসিতা মাত্র। অপরদিকে যুগের যাত্রীর সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অসৎ রাজনীতি কমলকে বারবার মনে করিয়ে দেয়—মাঠের লড়াইয়ের চেয়ে ড্রেসিং রুমের লড়াই অনেক বেশি হিংস্র।
কমলের জীবনে একমাত্র স্নেহের আলো ছিলেন পল্টুদা। বিদায়ের মুহূর্তে তাঁর বলা কথা—“ব্যালেন্স, কমল, ব্যালেন্স কখনও হারাসনি”—তার ভিতরে নিঃশব্দ শক্তির মতো কাজ করে, জীবনের সমস্ত ঝড়-ঝাপটার মাঝেও তাকে স্থির থাকতে শেখায়।
এরপর আসে সেই শেষ ম্যাচ। জীবনের মতোই অনিশ্চিত, দোদুল্যমান। এই ম্যাচ তার নিজের কাছে, প্রতিপক্ষের কাছে, এবং সবচেয়ে বড় কথা—ছেলের সামনে নিজের মূল্য প্রমাণের শেষ সুযোগ। মাঠ যেন ক্রমে তার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে একসূত্রে বেঁধে ফেলে; আর পাঠক অনুভব করে প্রতিটি পাস, প্রতিটি ট্যাকল, প্রতিটি দৌড়ের সঙ্গে জমে থাকা ক্ষোভ ও অভিমান কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে আসছে।
স্টপার পড়তে পড়তে মনে হয়, মতি নন্দী ফুটবলের চেয়েও বড় কিছু লিখেছেন—একজন মানুষের মর্যাদা হারানোর ভয়, নিজের পরিচয় আঁকড়ে ধরার চেষ্টা, এবং নীরবে গড়ে ওঠা দৃঢ়তার গল্প। স্টেডিয়ামের আলো, গ্যালারির চিৎকার, ড্রেসিং রুমের গুঞ্জন—সব মিলিয়ে তিনি ফুটবলের এক নব্য লোককথা রচনা করেছেন।
শেষ অংশের বর্ণনায় লেখকের কলমে যেন বজ্র নেমে আসে—রোমাঞ্চ, উৎকণ্ঠা, নীরবতা, বিস্ফোরণ—সবকিছুর এমন নিখুঁত সংমিশ্রণে মনে হয়, পাঠক নিজেই গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে শ্বাস আটকে খেলাটি দেখছে।
জীবনে সত্যিই কিছু লড়াই শুধু জেতার জন্য নয়—বেঁচে থাকার জন্যও লড়তে হয়। আর যে মানুষ নিজের ব্যালেন্স ঠিক রাখতে পারে, তার কঠিন পথও একসময় আলোর দরজায় গিয়ে থামে।
কোথায় যেন পড়েছিলাম, বাঙ্গালির প্রথম প্রেম আসলে ফুটবল...বাকি সব নাকি ফুটবলটাকে ভুলে থাকার জন্য সাময়িক ব্যাবস্থা মাত্র! সেই ফুটবল নিয়ে শেষ কবে এত চমৎকার কোন লেখা পড়েছি সেটা এখন মনে করতে পারছি না।
গল্পটা এক সময়ের মাঠ কাঁপানো স্টপার অমলের। গল্পটা ফুটবল ক্লাবগুলোর ভেতরে করিডোরের প্রতিটি বাঁকে মিশে থাকা নোংরামির। গল্পটা এক ঝাঁক নতুন ফুটবলারের। কিংবা গল্পটা হয়ত একজন মানুষের ফুটবলার হয়ে ওঠার! সব ছাপিয়ে গল্পটা আসলে ফুটবলের আর ফুটবলের প্রতি অফুরন্ত ভালোবাসার।