ধান্যকুড়িয়া প্রাথমিক আদর্শ শিশুশিক্ষা নিকেতনের প্রধান শিক্ষিকা দেবিকা ঘোষাল মাথা নামিয়ে নিবিষ্ট মনে ক্লাস ফোরের অঙ্কের ফাইনাল পরীক্ষার খাতায় দেওয়া নম্বরগুলো চেক করছিলেন। চল্লিশটার মধ্যে তেরোটা দেখা হয়েছে এবং নম্বর যোগ দেওয়ায় তিনটি ভুল আবিষ্কার করেছেন। ঠিক এমন সময়ই তিনি শুনলেন, ”বড়দিদিমণি আসব?”
দেবিকা মুখ তুলে তাকিয়ে বললেন, ”আসুন।” আবার খাতা দেখতে শুরু করলেন। যিনি বললেন ”বড়দিদিমণি আসব” তিনি বছর ষাটের সাদা থান কাপড় পরা বেঁটেখাটো স্থূলকায় ধীর শান্ত নম্র স্বরের সুলতা মণ্ডল। ধানকুড়ির (ধান্যকুড়িয়ার এটাই ডাকনাম) অন্তত সত্তরভাগ মানুষ তাকে চেনেন এবং বড়দিদিমণিও তাঁর নাম শুনেছেন। মুখ নামিয়েই দেবিকা বললেন, ”বলুন মাসিমা।” ইতস্তত করে সুলতা বললেন, ”আমার নাতিটাকে ভর্তি করাতে এনেছি।” ”কোথায় নাতি?” ”এই তো।” সুলতা মুখ ফিরিয়ে দেখালেন।
দেবিকা মুখ তুলে দেখলেন লম্বা একট কিশোর। ঘোর কালো গায়ের রং। নাকটি ভোঁতা, ঝাঁকড়া রুক্ষ চুল। সারল্য ও বোকামি মুখে মাখানো। অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানেন গ্রামাঞ্চলে ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া একটু বেশি বয়সেই শুরু করে। কিন্তু এত বড় ছেলে তো শিশুশিক্ষা নিকেতনের অর্থাৎ প্রাইমারি স্কুলের পক্ষে অত্যন্ত অনুপযুক্ত। দেবিকা হেসে বললেন, ”মাসিমা, দশটার পর এসে বড়বাড়ির হেডমাস্টারের সঙ্গে দেখা করুন।” প্রাথমিক স্কুলের টালির চালের তিনখানি ঘরকে বলা হয় ছোট বাড়ি আর তার পঞ্চাশ গজ দূরের দোতলা মাধ্যমিক স্কুলটিকে বলা হয় বড়বাড়ি।
”না, না, আমি কালীকে বড় স্কুলে নয়, এখানে ভর্তি করাব বলেই এনেছি।” সুলতা ব্যস্ত হয়ে বললেন।দেবিকা কপাল কুঁচকে জানতে চাইলেন, ”বয়স কত?” উত্তরে যা শুনলেন তাতে চেয়ার থেকে ওনার পড়ে যাওয়ার কথা, কিন্তু পড়লেন না। কেননা উনি খুব শক্ত ধাতের মহিলা, তবে টেবিলের কোনা চেপে ধরে বিস্ফারিত চোখে শুধু বললেন, ”আপনার নাতির বয়স ছয়।”
সুলতাও অবাক স্বরে বললেন, ”হ্যাঁ, ছয়। আমি ওর বাথ সার্টিফিকেট সঙ্গে করে এনেছি। কালী তো জন্মেছে এখানেই, এই তো আমাদের মিনিসিপ্যাল হাসপাতালে। মেয়ের পেট কে*টে ওকে বার করতে হয়েছিল। যমে মানুষে সে কী টানাটানি! ডাক্তারবাবুও খুব শক্তপোক্ত ছিল, যম একদম সুবিধে করতে পারেনি। একমাস পর জামাই এসে মা—ছেলেকে সুন্দরবনের মৌসুনীতে নিজের বাড়িতে নিয়ে যায়।” বলতে বলতে সুলতা ধান্যকুড়িয়া মিউনিসিপ্যালিটির ���েওয়া বার্থ সার্টিফিকেট কাগজটা খাম থেকে বার করে এগিয়ে দিলেন।
দেবিকা তিনবার জন্মতারিখটা দেখে মনে মনে দ্রুত একটা অঙ্ক কষে ফলটা বার করে নিলেন, কালীর বয়স আজ ছ’বছর দুশো দশ দিন। আড়চোখে ঘরের বাইরে দাওয়ায় মাদুরে—বসা পাঁচ ছয় বছরের ছেলেমেয়েদের একবার দেখে নিলেন তিনি। বিস্ময়ের ধাক্কাটা সামলে শক্তধাতের বড়দিদিমণি এবার কৌতূহলী হয়ে পড়লেন।
ছেলেটির নাম জিজ্ঞেস করলেন। দেবিকা একটু কানে কম শোনেন তাই ছেলেটির নাম শুনে অবাক হয়ে বললেন, ”কালী কিং কং? অদ্ভুত পদবি তো।” সুলতা দ্রুত ভুল শুধরে দিলেন, ”না গো বড়দিমণি, কিং কং নয়, কিং কং নয় কিঙ্কর, কালীকিঙ্কর ঢালি। বাবার নাম শিবশঙ্কর ঢালি।” নাতিকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে সুলতা রীতিমতো বাসায় কালীকে পড়াতে মাস্টার রাখলেন। এই অদ্ভুত ছেলেটিকে পড়াতে এলো পাশের পাড়ার ”সুধন্য হালদার। ডাক নাম ধানু"। খুব ভাল ছেলে বড়বাড়িতে ক্লাস টেনে পড়ে। খুব গরিব। কয়েকটা টাকা পেলে ওর খুব উপকার হয় এটা স্কুলের শিক্ষিকা রাধারানীর অভিমত। তিনি নিশ্চিত করলেন ধানু খুব যত্ন করে কালীকে পড়াবে।
কালীকে সুলতা মানুষ বানানোর জন্য লেখাপড়া শেখাতে নিজের কাছে নিয়ে এলেন ডা*কাত বাপের নজর থেকে দূরে। নাতিকে স্কুলে ভর্তি করে লেখাপড়ার জন্য বাড়িতে মাস্টারও রাখলেন কিন্তু এই অদ্ভুত উচ্চতার জন্য কালীর ভাগ্যে এরপর দুর্ভোগ ঘটে কী না এটাই বড় চিন্তার কথা। কারণ সবাই ওর উচ্চতা দেখে ওকে বড় মানুষ ভাবে। ছোট বাচ্চারা যারা ওর বয়সী তারা ওর সাথে মিশতে চায় না। স্কুলের দেবিকা ম্যাডামের শোনা সেই কিং কং পদবীটা যেন কালীর আসল নামের সাথে বসে গেল। উচ্চতা অস্বাভাবিক তবে বয়সে, মনের দিক থেকে ওই শিশুটিকে কী সবাই হাসির খোরাক বানিয়ে ফেলবে?
🥎পাঠ প্রতিক্রিয়া🥎
"ধানকুড়ির কিং কং" মতি নন্দীর লেখা কিশোর উপন্যাস। আমি তো বলবো একদম পিওর কিশোর উপন্যাস। কারণ এখানে আপনি বড়দের কিছু পাবেন না। বরং এই বইয়ে বড়দের বুদ্ধিসুদ্ধি খানিক কম। শিশুদের জন্য এই বইটি হবে দারুন উপযোগী। আর মতি নন্দীর লেখা সবসময়ই ভালো লাগে কারণ কিশোর উপন্যাসে উনি সব বইয়ে চেষ্টা করেছেন ভাষা বেশ সহজ ও প্রাঞ্জল রাখতে।
কালীকিঙ্কর ঢালী ওরফে কালীর কথা যদি বলি তাহলে বলবো কালীর অস্বাভাবিক উচ্চতা বৃদ্ধি হয়তো কোনো জিনগত সমস্যা হতে পারে কিন্তু কালীর মেধা দারুন। ছেলেটির স্মরণশক্তি অসাধারণ। যেকোনো কিছু খুব সহজে মনে রাখতে পারে। লেখাপড়া শেখাতে তাই ধানুর কষ্ট করতে হয়নি বেশি। আবার ওর মনটা কোমল একদম। বনের পশুপাখিদের জন্য ছেলেটির মায়া। কুড়িয়ে পাওয়া আ*হত পাখি কিংবা একটি ছাগল ছানার জন্য ওইটুকু ছেলের সহানুভূতি দেখার মতো।
কিন্তু আমাদের সমাজে মানুষের স্বভাব হচ্ছে কারো কোনো দূর্বলতা পেলে সেটা নিয়ে হাসি ঠাট্টা করা। কালী অস্বাভাবিক লম্বা। তাতে ওই ছেলেটার কী দোষ? সে কী কোনো দৈ*ত্য নাকি গল্পের সেই কিং কং গরিলা? কেন তাকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করে ওইটুকু ছেলের মনটায় আ*ঘাত করা হচ্ছিল বারবার? সুলতাকে ভালো লেগেছে তিনি নাতিকে লেখাপড়া শেখাতে চেষ্টায় ত্রুটি রাখেননি। মানুষের বাজে কথা তিনি গায়ে মাখেন না। একবার যখন তাই মাধ্যমিক স্কুলের হেডমাস্টার কালীকে স্কুলে যেতে নিষেধ করেন অস্বাভাবিক উচ্চতার জন্য তখন নাতির জন্য সুলতা প্রতিবাদ করেছেন।
ধানু কেও সহানুভূতিশীল হতে দেখি আমরা কালীর প্রতি। ধানুও কখনো কালীর অস্বাভাবিক উচ্চতা নিয়ে হাসি ঠাট্টা করেনি। বরং কালীকে সবসময় সাহায্য করেছে। একসময় স্কুলের জন্য কালী কি কম সম্মান বয়ে এনেছে? তবে এই ছোট্ট শিশুটির প্রতি সবার বিরূপ মনোভাব কেন?
সব শিশুর মাঝেই গুন থাকে। শুধুমাত্র অস্বাভাবিক উচ্চতার জন্য কালী অসম্মানিত হতে পারে না। মতি নন্দী গোটা উপন্যাস লিখবেন আর খেলাধুলার প্রসঙ্গ আসবে না সেটা কী হয়! এই বইয়েও কিন্তু আছে। তবে কোন খেলা সেটা বললাম না। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো বইটি কিশোর উপন্যাস হিসেবে উপভোগ্য ছিল।
আমি প্রচুর কিশোর উপন্যাস পড়ি বলে আমার তো দারুন লেগেছে। মতি নন্দীর লেখা অন্যান্য বইয়ের তুলনা করলে মোটামুটি তবে পিওর কিশোর উপন্যাস হিসেবে শিশু কিশোরদের হাতে তুলে দিন বইটি।
🥎বইয়ের নাম: "ধানকুড়ির কিং কং"
🥎 লেখক: মতি নন্দী