হুগলি জেলায় আটঘরা আর বকদিঘি নামে পাশাপাশি দুটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম আছে। দুই গ্রামের দুই জমিদার—বংশ সিংহ ও মুখুজ্যেদের মধ্য ঝগড়াঝাঁটি প্রবল। সামান্য বা অসামান্য সব ব্যাপারেই উভয়ের মধ্যে রেষারেষি। জমিদারি প্রথা উঠে যাবার পর সেটা কেন্দ্রীভূত হয়েছে দুই গ্রামের মধ্যে বছরে একবার একটি ক্রিকেট ম্যাচকে উপলক্ষ করে। মহা ধুমধামে দুই গ্ৰাম মিলিয়ে এই বাৎসরিক ম্যাচ হয়। এক মাস আগে থেকেই দুই গ্রামের ছেলে—বুড়ো—মেয়ে পুরুষ টেনশনে ভুগতে শুরু করে। প্রতিবার এই খেলায় একটা—না—একটা ঝঞ্ঝাট বাধেই, আর তাই নিয়ে হুলুস্থুলু পড়ে যায়। তাই এই ক্রিকেট ম্যাচের আলাদা গুরুত্ব আছে দুই গ্ৰামের কাছেই সবসময়।
আটঘরার জমিদারবাড়ির নাতনি কলাবতী বাংলার মেয়ে ক্রিকেট দলে খেলে। খুবই সম্ভাবনাময় ব্যাটসউওম্যান, টেস্টম্যাচ খেলার জন্য যে ডাক পাবেই তাতে সন্দেহ নেই। ওর খুবই ইচ্ছে, এবং ওর দাদু রাজশেখরেরও, এই বাৎসরিক ম্যাচে খেলার। কিন্তু বকদিঘির অধিনায়ক পতু মুখুজ্যে সাফ জানিয়ে দিয়েছে ছেলেদের ম্যাচে মেয়েদের খেলার নিয়ম নেই। এই ম্যাচে অবশ্য কলাবতীর কাকা সত্যশেখর খেলবে। কলাবতীর দাদুর ইচ্ছা তিন পুরুষ নিয়ে তিনি এই ম্যাচে খেলবেন কিন্তু কলাবতী মেয়ে বলে কী খেলা থেকে বাদ পড়ে যাবে শেষমেশ?
বকদিঘির জমিদার হরিশংকরের মেয়ে মলয়া কলাবতীর স্কুলে হেডমিস্ট্রেস। কলাবতীকে খুব আদর করতেন। কিন্তু কলাবতীর কাকা সত্যশেখরের সাথে মলয়ার আদায় কাঁচকলায়। কারণ মলয়াকে দেখলেই সত্যশেখর জিব বের করে ভেংচি কেটে দেয়। তো কলাবতীদের স্কুলের স্পোর্টস ডে তে কলাবতী ঘটিয়ে ফেলে এক কান্ড। যা নিয়ে পুরো স্কুলে হৈচৈ পড়ে যায়।
মা অকালে চলে গেছে। বাবা সেই শোকে সন্ন্যাসী। কলাবতীর জীবনে আপন বলতে দাদু আর কাকা সব। তারাও কলাবতীকে খুব ভালোবাসে। ছিপিছিপে শরীরের লম্বা কালোমতন মেয়েটিকে নিয়ে এই গল্প। কলাবতী স্কুলে কী কান্ড করেছিল কিংবা ক্রিকেট ম্যাচে শেষমেশ খেলার সুযোগ পেলো কী না জানতে হলে কলাবতীর সাথে চলতে এই বইয়ের পাতায়। এছাড়াও কলাবতীর কাকা সত্যশেখর কে মলয়ার বাবা কেমন প্যাঁচে ফেলেন এটাও কিন্তু বাকি।
🪷পাঠ প্রতিক্রিয়া 🪷
"কলাবতী" মতি নন্দীর লেখা কিশোর উপন্যাস। আমি তো বলবো একদম পিওর কিশোর উপযোগী বই। কলাবতীকে নিয়ে মতি নন্দী অনেকগুলো বই লিখেছেন বলে এটাকে সিরিজ বলা যায়। তবে কোনো বইয়ের সাথে কোনোটার খুব বেশি সামঞ্জস্য নেই প্রধান চরিত্রগুলো ছাড়া। মতি নন্দীর লেখা সবসময়ই ভালো লাগে কারণ কিশোর উপন্যাসে উনি সব বইয়ে চেষ্টা করেছেন ভাষা বেশ সহজ ও প্রাঞ্জল রাখতে।
মা হারা কলাবতীর গল্প পড়লাম বেশ ভালো লাগলো। এবং আমার বেশ ভালো লাগলো ওর দাদু এবং কাকাকেও। বইয়ের মাঝে রয়ে রয়েছে হাস্যরস। বিভিন্ন ঘটনা। আবার রয়েছে ক্রিকেট। মতি নন্দীর বই আর আপনি খেলাধুলা পাবেন না সেটা তো হতে পারে না। তবে এখানে ক্রিকেট নিয়ে কিন্তু প্রচুর কচকচানি নেই। বরং যেটুকু আছে গল্পের প্রয়োজনে দারুন মানিয়েছে। মলয়ার সাথে সত্যশেখরের খুনসুটি কিন্তু বেশ লেগেছে। হাসিও পেয়েছে। ভাবুন তো কেউ আপনাকে দেখলেই শুধু জিব বের করে ভেংচি কেটে যায় কেমন লাগবে!
কলাবতী বেশ বুদ্ধিমতী। এবং তাই বলে কিন্তু আবার দুষ্টু নয়। যথেষ্ট ভদ্রতাও আছে। কলাবতীর দাদুকে যেভাবে লেখক উপস্থাপন করেছেন তাতে বয়স কেবল মাত্র একটা সংখ্যা বোঝা যায়। অফুরন্ত প্রাণশক্তি রয়েছে এই বৃদ্ধ মানুষটির। নাহলে ভাবুন জীবনে চলার পথে তিনি কম আঘাত তো সহ্য করেননি। স্ত্রীর মৃ*ত্যু, পুত্রবধূর চলে যাওয়া, সেই শোকে ছেলে হলো বিবাগী। তাই একমাত্র নাতনি কলাবতীকে আর তিনি নিজের কাছ থেকে আলাদা রাখতে চাননি।
সত্যশেখর খুব মজার মানুষ। আইন পেশায় নিয়োজিত এই লোকটি কিন্তু বিলেত ফেরত আইন নিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি আছে। খেতে খুব ভালোবাসেন। এবং এরজন্য এখনো বয়স পঁয়তাল্লিশ হলেও নিজের বাবার কাছেও বকা শোনেন। ভাইঝি কলাবতীকে খুব ভালোবাসেন। একদম বন্ধুর মতো জুটি কাকা ভাইঝির। তবে বকদিঘির জমিদার হরিশংকরের মেয়ে মলয়া মুখার্জির সঙ্গে তার দ্বন্দ বোধহয় সহজে মিটবে না।
কলাবতী সিরিজের বাকি বইগুলোও পড়ে ফেলার ইচ্ছা আছে। আমি প্রচুর কিশোর উপন্যাস পড়ি বলে আমার তো দারুন লেগেছে। এবং বিশেষ করে কলাবতীকে বেশ প্রাণবন্ত একটা মেয়ে মনে হয়েছে। চোখে কিছু করে দেখানোর প্রত্যয়। প্রখর বুদ্ধিমত্তা কিন্তু তবুও দাদুর শিক্ষায় ভদ্রতাবোধ ও রয়েছে। কলাবতীর মজার মজার কান্ডে ওর কাকা কিন্তু মাঝে মাঝেই ওর সঙ্গী হয়। তবে কলাবতী একাই একশো আমি মনে করি। এই মেয়েটিকে আশা করি ভালো লাগবে পড়তে সবার কাছে।
🪷বইয়ের নাম: "কলাবতী"
🪷 লেখক: মতি নন্দী