যেমন ধরা যাক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সেই "গোঁসাইবাগানের ভূত" নামক কিশোর উপন্যাসটার কথা। কী অবিস্মরণীয় এক ক্রিকেট ম্যাচের বর্ণনাই না রয়েছে উপন্যাসটিতে! কিংবা স্মরণ করা যাক, "বক্সার রতন" উপন্যাসে সুব্বার সাথে রতনের সেই দুর্দান্ত বক্সিং ম্যাচটার কথা! এইসব দৃশ্য কি আর ভোলা যায়, বলুন? কিন্তু একটা ব্যাপার খেয়াল করেছেন কিনা জানি না, এই খেলাগুলোর কোনোটাই আসলে ওই উপন্যাসগুলোর মূল বিষয় ছিল না। অর্থাৎ খেলাধুলো কিশোর সাহিত্যে এসেছে বটে তবে তা অন্য কিছুর লেজ ধরে, প্রধানতম বিষয় হয়ে নয়। আর এখানেই আর সবার চাইতে মতি নন্দী আলাদা হয়ে যান।
.
আর দশটা বাংলা কিশোর উপন্যাস পড়তে গেলে কেবল গৎবাঁধা ছকেরই দেখা মেলে, হয় উপন্যাসে থাকবে কোনো এডভেঞ্চারের গল্প, নতুবা হবে কোনো গোয়েন্দা অভিযান, নয়তো লেখা হবে দারুণ জমজমাট এক সায়েন্স ফিকশান অথবা রচিত হবে নিছকই হাসির কোনো উপাখ্যান। কিন্তু মতি নন্দী যখন কিশোর উপন্যাস লেখায় হাত দিলেন তখন এসবের ধারে কাছেও গেলেন না তিনি। শুরু করলেন ভিন্ন এক বিষয় নিয়ে লেখালেখি। আর তা হল খেলা। নিজে স্পোর্টস সাংবাদিক ছিলেন বিধায় খুব কাছ থেকে খেলার প্রতিটি বিষয়কে অবলোকন করেছেন, জেনেছেন খেলার ভেতরকার রাজনীতি। আজীবন ছিলেন খেলাধুলোর মানুষ, তাই খেলাকে উপজীব্য করে লেখা তার এইসব উপন্যাস আলাদা প্রাণ পেয়েছে যেন। যেমন এই "মিনু চিনুর ট্রফি" উপন্যাসটার কথাই ধরা যাক না....
.
মৃন্ময় আর চিন্ময় ওরফে মিনু-চিনু, দুই ভাই। বাবা তন্ময় বসুমল্লিক, পেশায় মহাদেবপুর জুট এন্ড টেক্সটাইল মিলসের একজন কর্মকর্তা, মা তপতী বসুমল্লিক, এককালে টেনিস খেলতেন বটে কিন্তু এখন পুরোদস্তুর গৃহিণী। হঠাৎ করেই চিন্ময় যক্ষ্মায় আক্রান্ত হলে ছেলের স্বাস্থ্যোদ্ধারে বাবা-মা জান-প্রাণ লাগিয়ে চেষ্টা করার সময় টের পেলেন শরীরকে সুস্থ রাখার ভালো একটা উপায় হল খেলাধুলো করা। সুতরাং ছেলে দুটোকে দিয়ে খেলাধুলো করানো যাক। কী খেলা খেলানো যায়, ভাবতেই তপতীর সেই ভার্সিটি জীবনে খেলা টেনিসের কথাই মনে পড়ল। আর তাতেই দেখা গেল, এই খেলায় একটা সহজাত প্রতিভা রয়েছে মৃণ্ময়ের। কিন্তু খেললে যে পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটে, ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন করাটা কি ঠিক হবে? ঠিক তখনই উপন্যাসে এমন একটা সংলাপ পাওয়া যায়, "দাদা, দেশে প্রচুর ডাক্তার, উকিল, জজ-ব্যারিস্টার আছে, ক'জনের নাম দেশের লোকে জানে? কিন্তু কৃষ্ণনের নাম (উপন্যাসের টেনিস তারকা) করুন, বহু লোক তাকে চিনবে। মিলখা সিং, শৈলেন মান্না, পঙ্কজ রায়, ভিনু মানকাদ, লক্ষ লক্ষ লোক এদের নাম জানে!.... প্রতি বছর ভারতে লক্ষ লক্ষ ছেলে কলেজ থেকে বেরোচ্ছে, কিন্তু কৃষ্ণন তো একটাই।"
.
কিন্তু এই ছা-পোষা মধ্যবিত্ত কেরানি বাঙালিদেরকে কে বোঝাবে খেলার মাহাত্ম্য? উপন্যাসটা পড়তে পড়তে আমার বন্ধু মামুনের কথা মনে পড়ছিল। মামুন ভালো ক্রিকেট খেলত, সে হতে পারত বাংলাদেশের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান এবং কীপার, অথচ সে কী না এখন ৯টা-৭টার ব্যাংকে গিয়ে কলমের মজুরি করে এবং নিয়ম করে রোজ তিনবেলা নিজেকে গালি দেয়। দুটো ডাল ভাতের রোজগার করতে গিয়ে আমরা কতই না আমাদের স্বপ্নের জলাঞ্জলি দিই! মতি নন্দীর উপন্যাসগুলো আমাদের তখন অনুপ্রেরণা দেয় কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয়, শিক্ষা দেয় কীভাবে সফলতা নিজের করে নিতে হয়!
.
মতি নন্দীর গল্প তাই কেবলই কিশোরদের জন্যে লেখা নয়, মুষড়ে পড়া বড়দের জন্যেও।