''দাদু তুমিই তো বলেছিলে, একটা মানুষ ভাল না খারাপ সেটা বোঝা যায় পশুপাখিরা মানুষটাকে কীভাবে গ্রহণ করছে, তাই দেখে। পঞ্চু আমাকে নিশ্চিন্তে গ্রহণ করেছে। আমি যে সত্যি সত্যিই ভাল, এর থেকে বড় প্রমাণ আমার কাছে আর কী হতে পারে।''
স্কুল থেকে ফিরে কলাবতী স্কুলের ব্যাগটা টেবিলে নামিয়ে রেখে চেয়ারে ধপ করে বসে মুখ তুলে কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে বলল, ”উফফ কী গরম রে বাবা!…পাখাটা একটু বাড়িয়ে দেবে পিসি?” অপুর মা রেগুলেটর বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ”একটু জিরিয়ে হাত—মুখ ধুয়ে নাও, ততক্ষণে পেঁপেটা কেটে আনি।” ”পেঁপে!” কলাবতী সিধে হয়ে বসল। ”আমার খিদে নেই।” গম্ভীর মুখে কলাবতী বলল। ”খিদে নেই? রোজ এই এক কথা। কী খেয়েছ টিফিনে? ধুপুকে আজ ওর মা সঙ্গে দিয়েছিল খিচুড়ি। কাদা কাদা নয়, শক্ত শক্ত বেশ ঝরঝরে অনেকটা পোলাওয়ের মতো, বলল ভুনা খিচুড়ি। হটপট থেকে চামচে তুলে তুলে খাচ্ছে—”
”আর তুমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলে।” অপুর মা’র চোখে দপদপ করল ধিক্কার। সেটা অগ্রাহ্য করে কলাবতী বলল, ”দেখছিলুমই তো। দেখব না? কী জিনিস।” ”কেন তুমি কি কখনও খাওনি? এই তো ক’দিন আগে ভাদ্দর মাসে ছোটবাবু বললেন বিষ্টি হচ্ছে আজ খিচুড়ি খাব। করে দিলুম, বেগুনিও করলুম।” বলব কী পিসি, সে কী বড়িভাজা! মোহন্তর পকৌড়িও সেই বড়ির ধারেকাছে আসে না।” কথাগুলো বলার সঙ্গে কলাবতী জিভ দিয়ে শব্দ তৈরি করল।
শুনতে শুনতে কালো হয়ে এল অপুর মা’র মুখ। গম্ভীর থমথমে মুখে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বলল, ”পেঁপেটা, নিশ্চয় মুখে রুচবে, ওটা আমার রান্না করা নয়।” কলাবতী বুঝে গেল পিসি দারুণ চটেছে, কারও রান্নার প্রশংসা সহ্য করতে পারে না। ও চায় সবাই ওর রান্নারই গুণগান করুক। কলাবতী যেদিন বলল, ”বলব কী পিসি সে কী বড়িভাজা!” পরের শনিবারই অপুর মা নিজে থলি হাতে পাড়ার মুদির দোকানে গিয়ে দু—তিনরকমের ডাল, কালোজিরে, পোস্ত আর হিং কিনে আনল। ডাল ভিজিয়ে রাখল গামলায়।
তারপর গজগজ করতে করতে বলল, ”ধুপুর মা’র ভাজাবড়ি খেয়ে কালুদিদি মুচ্ছো গেছে! অমন বড়ি নাকি পিথিবিতে আর কেউ তৈরি করতে পারে না।
ছাদে বড়ি শুকানোর পর বড়ির গুণগত উৎকর্ষ পরীক্ষা করার জন্য পোস্ত বড়িভাজা, পলতার শুক্তোবড়ি, হিং দিয়ে ঝালের বড়ি এবং টকের বড়ি রান্না হল এক রবিবারের দুপুরে। কলাবতী বলল, ”তেঁতুলের টকে যে বড়ি খেলুম সেটা ধুপুকে খাওয়াতেই হবে পিসি, তুমি একদিন রেঁধে দাও, আমি ওর বাড়িতে নিয়ে গিয়ে খাইয়ে আসব।”
এইসব কথা শুনে খুশি চেপে নম্রস্বরে অপুর মা বলে, ”শুধু টকের বড়ি কেন, অন্য বড়ির রান্নাও টিপিন কেরিতে করে দোব, নিয়ে গিয়ে ধুপুর মাকে খাইয়ে আসবে আর বলে দেবে এসব আটঘরার বড়ি।” আধঘণ্টা পর টিফিন ক্যারিয়ার হাতে ঝুলিয়ে কলাবতী বের হলো। ধুপুদের ফ্ল্যাট প্রায় দশ—বারো মিনিটের পথ। কলাবতী যেতে যেতে দেখল পার্কের ছোট গেটের ধারে ডালমুট, চানাভাজা, সিদ্ধ ছোলা নিয়ে বসে একটা লোক। কলাবতী চিনেবাদাম কিনে খেতে বসলো।
একটু পরেই সে চমকে উঠে তাকাল, যেখানে টিফিন ক্যারিয়ার ফুটপাতে রেখে বাদাম কিনছিল সেই জায়গাটার দিকে, দেখল একটা বাঁদর টিফিন ক্যারিয়ার তুলে নিয়ে রেলিংয়ের ওপর দিয়ে উঠে পার্কের ভেতর নামল। তারপর ছুটে দূরে গিয়ে টিফিন ক্যারিয়ারের মাথার খিলটা সরিয়ে ঢাকনা তুলল। কলাবতী ধড়মড়িয়ে ছুটে গেল গেটের দিকে। পার্কের মধ্যে ঢুকে ”হেই হেই” বলে চিৎকার করতে করতে ছুটল বাঁদরটার দিকে। ওপরের বাটিতে রাখা ছিল আলু ও বেগুন দিয়ে বড়ির ঝাল। বাঁদরটা কপকপ করে সেগুলো তুলে মুখে পুরছে। কলাবতীকে ছুটে আসতে দেখে বাঁদরটা টিফিন ক্যারিয়ার ফেলে পাশেই রাধাচূড়া গাছটায় উঠে মুহূর্তে মগডালে পৌঁছে গেল।
এই বাঁদর হচ্ছে পঞ্চু। পঞ্চুর গল্প কিন্তু এখনো আরো বাকি আছে। কলাবতীর সাথে পঞ্চুও ওদের বাড়িতে পৌঁছে গেল। এবং এরপর ঘটবে আরো মজার ঘটনা। সাথে অবশ্যই অপুর মা তো রয়েছেই। তিনজনে মিলে কী কী কান্ড যে করবে এরা।
🫔পাঠ প্রতিক্রিয়া🫔
"কলাবতী, অপুর মা ও পঞ্চু" মতি নন্দীর লেখা আরেক��ি দারুন কিশোর উপন্যাস। মতি নন্দীর লেখা সবসময়ই ভালো লাগে কারণ কিশোর উপন্যাসে উনি সব বইয়ে চেষ্টা করেছেন ভাষা বেশ সহজ ও প্রাঞ্জল রাখতে। এই বইটিও কিশোর উপন্যাস হিসেবে বেশ ভালো। আর আমি আসলে না কলাবতী সিরিজ পড়ে কলাবতীকে কোনো বইয়েই রেটিং কমিয়ে দিতে পারছি না। সহজ সরল প্লটে কিশোর উপযোগী দারুন বই এগুলো। এখন পর্যন্ত এই সিরিজের তিনটা পড়ে শেষ করলাম। এবং আমার কাছে বেশ ভালো লেগেছে সবগুলোই। এরপরের গুলো ও পড়ে ফেলবো ইনশাআল্লাহ।
কলাবতী সিরিজের এই গল্পে কালুর নতুন সঙ্গী পঞ্চু। আমি বাঁদর ওই চিড়িয়াখানায় দেখেছি যা। এরপর হনুমান দেখা হয়েছে। তবে বাঁদর আর হনুমান আলাদা জিনিস সেটা অবশ্য জানা আছে। পঞ্চুকে নিয়ে যে লোক খেলা দেখাত সে চলে যাবার পর পঞ্চু একা হয়ে যায়। খিদের জ্বালায় ঘরে ঘরে খাবারের জন্য হানা দিতো। কলাবতীর কাছে ওর নতুন ঠিকানা দেখে পড়তে পড়তে ভালো লেগেছিল। কলাবতীর দাদু তো ঠিক কথাই বলেছেন যে পশুপাখিরা মানুষ চেনে। কে ভালো আর কে খারাপ। কার কাছে আশ্রয় পাওয়া যাবে। বাঁদরেরা খুব বুদ্ধিমান হয় এবং ট্রেনিং দিলে এরা অনেক কাজ করতে পারে। পঞ্চুও তেমন ধরনের বাঁদর।
এই বইটার বর্ণনাগুলোও বেশ ভালো। এই বইটায় খেলাধুলার বর্ণনা নেই। কিন্তু তারপরও আরেকটা ইন্টারেস্টিং অংশ রয়েছে। যেটা পড়তে ভালো লেগেছে। এবং বেশ টানটান উত্তেজনা অনুভব করছিলাম যে শেষমেশ কী হবে। এবং এই অংশটুকুই এই বইয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক আমার কাছে।
কলাবতী সিরিজের বাকি বইগুলোও পড়ে ফেলার ইচ্ছা আছে। ভালো বই আসলে বেশিদিন ফেলে রাখতে নেই তাই না। কলাবতীর সাথে অপুর মায়ের জুটি কিন্তু আমার কাছে বেশ লেগেছে। মা হারা মেয়েটার তবুও তো একটা সঙ্গী হয়েছে। কলাবতীর মজার মজার ঘটনা আশা করছি আপনাদেরও ভালো লাগবে। এইসব বইয়ে আসলে খুঁত ধরার মতো কিছুই নেই। সবমিলিয়ে বইটি আমার কাছে জমজমাট লেগেছে শেষের অংশটুকুর জন্য। আরেকজনের কথা বিশেষভাবে বলবো সত্যশেখর। কলাবতীর কাকা। কমিক টাইমিং দারুন।
🫔বইয়ের নাম: "কলাবতী, অপুর মা ও পঞ্চু"
🫔লেখক: মতি নন্দী