ক্রিকেট সিজনের শুরুতেই সি সি এইচ—এর অর্থাৎ ক্রিকেট ক্লাব অফ হাটখোলার নেট পড়ে মহামেডান মাঠের পাশে, মেম্বার গ্যালারির পিছনে। চার শরিকের মাঠ। সি সি এইচ দেয় বছরে চারশো টাকা। হেড মালী দুর্যোধন মহাপাত্র। পূজা শেষ হলেই মাঠের মাঝে একখণ্ড জায়গার চারকোণে বাঁশ পুঁতে দড়ি দিয়ে ঘিরে দেয়। জল ঢেলে আর কয়েকদিন রোলার টেনে দলাই—মলাই করে, দুর্যোধন যখন সগর্বে ঘাসবিহীন পাথুরে পিচের দিকে হাত তুলে বলল, ‘কী একখানা পিচো বনাইছি দেখ ননীবাবু, লরি চালাই দাও কিছু হবেনি।”
তখন ননীদা গম্ভীর থেকে আরও গম্ভীর হয়ে উঠলেন। তারপর খুব ঠাণ্ডা গলায় বললেন, ”ক্রিকেট লরি—ড্রাইভারদের খেলা নয়, দুর্যোধন।” ”মো কি সে কথা বলিছি। গত বৎসর আপোনি বলিলেন, কড়া ইস্তিরি—করা শার্টের মতো পেলেন পিচ না হলি ব্যাটোসম্যান স্টোরোক করি খেলবি কেমনে? তাই এবছর ইস্তিরির মতো করি রোলার টানিছি।”
”ক্রিকেট ধোপাদেরও খেলা নয়, দুর্যোধন।” দুর্যোধন একটু ঘাবড়ে গেল ননীদার আরও ঠাণ্ডা গলার স্বরে। ক্ষুণ্ণ হয়েই সে বলল, ”গত বৎসরের আগের বৎসরো বলিলেন, কী পিচ বনাইছিস, এ যে খেতি জমি, ধানো ছড়াই দিলি গাছো হই যিব।” ”ক্রিকেট চাষাদেরও খেলা নয়, দুর্যোধন।”
এবার দুর্যোধন ভ্রূ কুঁচকে বিরক্ত চোখে ননীদার ভাবলেশহীন মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ”কিরিকেট তবে কারা খেলে?” ”ভদ্রলোকেরা।” ননীদা আকাশবাণী ভবনের গম্বুজ থেকে শহিদ মিনারের ডগায় উদাস চাহনিটাকে সুইপ করে নিয়ে গেলেন। ”পিচ হবে স্পোর্টিং, বোলার আর ব্যাটসম্যানকে ফিফটি—ফিফটি সুযোগ দেবে।”
তো এই ভদ্রলোকের খেলায় ননীদা এতটা বছর ধরে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন। ননীদা গত বছর পর্যন্ত ক্লাবের ক্যাপ্টেন ছিলেন। কত বছর ছিলেন সেটা কারো পক্ষে খাতাপত্তর না দেখে বলা শক্ত। সম্ভবত সিকি—শতাব্দী। বারো বছর মাত্র এই ক্লাবে আছেন লেখক। তার মধ্যে ননীদাকে যে রূপে দেখেছেন তা বোঝাতে হলে, প্রেসিডেন্ট, সেক্রেটারি, ট্রেজারার, সিলেকটর, স্কোয়ার, মালী, সাবস্টিটিউট ফিল্ডার, ক্যাপ্টেন প্রভৃতিকে একত্রে একটি লোকের মধ্যে ভরে দিলে যা হয়, উনি তাই। ওঁর মুখের উপর কথা বলতে পারে বা ওঁর কথা অগ্রাহ্য করার সাহস দেখাতে পারে এমন কাউকে এখনও সি সি এইচ—এ দেখেনি কেউ। অনেককে গাঁইগুই করতে শুনেছে কেউ কেউ, কিন্তু আড়ালে। দুর্যোধনের পোষা নেড়িকুত্তাটা পর্যন্ত ননীদার গলার আওয়াজ পেলে লেজটাকে নামিয়ে সরে যায়।
মনে রেখো মতি, এবছর তুমি সি সি এইচ—এর ক্যাপ্টেন। তোমাকে ট্যাক্টফুল হতে হবে।” লেখককে এভাবেই নির্দেশনা দিয়েছিলেন ননীদা।
সবিনয়ে ঘাড় নেড়ে লেখক বললেন ”নিশ্চয়। তা ছাড়া আপনি তো আছেনই, দরকার পড়লে পরামর্শ নিশ্চয় করব।” খুশি করার জন্য কথাগুলো বলেননি লেখক। বিপদে ননীদাকে সত্যিই দরকার হবে। ননীদার ট্যাকটিকস, যাকে সবাই ‘ননীটিকস’ নামে আড়ালে অভিহিত করে, কতবার যে সি সি এইচ—কে বিপদ থেকে উদ্ধার করেছে তা লিখতে গেলে মহাভারত হয়ে যাবে।
ক্রিকেট ক্লাব অফ হাটখোলার অবস্থা খুবই শোচনীয়। বলা যায় একদম গরীব ক্লাব। প্লেয়ারদের ব্যাট, গ্লাভস, এমনকি ঠিক করে বল কিনে দেয়ার মতো টাকা জোটে না। ক্লাব চলছে বড় বড় ধনীদের অনুদানে। অর্থবান, যশোলোভী, ঈষৎ বোকা ধরনের, তোষামোদপ্রিয় লোক খুঁজে ব���র করে, তাকে নানানভাবে জপিয়ে প্রেসিডেন্ট বানিয়ে (ননীদা বলেন, ‘ট্যাকটিকস প্রয়োগ করে’) মোটা টাকা আদায় করার দায়িত্ব ননীদাই এতকাল বহন করে আসছেন। এখনো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই টাকার উপরই ক্লাবের জীবন—ম রণের অর্ধেক নির্ভর করে।
ক্লাবের নতুন প্লেয়ার তন্ময় একটু গোঁয়ার ধরনের। ননীদাকে ঠিক মানতে চায় না। দেখা যাক ম্যাচগুলোতে। তবে সবকিছু একা হাতে সামলে এই মানুষটি এখনো ছেলেপুলেদের ক্রিকেট খেলা শেখান নেটে হাতে ধরে। সবার কাছে শ্রদ্ধার পাত্র ননীদা কী পারবেন এই ক্রিকেট ক্লাব অফ হাটখোলাকে টিকিয়ে রাখতে? সংসার জীবনে বউ গত হয়েছেন আরো দশ বছর আগে, নিঃসন্তান মানুষটি ক্রিকেটে আজীবন কী নট আউট থাকতে পারবেন মাথা উঁচু করে?
🍡পাঠ প্রতিক্রিয়া🍡
"ননীদা নট আউট " এই বইটি কিশোর উপন্যাস হলেও আমার বেশ ভালো লাগলো। মতি নন্দীর লেখা আগেও পড়া হয়েছে। ওনার বই থেকে তৈরি হয়েছে সিনেমাও। একজন ক্রিড়া সাংবাদিক হবার সুবাদে তিনি খেলা বিষয়ক বেশ কয়েকটি লেখা লিখেছেন। এই বইটিকে আমি বলতে পারি খেলোয়াড়ি জীবন নয় বরং একজন শিক্ষকের গল্প, হাতে ধরে যিনি গড়ে তোলেন আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। নিজেও খেলেছেন তবে খেলার প্রতি ভালোবাসা থেকে এখনো প্যাড, গ্লাভস, ব্যাট তুলে রাখেননি। এখনো ক্রিকেট তার ভালোবাসা। এরকম অসংখ্য কারিগর আড়ালে রয়ে যান। যাদের থেকে শিখে তৈরি হয় আগামী দিনের অসংখ্য প্রতিভা। কেউ তাদের মনে রাখে, কেউ রাখে না। তবুও বলা যায় তারা নট আউট। জীবন এবং ক্রিকেট দুই জায়গায়।
ভালো লেগেছে বইটি এবং মতি নন্দীর বই মানেই এখানে ভাষাগত প্রয়োগ কখনোই তেমন খটমটে মনে হয়নি। এবং চরিত্রগুলো নিয়ে তিনি সমানভাবে কাজ করেছেন। তুলে ধরেছেন কোন ক্ষেত্রে কার কী ভূমিকা হতে পারে। এবং মতি নন্দীর খেলাধুলা বিষয়ক লেখাগুলো পড়লে আসলে সেই ক্রিকেট হোক বা ফুটবল একটা জীবন্ত ছবি যেন কল্পনায় ভেসে আসে।
আমি মতি নন্দীর লেখা সবসময়ই পছন্দ করি। খেলা বিষয়ক ছাড়াও ওনার আরো বিখ্যাত বই রয়েছে। পড়ার ধারা অব্যাহত থাকবে।
🍡বইয়ের নাম: "ননীদা নট আউট"
🍡লেখক: মতি নন্দী
🍡প্রকাশনা: আনন্দ পাবলিশার্স
🍡ব্যক্তিগত রেটিং: ৪.১/৫