দুই বঙ্গসন্তান ১৭ মে ২০১০ ছুঁয়ে এলেন পৃথিবীর ‘তৃতীয় মেরু’, এভারেস্ট শৃঙ্গ। এভারেস্ট জয় শুরু হয়েছিল ২৯ মে ১৯৫৩ এডমন্ড হিলারি ও তেনজিং নোরগের শীর্ষারোহণ দিয়ে, তার পর থেকে এভারেস্ট শৃঙ্গে উঠেছেন প্রায় চার হাজার মানুষ। তবু এই দুই পর্বতারোহী বসন্ত সিংহ রায় ও দেবাশিস বিশ্বাসের কৃতিত্ব অনন্য হয়ে থাকবে। এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গ থেকে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও বেসরকারি উদ্যোগে এভারেস্ট আরোহণ সফল হল। গত দুই দশকে এমন চেষ্টা একাধিকবার হয়েছে, কিন্তু সাফল্য এই প্রথম। দেবাশিস বিশ্বাস এই বইতে শুনিয়েছেন সেই অভিযানের বৃত্তান্ত। কিন্তু আর-পাঁচটা অভিযান-কাহিনির মতো কেবল একটা অভিযানের কথা নয়, এই বইতে দেবাশিস শুনিয়েছেন তাঁর আত্ম-অন্বেষণের কাহিনি। এক অসম্ভব স্বপ্ন লালন করে চলা আর সেই স্বপ্নপূরণের জন্য নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়ার বৃত্তান্ত। এভারেস্ট এই বইতে শেষ অবধি হয়ে ওঠে একটা প্রতীকমাত্র।
দেবাশিস বিশ্বাস-এর জন্ম অসমের গৌহাটিতে। চার ভাই, এক বোনের মধ্যে দেবাশিস দ্বিতীয় সন্তান। শৈশবেই পিতার বদলির চাকরির জন্য নানা জায়গা ঘুরে কৃষ্ণনগরে আসে তাঁর পরিবার। সেখানে এ ভি হাইস্কুলে বিদ্যালয়জীবন শেষ করে কৃষ্ণনগর গভর্নমেন্ট কলেজ থেকে স্নাতক। নদীয়া গ্রামীণ ব্যাঙ্কে চাকরির পর যোগ দেন আয়কর বিভাগে, ইন্সপেক্টর পদে৷ পর্বতারোহণ শুরু ১৯৯৫ থেকে, মাউন্টেনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন অফ কৃষ্ণনগরের সঙ্গে। পর্বতারোহণে তাঁর মুখ্য প্রেরণা ছিলেন স্বর্গত পিতা জিতেন্দ্রনাথ। বাড়ি ব্যারাকপুর শহরের উপকণ্ঠে পলতায়। বর্তমান নিবাস বিধাননগরের তেলেঙ্গাবাগানে আয়কর বিভাগের সরকারি আবাসনে। স্ত্রী মুক্তি কলকাতা বিমানবন্দরে এয়ার ইন্ডিয়ায় কর্মরতা। দুই ছেলে শান্তনু ও দেবাংশু।
পর্বতারোহণ নিয়ে বাংলায় লেখা বইয়ের সংখ্যা খুবই নগণ্য। অধিকাংশই বই-ই ইংরেজীতে লেখা বা অনুবাদ করা এবং তা ভরা থাকে বিভিন্ন টেকনিক্যাল টার্মে যা সাধারণ পাঠকের বোধগম্য হয় না অনেক সময়। তাছাড়া আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশে পর্বতারোহনের মত একটি ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল খেলায় অংশগ্রহন করাও অনেকটা বিলাসীতা। তাই এই ক্রীড়ায় অনগ্রসরতা বা অনীহার কারণে ও আমাদের কাছে পর্যাপ্ত রিসোর্স না থাকার কারণে আমরা ধারণাও করতে পারি একটি পর্বত অভিযান কিভাবে হয়ে থাকে, কতটা অ্যাডভেঞ্চারাস, কতটা শ্রম ও আইসোলেশনের দরকার পড়ে।
অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় বা যাদের পর্বতারোহন সম্পর্কে জানার আগ্রহ আছে কিন্তু পারছে না তাদের জন্য বইটি জন্য অনেক সহায়ক হতে পারে। যথেষ্ট তথ্যবহুল ও অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় লেখক তার অভিযানের বর্ণনা করেছেন, একদম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। এতটাই সাবলীল যে একটি বাচ্চা ছেলেও পড়তে থাকলে মনে হবে নিজেই তার সাথে সাথে একবার এভারেস্ট আরোহন করে এসেছে।