Shahriar Kabir (in Bengali: শাহরিয়ার কবির) is a Bangladeshi journalist, filmmaker, human rights activist and author. His books focuses on human rights, communism, fundamentalism, history, juvenile and the Bangladesh war of independence.
শাহরিয়ার কবির সংবাদপত্রে বেশ বিতর্কিত আদমি। উনাকে নিয়ে নানান কচকচানি টিভি বা ফেসবুকে দেখে আসছি। ঘাতক নির্মূল কমিটির অন্যতম মুখপাত্র তিনি। তবে তিনি যে অসংখ্য কিশোর উপন্যাসের জনক ও সুলেখক তা আমার জানা ছিলোনা। একাত্তরের যীশু ছবিটা উনারই বইয়ের এডাপশন, সেটা জানতাম না আমি।
সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুল ১৮৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বেলজিয়ামের বেনেডিক্টাইন ধর্মযাজক গ্রেগরি ডি গ্রুট দ্বারা। তাঁর নামেই স্কুলটির নামকরণ সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুল। প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে এক বিশাল ঐতিহ্যবাহী ইতিহাস। অমর্ত্য সেন, তাজউদ্দীন আহমেদ,সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মত দেশ ও ইতিহাস বদলে দেওয়া ব্যক্তিত্বরা উক্ত প্রতিষ্ঠানের ছাত্র। শাহরিয়ার কবির খুব চমৎকার প্রাঞ্জলতার সাথে তাঁর সাধু গ্রেগরীর দিনগুলোর কথা লিখেছেন। শুধু সেই স্কুলের পড়ার নানান অভিজ্ঞতা নয়, আসলে তাঁর শৈশব থেকে স্কুল শেষ হওয়া পর্যন্ত আত্মজীবনী বিধৃত হয়েছে এতে। শাহরিয়ার কবিরের লেখার ছটায় ষাটের দশক যেন মূর্ত্য হয়ে উঠেছে চোখের সামনে। তখনকার ঢাকা শহরের নানান অনুষঙ্গ, সেইসাথে তাঁর শৈশব স্মৃতির নানান ঘটনা বেশ উপভোগ্য ও পাঠককে নিজ শৈশব সম্পর্কে নস্টালজিক করে তোলে। সাধু গ্রেগরীর দিনগুলো স্মৃতিকথা হিসেবে তো চমৎকার বটেই, ষাটের দশকের অসাধারণ ডকুমেন্টেশান হিসেবেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
শাহরিয়ার কবিরের 'শাহরিয়ার' নামটি রেখেছিলেন লেখকের চাচাত ভাই কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রনির্মাতা জহির রায়হান। শহীদুল্লাহ কায়সাকে শাহরিয়ার কবির সব সময় বড়দা বলে সম্বোধন করতেন। 'সাধু গ্রেগরীর দিনগুলি' কিশোরসাহিত্য নয়। বরং ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সেন্ট গ্রেগরী হাইস্কুলে এগারো বছর পড়ার অভিজ্ঞতা ও নিজের কিশোরবেলাকে নিয়ে লিখেছেন। খুব সুন্দর স্মৃতিকথা। ৯৫ পাতার বইটির প্রকাশক চারুলতা।
পঞ্চাশের দশকে পূর্ব পাকিস্তান সাবেক মন্ত্রী হামিদুল হক চৌধুরীর প্রায় পঞ্চাশ বিঘা জুড়ে এক বাগানবাড়ি ছিল আজকের গ্রিন রোডে। শাহরিয়ার কবিরের মায়ের দিকের আত্মীয় ছিলেন তিনি। সেই হিসাবে হাওয়া বদলের জন্য অসুস্থ মাকে নিয়ে এই বাগানবাড়িতে থাকতেন ছোট্ট শাহরিয়ার কবির, তার ছোটো ভাই বাবলু, বড়ো ভাই ও পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের চাকরিজীবী পিতাকে নিয়ে। বেশ সুখপাঠ্য বর্ণনা দিয়েছেন ছয় দশক আগের গ্রিন রোডের। আজকের সঙ্গে তা মিলবে না। বরং পড়তে গিয়ে রূপকথা মনে হতে পারে।
লেখকের ছয় বছর বয়সে তার মা মারা যান। ছোটো ভাইয়ের বয়স দেড় বছরের মতো। বড়ো ভাইয়ের সঙ্গে কখনোই লেখকের সুসম্পর্ক ছিল না। তার এই বড়ো ভাই মা মারা যাওয়ার পর ছোটো ভাইকে দেখে রাখার বদলে জালিমের ভূমিকায় নামেন। ক্রমাগত মারধর করে বিষিয়ে তোলেন জীবন। এই স্মৃতির কথা তিনি ভোলেননি।
গ্রিন রোডের বাগানবাড়ি ছেড়ে চলে আসেন পুরোনো ঢাকায়। ভর্তি হন সেন্ট গ্রেগরি স্কুলে। নানা অম্ল-মধুর স্মৃতি লিখেছেন। সেই স্মৃতি কখনো স্কুলের বন্ধুদের নিয়ে। কখনো চাচাত ভাই শহীদুল্লাহ কায়সার ও জহির রায়হানকে নিয়ে লিখেছেন। তার পিতার দ্বিতীয় বিয়ের বাজার করতে পিতার সঙ্গে গিয়েছিলেন, এমন অভিনব ঘটনারও স্মৃতিচারণ করেছেন।
এই বইয়ের সবচেয়ে স্মরণীয় অংশ স্কুলের শিক্ষক ফাদার রোণাল্ডের সঙ্গে লেখকের তিক্ত অভিজ্ঞতা। পাঠককে নাড়া দেবে শিক্ষকের সঙ্গে কিশোর শাহরিয়ার কবিরের ব্যবহার ও তার অনুতাপ।
কথাসাহিত্যিক শাহরিয়ার কবিরের সঙ্গে তার রাজনৈতিক আদর্শের তুলনা করে বইটা পড়তে বসবেন না। এই দুই সত্তাকে সচেতনভাবে আলাদা করতে পারলে কিশোর ঔপন্যাসিক শাহরিয়ার কবিরের যে কোনো কিশোরসাহিত্য উপভোগ করতে পারবেন। কিন্তু বাংলাদেশি পাঠক কী শাহরিয়ার কবিরের কিশোরসাহিত্যিক সত্তা ও রাজনৈতিক আদর্শের সত্তাকে আলাদা করে দেখতে পারবে? বর্তমানে এতখানি ঔদার্য কী দেখানোর সাহস তাদের রয়েছে?
এমন কিছু বই আসলে বড় বয়েসে পড়া বেশ ভালো। মায়াময় শৈশবকে হৃদয়ের গভীর থেকে অনুভব করার আরো একবার সুযোগ হয় তাহলে। এই বইয়ের অনেক চরিত্রের সাথেই আগে পরিচয় হয়েছে লেখকের অন্যান্য উপন্যাস পড়ার সুবাদে। কত নির্ভেজাল, সাহসী আর মায়াময় ছিল তাঁদের কৈশোরের দিন। আমাদের ও ছিল। আফসোস, এখনকার ছেলেমেয়েরাই বড় দুর্ভাগা। তারা নির্মলতা কী দিন দিন তা ভুলেই যাচ্ছে হয়তো।
লেখকের স্কুল জীবনের স্মৃতিকথা মূলত এই বই। এতে যেমন স্কুল, বন্ধুরা,আড্ডা, খেলা এসব উঠে এসেছে, তেমনি ৬০ দশকের ঢাকার একটা ভিন্টেজ চিত্র ফুটে উঠেছে পুরো লেখায়। পড়তে এত্ত ভাল লাগছিলো।
সম্ভবতঃ শাহরিয়ার কবিরের জীবনের সেরা কাজ। স্কুলজীবন নিয়ে এমন মমতা ভরা লেখা আর কোথাও দেখি নাই। টম ব্রাউনের স্কুল জীবনের কথা মনে পড়ে, তবে সেটা ফিকশন, এটা নন ফিকশন আত্মজীবনী ধাঁচের।