দুর্নীতির সাথে আপস না করায় সরকারি চাকরি ছাড়তে বাধ্য হলেন ইঞ্জিনিয়ার হাবিবুল বাশার। পুরো পরিবার নিয়ে খাগড়াছড়ির কমলছড়িতে চলে আসলেন তিনি। লীজ নেয়া জায়গাটাতে চাষবাস করে বাকি জীবনটা পার করে দেবার ইচ্ছা তার। কিন্তু মুল্লুকটা যে মগদের! এখানে কি আর চাইলেই কোন কাজ ঠিক ভাবে হয়? ১৯৭৭-৮১'র পার্বত্য অঞ্চলের প্রেক্ষাপটে লেখা অনবদ্য এ কিশোর উপন্যাসটিতে উঠে এসেছে তখনকার রাজনীতি আর জীবনযাপনের এক খন্ডচিত্র।
Shahriar Kabir (in Bengali: শাহরিয়ার কবির) is a Bangladeshi journalist, filmmaker, human rights activist and author. His books focuses on human rights, communism, fundamentalism, history, juvenile and the Bangladesh war of independence.
❝ বার্চবনে ঝড় ❞ উপন্যাস দিয়ে শাহারিয়ার কবিরের লেখার সাথে আমার পরিচয় ঘটে। একটা উপন্যাস পড়েই ঠিক করে ছিলাম উনার সব কিশোর উপন্যাস পড়বো।
সীমান্তে সংঘাত আমার পড়া তৃতীয় উপন্যাস। বরাবরের ন্যায় আবার মুগ্ধ হলাম। নির্মেদ গল্প। অসম্ভব সুন্দর ভঙ্গিতে গল্প বলার প্রক্রিয়া। পাঠককে গল্পের মধ্যে টেনে রাখে। পড়তে পড়তে অবাক হতে হয়। এত চমৎকার লেখনী।
"সীমান্তে সংঘাত" আদিবাসী এবং পাহাড় কেন্দ্রীক গল্প। এখানে একে একে উঠে এসেছে পাহাড়ি আদিবাসীদের লাঞ্ছিত হওয়ার কথা,শান্তিবাহিনী, বন্যদস্যু আর তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। সব মিলিয়ে বলতে গেলে,এটা নামেই কিশোর উপন্যাস। আদতে সবার জন্য খুব জরুরি একটা বই। ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ সময়ে এসে, এটা যখন কেউ পড়বে,পাহাড় সংক্রান্ত অনেক প্রশ্নের সদুত্তর পাবে।
একাধারে চমৎকার এবং জরুরি একটা বই ❝ সীমান্তে সংঘাত ❞।
বাবা বললেন,"আগে আমরা ভাবতাম,এদেশ থেকে ব্রিটিশরা চলে গেলে আমরা স্বাধীন হবো,পাকিস্তান পাবো,সুখে থাকবো।ব্রিটিশ চলে গেলো,সাধারণ মানুষের অবস্থা বদলালো না;পাকিস্তান আমলে আমরা বলতাম,পাঞ্জাবিরা চলে গেলে,আমরা পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে বাংলাদেশ বানালে সুখে থাকবো,পাঞ্জাবিরা গেলো,বাংলাদেশ এলো,সুখ কি এলো?"
নুলিয়াছড়ির পরে এটাই মনে হয় আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে। গতবছর ডিসেম্বরে গেলাম বান্দরবান।যাওয়ার আগে গাইগুই করলেও যাওয়ার পরে বান্দরবান এর রূপ-লাবণ্য দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। আর এই গল্পের টুটুলরা ঢাকা ছেড়ে পুরো পরিবার নিয়ে নতুন আবাসস্থল তৈরি করেছিলো বান্দরবান ছেড়েও দূরে-খাগড়াছড়ি এবং সেখান থেকেও খানিকটা দূরের কমলছড়িতে।কমলছড়ির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য,সেখানে টুটুলদের নতুন সংসার,জীবনযাপন লেখক ভীষণ চমৎকার ভাবে তুলে ধরেছেন। শাহরিয়ার কবির মোটামুটি তাঁর সব কিশোর উপন্যাসেই রাজনৈতিক ব্যাপার স্যাপার অন্তর্ভুক্ত করেন,তা সে বিশ্ব রাজনীতি হোক বা দেশীয় অভ্যন্তরীণ রাজনীতি।এই বইয়েও তা দেখা যায়। দেশের সরকারের সাথে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বিবাদ,বা সর্বহারা দলের সাথে আর্মির বিবাদ ইত্যাদি উঠে এসেছে এখানে।বইয়ের সমাপ্তির মত সুন্দর কিছু হয়তো এখন বাস্তবে সম্ভব নয়,তবুও ইতিবাচক সমাপ্তি গল্প হিসেবে খারাপ লাগেনাই।
এখনকার কিশোরসমাজ কি এই চমৎকার লেখা গুলা পড়ে? না সেলিব্রেটি লেখকের অটোগ্রাফ নিয়েই খালাশ?
গল্পটা টুটুল নামে এক কিশোরের। মা-বাবা, বাবার মা যাকে ওরা দিদা ডাকে, টুটুলের ছোট দুই ভাইবোন এবং তাদের দেখেশুনে রাখা বিহারী আয়া বড়িবি, এদের নিয়ে গোছানো সংসার টুটুলের। টুটুলের ফুফুর শ্বাশুড়ির সাথে দিদার ঝগড়া হয় রান্না নিয়ে, তাও টেলিফোনে! টুটুলের বন্ধু-বান্ধবরা এসে আড্ডা জমায় তাদের ছিমছাম বাড়ির লম্বা ঝুল বারান্দায়। ঘনঘন চা খায়, সাথে দিদার আদুরে বকুনি। বই পড়ে, খেলাধুলা করে, ব্যায়াম করে টুটুল শরীরকে বানিয়েছে শক্তপোক্ত। পড়াশোনায় ভালো, উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, সুন্দর গোছানো সংসার। কিন্তু হঠাৎ নেমে এলো কালো ছায়া। এক রাতের সিদ্ধান্তে চাকরি ছেড়ে দেন টুটুলের বাবা, হাবিবুল বাশার। কারণ নৈতিকতা ঠিক রেখে চাকরি করতে বাঁধা দেয়া হয়েছিল তাকে। এরপর সংসারের সকলকে নিয়ে পাড়ি জমান খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে, ওখানে গিয়ে চাষ-বাস করে অন্য একটা জীবন কাটানোর উদ্দেশ্য। কিন্তু সীমান্তে যে লেগে আছে সংঘাত! এলাকাটা মগদের, বাঙালিদের অত্যাচারের কারণে সকল বাঙালিকেই তারা দেখে ঘৃণার চোখে! এমন সফল এক ইঞ্জিনিয়ারের হুট করে শহর ছেড়ে পাহাড়ে বাস করাটাকে তারা দেখলো সন্দেহের চোখে! শুধু তারাই না, পাহাড়ি রাজনৈতিক দলগুলোও তৎপর হয়ে উঠল। ঘটতে থাকলো একের পর এক রোমাঞ্চকর ঘটনা।
এটি আমার অন্যতম প্রিয় এক কিশোর উপন্যাস। এত অসাধারণ কিছু অনুভূতি আছে এই বইয়ে, কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যেতে দারুণভাবে সাহায্য করে তা। একই সাথে পাহাড়িদের প্রতি মমতায় হৃদয় করে তোলে আর্দ্র।
পাহাড়ি চড়াইয়ে গাড়ি খারাপ হয়ে যাওয়া, সবাই মিলে গাড়ি ঠেলা, সন্ধ্যাবেলার গা ছমছমে আবহাওয়াতে মুনিয়া পাখির ডাক! কী, গা শিউরে উঠছে না? পাহাড়ের বাঙালি শিক্ষক এবং তার টুটুলের বয়েসী ছেলে বিদ্যুৎ এর সাথে দেখা, তাদের সুন্দর উঁচু বাড়িতে রাত্রিযাপন, ঢেঁকিছাঁটা লাল চালের ভাত আর কই মাছ দিয়ে রাতের খাবার! আহ, অমৃত যেন। আর তারপর পাহাড়ের মাঝেই টুটুলদের কাঠের বাড়ি বানানো, নোয়াখালির কেয়ারটেকারের পাথরের বাড়ি আর মজার মজার কাণ্ড, পুকুর থেকে নিজ হাতে ধরা তেলাপিয়া মাছের দোপেঁয়াজা! প্রতিটা দৃশ্য এখনো ভেসে উঠে চোখে। মনে হয় ছুটে এমন কোন জায়গায় চলে যাই। তারপর ডাকাতের আক্রমণ, পাহাড়ে চারমিনারের গোড়া, বনে শিকারে গিয়ে রহস্যময় তরুণের সাথে পরিচয় এবং পরে আরো অনেক অনেক ঘটনা। সব মিলিয়ে কৈশোরের এই বইটির স্মৃতি আজো অমলিন। শেষটাও আনন্দময়। শাহরিয়ার কবিরের কিশোর উপন্যাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য রাজনৈতিক কোন একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রাখা। এটাতেও ছিল সিরাজ শিকদার, আবদুল হকের দলের কথা, শান্তিবাহিনীর কথা। অনেক বছর পর আজকে আবার বইটা পড়ে ভীষণ ভালো একটা সন্ধ্যা কাটালাম।
সত্যি বলতে কি, সাহিত্যগুণের দিক থেকে বইটা এই লেখকের সমসাময়িক অনেকের থেকেই সমৃদ্ধ। বইটা খুবই চমৎকার। এডভেঞ্চার পছন্দ করলে বইটা যে কারই ভালো লাগবে। মজার ব্যাপার হল বয়স হবার পর আমি অনুধাবন করি যে এই লেখকের চিন্তাধারার সাথে আমার চরম আপত্তি রয়েছে। কিন্তু আমি ইংরেজি সাহিত্যিক সালমান রুশদিকে যেভাবে বিচার করি শাহরিয়ার কবিরকেও সেভাবেই বিচার করব।