গল্পটা টুটুল নামে এক কিশোরের। মা-বাবা, বাবার মা যাকে ওরা দিদা ডাকে, টুটুলের ছোট দুই ভাইবোন এবং তাদের দেখেশুনে রাখা বিহারী আয়া বড়িবি, এদের নিয়ে গোছানো সংসার টুটুলের।
টুটুলের ফুফুর শ্বাশুড়ির সাথে দিদার ঝগড়া হয় রান্না নিয়ে, তাও টেলিফোনে! টুটুলের বন্ধু-বান্ধবরা এসে আড্ডা জমায় তাদের ছিমছাম বাড়ির লম্বা ঝুল বারান্দায়।
ঘনঘন চা খায়, সাথে দিদার আদুরে বকুনি। বই পড়ে, খেলাধুলা করে, ব্যায়াম করে টুটুল শরীরকে বানিয়েছে শক্তপোক্ত। পড়াশোনায় ভালো, উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, সুন্দর গোছানো সংসার।
কিন্তু হঠাৎ নেমে এলো কালো ছায়া। এক রাতের সিদ্ধান্তে চাকরি ছেড়ে দেন টুটুলের বাবা, হাবিবুল বাশার। কারণ নৈতিকতা ঠিক রেখে চাকরি করতে বাঁধা দেয়া হয়েছিল তাকে। এরপর সংসারের সকলকে নিয়ে পাড়ি জমান খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে, ওখানে গিয়ে চাষ-বাস করে অন্য একটা জীবন কাটানোর উদ্দেশ্য।
কিন্তু সীমান্তে যে লেগে আছে সংঘাত!
এলাকাটা মগদের, বাঙালিদের অত্যাচারের কারণে সকল বাঙালিকেই তারা দেখে ঘৃণার চোখে!
এমন সফল এক ইঞ্জিনিয়ারের হুট করে শহর ছেড়ে পাহাড়ে বাস করাটাকে তারা দেখলো সন্দেহের চোখে! শুধু তারাই না, পাহাড়ি রাজনৈতিক দলগুলোও তৎপর হয়ে উঠল। ঘটতে থাকলো একের পর এক রোমাঞ্চকর ঘটনা।
এটি আমার অন্যতম প্রিয় এক কিশোর উপন্যাস। এত অসাধারণ কিছু অনুভূতি আছে এই বইয়ে, কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যেতে দারুণভাবে সাহায্য করে তা। একই সাথে পাহাড়িদের প্রতি মমতায় হৃদয় করে তোলে আর্দ্র।
পাহাড়ি চড়াইয়ে গাড়ি খারাপ হয়ে যাওয়া, সবাই মিলে গাড়ি ঠেলা, সন্ধ্যাবেলার গা ছমছমে আবহাওয়াতে মুনিয়া পাখির ডাক! কী, গা শিউরে উঠছে না?
পাহাড়ের বাঙালি শিক্ষক এবং তার টুটুলের বয়েসী ছেলে বিদ্যুৎ এর সাথে দেখা, তাদের সুন্দর উঁচু বাড়িতে রাত্রিযাপন, ঢেঁকিছাঁটা লাল চালের ভাত আর কই মাছ দিয়ে রাতের খাবার! আহ, অমৃত যেন।
আর তারপর পাহাড়ের মাঝেই টুটুলদের কাঠের বাড়ি বানানো, নোয়াখালির কেয়ারটেকারের পাথরের বাড়ি আর মজার মজার কাণ্ড, পুকুর থেকে নিজ হাতে ধরা তেলাপিয়া মাছের দোপেঁয়াজা! প্রতিটা দৃশ্য এখনো ভেসে উঠে চোখে। মনে হয় ছুটে এমন কোন জায়গায় চলে যাই।
তারপর ডাকাতের আক্রমণ, পাহাড়ে চারমিনারের গোড়া, বনে শিকারে গিয়ে রহস্যময় তরুণের সাথে পরিচয় এবং পরে আরো অনেক অনেক ঘটনা।
সব মিলিয়ে কৈশোরের এই বইটির স্মৃতি আজো অমলিন।
শেষটাও আনন্দময়।
শাহরিয়ার কবিরের কিশোর উপন্যাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য রাজনৈতিক কোন একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রাখা। এটাতেও ছিল সিরাজ শিকদার, আবদুল হকের দলের কথা, শান্তিবাহিনীর কথা।
অনেক বছর পর আজকে আবার বইটা পড়ে ভীষণ ভালো একটা সন্ধ্যা কাটালাম।