‘আরবদের কাছে কবিতার চাইতে প্রিয় আর কিছু নেই। কবিতার প্রতি তাদের এই অন্ধ ভালোবাসা দেখে বিস্মিত হয়ে পারস্যের এক মনীষা বলেছিলেন, আরবদের ত্বকের নিচের শিরা দিয়ে রক্ত নয়, বয়ে চলে কবিতার স্রোত।’ আরবের এই ঋদ্ধ ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিপুরুষ ছিলেন ইমরুল কায়েস। ইসলাম পূর্ব যুগের এই কবির কবিতা আজও সমানভাবে জনপ্রিয়, এমন্ আশ্চর্য প্রতিভা ছিলেন তিনি। ইমরুল কায়েস যেমন ছিলেন তাঁর যুগের কবিশ্রেষ্ঠ, তেমনি ছিলেন বীর যোদ্ধা, প্রেমিক আর দুর্ধর্ষ একজন। তাঁর হ্রস্ব জীবন রহস্য, প্রাচুর্য আর ঘটন-অঘটনে পূর্ণ। দেড় হাজারের বেশি বছর আগের প্রাচীন এই বিস্ময়প্রতিভা নিয়ে এক আশ্চর্য-আখ্যান লিখেছেন একুশ শতকের বাঙালি লেখক জাকির তালুকদার। যদিও কবির সৃষ্টি ও প্রেম এই আখ্যানের কেন্দ্র কিন্তু এর আড়ালে লেখক ছবির মতো জীবন্ত ক তুলতে চেয়েছেন কবির সমসময় ও পরিপার্শ্বকে, যেখানে চিত্রিত হয়েছে তৎকালীন আরবের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি; গোত্র দাসপ্রথা ও শ্রেণিসম্পর্ক নয়, নর-নারীর প্রেম, যৌনতা, ঈষা, ঘৃণা, যুদ্ধ, হিংসা। অন্ধকার-সময়ের এমন এক উপাখ্যানকে ঘিরে রচিত জাকির তালুকদারের এই বই, কবি ও কামিনী আলোকিত করল তাঁর সৃষ্টিক্ষমতাকেই।
জন্ম ২০ জনুয়ারি ১৯৬৫, নাটোরে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্নাতক। স্নাতকোত্তর ডিগ্রী স্বাস্থ্য অর্থনীতিতে। সমকালীন মূলধারার বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁর অপরিহার্যতা ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত। অনবরত বাঁকবদল তাঁর সাহিত্যিকতার প্রধান বৈশিষ্ট। বিষয় ও আঙ্গিকে, মাধ্যম ও প্রকরণে তাঁর স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত অবস্থান সকল মহলেই স্বীকৃত। পেয়েছেন বাংলা একাডেমিসহ দেশের প্রধান প্রায় সকল সাহিত্য পুরস্কার।
আরবের ঋদ্ধ ইতিহাসে সর্বজন স্বীকৃত এবং সর্ব সিদ্ধ কবিশ্রেষ্ঠ "ইমরুল কায়েস"।
জীবন যার রহস্য প্রাচুর্য ঘটন-অঘটনের ঘনঘটায় পরিপূর্ণ,একাধারে প্রেমিক,কবিত্ত্বের শক্তির সাথে শৌর্যে ও যার সীমা পরিসীমা ছিল না ইসলাম পূর্ব যুগে।
মেঘে মেঘে অনেক বেলা পেরিয়েই এ ফুলে ও ফুলে মধুরেণু সমীপে শেষে তরী ভিড়লো তার অনিন্দ্য সুন্দরী শ্রেষ্ঠা উম্মুল জুনদবের তীরে। পরিচয়ের শুরুতেই যে প্রনয়ের প্রস্তাবের প্রত্যুত্তরে পরিনয় শর্তের সাথে প্লেবয়দের মতো ছোক ছোকানি ছেড়ে জুনদবের সাথে জীবন মরনে রহিবো একে অন্যের শরনে;
এই সংকল্পের কথা যখন কানাকানি হয়ে তামাম মরুর তরুণীদের কর্ণকুহরে পৌঁছালো ততক্ষনে তিনটি তাজা প্রান গেলো ইমরুল বিহনের বিরহে,বাকিদের ও তথৈবচ অবস্থা।
এদিকে দেহছন্দের সাথে মধুচন্দ্রিমায় মত্ত ইমরুলের একমাত্র শত্রু আল কামাহ আবার শয়নে স্বপনে প্রতিশোধের আগুনের তীব্রতায় লেগেছে ক্ষীন হয়ে আসা নদীর মতো নিস্তরঙ্গতা,চিত্তে লেগেছে রমনীশ্রেষ্ঠ জুনদবকে শয্যাশায়িনী করে রূপের সুধায় আকন্ঠ ডুবে নিজের তুষের আগুনের তৃষ্ণার জল পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা।
এই দুইয়ের দ্বিধার দোলাচলে জুনদব জয়ী করতো ইমরুলকেই,যদি না সে ভীমরুলের চাকে ঢিল দেবার মতো পুরোনো প্রেয়সী উনায়জার উন্মত্ত প্রেমে মত্ত হয়ে পরিনয় পূর্ব প্রতিজ্ঞা ভুলে পরকীয়ার আত্মপ্রসাদে নতুন তশবিবের(প্রেমের কবিতা) খাতায় নগদে ধরা না খেতো বিবির হাতে।
একে তো রমনী,দুইয়ে বিদুষী রাবীকে ছেড়ে পরনারীতে রমনের শাস্তি প্রথমে ওকাজ মেলায় হেরে পরে ভাগ্যের ফেরে বিষাক্ত বসনে পৃথিবী থেকে বিলীন হবার এ গল্প স্মরন করিয়ে দেয়;
"রমনী মাত্রই প্রেয়সী নহে সে সময়ে সে কখনো কখনো প্রাণনাশিনী হয়"
দূর্ভাগ্যে দিনশেষে মৃত্যু থেকে কয়েক মূহুর্ত দূরে শকুনের শৈন্য দৃষ্টি দেখেও ফ্যাসফ্যাসে স্বরের কবির কন্ঠে শুধু এই কথা রয়;
কবিতা শুনবি?
লোকে মুশকান জুবেরি দেখে ডরায়,জুনদবকে জানলে বোধহয় জান নিয়ে ইয়া নফসী বলে পালায় যাইত নিজ নিজ ডেরায়।😴
ধর্মবিদ্যার দৌড় পাঠ্যবই পর্যন্ত সীমাবদ্ধ হলেও এ কথা অন্তত প্রায় সবাই জানে, হযরত মুহাম্মদ (স) এর জন্মের আগে আরবে ছিল আইয়্যামে জাহেলিয়াতের যুগ। সামান্য কিছু নিয়ে ঝগড়া তাতেই বছরের পর বছর পার রক্তারক্তি আর যুদ্ধে যুদ্ধে। আইয়্যামে জাহেলিয়াত যুগের কথা বলে আসলে শেষ করা যাবে না। কিন্তু এখন যে কথা বলতে যাচ্ছি... না ইয়ে মানে আমি না, সুলেখক জাকির তালুকদার মহাশয় আর কি, সে হলো গিয়ে আরেক জগৎ। প্রখ্যাত কবি ইমরুল কায়েসের নাম শুনেছেন?
আমিও নিজেও জানতাম না অবশ্য :3 বেশ ক'দিন আগে জানতে পারলাম আরবি ভাষার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি বলা হয় এই ইমরুল কায়েসকে। তার কিছুকাল পরে হাতে এলো এই বই, চমকে গেলাম.. খাইসে! এ দেখি সেই ইমরুল কায়েসকে নিয়ে লেখা!! সম্মান, প্রতিপত্তি আর আভিজাত্যের সাথে মানানসই রকমের দেহসৌষ্ঠব, আবার তিনি কবিশ্রেষ্ঠ। স্বাভাবিকভাবেই মরুসুন্দরীগণ গণহারে ক্রাশ-ফাঁস খেয়ে এক্কেবারে লেজেগোবরে অবস্থা। কবিও প্রায় প্লে-বই টাইপের 😛 তো ভালই যাচ্ছিল দিনকাল। এই ফুল-সেই ফুল করতে করতে কবিশ্রেষ্ঠ ক্রাশ খেলেন এক অসাধারণ সুন্দরী উম্মুল জুনদবের উপর। আর এই তরুণী শুধুমাত্র সুন্দরীই নন, বিদুষীও বটে! বুদ্ধিমতী জুনদব প্যাচ খেললেন এবারে। কবি প্রেম নিবেদন করায় সরাসরি বললেন তাকে পেতে হলে প্লেবয়গিরি ছাড়তে হবে। প্রেমে নয়, জেদের বশে রাজি হয়ে গেলেন কবিও। ব্যাস, আর যায় কই... ধুমধামে হয়ে গেল বিবাহ। কবি ভাবলো জিতে গেলাম, নায়িকাও ভাবল তাই। এদিকে হৃদয়ে ভাংচুর হয়ে গেল বাদবাকি সব মরুসুন্দরীর। কবির বিয়ের পরপর তিন তিন জন তরুনীর আত্মহত্যার সংবাদে আর বিবাহ পরবর্তী প্রাথমিক উচ্ছ্বাস কেটে যাবার পর বোধোদয় হয় কবির। তখন তার মনে পড়ে আয়হায়! বিয়ে করে কি ভুলটাই না করলাম! মনে পরে যায় পুরানো প্রেমিকা উনায়জার কথা। ঘটনাক্রমে কবি-পত্নীও সেটা জানতে পারে, বোধোদয় হয় তারও, শালার কী একখান ভুল করে ফেললাম!
এ তো গেলো ইনডোরের কথা। এখন আউটডোরের দৃশ্যপটে ভিলেন না থাকলে কি হয়? ভিলেনও আছে, দরিদ্র কবি আল কামাহ। সে আবার জুনদবের প্রেমে পাগলপারা। আবার ইমরুল কায়েসের কবিতার প্রতিদ্বন্দ্বী। শুরু হয় ত্রিভুজ প্রেমের খেলা... ঈর্ষা, ঘৃণা, প্রেম-প্রতিশোধ আর শ্রেষ্ঠত্বকে কেন্দ্র করে সে এক অনন্য আখ্যান। ধু ধু করা বালির দেশ, আপাতদৃষ্টিতে বর্বর আরব বেদুইনদের কথামালা বা তাদের প্রেমোপাখ্যানই শুধু নয়.. প্রাক ইসলাম যুগে আরব দেশ ও তাদের রীতিনীতি, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ধর্ম অর্থাৎ শুধুমাত্র অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগের ছবি নয় বরং প্যাগান সংস্কৃতি, সূক্ষ্মরুচি আর আমুদে একটা জনপদের ছবি তুলে ধরেছেন লেখক জাকির তালুকদার।
বি.দ্র. আমার ফাজলেমি আর লেইম কথাবার্তাগুলো পড়ে বিভ্রান্ত হবার কিছু নেই। বইটা ভালো, কবিতাগুলোও। আর কবি ইমরুল কায়েস কেমন ছিলেন সেটা তো আর এখন জানার উপায় নেই, (বেশি ইচ্ছা করলে বই পড়ুন, গুগলের দ্বারস্থ হোন) লেখক মহাশয় যেমন করে তার গল্পের বর্ণনার সুবিধার্থে তুলে ধরেছেন, আমার রিভ্যুও সেইরকমই হয়েছে :3 কেউ আঘাত পেলে দু:খিত 😛
আইয়্যামে জাহেলিয়া নিয়ে নানা মুনির নানা মিথ ও মত আছে । আরবের এই যুগকে অনেকে ইতিহাসে দুঃসময়ের ঘোর কলি কাল মনে করেন আর অনেকে বলেন কারণ সৃষ্টির ডামাডোল । সে সময়ের রাজ-রাজড়াদের আসরে মুকুট-কেন্দ্রিক কবিত্বের লড়াই হত । একজন কবি ইমরুল কায়েস এর সামাজিক প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও নিজের মত চলা, প্রকাশ করা, ভাব ও দর্শনের পক্ষে থাকার গল্প । যেখানে সে পক্ষপাতদুষ্টের কারণে সভাসদ ত্যাগ করে । তারপর তার ব্যক্তিজীবনের সংগ্রাম ও বেঁচে থাকার গল্প । পদে পদে বিপদ, কাঁটা, রণ-রক্ত মাতম করা প্রেম ও দ্রোহে ঘটনা এগোতে থাকে ।
আরব্য রজনীর ইতিহাসকে ভিত্তি করে লেখক এই গল্পে আমাদের ধারণাকে তৎকালীন আরবের রূঢ় বাস্তবতার কিছু চিত্র দেখান । বিশাল পটভূমিকে সারসংশ্লেষে তুলে আনেন দুই মলাটে ।
প্রাচীন আরবের রীতিনীতি, সামাজিক প্রথা, কাব্যচর্চা, কবিতার প্রতি আরবদের অনুরাগ, সমাজে কবির অবস্থান, আরবের শ্রেষ্ঠ কবি ইমরুল কায়েসের প্রেমোপাখ্যান ও বিরহগাঁথা দারুণভাবে বর্নিত হয়েছে বইটিতে। এক বসায় পড়ে ফেলার মতো বই। বর্ণনাভঙ্গি ও আকার দুইদিক থেকেই।
বাদফজর ঘুমাতে যাবার সময় অকারণেই হাতে নিয়েছিলাম। বই পড়লে নাকি ঘুম আসে ভেবে শুরু করেছিলাম জাস্ট। তারপর আর ঘুম হলো কই? বই শেষ করে খোলা জানালায় চোখ রেখে দেখি বাইরে রোদ উঠে গেছে তোড়জোড়ে। পাতায় পাতায় ছড়িয়ে দিয়েছে তার সোনালী আভা। একটানা ধরে রাখে এমন বই রোজ রোজ পেলে ফজরের পরের ঘুমটা মিস করতাম ইচ্ছা করে। . ইতিহাসের সত্যতা নিয়ে কথা বলবো না। এই সর্ম্পকিত ইতিহাস তেমন জানা নেই আম���র। বাকি বইটা দারুণ। মোহাবিষ্ট করে রাখলো একটা সকাল।