আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ছিলেন একজন বাংলাদেশি ঔপন্যাসিক এবং ছোটগল্পকার। তিনি মাত্র দুটি উপন্যাস রচনা করলেও সমালোচকরা তাঁকে একজন শ্রেষ্ঠ বাঙালি ঔপন্যাসিক হিসেবেই বিবেচনা করেন। এই দুটি উপন্যাসের বাইরে ইলিয়াস মাত্র তেইশটি ছোটগল্প এবং বাইশটি প্রবন্ধ লিখেছেন। ইলিয়াস সমাজ, রাষ্ট্র এবং জনগণের একজন একাগ্র পর্যবেক্ষক ছিলেন। তিনি তাঁর লেখার চরিত্রগুলোকে বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণি এবং অবস্থানের প্রতীক হিসেবে সুদক্ষভাবে রূপায়ন করতেন। লেখার সময় তিনি চেষ্টা করতেন ঐতিহাসিকভাবে নির্ভুল থাকতে, ফলে তিনি পাঠকের স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে লেখার অন্তর্নিহিত গুরুত্বকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন সবসময়। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে অকালমৃত্যুর ফলে তাঁর সৃজনশীল জীবন খুব দীর্ঘায়িত হতে পারেনি, কিন্তু তাঁর লেখাগুলো বাংলা সাহিত্যে ধ্রুপদী সৃষ্টি হিসেবে স্থান পেয়েছে।
Akhteruzzaman Elias was a Bangladeshi novelist and short story writer. Despite the fact that he only wrote two novels, critics consider him to be one of the finest Bengali novelists. Besides these two books, Elias wrote only 23 short stories and 22 essays. Elias was a good observer of society, state, and people as he created his characters symbolising social classes and positions. He always strived to be historically accurate when writing, even if it meant pushing readers out of their comfort zones. His creative life was cut short by a premature death from cancer, but his writings are regarded as Bangla literature classics.
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কিছু লেখাও সম্ভবত এই জনরায় পড়ে৷ আমার কাছে ম্যাজিক রিয়েলিজম জনরায় লেখা গল্পগুলো আইডেন্টিফাই করা বেশ ঝক্কির কাজ মনে হয়।
কোনো চেংড়া লেখক, না বুঝে এই রাইটিং টুল অ্যাপ্লাই করতে গেলে লেখাটা কতটুকু ম্যাজিক রিয়েলিজম হবে জানি না, তবে অতিলৌকিক বা প্রতিপ্রাকৃত হবার সম্ভাবনা বেশি।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস যদু-মদু কেউ নন। নিশ্চিন্ত চিত্তে তার লেখা গল্প পড়ি আমি। ভালো লাগে। এই বইয়ের গল্পগুলোও ভালো লেগেছে।
এক বিশেষ কারণে ইলিয়াস সাহেবের দুই একটা লেখার কাহিনী-সংক্ষেপ পড়া হয়েছিল। এই গল্পগ্রন্থ পড়ে প্রশ্ন জেগে গেছে, কেন দ্বিতীয় হাতের বিদ্যা নিয়েছি! আখতারুজ্জামান তার কাহিনীর জন্য নয়। অনন্য তাঁর লেখার স্টাইলের জন্য। তাঁর চরিত্রগুলোর বৈশিষ্ট্যের জন্য।
একটা বিষয় প্রথমেই চোখে লাগে, তাঁর চরিত্রগুলোর অতিরিক্ত পরিমানে চিন্তা। গল্পগুলোর অধিকাংশ সময় ও জায়গা কাটে প্রধান চরিত্রের মাথায়। তাঁর ভাবনার ধারা, কারণ বা ব্যাখ্যা খুঁজে বের করা - এগুলো হয়ে উঠে রচনার মুখ্য উদ্দেশ্য। আকাশ-কুসুম চিন্তা আর মাঝে মাঝে বাস্তবতা ছাড়িয়ে অতীন্দ্রিয় ও অতিমানবীয় জগতে চলে যাওয়াটাও দুর্লভ না। আর এসবকে ছাপিয়ে চরিত্রগুলোর মুখে যথাযথ আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগ।
জাতিবৈষম্যের থেকে সৃষ্ট যে হতাশা, তাকে নেভানোর জন্য প্রতিহিংসা আর প্রতিশোধের শরণাপন্ন হওয়াটা যখন 'কীটনাশকের কীর্তি'র মূল আবার ঠিক পরেরটা, 'যুগলবন্দী', সেই বৈষম্য ঘুচাতে গিয়ে আত্মসমর্পণের কথা তুলে আনে। একটিতে আসে শিল্পপতির কাহিনী আর অন্যটিতে একজন উচ্চপদস্থ আমলার।
তৃতীয়টি, 'অপঘাত', পুরোপুরি স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে এক গ্রামের কাহিনী। গ্রামে মিলিটারির আগমনে মানুষগুলোর মানসিক অবস্থার অসামান্য বর্ণনা যেমন পাওয়া যায় তেমনি আমরা দেখি দেশের জন্য জীবন দেয়া এক ছেলের গর্বিত বাবার চিন্তাধারা। সাধারণ মানুষের সাধারণ মননের মাঝেও কীভাবে দেশের জন্য বিপ্লবী চেতনা মাথা চাড়া দিয়েছিল, সেটাই মুখ্য।
আর শেষ গল্পটি মারাত্মকভাবে নাড়া দিয়ে যেতে পারে পাঠককে। কামাইল্যা তাঁর অর্ধেক শরীর নিয়ে যে 'দোজখের ওম' পোহাচ্ছে তাঁর বর্ণনাতে অনেক বাঙালি কিঞ্চিৎ নড়ে চড়ে বসতে পারে। আবার নাও পারে! যুগ বদলিয়েছে না!! সম্পদ বণ্টন নিয়ে পারিবারিক দ্বন্দ্ব, হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক, মুক্তিযুদ্ধের মৃদু ছোঁয়া, পীর-মুরিদের কথকতা, মানুষের কপটতা, আবার কখনো মৃদু অনুকম্পার অনুরণন। কামাইল্যার মুখে তাই,
রাস্তার পাশে বিশাল একটা আম গাছ গুরুগম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একটু দূরে আমগাছের দিকে তাকিয়ে থাকা দ্বিধাগ্রস্ত ল্যাম্পপোস্টটি এই সকাল বেলাতেও জ্বলছিলো আর নিভছিলো। ল্যাম্পপোস্টের পাশে মাজেদের চায়ের দোকানের ভেতর দুইজন বালক হিটলার মৃত্যুর আগে বিবাহিত ছিলো নাকি অবিবাহিত ছিলো তা নিয়ে তুমুল তর্ক করছে। মাজেদ চা ঘুটতে ঘুটতে হিটলারের বিয়ের বিষয়ে হঠাৎ নিজের মধ্যে কৌতূহল আবিষ্কার করে। কিন্তু মোড়ের এক্কেবারে মাথায় অবস্থিত ভিসিডির দোকানে এন্ড্রু কিশোরের গাওয়া ভেঙেছে পিঞ্জর, মেলেছে ডানার শব্দে তর্ক প্রায় কিছুই শোনা যায় না। ঐ পথ দিয়ে ফেইক মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুল্লাহ বাহার মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী সুইটি কোচিং শেষ করে বাসায় ফিরে যাচ্ছিলো, ভিসিডির দোকানের মালিক খসরু ভেতর থেকে ব্যাপারটা লক্ষ্য করে। কিছুক্ষণ বাদে এন্ড্রু কিশোর চুপ হয়ে যায়, চিরল বিরল কেশের অধিকারী সুপরিচিত গায়ক হাসান তার নাসিকা ব্যবহৃত কন্ঠে অনুরোধ করতে শুরু করলো - সুইটি তুমি আর কেঁদো না.....
ইলিয়াস সাহেবের অসামান্য রচনাশৈলীর গুণে গল্পগুলো পড়ে বেশ আরাম পাওয়া যায়। 'কীটনাশোকের কীর্তী', আর 'যুগলবন্দী' গল্প দুইটিতে আর্থসামাজিক বৈষম্যের আঘাতে নিচে শ্রেণীর মানুষের অবচেতন মনের চিন্তা প্রবাহ ইলিয়াস সাহেবের কলমের ডগায় স্পষ্টরূপে দৃশ্যমান। গল্পের পরিণতি কমজোর হলেও লেখার স্বকীয়তায় একটা ভালো লাগার রেশ থেকে যায়। শেষের দুইটি গল্প 'অপঘাত' ও 'দোজখের ওম' অসাধারণ লেগেছে। 'অপঘাত' গল্পটি কেন্দ্রীয় চরিত্র মোবারক আলীর অনুভূতির আলোকে বর্ণিত হয়েছে। মোবারক আলীর ছেলে বুলুর অপঘাতে মৃত্যু হয়, অর্থাৎ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে বুলু শহীদ হয়। প্রথমদিকে মোবারক আলীর কাছে বুলুর মৃত্যু দুঃখজনক ঘটনা মনে হলেও, চেয়ারম্যানের ছেলে ঘরের বিছানায় টাইফয়েডে সাধারণ মৃত্যুতে মোবারক আলী নিজের ছেলের মৃত্যুর তাৎপর্য বুঝতে পেরে গর্ববোধ করে। বুলুর মুক্তিযুদ্ধে যোগদান, বৌ ডোবা খালের গ্রনেড ছুঁড়ে মারা, চেয়াম্যানের ছেলের লাশদাফন, গণহত্যা ঘটনায় যুদ্ধের সময় সাধারণ মানুষের মানসিক অবস্থা লেখক ব্যতিক্রমী শিল্পকৌশলে বর্ণণা করেছেন। 'দোজখের ওম' গল্পের পক্ষাঘাতগ্রস্ত কামালউদ্দিনের বাস্তজীবনের রূঢ়তায় দোজখের উষ্ণ ভাব অনুভব করে। সে নিজ চোখে একে একে স্ত্রীর ও সন্তানদের মৃত্যু দেখে। কামালউদ্দিনের মৃত স্ত্রী তাকে নিয়ে যেতে আসলেও কোন পাপের কারনে এই রুক্ষ জীবন্ত দোজখ থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব কামালউদ্দিন বুঝতে পারে না।
'ওম' শব্দের অর্থ উষ্ণতা। এক পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তির জীবনযাপন নিয়ে "দোজখের ওম" গল্পটি রচিত যে কিনা দুনিয়াতে দোজখের ওম পাচ্ছে বলে মনে করে।
কামালউদ্দিন অনেকদিন যাবৎ শয্যাশায়ী। একে একে তার কয়েকজন সন্তান মারা যায়। তার স্ত্রীও তাকে ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমায়। কিন্তু প্রতিদিন সে তার স্ত্রীকে অলৌকিকভাবে দেখতে পায়। একসময় তার বড় ছেলে আকবর মারা যায়। কামালউদ্দিনের ধারণা জন্মায় তার স্ত্রী তার সন্তানদেরকে নিজের কাছে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাকে কেন নিয়ে যাচ্ছে না- এ নিয়ে তার যত চিন্তা। তার কী পাপ ছিল যার জন্য তাকে একে একে সবার মৃত্যু দেখতে হচ্ছে, অচল শরীর নিয়ে বেঁচে থাকতে হচ্ছে? এ নিয়েই গল্প এগিয়ে চলে। সবাইকে পড়ার আমন্ত্রণ :)
পড়া শেষ অনেক আগেই, আপডেট করতে ভুলে গেছিলাম। ইলিয়াস তার দুইটা গল্পে বড়লোক ফ্যামিলিতে পোষ্য হিসেবে অ্যালসেশিয়ান কুকুর দেখাইছেন। বিষয়টা ইন্টারেস্টিং। এটা নিয়ে আমার একটা চিন্তা আছে, পরবর্তীতে শেয়ার করবো।
এই বইয়ের রেটিং করা আমার মত ছোট মানুষের কম্ম নয় বাপু! ছোটগল্প বা গল্প সংকলন আমি একটু কমই পড়ি।কাহিনী-চরিত্রগুলোর সাথে আমার জানাশোনা,ভাব ভালবাসা হওয়ার আগেই দেখি টুক করে গল্প শেষ হয়ে যায়। কিন্তু ওরে বাবা!এই বইয়ে সেই অভিযোগের সু্যোগ আছে নাকি আবার! লেখক তো আমাকে একেবারেই চরিত্রগুলোর মগজে,শিরায়-ধমনীতে,রক্ত মাংসে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন! এই বইয়ের ৪ টি গল্পের প্রতিটির সাথে,প্রতিটি চরিত্রের সাথে এখন আমার গভীর সম্পর্ক,তাদের নিউরনের সকল ভাবনা চিন্তার তড়িৎ গতি আমি এখন জানি। আখতারুজ্জামান একজন অসাধারণ লেখক। বিশেষত Rustic জিনিসপত্র তাঁর ক্রিয়েটিভ লেখার গাঁথুনিতে এমন চমৎকার ভাবে ফুটে উঠে! আগেও বলেছি,মৃত্যুদৃশ্য তাঁর মতো অদ্ভুত ভাবে কাউকে লিখতে দেখিনি।গায়ে কেমন কাঁটা দেয়,আবার ভারি অবাক ও হই "বাহ,কি চমৎকার করে লিখলো!" যদি আপনি,খুব ভাল মানের লেখার সাথে পরিচিত হতে চান,দোজখের ওম পড়ে দেখবেন প্লিজ!
গল্পগুলো ঘুরপাক খেয়েছে একটি বিশেষ ধাঁচের কেন্দ্রীয় চরিত্র ঘিরে । বিশেষ বললাম কারণ চরিত্রগুলো বিভিন্ন বয়স, সামাজিক, অর্থনৈতিক অথবা শারীরিক অবস্থার হলেও তাদের সকলের মধ্যে এক অন্তর্নিহিত মিল আছে । এক অদৃশ্য জালে তারা জুড়ে আছে একে ওপরের সাথে । প্রত্যেকটি কেন্দ্রীয় চরিত্রই পুরুষ এবং কেউই Alpha পুরুষ নন। বরং Beta বা Delta পুরুষ চরিত্র । তারা সকলেই সামাজিক-অর্থনৈতিক-শারীরিক বিভিন্ন পরিস্থিতে অবদমিত । গল্পগুলো এসব অবদমিত মনের চেতনা প্রবাহ (Stream of consciousness) । আর অবদমিত মনের ভীষণ রকমের দ্বিধা-অনুশোচনা-ভয়-লোভ ছাড়াও আরও অনেক মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনের আবহাওয়া বিরাজ করে আছে গল্পগুলো জুড়ে ।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লেখার স্টাইল আর চরিত্র সৃষ্টি আসলেই অসাধারণ। তার রচিত গল্পগ্রন্থ দোজখের ওম এর মধ্যে রয়েছে ৪ টা গল্প। পছন্দ অনুযায়ী গল্পগুলো রেটিং করলে হয়ত এমন দিবো.. ১। কীটনাশকের কীর্তি *** ২।যুগলবন্দী ** ৩।অপঘাত **** ৪। দোজখের ওম **** প্রথম গল্প দুটি অর্থাৎ, কীটনাশকের কীর্তি আর যুগলবন্দীর মধ্যে ফুটে উঠেছে আর্থসামাজিক বৈষম্যের কড়াঘাতে নীচ শ্রেনীর মানুষের মনের চিন্তা আর উদ্বেগ। অপঘাত আর দোজখের ওম গল্প দুটি ছিল সত্যিই প্রশংসনীয়। অপঘাত গল্পে বলা হয়েছে বুলু নামক একটা ছেলের কথা যে অপঘাতে (পাকিস্তানি বাহিনীর গুলীর আঘাতে) মারা যায়। বুলুর বাবা মোবারক আলী অনেক কষ্ট পায় ছেলের এমন মৃত্যু সংবাদে। কিন্তু যখন চেয়ারম্যানের ছেলে শাজাহান টাইফয়েডে মারা যায়, আর মৃত্যুর পূর্ব মূহুর্তে বার বার বুলুর সাথে যুদ্ধে যেতে চায় তখন মোবারক আলী বোঝে তার ছেলের মৃত্যুর তাৎপর্য। এভাবে মোবারক আলীর নানান কল্পনার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যায় কাহিনী। শেষ গল্পটি হলো 'দোজখের ওম'। গল্পটার কথা এমনভাবে উপস্থাপন করা যায়- "তার কোঁচকানো শরীর আরো কাঁপে। সচল ও অচল অঙ্গগুলোকে একটিমাত্র অবিভাজ্য কাঠামোতে রূপ দেওয়ার জন্য সে কুন্ডলী পাকিয়ে শোয়।ঘন নিশ্বাসে কামালউদ্দিন নিঃশব্দে মোনাজাত করে,আল্লা তুমি তোমার বান্দার দিলের খবর রাখো। এই রাইত যানি আমার শেষ রাইত হয়। আমারে এই দোজখ থাইকা উঠাইয়া তুমি যা খুশি করো।কেয়ামত তক আমারে গোর আযাব দাও, মুনকির নকুর আইয়া আমারে আগুনের দোররা মারুক, তাও ভি ভালা, মগর এই হাবিয়া থাইকা আমারে উঠাইয়া লও" কথাগুলো অসুস্থ কামালউদ্দিনের যে কিনা তার জীবনের শেষ সময়টুকু পার করছে হৃদয়ভরা বেদনা, আক্ষেপ আর চিন্তা নিয়ে। যদিও বলছি শেষ সময় পার করছে কিন্তু পুরো উপন্যাসে তার সেই শেষ সময় আসেনি।সে তখনো বেঁচে আছে এবং নিয়মিত তার কল্পনায় ভেষে বেড়াচ্ছে তার স্ত্রী যে মারা গিয়েছে সাড়ে ৩ বছর আগে।সে আসে কামালউদ্দিনকে কিছু খোঁচা-মারা কথা শোনায়, তার ঘর গুছিয়ে দেয় আর বলে চলে আসতে। কামালউদ্দিন দেখে তার কাছে আরো আসে তার মৃত বড় ছেলে আকবর,তার ছোট ছেলে সোবহান (যে যুদ্ধে গিয়ে গুলিতে মারা গিয়েছে),আরো আসে তার মৃত মেয়ে নুরুন্নাহার আরো অনেকে,সে ভাবে তারা এবার তাকে নিয়েই যাবে। সেও যেতে চাই তার দোজখতুল্য এই সংসার ত্যাগ করে। জীবনটা তার কাছে এখন দোজখের মতো ঠেকে। যদিও সে চাই এই জীবন্ত দোজখ থেকে মুক্তি পেতে কিন্তু, তার পাপের কারনে এই জীবন্ত দোজখ থেকে মুক্তি পাওয়া তার হয়ে ওঠে না।
১.কীটনাশকের কীর্তি- রমিজ তার বোনের বিষ খেয়ে আত্মহত্যার খবর শুনে বিষাদগ্রস্ত হয়ে জ্ঞানহারা কার্জ-কারবার করতে বসে। আপনজন হারানোর মর্মযন্ত্রণায় ব্যকুল হয়ে কতসব কল্পনা মনে জায়গা করে নেয় তা খুব সুন্দর ভাবে উঠে এসেছে এই গল্পে।
২.যুগলবন্দি- অভাবের তাড়নায় ধনী মালিককে ঠকিয়ে ও একি সাথে মিষ্টি কথা বলে কিভাবে সমৃদ্ধির স্থান কিছু মানুষ অবলিলায় খাবলিয়ে নেয় তা নিয়ে একটা হাস্যোরসাত্মক ছোটগল্প।
৩.অপঘাত- যোদ্ধা ছেলের মৃত্যু সংবাদে শোকার্ত বুলুর বাবার কাছে কি বুলুর মৃত্যু নিছক অপঘাত?
৪. দোজখের ওম- অসুস্থতায় বিছানায় পরে যাওয়া কামালুদ্দিন বিছানায় শুয়ে শুয়ে নিজের মৃত্যু কামনা করে কেননা এ-ই জীবন এখন তার কাছে দোজখের সমান। ছেলেমেয়েদের কাঁধের বোঝা হতে কামালুদ্দিন নারাজ। সূক্ষ চিন্তাভাবনার বুন যেভাবে কামালিদ্দিন বুনে, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস যেনো ঠিক একি ছাঁচে গল্পটি লিখেছেন।
৪টা গল্পের মধ্যে দোজখের ওম আমার পার্সনাল ফেভারিট কারণ অসহায়ত্ব বেপারটা হয়ত আর কোথাও এতোটা কাছে থেকে অনুভাব করতে পারিনি। এ-র পরে ভাল লেগেছে ১ম গল্পটি। "গ্রিফ" বলতে আমরা যা বুঝি তা একেবারে প্রতিটা পৃষ্ঠায় খুব ভালভাবে জানান দিয়েছে।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লেখা গল্পগ্রন্থ 'দোজখের ওম'। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্প লেখার হাত দারুণ, সেইসাথে পড়ার সময় পাঠকেও যথেষ্ট মনোযোগী হতে হয়। না হলে গল্পের খেই হারিয়ে যায়। 'দোজখের ওম' চারটি গল্পের সংকলন।
প্রথম দুটি গল্প 'কীটনাশকের কীর্তি' ও 'যুগলবন্দি' এর বিষয়বস্তু প্রায় একই। অর্থ���ৈতিক বৈষম্য ,এর থেকে সৃষ্ট হতাশা, প্রতিশোধ কিংবা আত্মসমর্পণ।
'অপঘাত' মুক্তিযুদ্ধের গল্প। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন একটি গ্রামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আগমনের ফলে গ্রামের মানুষদের মানসিক অবস্থার বর্ণনা পাওয়া যায়। গল্পের প্রধান চরিত্র মোবারক আলীর ছেলে মুক্তিযুদ্ধে গিয়ে শহীদ হন , সেইসাথে চেয়ারম্যানের ছেলে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এখান থেকেই মূলত তিনি তাঁর ছেলের মৃত্যুর গুরুত্ব বুঝতে পারেন।
'দোজখের ওম' পক্ষাঘাতগ্রস্ত কামালউদ্দিন এর গল্প। এখানে তিনি বাস্তব জীবনে দোজখের ওম অনুভব করেন। কারণ তিনি একে একে স্ত্রী সন্তানদের মৃত্যু দেখেন। এছাড়াও গল্পে পারিবারিক দ্বন্দ্ব , মানুষের কপটতা, মুক্তিযুদ্ধের কথাও গুরুত্ব পায় ।
চারটি গল্প নিয়ে এই গল্পগ্রন্থ "দোজখের ওম"। লেখকের লেখায় বরাবরই একটা আলাদা বৈশিষ্ট্য থাকে, এটা লেখকের নিজস্বতা। এই বইটাতেও তাঁর সেই বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। তাঁর বেশীরভাগ চরিত্র গুলো চিন্তাশীল ও স্মৃতিকাতর। মূল কাহিনিতে সময়ের ব্যবধান থাকে খুবই কম তবে এই সময়ে দাঁড়িয়ে চরিত্র গুলো স্মৃতি হাতড়ে বেড়ায় এবং এটা বেশী দেখা যায় প্রধান চরিত্রের মধ্যে। এছাড়া সময়, সমাজ ও মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে লেখক নিজের স্বকীয়তা বরাবরই দেখিয়ে থাকেন।
চারটি পাওয়ারফুল ছোট গল্পের সংকলন- কীটনাশকের কীর্তি, যুগলবন্দী, অপঘাত এবং দোজখের ওম! এই গল্পগুলো একবার আবার মনে করিয়ে দেয় কিছু মানুষের জন্য মাঝে মাঝে বেঁচে থাকা মৃত্যুর চেয়েও বেশি কষ্টের! একটাই জীবন, একটা পৃথিবী, কিন্তু বলতে শুরু করলে সবার গল্পটা আলাদা! চারটা ছোট গল্প চারটা মোটামুটিভাবে একই শ্রেণির চরিত্রকে ঘিরে লেখা। চারজন মানুষের চারটি অসুখী পৃথিবীর গল্প! এরকম নিম্ন মধ্যবিত্ত জীবন কে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে অনেক গল্প লেখা হলেও আপনি প্রথম গল্প টা পড়েই মোটামুটি রকম ধাক্কা খাবেন তাদের বাস্তবতার সাথে মুখোমুখি হয়ে! লেখকের লেখার যেই বিষয়টা সবচেয়ে ভালো লেগেছে তা হলো তিনি অতীত এর কিছু মুহুর্ত এবং বর্তমানকে এক সুতায় বেধে এক কল্পনার জগত (পরাবাস্তব জগত) তৈরি করেছেন গল্পের চরিত্রের জন্য, সে কল্পনা এবং বর্তমান কে আলাদা করতে না পেরে এমন কিছু করে ফেলে যার মাসল তাকে দিতে হয় ভীষণ খারাপ ভাবে! ( Ref: কীটনাশকের কীর্তি) আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে প্রথম গল্পটি। কীটনাশক খেয়ে বোন মারা যাওয়ার চিঠি পেয়ে রমিজ (গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র) যে বাড়িতে কাজ করে সে সাহেবের মেয়েকেই শাস্তি দিতে চায়, কিছুটা এভাবে চিন্তা করে সম্ভবত তার বোন সুবিধাবঞ্চিত - তার জগত আলাদা, আর সাহেবের মেয়ের লাক্সারিয়াস জগত! এখানেই লেখকের ম্যাজিক- রমিজের জন্য একটা পরাবাস্তব জগত তৈরি - তার বোনের সাথে সাহেবের মেয়ের জগত কে সূতোয় বাধতে গিয়ে নিজের উপরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে!
I highly recommend this book to people who love reading.