একাত্তরের যীশু পিয়ানো ভূতের গল্প পল গোমেজের বাবা নতুন বছরের ছন্দ দেয়াল রাজুর পৃথিবী জয় পরাজয় লাল সূর্য বেনুর সুখ দুঃখ শহরে সকল সুখ শয়তান ও একটি চারাগাছ
Shahriar Kabir (in Bengali: শাহরিয়ার কবির) is a Bangladeshi journalist, filmmaker, human rights activist and author. His books focuses on human rights, communism, fundamentalism, history, juvenile and the Bangladesh war of independence.
বইটা দ্বিতীয়বারের মত পড়লাম। প্রথমবার পড়েছিলাম সম্ভবত ২০০৮ এর দিকে। ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি থেকে নিয়ে। শুরুর কয়েকটা পৃষ্ঠা ছিল না ওতে। আমার পড়া শাহরিয়ার কবিরের প্রথম কোন বই ছিল ওটা। এরপর গতবছর দ্বিতীয় বইটি পড়লাম।
আমি খুব সহজেই ভুলে যাই। কিন্তু এই বইয়ের পল গোমেজের বাবা গল্পটা বোধহয় কখনো ভুলবো না। একটা বাড়ী, চা বাগান, চা বাগানের মধ্যে বাড়ী, একজন নায়কের মত দেখতে বাবা, বাবা হচ্ছে বেলুন-ওয়ালা, বাড়ী ভর্তি বেলুন, স্বপ্নময় বাড়ী, বাবা যেন স্বর্গের দেবদূত। কি অসাধারণ সেই গল্পটা।
শাহরিয়ার কবিরের এই গল্প সংকলন যে কি অসাধারণ হয়েছে! যাদুময়তা, ভাবালুতা, বাস্তবতাবোধ, সুখ, দুঃখ, বিবেচনাবোধের আরো কতকিছুর যে সমন্বয় এই একটা সংকলনে! অসাধারণ একটা বই।
নাম দেখে আমি ভাবছিলাম মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটা কিশোর উপন্যাস হবে বইটা। কিন্তু পেলাম একটা গল্পসমগ্র হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধ তো আছেই, আছে লেখকের নিজস্ব জীবন নিয়ে লেখা গল্প, আছে গ্রামীণ শিল্পের ধ্বংস বা নগরায়নের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে গল্প।
মোটামুটি একটা বই। গল্পের বৈচিত্র্য সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক। কিন্তু কোনো গল্পই তেমন আকর্ষণীয় না। নাম গল্পটা বেশ ভালো। এটা নিয়ে হুমায়ুন ফরিদী অভিনীত একটা মুভিও আছে, দেখতে হবে। এছাড়া আর কোনো গল্পের কথা আলাদাভাবে মনে পড়ছে না। সব এ্যাভারেজ আরকি!
শাহরিয়ার কবিরের "একাত্তরের যীশু" গল্পগ্রন্থ মূলত বেশ কয়েকটা ছোটগল্পের সংকলন। একাত্তরের যীশু চলচ্চিত্রটি বোধহয় অনেকেই দেখে থাকবেন, গল্পটাও হয়তো অনেকেরই পড়া। তবে এই বইয়ের আরও দুইটা গল্প আমার প্রচন্ড ভালো লেগেছিলো, বুকে দাগ কেটে যাবার মত। একটা হচ্ছে "জয় পরাজয়", আরেকটা " রাজুর পৃথিবী!"
"রাজুর পৃথিবী" গল্পের মূল চরিত্রের মধ্যে আছে কয়েকজন মানুষ, রাজু, নেহায়েৎই ছোট একটা স্কুলপড়ুয়া ছেলে, তার দুই ভাই, যারা বীর বিক্রমে মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে, রাজুর বাবা, যিনি একটা সময় তার মুক্তিযোদ্ধা দুই সন্তানের জন্য প্রচন্ড গর্বিত থাকলেও এখন প্রচন্ড হতাশ বর্তমান সময় নিয়ে। দুই ভাই বেকার, অনেক মুক্তিযোদ্ধাই এর মধ্যে অস্ত্র দেখিয়ে ভোল পালটে নিজেদের বন্দোবস্ত করে নিতে পারলেও, এরা দুইজন পারেনি। বাবার এ নিয়ে প্রচন্ড ক্ষোভ, সরাসরি বলতেও পারেন না, অন্যদিকে দিনের পর দিন এই দুর্দশা সহ্য করতেও কষ্ট লাগে তার। খাবার টেবিলে দুই ভাইকে অকর্মা বলে গালিগালাজ করেন, রাজু চুপচাপ শোনে, আর মন খারাপ করে নিজের মত বসে থাকে।
এর মধ্যে একদিন রাজুর বড় ভাই, কবিতা লেখা লাজুক ছেলে, তাকে রাস্তায় ছিনতাইকারী ভেবে পিটিয়ে খুন করা হয়। বাবা-মা বুড়িয়ে যান, দিনগুলো আরও অন্ধকার হতে থাকে। রাজুর পরিবারের সবাই এক সময়ে বিদ্রোহী ছিলো, বিপ্লবী ছিলো, প্রথাগত নিয়মের বাইরে গিয়ে সবকিছু পাল্টে দেবার প্রচন্ড তাড়না ছিলো প্রত্যেকেরই। রাজুর বাবার দাদা এক ইংরেজ সাহেবকে চড় মেরেছিলেন, রাজুর এক দাদা বোমা বানাতে গিয়ে খুন হয়েছিলেন, রাজুর দুই ভাই যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করে ফিরেছে, এতকিছুর পরেও, এই মানুষগুলো পরাজিত হতে শুরু করে। রাজুর বাবার চাকরী চলে যায় বড় সাহেবের সাথে তর্ক করার জন্য, দালালীর অভিযোগে কর্মচ্যুত হওয়া বাবা হেসে বলেন, "ভালোই হয়েছে, দালালী করতে হবে না আর!"
পাশের গির্জাতে ঘন্টা বাজে। স্কুলের টাকা দিতে না পারায় নাম কাটা যাওয়াতে সারাক্ষণ ঘরবন্দী রাজু বসে বসে গির্জার ঘন্টার ডাক শোনে।
চার পাঁচ পাতার একটা ছোট গল্প। অথচ জীবনের কত শত দিক দেখিয়ে গেলো। যুদ্ধ, যুদ্ধের চেতনা, পারিবারিক অহম, গর্বের ক্রমান্বয় পতন, রাজনৈতিক দুষ্টতা, সমাজের ক্ষয়, কতকিছু।
"জয় পরাজয়" একদমই অন্য ধাঁচের গল্প। এক মিশনারী স্কুল, যেখানে এক ব্রাদার থাকেন, প্রচন্ড বদমেজাজী, মারধোর করেন মাঝেমাঝেই। এর মধ্যেই একদিন ক্লাসে দুষ্টুমির পর শিক্ষক রেগে গিয়ে গালি দেন এক শিক্ষার্থীকে, ইংরেজিতে, ব্লাডি সোয়াইন। এক ছেলে এর প্রতিবাদ জানায়, মুখ ফস্কে শিক্ষককেও গালি দিয়ে বসে, "ইডিয়ট"। শিক্ষক প্রচন্ড রেগে যান, হেডস্যার এসে সম্পূর্ণ ঘটনা বুঝে মিটমাট করে ফেলতে চাইলেও, জটিলতা বাড়তে থাকে।
পরদিন স্কুলে এলে অই শিক্ষার্থীকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়, সে তার শিক্ষককে ইডিয়ট বলেছে কিনা, লজ্জায় ছেলেটি অস্বীকার করে। ব্রাদার, প্রিন্সিপাল ফাদার হতবাক হয়ে যান। পাশের কলেজের বড় শিক্ষার্থীরা এসে এ বিষয় নিয়ে হট্টগোল করে, বাংলা ভাষাকে অপমান করার অভিযোগ তোলা হয়। ভাংচুর এবং অন্যান্য হেনস্থার ভয়ে ব্রাদারকে স্বীকার করতে হয়, তিনি অন্যায় করেছেন। শিক্ষার্থীদের দাবি থাকে, অপমান করার জন্য শিক্ষককে মাফ চাইতে হবে। ফাদার বলেন, শিক্ষক বাবার মত, বাবা কখনো ছেলেকে অপমান করতে পারেন না, বরং উল্টোটা হতে পারে।
শেষমেষ ব্রাদার মাফ চাইতে বাধ্য হন। সব ঝামেলা মিটে গেলে, ছেলেটিকে ডেকে পাঠানো হয় একান্তে। ফাদার ছেলেটিকে জানান, ব্রাদারকে চাকরীচ্যুত করা হবে, তার দেশে ফেরত পাঠানো হবে। অনুতাপবোধে জর্জরিত হয়ে ছেলেটি জিজ্ঞেস করে, " কেন?"
ফাদার বলেন, "তোমার কথা সত্যি হলে, ব্রাদার মিথ্যা বলেছেন। ব্রাদাররা মিথ্যা বলেন না। উনি মিথ্যা বলেছেন, এটা মেনে নিলে, তাকে কোনোভাবেই এখানে রাখা সম্ভব নয়!"
ফাদারের শেষ কথাগুলো প্রচন্ড আর্তনাদের মত শোনায়, "তুমি অপমানকে সহ্য করো নাই। এই জিনিসটা যেন আমি আজীবন তোমার মাঝে দেখি। তোমার বাংলা ভাষার অপমান আজ তুমি ম্রনে নিতো পারো নাই, ভবিষ্যতে সারা জীবন যেন তোমার সামনে কেউ বাংলাকে অপমান করতে না পারে। মে গড ব্লেস ইউ!"
বাইরে ছেলেদের তখন আন্দোলন সফলের মিছিল চলছে।
এই গল্পটাতেও বিশাল একটা মন খারাপ এবং মনস্তত্ত্বে ধাক্কা খাবার মত অবস্থা হয়েছিলো। আমরা যে ব্যাপার গুলোতে প্রচন্ড সংবেদনশীলতা দেখাই, সেটা আসলে ঠিক কতটুকু পর্যন্ত যৌক্তিক? কিংবা, যৌক্তিক হলেও, সেটা আমরা কি নিজেদের অনুভূতির কারণে করি, নাকি স্বার্থের কারণে করি? যদি অনুভূতি থেকেই করে থাকি, তাহলে সেই ইন্টিগ্রিটিটা সারাজীবন ধরে রাখার মত সততা রাখতে কেন পারি না?
এই দ্বিত্বতা, মানসিক দোটানা, নিজেদের সীমাবদ্ধতা, আর টানাপোড়ন নিয়ে এরকম অ���্ভুত সুন্দর ছোটগল্প আমি আর পড়ি নাই।
This entire review has been hidden because of spoilers.
পিয়ানো ভূতের গল্প পল গোমেজের বাবা নতুন বছরের ছন্দ দেয়াল রাজুর পৃথিবী জয় পরাজয় লাল সূর্য বেনুর সুখ দুঃখ শহরে সকল সুখ শয়তান ও একটি চারাগাছ
৭৭ পৃষ্ঠার এ বইটি জুড়ে রয়েছে এগারোটি খুদে গল্প। শিশুদের জন্য লেখা এ বইটি যে কোন বয়সী মানুষের ভালো লাগার বই হতে সক্ষম। অদ্ভুত সুন্দর প্রায় সবগুলো গল্প মনে দাগ কাটার মতো। আনন্দ আর বিষাদমাখা গল্পগুলো কখনো হাসিয়েছে, কখনো আবার বিমর্ষ করেছে। বুড়ো ডেসমন্ড এর কাছে আসা একাত্তরের যীশুরা, স্কুলের পিয়ানো ভূতের কারবার, পলের বাবার বেলুনগুলোর সাথে মন্ত্রমুগ্ধ করা সারডিনিয়ার বরফঝরা বনের গল্প, মা বাবা হারানো ছন্দ,নির্মম বাস্তবতার ভাগ্যের পরিহাসের শিকার ছোট্ট বেনু সহ প্রভৃতি গল্পগুলোর কারণে এ বইটি বারবার পড়তে ইচ্ছে হয়।
#bookreview এটি মূলত একটি গল্পগ্রন্থ। লেখকের নাম দেখে ভেবেছিলাম উনার লেখা তেমন একটা ভালো হবে না৷ কিন্তু এ ধারণা পোষণ করাটা অন্যায় হয়েছে। দারুণ লিখেছেন উনি। মুক্তিযুদ্ধ, মিশনারি স্কুল, গ্রামীন জীবন নিয়ে গল্পগুলো। আমার কাছে বিশেষ ভালো লেগেছে। এ গল্পগুলো__
°•একাত্তরের যীশু (এই নামে ১৯৯৩ সালে একটি চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে) °•পিয়ানো ভুতের গল্প °•বেনুর পৃথিবী °•রাজুর সুখ দুঃখ _______________ মোট গল্প ১১ টি__
১. একাত্তরের যীশু ২. জয় পরাজয় ৩. দেয়াল ৪. নতুন বছরের ছন্দ ৫. পল গোমেজের বাবা ৬. পিয়ানো ভূতের গল্প ৭. বেনুর পৃথিবী ৮. রাজুর সুখ দুঃখ ৯. লাল সূর্য ১০. শয়তান ও একটি চারাগাছ ১১. শহরে সকল সুখ
বই : একাত্তরের যীশু লেখক: শাহরিয়ার কবির গল্পগ্রন্থ প্রথম প্রকাশ - ফেব্রুয়ারি ১৯৮৫