রকিব হাসান বাংলাদেশের একজন গোয়েন্দা কাহিনী লেখক। তিনি সেবা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত তিন গোয়েন্দা নামক গোয়েন্দা কাহিনীর স্রষ্টা। তিনি মূলত মূল নামে লেখালেখি করলেও জাফর চৌধুরী ছদ্মনামেও সেবা প্রকাশনীর রোমহর্ষক সিরিজ লিখে থাকেন। থ্রিলার এবং গোয়েন্দা গল্প লেখার পূর্বে তিনি অন্যান্য কাজে যুক্ত ছিলেন। তিনি রহস্যপত্রিকার একজন সহকারী সম্পাদক ছিলেন।রকিব হাসান শুধুমাত্র তিন গোয়েন্দারই ১৬০টি বই লিখেছেন। এছাড়া কমপক্ষে ৩০টি বই অনুবাদ করেছেন। তিনি টারজান সিরিজ এবং পুরো আরব্য রজনী অনুবাদ করেছেন। তাঁর প্রথম অনুবাদ গ্রন্থ ড্রাকুলা। রকিব হাসান লিখেছেন নাটকও। তিনি "হিমঘরে হানিমুন" নামে একটি নাটক রচনা করেন, যা টিভিতে সম্প্রচারিত হয়।
কমিক্সের পরে প্রথম ছিল সেবার হরর সিরিজের একটা বই। ওইটা আমি কিনেছিলাম। বইটার নাম 'মমির অভিশাপ'। যদিও আমার প্রথম পড়া বইটা ছিল 'অভিশপ্ত ক্যামেরা'। আমি খুব বেশি ভুল না করলে সালটা হবে ১৯৯৮। কিন্তু তার অনেক আগে সেই ৯৬ এর দিকে নানা বাড়ি থেকে সেবার একটা বই গাপ করে দেই। ওইটা ছিল স্বপ্ন মৃত্যু ভালোবাসা। এরিখ রোমারকের ছিল ওটা। মনে আছে কিছু বুঝতাম না। দাত ভেঙে যেত। বইটা আবার বেহাত হয়ে নানা বাড়ি চলে যায় যায়। আবার নিয়ে আসি। তখন থেকেই বইয়ের কালেকশন শুরু। কিন্তু এই সব বাদ দিলে আমার ক্লাস টু থ্রিতে থাকার সময়কার প্রথম অ্যাডভেঞ্চার এক বন্ধুর সাথে প্রথম গিয়ে কিনেছিলাম বা বদলিয়ে নিয়েছিলাম কমিক্সের সাথে তার নামটা হচ্ছে তিন গোয়েন্দা ভলিউম ৪/১। যদিও মনে নেই আসলেই কিনেছিলাম নাকি বদলিয়েছিলাম। তবে ওটা যোগার করেছিলাম আমাদের এক ফ্রেন্ডের বড় ভাইয়ের কাছ থেকে। তখন তার জন্য হেঁটে হেঁটে পাশের দুই এলাকা ডিঙ্গিয়ে অন্য এলাকায় যেতে হয়েছিলো বইটা সংগ্রহ করতে। ওই দূরত্বতো তখন বিশাল ব্যাপার। আর আমি কখনোই রূপকথার ফ্যান ছিলাম না। কারণ হয়তো এই তিন গোয়েন্দা আর সেবা প্রকাশনী। এদের খপ্পরে পরে বেশি বুঝুয়া হয়ে গেলাম। তাই রূপকথা টুপকথা মামুলি লাগতো। আর তার জন্য প্রধানত দায়ী যে বইটা সেটি হচ্ছে এই ভলিউম ৪/১। কারণ এটা পড়ে যে ভাবে মজেছিলাম ওই সময় অন্য কিছুতে তেমনটা হয়নি। :P
তিন গোয়েন্দা ভলিউম ৪ এর প্রথম খন্ড পড়ে শেষ করলাম।
১.ছিনতাইঃ ৪/৫
ভলিউমের প্রথম গল্প 'ছিনতাই' বেশ ভালো লেগেছে। প্রথমার্ধে প্লেন হ্যাইজ্যাকিং এর ফলে হোস্টেজ থ্রিলারের একটা ফিল পেয়েছি। আর দ্বিতীয়ার্ধে ছিল পুরোদস্তুর অ্যামাজন বনে অ্যাডভেঞ্চার। গল্পের ক্লাইম্যাক্সটা অত্যন্ত উপভোগ্য ছিল। একই গল্পে দুই জনরার থ্রিলারের স্বাদ পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে,উপভোগ্য।
২.ভীষন অরণ্য(১+২)ঃ ৫/৫
ভলিউমের দ্বিতীয় গল্প 'ভীষন অরণ্য' একটা পিউর অ্যাডভেঞ্চার গল্প। দুর্দান্ত ছিল কাহিনীটা। তিন গোয়েন্দার সেরা পাঁচটি গল্পের মধ্যে অনায়াসে জায়গা করে নেবে এটা। জঙ্গলের দুর্গম পরিবেশ,নরমুন্ড শিকারী,হিংস্র শ্বাপদের দল ও প্রকৃতির চারপাশে পদে পদে ওত পেতে থাকা ভয়াবহ মৃত্যুফাঁদ গল্পটাকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। বর্ণনা এতটাই জীবন্ত ছিল যে পড়ার সময় মনে হচ্ছিল সবকিছু আমার চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি। সব মিলিয়ে,'ভীষন অরণ্য' গল্পটা পড়ে যে খুব উপভোগ করেছি তা বলাই বাহুল্য।
ছিনতাই ও ভীষন অরণ্য এই দুইটি গল্প নিয়ে ভলিউম ৪/১। দুটি গল্পই আমাজনে তিন গোয়েন্দার রহস্যময় অভিযান নিয়ে লেখা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথমটিতে তিন গোয়েন্দাকে ছিনতাই করে আমাজনে নিয়ে যাওয়া হলেও দ্বিতীয়টিতে তারা নিজেরাই বেড়িয়ে পড়ে গহীন আমাজনে জন্তু শিকারের উদ্দেশ্যে। টান টান উত্তেজনায় ভরপুর গল্প দুটি তিন গোয়েন্দা সিরিজের সেরা গল্পগুলোদ মধ্যে নিঃসন্দেহে জায়গা করে নিয়েছে।
তিন গোয়েন্দার প্রথম দিকের বইগুলো একেকটা মাস্টারপীস, রিভিশন দেবার জন্য আবার পড়লাম বইটা, ভীষ্ন অরন্য এ ভলিউমের সেরা গল্প, এমাজন এডভেঞ্চার। পড়তে পড়তে ফিরে গিয়েছিলাম অতীতে। আসলে এ বইগুলার আবেদন শেষ হবে না কখনও, এরকম বইও আর বের হবে না সেবে থেকে, যদিও তিন গোয়েন্দা সিরিজটা এখনো ধুকে ধুকে চলছে।
এই ভলিউমটির তিনটি কাহিনিই আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। এডভেঞ্চার এবং টুইস্টে ভরপুর। সত্যি বলতে কি, রকিব হাসান-এঁর সবগুলোই ভালো। তবে বেশ কিছু বই আছে যেগুলোকে তুলনাহীন বলা চলে, সেগুলোর মধ্যে এই ভলিউমটাও রয়েছে।