"কাবুলিওয়ালার বাঙালি বউ"– বইটা সম্পর্কে জানতে পারি কুইজিং করতে যেয়ে। খুব আগ্রহ নিয়েই বইটা শুরু করেছিলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বেশ আশাহতই হলাম।
.
.
কলকাতার এক তরুণী প্রেম করে বিয়ে করেন আফগানিস্তানের এক সুদের কারবারিকে। তারা একসঙ্গে স্বপ্ন দেখেন এক নতুন জীবনের। তারা বললে ভুল হবে, কারণ আমার মতে স্বপ্ন শুধু লেখিকাই দেখে গেছেন, তাঁর স্বামী জাঁবাজ নন। কারণ স্ত্রীকে আফগানিস্তানে ফেলে তিনি চলে যান ভারতে।
যাই হোক, সেই স্বপ্ন দ্রুত ভেঙে যায় যখন তিনি পা রাখেন এক ভিন্ন সংস্কৃতি, ভাষা, ও জীবনযাপনের দেশে, যেখানে নারীদের স্বাধীনতা প্রায় নেই বললেই চলে আর সামাজিক রীতিনীতি পুরুষতান্ত্রিকতার কঠোর বেড়াজালে আবদ্ধ।
তালেবান প্রভাবিত আফগান সমাজে নারীদের চলাফেরা, পোশাক, শিক্ষা, এমনকি কথা বলাও নিয়ন্ত্রিত। একজন বহিরাগত হিসেবে এই নিয়মগুলোর সাথে মানিয়ে নেওয়া যেমন ছিল কঠিন, তেমনি ছিল একাকীত্ব ও সাংস্কৃতিক দূরত্বের যন্ত্রণা।
.
.
বইটিতে লেখিকা খোলামেলা ভাষায় নিজের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা, ভয়, হতাশা ও মানসিক অস্থিরতার কথা তুলে ধরেছেন। কিভাবে একসময় ভালোবাসা ভরসা হয়ে উঠেছিল ভয়ের উৎস আর নতুন জীবন হয়ে উঠেছিল অচেনা কারাগার, সেসব বেদনাদায়ক মুহূর্ত এখানে স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে।
আফগান নারীদের বাস্তবতা, তাদের নিঃশব্দে সহ্য করা অবিচার এবং একজন বিদেশি স্ত্রী হিসেবে লেখিকার উপর আরোপিত প্রত্যাশা ও সীমাবদ্ধতাগুলো লেখিকা এই বইয়ে তুলে ধরেছেন।
শেষ পর্যন্ত নিজের সাহস, বুদ্ধিমত্তা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে তিনি পালিয়ে ভারতে ফিরে আসেন, যা কেবল শারীরিক মুক্তিই নয় বরং মানসিক ও সামাজিক মুক্তিও।
.
.
বইয়ে ভালো লাগার বিষয় বলতে বইটার মূল থিম কিংবা লেখিকার সেই দুর্গম জায়গা হতে বেরিয়ে আসা৷ আসলে বিষয়বস্তু যতই শক্তিশালী হোক, বইটির উপস্থাপনায় স্পষ্ট দুর্বলতা রয়েছে। লেখাটি ডায়েরির মতো সাজানো হলেও কোনো ধারাবাহিকতা নেই, হঠাৎ হঠাৎ ফ্ল্যাশব্যাক চলে আসছে। হুটহাট আফগানিস্তান থেকে কাহিনী চলে যাচ্ছে কলকাতায়। আর কনটেক্সট ছাড়াই একটার পর একটা চরিত্রের আগমন বেশ বিরক্তির উদ্রেক ঘটাচ্ছিল।
ভাষাগত দিক থেকেও বইটি দুর্বল। বানান ভুল, অস্পষ্ট বাক্যগঠন এবং আবেগ প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় গভীরতার অভাব রয়েছে। কিছু জায়গায় একই প্রসঙ্গ বারবার ফিরে এসেছে, যা পড়তে গিয়ে একঘেয়েমি তৈরি করে।
.
.
বইটা পড়তে যেয়ে বারবার মনে হচ্ছিল লেখিকার এই আফগান যুবককে বিয়ে করে সেই দেশে যাওয়ার দরকারই বা কী ছিল। লেখিকা নিজেই স্বীকার করেছেন তাঁর স্বামী জাঁবাজকে উনার বেশ লম্বা ও সুদর্শন মনে হয়েছিল, এইজন্য বিয়ে করা। বিয়ে করা পর্যন্ত ঠিক ছিল, কিন্তু তালেবানদের দেশে কেন গেলেন বিপদ জেনেও। ওই সময় তো আফগানিস্তানের অবস্থা অজানা থাকার কথা না। উনি বারবার বলেছেন প্রেমের টানে গিয়েছেন বাবা-মা নিষেধ করা সত্ত্বেও৷ তাও আবার ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হয়ে৷ উনি কিন্তু বিয়ের পরেও ধর্মান্তরিত হননি। লেখিকা শিক্ষিত, প্যারামেডিকে হওয়ার পরেও কেন এমন সিদ্ধান্ত নিলেন কে জানে। কথায় আছে না, ভাগ্যের লিখন না যায় খন্ডন?
সবচেয়ে এপিক ব্যাপার জানতে পারি বইটা পড়া শেষ করার পর, যখন লেখিকার বর্তমান অবস্থা দেখতে যাই৷ জানতে পারলাম এত কাঠখড় পেরিয়ে আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তান, সেখান থেকে ভারতে ফেরত আসার পরেও তিনি আবার আফগানিস্তানে যান, স্বেচ্ছায়, ২০১৩ সালে। উদ্দেশ্য ছিল আফগান নারীদের চিকিৎসা সেবা দেওয়া। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, সেখানে যাওয়ার পরপরই তাঁর মৃত্যু হয় সেই তালেবানদের হাতেই। ওহ, ২০১৩ সালেই আবার তাঁর স্বামীর সাথে নিজের মিল হয়। আর তাঁর সাথেই আফগানিস্তানে ফেরত আসেন তিনি।
.
.
আগেই যেটা বললাম, লেখিকার জীবনের গল্প বেশ শক্তিশালী। কিন্তু সঠিক উপস্থাপনার অভাবে বইটা পড়তে যেয়ে খুবই খারাপ লাগলো।
উনি একজন ভালো লেখককে দিয়ে বইটা লেখাতে পারলে হয়তো তা পাঠকের মনে অনেক গভীরভাবে দাগ কাটতে পারতো।