বাঁশিওয়ালায় আছে প্রথিতযশা সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের দুটি অপরূপ উপন্যাস বাঁশিওয়ালা এবং কোলাজ । বাঁশিওয়ালা ১৪১৪ বঙ্গাব্দের ‘শারদঅর্ঘ্য’ সম্মানে ভূষিত। বিদেশের অভ্যস্ত জীবন থেকে দেশে ফিরে এল মৃদুল। ফিরল তার শৈশবের চেনা গ্রামে। বউ লুইজা মেয়ে নিলিকে নিয়ে কানাডায় চলে গেছে। বিয়ে ভেঙে গেছে মৃদুলের। গাঁয়ের বাড়ির জমিজমা সম্পত্তি বিক্রি করে দেবে মৃদুল, এমনই ইচ্ছা। সম্পত্তির আয়-ব্যয়ের কড়াক্রান্তি হিসেবে সমেত সব আগলে আছেন হরপ্রসন্ন। মৃদুল নিজের জমিজমা দেখতে গিয়ে আবিষ্কার করল প্রকৃতির প্রাণ। ধানের ভারে নুয়ে পড়েছে গাছ। এ তার বিস্ময়। এই বিস্ময় সমেত মৃদুলকে ঘিরে ধীরে ধীরে গড়ে উঠল এক জাদুর জগৎ। মৃদুল বাঁশি বাজাল আর আকাশ বাতাস, মূক প্রাণীকুল হল বাঙ্ময় । মৃদুলের বিচ্ছিন্ন শিকড় আবার চারিয়ে গেল গ্রামের ভুঁয়ে।
কোলাজ উপন্যাসে বিচিত্র সব চরিত্র শীর্ষেন্দুর কলমে উপস্থিত। নানা রকম হৃদয়ের খেলা। নীলরঙা জিনস আর সাদা কুর্তায় অনন্যা বিটু যেভাবে গৌরাঙ্গের কাছ থেকে চুম্বন আদায় করে, লুটেরা বাতাসে ছাড়ে রহস্যময় ফিসফিস, তার তুল্য ভালবাসা ক’বার আসে জীবনে?
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় একজন ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক।
তিনি ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত ময়মনসিংহে (বর্তমানে বাংলাদেশের অংশ) জন্মগ্রহণ করেন—যেখানে তাঁর জীবনের প্রথম এগারো বছর কাটে। ভারত বিভাজনের সময় তাঁর পরিবার কলকাতা চলে আসে। এই সময় রেলওয়েতে চাকুরিরত পিতার সঙ্গে তিনি অসম, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের বিভিন্ন স্থানে তাঁর জীবন অতিবাহিত করেন। তিনি কোচবিহারের ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। শীর্ষেন্দু একজন বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। বর্তমানে তিনি আনন্দবাজার পত্রিকা ও দেশ পত্রিকার সঙ্গে জড়িত।
তাঁর প্রথম গল্প জলতরঙ্গ শিরোনামে ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সাত বছর পরে সেই একই পত্রিকার পূজাবার্ষিকীতে তাঁর প্রথম উপন্যাস ঘুণ পোকা প্রকাশিত হয়। ছোটদের জন্য লেখা তাঁর প্রথম উপন্যাসের নাম মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি।
চমৎকার একটা বই!! এক ব্যর্থ মানুযকে নিয়ে, যার বয়স মধ্য তিরিশ, বিদেশফেরত, বিদেশী বঊয়ের সাথে বিচ্ছেদ, অর্থাভাব, নিকট আত্ত্বীয় বিহীন, সব মিলিয়ে ভেঙ্গে পড়া এক মানুয যে গ্রামের বাড়ীতে যায় সব কিছু বিক্রি করে টাকা নিয়ে বিদেশ ফিরে যাবার জন্য। কিন্তু সেখানে কিসের টানে জড়িয়ে পড়ে মৃদুল ?! লেখক এক কঠিন আত্ম অনুসন্ধানের কাহিনী খুব সহজ ভাবে বলেছেন। এবং লেখার ধরন ও অন্যরকম। খুব সহজ কিন্তু খুবই বাস্তব। আসলে এমন তো হয়ই। চরিত্রগুলোকে খুব যত্ন নিয়ে আঁকা হয়েছে।
পরের উপন্যাসটাও (কোলাজ) বেশ চমৎকার। সম্পূর্ণ অন্য স্বাদের একটি উপন্যাস একই বইয়ে। লেখার ধরণ ও পাল্টেছে ।
বইটি পড়লে বোঝা যায় কেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী লেখক এবং তার বিখ্যাত লেখাগুলো ছাড়াও তিনি যে অন্য অনেক লেখার মধ্যে তার মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন তার প্রমান এই বইটি।
কদিন ধরেই কোন কারণহীন এক বিষণ্ণতা পেয়ে বসেছে। কোন বইয়ে, কোন কাজে মন বসছে না। অকারণ সব দুশ্চিন্তা কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে, আনন্দ পাচ্ছি না কিছুতেই। একের পর এক বই পাড়ছি তাক থেকে, নামাচ্ছি অন্তর্জাল থেকে, বায়োস্কোপ দেখব ভাবছি, হয়ে উঠছে না৷ খুঁজছিলাম এমন একটা বই, যা আমার এই বিষণ্ণতাকে ছুঁয়ে শেষে রঙিন করবে মন। 'বাঁশিওয়ালা' আমার সে আশ মিটিয়েছে। একটা ছোট্ট উপন্যাস, একটা গাঁয়ের৷ সময়কালটা কয়েক বছর আগের, সমকালীনই বলা যায় উপন্যাসের ধারা হিসেবে৷ সর্বস্ব হারিয়ে মৃদুল রায় ফিরে এসেছে গাঁয়ে, মৃত জ্যাঠামশাইয়ের বিপুল সম্পত্তি বিক্রি করতে। মেম বউ তাকে ছেড়ে গেছে, খোরপোষ মেটাতেই সর্বস্বান্ত, মারা গেছে একমাত্র দাদাও। আর এই ফিরে আসার পরের গল্পটাই বাঁশিওয়ালা। উপন্যাসে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে গাঁয়ের শরৎকাল। সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে এসে গ্রাম ও, যেখানে লক্ষীদির মতো দৃঢ়হৃদয় কুমারী মায়েরও দেখা মেলে আজকাল। আধুনিকতার ছোঁয়া লাগছে, তার অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে নিউক্লিয়ার হচ্ছে একের পর এক পরিবার। তবুও যেন শিউলি ফুলের ঘ্রাণমাখা শীতের মৃদু বাতাস গাঁয়ের একটা রূপকথার মতো ছবি মনে এঁকে দিয়ে যায়। তিন প্রজন্মের বাঁশুরে এই মৃদুল। তার বাঁশির টানে রাত বিরেতে রাস্তায় উঠে আসে সাপ, আর এক কিশোরী মেয়ে প্রেমে পড়ে দূর থেকে। দীননাথ যে সারাজীবন লক্ষীর পথ চেয়ে জীবন কাটিয়ে দিল, কেবল লক্ষীর ছায়ায় ছায়ায় জড়াজড়িতেই সে এই জীবনের সুখটুকু খুঁজে নিয়েছে। এই জন্ম যেন তাদের কেটে গিয়েছে অসম্ভবের অসঙ্গতেই। শেষটা স্বাপ্নিক, হয়তো একটু অবাস্তব। আবার কে জানে, এমন পাগল হয়তো অনেকই আছে। তাদের আমরা কেবল পাগল বলেই দূর থেকে তকমা সেঁটে দেই। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সৃষ্টি বিপুল, নানা ধরনের। তার মধ্যে এই ছোট্ট উপন্যাস বা বলা ভালো উপন্যাসিকাটি আমার চোখে অন্যতম সেরা হয়ে থাকবে। মন কেমনের একটা দিন পার হয়ে একটা উজ্জ্বল, ভালোবাসাময় ভোর উপহার যেন৷
খুব সাদামাটা গল্প, আর তেমনি সাদামাটা চরিত্রদের সমাবেশ; শীর্ষেন্দুবাবুর লেখনী আর দার্শনিক চিন্তাভাবনার গুণে অচিরেই বেশ ভালো লেগে যায় 'বাঁশিওয়ালা'। সব হারানো এক মানুষের বিলেত থেকে ঘরে ফেরার গল্প, নতুন করে নিজেকে ফিরে পাওয়ার গল্প 'বাঁশিওয়ালা'। দ্বিতীয় গল্প, 'কোলাজ' অতটা মন কাড়ে না, যদিও এর চরিত্রগুলি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। আর একটু বড়ো পরিসরে লেখা হলে বোধহয় ভালো হতো। ভালো করে চরিত্রদের বুঝে ওঠার আগেই গল্প শেষ।
স্বল্প পৃষ্ঠার বইটি পড়ে উঠতে বেশি সময় লাগে না। পড়ে দেখতে পারেন, ভালালাগার বেশ কিছু রসদ অবশ্যই পাওয়া যাবে।
বাঁশিওয়ালা গতকাল রাতে শেষ করে ঘুমালাম । অনেকটা মন খারাপ যেন চেপে ধরলো আমায় বইটা শেষ করার পর। একজন ব্যর্থ মানুষ আর তার পুরোনো স্মৃতির গল্প এভাবেও বলা যায় ?🥺 নিজেকে তো প্রায় হারিয়ে ফেলেছিল বাঁশিওয়ালা হয়তো পুরোনো স্মৃতির মাঝে নিজেকে খুঁজে পেয়ে শেষ জীবনটা স্মৃতি আকড়েই বেঁচে থাকবে সে।😌 প্রত্যেকটি চরিত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সবার জীবনের ঘটনা গুলো আলাদা রকমের তাৎপর্যপূর্ণ। 🥺তবে দীণনাথের জন্য কষ্টটা সব সময় রয়ে যাবে।😭 যে মানুষটা নিজের সবটুকু দিয়ে লক্ষীকে ভালোবাসলো তাও কোনোদিন ভালোবাসায় জোর খাটালো না কারন সে জানে অভাবে আর যাই হোক ভালোবাসা হয় না 😔হয়তো নিজের চিন্তা ভাবনার সাথে কোথাও দীননাথের সাথে নিজেকে মেলাতে পেরেছি । নিপবীথির সাথে মৃদুল এর সম্পর্কের ক্যালকুলেশনটা পরিবর্তন হতে দেখার কৌতূহলটা রয়েই গেলো ।। এভাবে পোষ্যদের নামকরণটা বেশ নজর কেড়েছে 😍 সব মিলিয়ে ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না মনের কতটা জায়গা জুড়ে রয়ে যাবে এই উপন্যাসিকাটি। 😌