কথা পরম্পরায় মানুষের ভাবনাজগৎ খুঁড়ে দেখার আনুষ্ঠানিক নাম সাক্ষাৎকার। সাক্ষাৎকার হয়ে উঠতে পারে একটি সৃজনশীল প্রক্রিয়া, ইতিহাসের মূল্যবান দলিল। তবে সে সাক্ষাৎকার হওয়া চাই গভীর অনুসন্ধানী, মেধাবী। নেহাত কৌতূহলহীন, খেলো, নিষ্পৃহ প্রশ্নউত্তর পর্ব মাত্র নয়, যথার্থ সাক্ষাৎকার একটি যৌথ অভিযান, দুজন মানুষের সৃষ্ট শিল্প। এই গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তেমনি কিছু মেধাবী সাক্ষাৎকার। স্বদেশ এবং বিদেশের সাহিত্য, চিত্রকলা, নাটক, চলচ্চিত্র, বিজ্ঞান এবং রাজনীতি বরেণ্য মানুষদের এই সাক্ষাৎকারসমূহ আমাদের আলোকিত করতে পারে নানা মাত্রায়।
Shahaduz Zaman (Bangla: শাহাদুজ্জামান) is a Medical Anthropologist, currently working with Newcastle University, UK. He writes short stories, novels, and non-fiction. He has published 25 books, and his debut collection ‘Koyekti Bihbol Galpa’ won the Mowla Brothers Literary Award in 1996. He also won Bangla Academy Literary Award in 2016.
একজন লেখকের বই পড়ার মাধ্যমে আপনি নিজের মস্তিষ্কের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারবেন। তবে কোনো প্রশ্নের উদ্রেক হলে কৌতুহল মেটানোর জন্য লেখককে পাবেন না। তবে সাক্ষাৎকারের বেলায় চিত্রটি পুরোটাই আলাদা। সরাসরি লেখককে প্রশ্ন করতে পারছেন এবং উত্তরের প্রতি-উত্তর দিতে পারছেন। একজন লেখকের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি, জীবনযাপন সম্পর্কে জানতে পারছেন। তবে এই ব্যাপারে একটি বিষয় লক্ষ্য রাখতে হয় যে, যিনি সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন, তিনি যথেষ্টই সাক্ষাৎদানকারী ব্যক্তি সম্পর্কে হোমওয়ার্ক করে নিচ্ছেন। অন্যথায় সাক্ষাৎকার একই বৃত্তে ঘুরপাক খাবে। শাহাদুজ্জামানের এই সংকলনটিতে লেখকের নিজস্ব গৃহীত কিছু সাক্ষাৎকার এবং ভাষান্তরিত মোট ১২ টি সাক্ষাৎকার রয়েছে। সাক্ষাৎকারদাতাদের মধ্যে সাহিত্যিক, চিত্রশিল্পী, ফটোগ্রাফার, মনোবিজ্ঞানী, চলচ্চিত্র পরিচালক কিংবা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সকলেই রয়েছেন।
নড়াইলের লাল মিয়া অর্থাৎ এস এম সুলতানকে নিয়ে প্রথম পড়েছিলাম আহমদ ছফার লেখায়। সুলতান সাহেবের ছবিগুলো সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হচ্ছিল তারই বিবরণ দিচ্ছিলেন আহমদ ছফা। একটি নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধও লিখেছেন তিনি। শাহাদুজ্জামানের সাথে আলাপচারিতায় সেই প্রবন্ধের উল্লেখও করেছেন সুলতান। আর্ট কলেজে ভর্তি, পড়ালেখা বাদ দিয়ে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেড়ানো, বিদেশের চিত্র প্রদর্শনী সবকিছু নিয়েই আলোচনা করেছেন তাঁরা। অকৃতদার মানুষটি গ্রামের বাড়িতে থাকতেন প্রকৃতির সান্নিধ্যে। এই বিষয়টি উপভোগ করতেন তিনি। আলোচনা করেছেন চিত্রকর্মের বিষয়বস্তু নিয়ে। তিনি মুক্তিযুদ্ধকে ছবির মাধ্যমে তুলে ধরতে আধুনিক অস্ত্রকে আনেননি। তিনি এনেছেন বাঙালি সংস্কৃতির লাঠি বল্লমকেই; এই অস্ত্রগুলোকেই সুলতান সাহেবের নিকট আপন মনে হয়েছে। বাঙালির মধ্যকার ধর্মীয় বিভেদ, ছবি সংরক্ষণের নাম করে এক ব্যবসায়ীর ছবি বিক্রি করে দেওয়া কিংবা আধুনিক ইউরোপের চিত্রকর্মের নানাদিক উঠে এসেছে এই আলাপচারিতায়।
বাংলা সাহিত্যে আঞ্চলিক ভাষার অনেক উপন্যাস রয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে দেখা যায় নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলের ভাষা সাধারণ পাঠকের কাছে বোধগম্য নাও হতে পারে। সেইক্ষেত্রে পাঠকের এই রুদ্ধতার দায় কি লেখকের উপর বর্তায়? প্রশ্নটির উত্তর দিয়েছেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় লেখক হাসান আজিজুল হক। একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের সংস্কার বা আবহ তৈরি করতে ঐ অঞ্চলের ভাষার উপস্থাপন জরুরি। এই বিষয়টা তুলে আনতে না পারলে দেখা যাচ্ছে, প্রাসঙ্গিক ঘটনাবলির ভিন্ন অর্থ চলে আসছে। তবে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করলেও লেখকদের উচিৎ খুব সংকীর্ণ শব্দ ব্যবহার না করা। একজন লেখকের বিশেষ কোনো শ্রেনি-পেশার মানুষের নিয়ে লিখতে হলে ঐ পেশার অন্তর্ভুক্ত হওয়া জরুরি নয়। তবে তাদের সম্পর্কে যতটা নিকট হতে তথ্য সংগ্রহ করা যায়, ততটাই তাদের জীবনের কাছাকাছি পৌঁছানো সম্ভব বলে মনে করেন এই প্রথিতযশা সাহিত্যিক।
ছোট গল্প কিংবা উপন্যাসের পাঠকেরা দুইটি বিষয় নিয়ে অনেক বিব্রত হন; যৌন দৃশ্যের বর্ননা ও গালিগালাজের ব্যবহার। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সাহেবের মতে, প্রয়োজন অনুযায়ী সকল বিষয়ই ব্যবহার করা যায়। অপ্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে চুম্বনের বর্ননা যেমন অশ্লীল মনে হতে পারে, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় অর্থে সহবাসের বর্ননাও শ্লীল হতে পারে। এই বিষয় পুরোটাই নির্ভর করে লেখক কীভাবে কোন জায়গায় উপস্থাপন করছেন। ঢাকাইয়া আঞ্চলিক আবহের ক্ষেত্রে দেখা যায় প্রচুর গালিবাচক শব্দের ব্যবহার, যা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লেখাতেও পাওয়া যায়। এই ব্যাপারটা হয়তো দীর্ঘকালের একটি সংস্কৃতি। তবে মানুষের কোনো একটা বিষয়কে অভিভূত বা আপ্লুত না হয়েই উপস্থানের যে প্রক্রিয়া তার কারণেই এই ধারার প্রচলন দেখা যায়। আলোচনা হয়েছে 'চিলেকোঠার সেপাই' উপন্যাসের চরিত্র ও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে। এছাড়া বহুমাত্রিক বিষয় উঠে এসেছে প্রশ্ন-উত্তরের মাধ্যমে, যা পাঠককে নানামুখী বিষয়ে ধারণা প্রদান করে।
পুঁজিবাদী আমেরিকার নাকের ডগায় বসে তাদেরই মদদপুষ্ট সরকারকে উৎখাত করে সমাজতন্ত্রের পতাকা উড়েছিল কিউবায়। সেই বিপ্লবের পুরোধা ছিলেন ফিদেল ক্যাস্ট্রো। দুই পর্বে ক্যাস্ট্রোর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। প্রথম পর্ব সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের পূর্বে কিউবার অবস্থা এবং ক্যাস্ট্রোর সময়কালকে ধারণ করেছে। দ্বিতীয় পর্বে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের পর কিউবার পরবর্তী পদক্ষেপ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি সসম্পর্কিত আলোচিত হয়েছে। মার্কসবাদের সাথে ধর্মের একটি সংঘাত সবসময় আলোচিত হয়। ক্যাস্ট্রো তাঁর ছেলেবেলা থেকে ক্ষমতায় আরোহনের উত্তরকালে ধর্মের প্রভাব ও জনমনে ধর্মীয় অনুশাসনের ক্রিয়াকলাপ আলোচনা করেছেন। তিনি নিজেকে ধর্মীয়ভাবে বিশ্বাসী বলার চাইতে, রাজনৈতিকভাবে বিশ্বাসী বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তাঁর মতে, বিশ্বাসটাই জরুরি এবং বিশ্বাসকে হত্যা করা যায়না। বিপ্লবের প্রথম ধাপে ব্যর্থ হয়ে সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়েছিলেন এবং জেলও খেটেছেন। তবে জনগণের সমর্থন জোরালো হওয়ায় জেল থেকে বের হয়ে পুনরায় বিপ্লবী সরকার প্রতিষ্ঠায় সফল হন। আলোচনায় এসেছে সহযোদ্ধা চে এবং কামিলোর কথা।
বিদেশী ব্যক্তিবর্গের মধ্যে ইতিহাসবিদ ভিলেন ভ্যান সেন্ডেলের সাক্ষাৎকারটাও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ইতিহাস চর্চা ও বাংলা ভাষার প্রসারে রাষ্ট্রের নগ্ন রূপকে তিনি প্রকাশ করেছেন। মনোবিজ্ঞানী সিগমুনফ ফ্রয়েড, চিত্রকর পাবলো পিকাসো, কথাসাহিত্যিক মিলান কুন্ডেরা কিংবা চলচ্চিত্রকার আন্দ্রেই তারকোভস্কির সাক্ষাৎকারেও তাঁদের নিজ নিজ পেশা সংশ্লিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়।
এককথায় অসাধারণ একটি বই। দুই-একটি সাক্ষাৎকার একটু একঘেয়েমি লাগলেও পুরো বইটি উপভোগ্য এবং পাঠকের চিন্তার দ্বারকে উন্মোচিত করতে সাহায্য করবে বলে মনে করি। শাহাদুজ্জামানের লেখনী সুন্দর, তিনি সাক্ষাৎকার নিয়েছেনও সচেতনতার সাথে; তাই সংকলনটি একটি নান্দনিক চেহারায় রূপ নিয়েছে। হ্যাপি রিডিং।
প্রচলিত সাক্ষাৎকারগুলোতে জিজ্ঞাসিত প্রশ্নসমূহের মধ্যে আমি কোন সুচিন্তিত জিজ্ঞাসাবোধ, সাক্ষাৎপ্রদানকারীর মত সম্পর্কে বিশুদ্ধ কৌতূহল কিংবা প্রশ্নসমূহের মাঝে বৈচিত্র্য কিছুই দেখতে পাইনা। সাক্ষাৎকারগ্রহীতাদের একই তেলানি মার্কা নয়তো তথাকথিত এস্থেটিক প্রশ্ন আর স্তুতিবাদে ভরপুর সাক্ষাৎকার চারিদিকে গমগম করছে বলে এসব পড়তে আর আগ্রহী হইনা। এখনকার ইন্টার্ভিউয়াররা যার ইন্টার্ভিউ নিবে তাঁর সম্পর্কে ন্যুনতম ধারণা না রেখেই চলে আসে। এমন তামাশার সাক্ষী আমি নিজে। এদিক দিয়ে শাহাদুজ্জামান যে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম এবং সাক্ষাৎকারগ্রহীতা হিসেবে যে অনন্যা তা বইটি পড়ার পর আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।
শাহাদুজ্জামানের নিজের নেওয়া বঙ্গদেশের কিছু কীর্তিমান ব্যক্তিত্ব এবং বিশ্বের শ্রেষ্ঠ কিছু মনীষীদের অনূদিত সাক্ষাৎকারসমূহ উক্ত গ্রন্থে সন্নিহিত হয়েছে। অনুবাদের কথা থাক, সেখানে তিনি সাবলীল। শাহাদুজ্জামানে নিজের গৃহীত সাক্ষাৎকারগুলোর কথা কিছু বলার দরকার। 'সাক্ষাৎকার' কোন হেলাফেলার বিষয় নয়। যাদের কথা-চিন্তা আমাদের জন্য মূল্যবান বলে পরিলক্���িত হয় আমরা তাদের কাছেই যাই। গভীর জিজ্ঞাসা ছাড়া কারো কাছে সাক্ষাৎকার নিতে গেলে সেটা সাক্ষাৎপ্রদানকারীর জন্য বিব্রতকর হয়ে দাড়ায়। শা��াদুজ্জামান যাদের কাছে গিয়েছেন তাঁদের সৃষ্টকর্ম সম্পর্কে গভীর জ্ঞান ও একটা প্রবল জিজ্ঞাসা নিয়েই গিয়েছিলেন। কথোপকথন হয়েছে দ্বিমুখী। চিন্তা-ভাবনার সমস্বত্ব আদানপ্রদান, কথিত বিষয়বস্তুর উপর সত্যিকার অনুরাগ এবং গ্রহীতা -প্রদানকারীর মাঝে শ্রদ্ধাবোধ থাকলে একটা প্রকৃষ্ট সাক্ষাৎকারের সৃষ্টি হয়। এইসব গুণাবলী শাহাদুজ্জামানের গৃহীত সাক্ষাৎকারসমূহে পুরোদমে উপস্থিত।
২৫ সালে এখন অবধি আমার পড়া সবচেয়ে প্রিয় বই 'কথা পরম্পরা'। বাংলায় এতো ভালো সাক্ষাৎকার গ্রন্থ হয়তো আর নেই। এই গ্রন্থ প্রমাণ করে, আপনি যার সাক্ষাৎকার নিবেন তার সম্পর্কে আপনার সম্পূর্ণ ধারণা থাকা লাগবে, তার যাবতীয় কাজকর্ম স্টাডি করে তারপর সাক্ষাৎকার নিতে হবে; তখনই কেবল সেই সাক্ষাৎকার পাঠকের চিন্তার জগতে আঘাত করবে, পাঠককে সামগ্রিকভাবে জাগ্রত করবে।
এই গ্রন্থে শাহাদুজ্জামানের সরাসরি গৃহীত সাক্ষাৎকার রয়েছে পাঁচটি। চিত্রকর এস.এম সুলতান, কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক এবং আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, ইতিহাসবিদ ভিলেম ভ্যান সেন্ডেল, নাট্যতত্ত্ববিদ আলেকজান্ডার স্টিলমার্ক। এছাড়া ভাষান্তরিত সাক্ষাৎকার রয়েছে আটটি। নাট্যকার হেনরিক ইবসেন, মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েড, চিত্রকর পাবলো পিকাসো, কথাসাহিত্যিক মিলান কুন্ডেরা, চলচ্চিত্রকার আন্দ্রেই তারকোভস্কি, আলোকচিত্রশিল্পী জেমস ন্যাক্টওয়ে, এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ফিদেল ক্যাস্ট্রো।
চিত্রকর এস.এম সুলতান এবং ফিদেল ক্যাস্ট্রোর সাক্ষাৎকার আমার জীবনে পড়া অন্যতম প্রিয় সাক্ষাৎকার। এই দুইটা সাক্ষাৎকার আমাকে সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে আগের চেয়ে বেশি সচেতন করেছে। সুলতানকে তো আমি আইডল হিসেবে ধরতে পারি। কারণ তার মতো আমিও একাডেমিক সনদের তোয়াক্কা করি না, আমারও কোনো ম্যাটেরিয়াল নিড নাই এবং আমিও সবার মধ্যে সেন্স অব রেস্পন্সিবিলিটি তৈরি করতে চাই। আর ফিদেল ক্যাস্ট্রো আমাকে পুরোপুরি রাজনৈতিক সচেতন করে তুলেছে। আর বর্তমান সময়ে আমরা সবাই যদি রাজনৈতিক সচেতন না হই তবে ভবিষ্যত প্রজন্ম আমাদের মতোই অন্ধকারে ডুবে থাকবে। আমাদের পূর্বপুরুষেরা যে ভুল করেছে সেটা তো আমরা করতে পারি না; তাহলে ভীষণ অন্যায় হবে।
ইতিহাসবিদ ভিলেম ভ্যান সেন্ডেলের সাক্ষাৎকার অবাক করেছে। একজন ভিনদেশী মানুষ বাংলাদেশেকে হৃদয়ে এভাবে ধারণ করতে পারে! যার গবেষণার বিষয়ই বাংলাদেশ, বর্হিবিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করাই যার জীবনের উদ্দেশ্য। যার চিন্তা-চেতনায় শুধুই বাংলাদেশ। আর নাট্যতত্ত্ববিদ আলেকজান্ডার স্টিলমার্ককে যখন শাহাদুজ্জামান জিজ্ঞেস করল, 'আমরা বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে নাটককে কীভাবে জনপ্রিয় করতে পারি?' তখন স্টিলমার্ক বলেছেন, 'যেদেশের মানুষের এখন অবধি মৌলিক চাহিদা পূরণ হয় নাই, সেদেশে নাটকের জনপ্রিয়তার চিন্তা করা এক ধরনের বিলাসিতা। আগে মৌলিক চাহিদা পূরণ হোক, তারপর নাটকের প্রচার এবং প্রসার নিয়ে ভাবুন।'
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে অনেক ভাবনার খোরাক আছে। তাছাড়া ভাষান্তরিত সবগুলো সাক্ষাৎকার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ফিদেল ক্যাস্ট্রোর দীর্ঘ সাক্ষাৎকার এবং আন্দ্রেই তারকোভস্কির সাক্ষাৎকার। পাশাপাশি ফ্রয়েড, পিকাসো, কুন্ডেরা, ন্যাক্টওয়ে এবং হেনরিক ইবসেনের সাক্ষাৎকারও আমার চিন্তার জগতকে আলোড়িত করেছে। তবে হাসান আজিজুল হকের সাক্ষাৎকার ভালো লাগেনি।
এই সাক্ষাৎকার গ্রন্থ একজন সচেতন পাঠক হিসেবে আপনার অবশ্যই পড়া উচিত। বাকিটা আপনার অভিপ্রায়। এমন বইগুলোর পাঠপ্রতিক্রিয়া জানাতে ভীষণ আনন্দ লাগে। রেকমেন্ডেড।
সুলতান, হাসান আজিজুল হক আর বিস্তৃত পরিসরে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সঙ্গে শাহাদুজ্জামানের কথোপকথন ব্যক্তি শিল্পীকে বুঝতে তো অবশ্যই সাথে শিল্পীর আশপাশের পরিস্থিতি তাকে কিভাবে সৃষ্টির দিকে ঠেলে দেয় বা সৃষ্টি করিয়ে নেয় তা চোখের সামনে নিয়ে আসে। দারুণ উপভোগ করেছি আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের দীর্ঘ কথোপকথন। ইতিহাস, ব্যক্তি, সমষ্টি, শ্রেণী বৈষম্য বা মানুষের পরিচয় আমলে নিয়ে ইলিয়াসের কথা কাজে লেগেছে খুব। আর হঠাৎ সাম্রাজ্যবাদী মদদে কিউবাতে অশান্ত আবহাওয়ার মধ্যে ফিদেল ক্যাস্ট্রোর রাষ্ট্র মেরামতির দীর্ঘ আলোচনা পড়া গেল। এটাও বেশ কাজের হলো। কারণ ঢাকায় বসে কিউবার ইতিহাস আর শ্রেণী সংগ্রাম বাংলায় পড়া হয়ে উঠত না। ভাবতেও অবাক লাগে, আমরা নিজেরা থাকি এক ভয়ংকর বৈষম্য বিস্তারি সমাজে। ভঙ্গুর এক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় মানুষের জীবন নাকাল। এমন পরিস্থিতে দেখি মানুষ কিউবার সমালোচনায় মুখর। নিজের বেঁচে থাকার অধিকার তলানিতে থাকা অবস্থায়, অন্য আরেকটা রাষ্ট্রের মানুষজন যারা রক্ত দিয়ে, ত্যাগ দিয়ে নিজেদের মানুষের জন্য একটা কল্যাণকর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা করে যাচ্ছে- তাদের গালমন্দ করা আমাদের সাজে না।
পুনর্পাঠ৷ '১৯ এর বইমেলা থেকে কেনার পর প্রথমবার পড়ে বেশ কিছু কৌতূহল-উদ্দীপক বিষয়ে জেনেছিলাম। ভালোই, বেশ সাজানো-গোছানো বই। তবে ভাষান্তরিত সাক্ষাৎকারের অংশটি অতো ভালো লাগেনি।
'শাহাদুজ্জামান' এর সাহিত্য ছাড়াও আনুষঙ্গিক কাজের একটা গুরুত্ব আছে যা সমকালীন বিশ্ব, জ্ঞান ও চিন্তার জগতের ধারণা পেতে সাহায্য করে । 'কথা পরম্পরা : গৃহীত ও ভাষান্তরিত সাক্ষাৎকার' তেমনই একটা বই যাতে তার নিজের নেয়া ও অনুবাদ করা সাক্ষাৎকারের সন্নিবেশ আছে । এই বইতে কবি, লেখক, চিত্রশিল্পী, চলচ্চিত্রকার, নাট্যকার, ফটোগ্রাফার; এমন শিল্পের জগতের বিভিন্ন ব্যক্তিত্ব ছাড়াও- ইতিহাসবিদ, মনোবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের যে সাক্ষাৎকারের সংকলন হয়েছে তা আমাদের চিন্তা ও চর্চার জগতে একটা হাইপার-ডাইভ হিসেবে কাজে লাগে ।
সুপাঠ্য বই, বিশেষ করে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাক্ষাৎকার ব্যাপক এবং ডাইভার্স। তুলনামূলকভাবে এস এম সুলতানের ব্যক্তিক আভাস পাওয়া গেল, যা খুবই অপ্রতুল আর তৃষ্ণাসঞ্চারী।
এই বইটা নিয়ে বিস্তারিত একটু না লেখা বইটার জন্যই অবমাননা হবে। সাক্ষাৎকার-গ্রহীতার উপরে সাক্ষাৎকার এর সার্থকতা অনেকাংশেই নির্ভর করে। অসম্ভব ইন্টারেস্টিং একজন মানুষের সাক্ষাৎকার ও সাক্ষাৎকার গ্রহীতার প্রশ্ন এবং তালের সাথে সাথে বিবর্ণ হয়ে যেতে পারে। এই বইটা সে সম্ভাবনা থেকে একেবারেই মুক্ত, কারণ সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন শাহাদুজ্জামান। আর ভাষান্তরিত সাক্ষাৎকার গুলোও চমৎকার এবং বাছা বাছা। অনুবাদও ভালো, যার কারণে সেগুলো পড়েও তৃপ্ত হয়েছি। ভাষান্তরিত সাক্ষাৎকারগুলোর মধ্যে ফ্রয়েড এবং ফিদেল কাস্ত্রো এর সাক্ষাৎকার দুটিই সবচেয়ে ভালো লেগেছে। কাস্ত্রোরটা অনেক বিস্তারিত। বিপুল বিষয়ে তাঁর ধারণা, তাঁর সংগ্রাম, আগ্রহ, সাহিত্যপ্রীতি, রাজনীতি, ব্যক্তিগত জীবন, ঈশ্বর ভাবনা সব উঠে এসেছে যেগুলো খুবই চিত্তাকর্ষক। ফ্রয়েডের লেখা এবং মতবাদের সাথে পরিচিত থাকলেও সরাসরি কোন সাক্ষাৎকার আগে পড়া হয়নি৷ এই সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে ব্যক্তি ফ্রয়েডকে যেন একটু চেনা গেল। আর গৃহীত সাক্ষাৎকারগুলোর প্রায় সবকটিই খুব চমৎকার। তবে সুলতানেরটা আলাদা করে উল্লেখ করতেই হয়। এই সাক্ষাৎকার পড়েই আমি নতুন করে আবার এস এম সুলতান সম্পর্কে আগ্রহী হয়েছি, তাঁকে নিয়ে তৈরি ডকুমেন্টারি দেখেছি, তাঁর আঁকা নিয়ে বই পড়েছি, আরো একটা বই সংগ্রহের তালিকায় যুক্ত করে রেখেছি। আজকের বাংলাদেশে এবং ভবিষ্যতেও এমন মানুষ খুব বেশি প্রয়োজন, এমন সহজ দর্শনের মানুষকে নিয়ে আরো অনেক বেশি আলোচনার প্রয়োজন। হাসান আজিজুল হক এবং আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাক্ষাৎকার দুটিও খুব হৃদয়গ্রাহী। এমন সুন্দর জ্ঞানগর্ভ আলোচনায় আমরা ক্ষুদ্র পাঠকেরা যে কতটুকু ঋদ্ধ হই, তা লেখায় প্রকাশ করাও কঠিন৷ আমার কাছে এটা সবসময়ের জন্য সেরা একটা সাক্ষাৎকার গ্রন্থ হয়ে থাকবে।
সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল পড়তে পড়তে পাঠকের মনে হয় তিনিও ইন্টারভিউ যে কক্ষে হচ্ছে সে কক্ষে উপস্থিত ফলে যিনি ইন্টারভিউয়ার এবং ইন্টারভিউই এর প্রতি নানা ধরনের আবেগ-অনুভূতির উদ্রেক করে।সাধারণ অর্থে ইন্টারভিউ একটি বিপদজনক টার্ম যিনি ইন্টারভিউ দিচ্ছেন তার জন্য ,ফলে জার্নালিজমে এই টার্ম প্রবেশের পর থেকে বিতর্ক শুরু। কিন্তু ইন্টারভিউ যদি হয় অলস দুপুরে খাওয়ার পর কথোপকথনের মত , যদি প্রশ্নকর্তা যাকে প্রশ্ন করবেন তার ফিল্ড সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান রাখেন তাহলে ঐ আলোচনা বা সাক্ষাতকার হয়ে উঠতে পারে বৈপ্লবিক, কালজয়ী আর উপভোগ্য তো বটেই। এইসব সেন্স থেকে শাহাদুজ্জামানের কথা পরম্পরা নামটি যথার্থ অর্থ বহন করে কেননা এটি কিছু অসামান্য মানুষের সাথে কিছু সরাসরি কথোপকথন এবং কিছু অনূদিত কথোপকথনের সংগ্রহ। আগে পত্রিকায় সাক্ষাৎকার অল্পস্বল্প পড়তাম যদিও সেগুলো খুবই মেকি এবং বিরক্তিকর কিছু প্রশ্নের সমন্বয় মাত্র। কিন্তু শাহাদুজ্জামান ঠিক সেসকল মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন যাদের জগত সম্পর্কে তিনি গভীর জ্ঞান রাখেন , ফলে সাক্ষাৎকারগুলো খুবই উত্তেজনাকর, সরেস, চিন্তার উদ্রেদকারি এবং অবাক করার মত। তার নিজের নেওয়া সাক্ষাৎকারের মধ্যে আছেন এস।এম।সুলতান, হাসান আজিজুল হক , আখতারুজ্জামান ইলিয়াস প্রমুখ । অনূদিত সাক্ষাৎকারের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং সবচেয়ে দীর্ঘ হচ্ছে ফিদেল ক্যাস্ট্রোরটি এছাড়াও চলচিত্র পরিচালক আন্দ্রেই তারকাভস্কি , ফটোগ্রাফার জ্যামস ন্যাটওয়ে(মোস্ট শকিং) প্রমুখদের চমকপ্রদ সব সাক্ষাৎকার। এই বই টি হল নদীর মত এবং নদী আপনাকে সাগরে নিয়েই ফেলবে। কারণ, এই বইয়ের অনূদিত ইন্টারভিউ গুলোর নেওয়া হয়েছে The Penguin Book Of Interviews edited by Christopher Silvester বই থেকে যা আসলে ইন্টারভিউ এর সাগর ।ঐ বইতে হিটলার থেকে শুরু করে হিচককের ইন্টারভিউ রয়েছে। বলা যায়, দুটো বই ই অবশ্যই পাঠ্য একটি বই।
দারুণ কিছু সাক্ষাৎকার। সবগুলো সমান উপভোগ্য না হলে মোটের ওপর চমৎকার বই। বিশেষ করে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সুলতান আর ফিদেল কাস্ত্রোর সাক্ষাৎকার দারুণ লেগেছে। ভাষান্তরিত সাক্ষাৎকারের ক্ষেত্রে কিছু সাক্ষাৎকার যেমন পিকাসো, ফ্রয়েড আর কুন্ডেরার সাক্ষাৎকার অনুবাদ করার জন্য যেখান থেকে বাছাই করেছেন সেই বাছাই খুব ভালো মনে হয় নি।