প্রত্যেক সুস্থ মানুষই জীবনের কোন না কোন সময় আত্মহত্যার কথা ভাবে। আত্মহত্যা কে সত্যিকার দার্শনিক সমস্যা বলেছেন কামু। আত্মহত্যার সার্বজনীন গ্রহনযোগ্য সমাধান আজতক মানুষ নির্ধারন করতে পারেনি। মানুষ কেন আত্মহত্যা করে? কেউ কেউ মুহুর্তের বিহ্বলতায়, কেউ কেউ জীবনযাপনের ব্যর্থতার দরুন, কেউ কেউ সামাজিক আত্মমর্যাদাবোধ রক্ষায় আবার অনেকে অন্তর্গত ' বিপন্ন বিস্ময়' দ্বারা তাড়িত হয়ে বেছে নেন আত্মহত্যার পথ। প্রত্যেকটি আত্মহত্যা ই ঘটনা হিসেবে স্বতন্ত্র ।
আত্মহত্যা ও অস্তিত্বের বিপন্ন বিস্ময় নিয়ে বাংলায় উল্লেখযোগ্য বইয়ের সংখ্যা অতি স্বল্প বলে আমার ধারণা। তাই স্বভাবতই বইটি প্রবল আগ্রহের সাথে সংগ্রহ করি। বইটির শুরু হয়েছে চমৎকারভাবে। কুমার চক্রবর্তী কবি মানুষ। এর ফলে তিনি 'আত্মহত্যা ও অস্তিত্ব'র মতো নিগূঢ় বিষয় তিনি একাডেমিকের দৃষ্টিতে না দেখে, সাহিত্যের নিরিখে দেখার চেষ্টা করেছেন। যদিও প্রচুর বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্তের বিবরণ ছিলো। তিনি আত্মহত্যা করা সৃষ্টিশীল মানুষ তথা সাহিত্যিকদের জীবন ও সাহিত্যের পর্যালোচনা করে সৃষ্টিশীলতার মাঝে লুকিয়ে থাকা আত্মবিধ্বংসের বীজ আবিষ্কারের চেষ্টা করেছেন। আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশের কতিপয় বিস্মৃত তরুণ কবিদের আত্মহত্যার সংবাদ।
বইটি অত্যন্ত চমৎকার হতে পারতো। কিন্তু সঠিক সম্পাদনা আর একই তথ্যের মাত্রাধিক পুনরাবৃত্তি যথেষ্ট বিরক্তের সৃষ্টি করেছে। কুমার চক্রবর্তীর অন্য একটি গদ্যের বই আমার পড়া। তাঁর গদ্য কবিসুলভ মনোরম কিন্তু এই বইয়ের কোন কোন অংশ এতটাই ফ্ল্যাট যে মনে হয় কোন ইংরাজি আর্টিকেল গুগল ট্রান্সলেটরে ফেলে বইয়ে জুড়ে দিয়েছে, যা ছিলো আশ্চর্যরকমের হতবুদ্ধিকর আমার জন্য। তবু বইটি পড়েছি বিষয়বস্তুর প্রতি আগ্রহের জোরে যা অনেক পাঠক করতে পারবেন না বা চাইবেন না। বেশ কিছুটা হতাশ হলেও বইটি আমি রেকমেন্ড করবো সবাইকে। অস্তিত্ব, আত্মহত্যা, জীবনবোধ ইত্যাদি নিয়ে বাংলায় আরো সেরিয়াস কিন্তু সাহিত্যমানসম্পন্ন বই লিখিত হোক সেই প্রত্যাশা রাখি।
একটি সুলিখিত গ্রন্থ পাঠককে চুম্বকের মতো আকর্ষিত করে। আর একজন সুলেখক জটিল ও কঠিন বিষয়কেও সহজ-সরল ভাষায় পাঠকের কাছে উপস্থাপন করতে পারেন।
'অস্তিত্ব ও আত্মহত্যা' পরস্পরবিরোধী বিষয়। এই নিয়ে আলোচনা সহজ নয়। এই কঠিন কাজটিকে আরও জটিল করে ফেলেছেন কুমার চক্রবর্তী। গুগল ট্রান্সলেটরের মতো প্রাণহীন শব্দ,বাক্যে লিখে গেলেই হয় না। তাতে পাঠক সংযুক্ত হতে পারবেন কীনা সেদিকেও মনোযোগী হওয়া বাঞ্ছনীয়। অথচ হেমিংওয়ে, মায়াকোভস্কি, ভার্জিনিয়া উলফ এবং সিলভিয়া প্লাথের মতো কবি ও সাহিত্যিকরা কেন আত্মহত্যা করেছেন, তাদেরসহ অন্যান্য আত্মহত্যাপ্রবণ লেখক,দার্শনিক কী বলেছেন তা যেন গুগল ট্রান্সলেটর থেকে টুকে বই হিসেবে ছাপিয়ে দিয়েছেন 'ভদ্রলোক'।
চমৎকার বিষয় নিয়ে বিশ্রীভাবে লেখা একটি বইয়ের দৃষ্টান্ত কুমার চক্রবর্তীর 'অস্তিত্ব ও আত্মহত্যা'।
গাঁটের অনেকগুলো টাকা খরচা করে সুন্দর শিরোনামওয়ালা মোটাসোটা বইটা খরিদ করেছিলাম। এক্কেবারে ঠকে গেলাম। এই ধরনের কর্মকাণ্ডে মন থেকে বলতে ইচ্ছে করে, ' আল্লাহ তোমার কাছে বিচার দিলাম! '
এই বইয়ের রিভিউ লেখার চেয়ে বই থেকে কোট করা ভাল মনে হল অথবা আমি এখনো এই বইয়ের রিভিউ লেখার জন্য যথেষ্ট হয়ে উঠতে পারিনি।
'আত্মহত্যা তো সাধনার বিষয় হইতে পারে না, আত্মার বিকাশই সাধনার লক্ষ্য।' -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
'প্রাণীদের মধ্যে সংঘটিত আত্মবধকে কোনভাবেই বলা যায় না আত্মহত্যা, কারণ তাতে থাকে না চৈতন্য তাড়িত প্রণোদনা'
'বিংশ শতাব্দীর আত্মহত্যা মহৎ শিল্পকর্মের মতোই হৃদয়ের নীরবতায় সংঘটিত হয়'
'ক্লেওপাত্রার আত্মহত্যা আর ভার্জিনিয়া উলফের আত্মহত্যা একই মাত্রা বহন করে না'
‘গ্রিসে স্বেচ্ছামৃত্যু অন্যায় ছিল না কিন্তু এর পেছনে সুন্দর যুক্তি থাকার প্রয়োজন হতো'
'সক্রাতিস ছিলেন নৈতিকভাবে এই প্রত্যাহারের পরিপন্হী । এ বিষয়ে তাঁর উক্তি: একটি নীতি গোপনে চুপিচুপি বলে বেড়ায় যে মানুষ হলো এক বন্দি, দরজা খুলে দৌড়ে যাবার যার কোন অধিকার নেই: there is a doctrine whispered in secret that man is a prisoner who has no right to open the door and run away..। কিন্তু তাঁর মৃত্যুকেও এক প্রচ্ছন্ন ধরনের আত্মহত্যা বলা হয় এবং প্লাতোর অ্যাপলজিতে বর্ণিত তাঁর উক্তিকে উদ্ধৃত করা হয়: it was better for me to die now and be delivered from trouble. প্রেক্ষাপট পরিবর্তিত হয়ে যায় । খ্রিস্টধর্ম প্রভাবিত ইয়োরোপে আত্মহত্যা মহাপাপ বলে বিবেচিত হতে শুরু করে'
'আধুনিক জীবন হলো full of specialist without spirit, sensualist without heart'
'স্বর্গে মৃত্যু থাকবে না, এই কারণেই সম্ভবত আত্মহত্যার চেষ্টা থাকবে'
'বৌদ্ধতত্ত্ব মনে করে, সত্তার দশটি ভাগ রয়েছে এবং মানব-অস্তিত্ব এই দশা ধরে অগ্রবর্তি হয়। এই দশা দশটি এ রকম: নরক, লোলুপতা, পশুপ্রকৃতি, ক্রোধ, প্রশান্তি, পরমানন্দ, জ্ঞান, আংশিক জ্ঞানালোক প্রাপ্তি, বোধিসত্ত্ব ও বুদ্ধত্ব'
'অস্তিত্ববাদ মূলত বিংশ শতাব্দীর দর্শন যা অস্তিত্বের উপলব্ধি, সম্ভাবনা ও সমস্যার ভেতর দিয়ে ব্যক্তির জীবনযাপনের দর্শনের প্রকাশ'
'আর যে শুভত্ব ও অশুভত্বের স্রষ্টা হতে চায় তাকে হতে হবে প্রথমে ধ্বংসকামী ও মূল্যবোধ ভঙ্গকারী'
'হাইডেগার বিংশ শতাব্দীর অস্তিত্ববাদী প্রপঞ্চবিদ্যার অন্যতম স্হপতি। এই প্রপঞ্চবিদ্যা প্রপঞ্চ ও ব্যক্তিক চেতনার মধ্যকার সম্পর্ককে পরীক্ষা করে। তিনি প্রকৃত অথবা অপ্রকৃত অস্তিত্বের বিষয়ে অনুসন্ধান চালান। যা পরবর্তিতে জ্যাঁ-পল সার্ত্রেকে প্রভাবিত করে। মানবসত্তা ও এর ধরনকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হাইডেগার 'Dasein' শব্দটি। এটা যে ক্রিয়া থেকে এসেছে তা হল dasein যার অর্থ 'অস্তিশীল' বা 'এখানে, সেখানে'।
আত্মহত্যা নিয়ে এমন বিশ্লেষণধর্মী ও বহুমাত্রিক লেখা আর চোখে পড়ে নি। বইয়ের বিষয়টি একটু অদ্ভুত বলে কিনা জানি না, প্রচুর রেফারেন্স থাকলেও পড়তে গিয়ে লেখাটা মাঝে মধ্যে খাপছাড়া মনে হয়েছে। নিঃসন্দেহে বইটি তথ্যবহুল এবং চিন্তার খোরাক যোগাবে।
যেকোন বই পড়ার জন্যে পাঠক হিসেবে সেই বইটির পরিপ্রেক্ষিতে নূন্যতম "ম্যাচুরিটি" থাকা লাগে।সেটা যেকোন বইয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য! চাইলেই ক্লাস এইটে থেকে মিথ অফ সিসিফাস পড়ে বুঝে ফেলা সম্ভব না।একটা বই পড়ার জন্য সেই বইটা পড়ার আগে কিছু জানাশোনা থাকাটা জরুরি বলে মনে হয়।খুব অল্প বয়সে পড়া বইটা খুব যে বুঝেছি তা বলবো না,ত���ে অনেককিছুই জানতাম না,যেটা জানা হলো!
প্রথমত, সান্ধ্য ভাষায় আত্মহত্যার মতো বিষয় নিয়ে লিখলে সেইটা পড়তে পড়তে পাঠকও রাগে দুঃখে আত্মহত্যা করে বসতে পারে।
দ্বিতীয়ত, বইটা কোনো দিকেই যেতে চায় না, শুরু মধ্য শেষ, যেন একই বিন্দুতে ঘুরপাক খেতে থাকে। বোঝা যায় লেখক নিজে যেমন বুঝে উঠতে পারছেন না আত্মহত্যা বিষয়টা কেমন, কিন্তু একই কথা বারবার লিখে নিজেকেই হয়তো সোলেস দিচ্ছেন।
গত দুইশ বছরে শিল্প সাহিত্য সংশ্লিষ্ট কত মানুষ আত্মহত্যা করেছেন সেই লিস্টির জন্য উইকি আর সব মিলিয়ে গুগল আছে। চারশ পৃষ্ঠার বইয়ের দরকার তো নেই মনে হয়।