বহুতদিনের একটা ইচ্ছা ছিল কোন জার্নিতে এক বসায় একটা বই শেষ করবো, বোধোদয়ের মাধ্যমে সেই ইচ্ছে-পূরণ হলো। ব্যাপারটা মজার, আমি বইটা পড়তে শুরু করি যেসময়, তখন এয়ারপোর্ট রেলস্টেশনে পারাবত এক্সপ্রেস চলতে আরম্ভ করেছে। আর শেষ পাতাটা উল্টানোর সময় ট্রেন সিলেট স্টেশনে ঢুকছে। এই বইয়ের কাহিনীও অনেকটা সিমিলার, শুরু আমেরিকান এক বিমানবন্দরে লেখক কোন বোয়িং ৭০৭ এ চেপে বসছেন, আর শেষটা যখন প্লেন কলকাতার দমদম এয়ারপোর্ট ছুঁয়েছে।
বইয়ের ভূমিকাতেই শংকর বলেছেন, এই লেখার অনেকদিকই বেশ অস্বস্তিকর। কারো কারো তো রীতিমতো রুচিতে বাঁধতে পারে। তার ভাষায়
- "একালের আজব মানুষদের আঁকতে গিয়ে যদি কোথাও সৌন্দর্য ও সৌজন্যের সীমা অতিক্রম করে থাকি তার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।"
সামাজিকভাবে নারী-পুরুষের মেলামেশার বিষয়টায় উপমহাদেশ এবং পাশ্চাত্যের অবস্থান যোজন যোজন দূরে। সে বিষয়ই অনেকটা জুড়ে আছে এই উপন্যাসে। কেন্দ্রীয় চরিত্র সুদূর আমেরিকার নিউটন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ ফেলোশিপ নিয়ে রিসার্চ পেপার লিখতে যাওয়া শ্রী অনির্বাণ চ্যাটার্জির উদ্দাম জীবন নিয়েই এই উপন্যাস। কলকাতার এক অজপাড়াগাঁ রাজবল্লভ সাহা সেকেন্ড বাই লেন থেকে উঠে আসা এই সুন্দর মায়াবী চেহারার অনির্বাণের আছে ধূর্ত একটা মস্তিষ্ক। যে জানে কোন নারীর মনের ঠিক কোথায় টোকা দিলে তাকে কাবু করা সম্ভব, তা নিয়েই অনির্বাণ একের পর এক নারীকে তার কাছে টেনে যায়। কিন্তু সে বাঁধনে জড়ায় না কাউকে। কারণ দুদিন পরপরই যে তার পুরোনো জনে অরুচি চলে আসে!
সবচেয়ে বড় পার্শ্বচরিত্রের নাম বেণীমাধব। ডাকসাইটে বিশ্ববিখ্যাত এই বিজ্ঞানী নিউটন ইউনিভার্সিটির প্রফেসর। কিন্তু তারও শেকড় পোতা ওই রাজবল্লভ সাহা লেনে। আমেরিকান মেয়ে আইলীনকে বিয়ে করে সিটিজেনশিপ নিয়েছেন কিন্তু দেশের নাম শুনলে একদম বাচ্চা শিশুটি হয়ে যান। তাইতো আর বাড়ির নাম ভগীরথী, ছেলের নাম ভারতকুমার, মেয়ের নাম রঞ্জাবতী!
পুরো ঘটনা ঘটে আমেরিকা টু কলকাতা প্লেন জার্নিতে, আর মাঝে মাঝেই ফ্লাশব্যাকে গিয়ে অনির্বাণের পুরাতন, রাজবল্লভ সাহা লেনের ভয়াবহ কষ্টের দিনগুলি, তার শৈশব কৈশরের জীবনের গল্প, তার শিক্ষক বাবার পদে পদে উপদেশের গল্প আর আজ যে সে এমন উদ্দম উশৃংখল জীবন কাটাচ্ছে সে বিষয়ে হুইস্কি খেয়ে কিঞ্চিৎ মাতালহয়ে অনুশোচনা। যায়গায় যায়গায় ১৮+ ঘটনার আগমন এবং একজন ঝানু লেখকের মতই ঠিকঠিক লিমিট বুঝে থেমে যাওয়া। আর এপর্যন্ত পড়া শংকরের সব উপন্যাসের মতই শেষে একটা দারুণ আনেক্সপেক্টেড টুইস্ট। সব মিলে দারুণ লেগেছে এই ১১০ পাতার বইটা।
আমার সম্প্রতি যে শংকর প্রেম চলছে তা সেদিন লিখেছি। সেজন্যই হয়ত এ উপন্যাস আরো বেশি ভালো লেগেছে। কেন যেন মনে হচ্ছে শংকরের লেখার সাথে পরিচয় হয়েছে একদম পারফেক্ট টাইমে, আগেও না পরেও না! জয়তু শংকর!!