ঠিক আট বছর আগের কথা। ব্যবসার কাজে বাসার বাইরে গিয়েছিলেন লুও ওয়েন। দীর্ঘদিন পর যখন বাসায় ফিরলেন, তখন অনুভব করলেন কিছু একটা ঠিক নেই। সব বদলে গিয়েছে। তার স্ত্রী, সন্তানের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। বেমালুম গায়েব হয়ে গিয়েছে তারা। এমনভাবে উধাও হয়েছে, যেন পৃথিবীতে তাদের কোনো অস্তিত্ব ছিল না কোনোদিন। আট বছর ধরে স্ত্রী, সন্তানকে খুঁজছে লুও। এতদিন পর হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু কী হয়েছিল তাদের সাথে, তা তো অন্তত জানা যাবে!
এই নিয়ে একই পদ্ধতিতে পঞ্চম খুন ঘটল। মুখে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের সিগারেট। খুনের মধ্যম হিসেবে লম্ফঝম্ফ দড়ি। কোনো এক সিরিয়াল কিলার নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। কিন্তু এতগুলো বছরেও এই কেসের মীমাংসা হয়েছে না। বরং দীর্ঘ বিরতিতে খুনের প্রক্রিয়া চলমান। পুলিশ প্রশাসনের ঘুম উড়ে যায়। তবুও কোনো সূত্র খুঁজে পাওয়া হয় না। এতটা নিখুঁত এ পরিকল্পনা! তবুও খুনের পাশে একটা আঙুলের ছাপ ঠিকই মেলে। যে খুনি কোনো সূত্র ছেড়ে যায় না, সে কেন আঙুলের ছাপ ছেড়ে যাবে? কোনো বিষয়ে ইঙ্গিত করছে? না-কি তার ফেলে রাখা নোট “পারলে আমাকে ধরো” এর মতো চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে পুলিশদের?
ইয়ান লিয়াং তুখোড় পুলিশ অফিসার হওয়ার পরও অতীতের একটা ঘটনায় নিজের চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে পুরোদস্তুর টিচার বনে গিয়েছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিষয়ের অধ্যাপক সে। সিরিয়াল কিলিংয়ের খুনের বিষয়ে তার সাহায্য চাইতে উপস্থিত হয় তারই সাবেক সহকর্মী। কিন্তু, সে অপারগ। এখন আর পুলিশকে সাহায্য করতে ইচ্ছুক নয় সে। যা পেছনে ফেলে এসেছি, তাকে সামনে আনার কোনো মানে হয় না। নিজের নির্ঝঞ্ঝাট জীবন কাটিয়েই সুখে আছে সে।
এলাকা ভেদে কিছু বখাটে থাকে, যারা মানুষকে উত্যক্ত করে মজা পায়। মেয়েদের অপদস্ত করে প্রতিনিয়ত। এমন এক ছেলের অত্যাচারে অতিষ্ট এক রেস্তোরাঁর মালকিন হুইরু। রেস্তোরাঁটি সে আর তার ভাই মিলেই চালায়। এলাকার এক বখাটের অত্যাচারে এমন এক ঘটনার সাথে জড়িয়ে যায়, যা তাকে আতঙ্কিত করে তোলে। হয়তো পুরো জীবন বদলে যাবে তার। তখন দেখা হয় লুও ওয়েনের সাথে। সে মেয়েটিকে আর মেয়েটির বন্ধুকে সাথে নিয়ে তৈরি করে এক ধাঁধা। যা পুলিশদের ঘোল খাওয়াবে। কোনভাবেই এই ঘটনার কথা পুলিশের কান পর্যন্ত যাবে না। গেলেও কিছু করার নাই পুলিশের। যেখানে কোনো সূত্র নাই, প্রমাণ নাই; পুলিশ সেখানে কী করতে পারে?
তবে একটা ভুল! কিংবা ইচ্ছাকৃত… যে কারণে ইয়ানের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় কেসটি। লুও ইয়ানের পুরোনো বন্ধু। যেহেতু পুলিশের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ছিল লুও, সেহেতু সাবেক পুলিশ অফিসার ইয়ানের সাথে সম্পর্কও ছিল তেমন জোরালো। এখন ভিন্ন দুই ঘটনায় মুখোমুখি দুই বন্ধু। বুদ্ধির এই খেলায় কেউ কারো চেয়ে কম নয়। তবুও একজনকে তো জিততেই হয়। এই লড়াইয়ে জয়ী পক্ষ হবে কে?
▪️পাঠ প্রতিক্রিয়া :
পারফেক্ট ক্রাইম বলে আদৌ কি কিছু আছে? এখন ���ানুষ যখন অপরাধ করে, তখন সে নিজের অজান্তেই সূত্র ছেড়ে যায়। যতই সচেতন বা দক্ষ হোক না কেন, নিজের অবচেতন মনে ভুল হয়েই যায়। কিন্তু এমন কোনো অপরাধীর সাথে যদি টক্কর হয়, যেখানে সামান্যতম সূত্র নেই। অপরাধীর কোনো ভুল চোখে পড়ছে না। তখন এই কেস সমাধানের করতে গিয়ে গলদঘর্ম হয়ে যায়।
জিযিন চেনের লেখা এর আগের বই পড়েছিলাম “ব্যাড কিডস”। দারুণ এক উপন্যাস মুগ্ধ করেছিল। সেই সাথে বাচ্চাদের সাইকোলজি ও অপরাধ প্রবণতার অন্ধকার দিকের সাথে পরিচয় ঘটেছিল। সে তুলনায় “দি আনটাচড ক্রাইম” কেমন লাগল?
আমি কখনও দুটি বইয়ের তুলনা করি না, তবে যদি বলতেই হয় “ব্যাড কিডস”কে কিঞ্চিৎ এগিয়ে রাখব। তাই বলে এই বইটিকে খারাপ বলার উপায় নেই। এখানেও মানুষের মনস্তত্ত্বের টানাপোড়েনের নিদর্শন দারুণভাবে ফুটে উঠেছে।
এ বইটিতেও লেখক আগে থেকে অপরাধীকে উন্মুক্ত করে দেয়। মূলত এখানে দুই ধরনের অপরাধ সংঘঠিত হয়। একটি সজ্ঞানে, আরেকটি ভুল করে। একটির অপরাধ অপরাধী কে আপনি জানেন, ঘটনাপ্রবাহে আরেক অপরাধীকে আপনি আন্দাজ করতে পারছেন; তবুও পড়তে বিন্দুমাত্র বিরক্ত আসে না। বরং কী হয়েছে, কীভাবে অপরাধ পর্যন্ত পৌঁছানো যায় বা অপরাধীর অপরাধ প্রমাণ করা যায়; তা জানার তীব্রোএগ্র লেখক তৈরি করতে পেরেছেন।
যেহেতু সিরিয়াল কিলিংয়ের ভিত্তি দিয়ে লেখক বইটির গাঁথুনি দিয়েছেন, পুলিশের কর্মকাণ্ড এখানে বেশ গুরুত্বপুর্ণ। এই বিষয়টা ইন্টারেস্টিং। চীনে কীভাবে একটি অপরাধের পেছনে পুলিশ সংগঠন কাজ করে আমি জানি না, তবে লেখকের দুইটি বই পড়ে মনে হয়েছে সেখানকার পুলিশের মধ্যে দায়সারা ভাব রয়েছে। তারা খুব সহজেই সমাধানে পৌঁছে যায়। এবং সঠিক তদন্ত না করে শুধু কিছু আনুষঙ্গিক বিষয়ের উপর নির্ভর করেই সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়। এ কারণেই দীর্ঘ সময় ধরে চলা সিরিয়াল কিলিংয়ের রহস্য তারা সমাধান করতে অপারগ।
অপরাধীদের মনস্তত্ত্ব খুবই জোরালো। তারা পুলিশকে ভুল পথে পরিচালিত করতে পারে। এই বিষয়টা মাথায় আসে না। ফলে মিমাংসা হয় না অপরাধের। কিংবা মূল অপরাধী ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে। বিষয়টা আমাকে অবাক করেছে। এমনও হতে পারে, তারা যেসব অপরাধীর সাথে টক্কর দেয়, তাদের সেই বুদ্ধি নেই। ফলে জটিল বুদ্ধি সম্পন্ন কাউকে পেলে খেই হারিয়ে গেলে।
বইতে ইয়ান লিয়াং আর লুও ওয়েনের লড়াই বেশ উপভোগ্য ছিল। বুদ্ধির খেলায় কেউ কাউকে ছাড় দেয় না। অপরাধী যতই সূক্ষ্ম হোক, যেভাবেই পারফেক্ট ক্রাইম হিসেবে ঘটনাকে উপস্থাপন করুক না কেন; ছোট্ট একটা ভুল, যা আদতে কেউ কখনোই নজরে আনবে না। দক্ষ পুলিশই কেবল তার উপর ভিত্তি করে অপরাধী পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে। এখানে দুইজনের অতীত ইতিহাস বেশ গুরুত্বপুর্ণ ছিল। তাদের মানবিকতা এখানে প্রকাশ পেয়েছে। অপরাধী হলেই যে অমানবিক হবে, বিষয়টা এমন না। কখনও মানবিক হতে গেলেও অপরাধ কিংবা ভুল করতে হয়। দিন শেষে তার জন্য অনুতপ্ত হওয়ার কারণ নেই।
লুও ওয়েনের কথা এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তার অতীত কতটা নির্মম! আট বছর ধরে যার পরিবার নিখোঁজ, সে জানেও না কী হয়েছে তার পরিবারের সাথে, আট বছর ধরে খুঁজে বেড়াচ্ছে, কেবল সে-ই জানে পরিবার ছাড়া কীভাবে তার জীবন কাটছে। এই দুঃখ কেউ বুঝবে না। শেষের দিকে যখন সে জানতে পারল, সে ঘটনা আর তার হাহাকার মন খারাপ করে দেয়। কী হয়েছিল তার পরিবারের সাথে?
শেষটা অবশ্য বেশ পছন্দ হয়েছে। খুব বেশি চমক এই বইতে ছিল না। তবে শেষে এসে ঘটনার মোড়, অপরাধীর সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা, সত্যের উন্মোচন হওয়া, যৌক্তিক লেগেছে। হুইরুর সাথে তার ভাইয়ের সম্পর্কও বেশ জোরালোভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এখানে।
তবে কিছু ঘটনা, যার আসলে কোনো প্রয়োজন ছিল না। এই যেমন, একজন মানুষ যেকোনো বাড়ির এলিভেটরে গিয়ে মলত্যাগ করে, নারীদের অভিনব উপায়ে যৌন নিপীড়ন করে; কাহিনির সাথে এর সামঞ্জস্য খুঁজে পাইনি। এমন না যে, এটা সাবপ্লট হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যায়। তাও না। অযথাই যেন বইয়ে এই ঘটনার আবির্ভাব। পুলিশের একটু দৌড়ঝাঁপ আর রহস্য জমিয়ে তুলতেই মনে হয় লেখক এমন ঘটনার অবতারণা করেছেন। আমি কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পাইনি।
▪️অনুবাদ, সম্পাদনা ও অন্যান্য :
আহনাফ তাহমিদের অনুবাদ বরাবরের মতন ভালো হয়েছে। পড়ে তৃপ্তি পেয়েছি। তবে কিছু জায়গায় সম্পাদনার ত্রুটি ছিল। বাক্যে শব্দের অদলবদল চোখে পড়েছে। দুয়েক জায়গায় শব্দের মিসিং ছিল। বানান বা ছাপার ভুল তেমন চোখে পড়েনি। এটা ভালো দিক
আর প্রচ্ছদ পুরোই আগুন। এক কথায় দুর্দান্ত। জোড়া লড়াইয়ের মানুষ যে মুখোশ পরে এক অপরের সামনে দাঁড়ায়, তারই প্রতিচ্ছবি। বাঁধাই, কাগজ সবকিছুই ভালো ছিল এখানে।
▪️পরিশেষে, চীনা সাহিত্য নিয়ে খুব একটা কাজ হয়নি। এই প্রথম নতুন এক থ্রিলার সাহিত্যে প্রবেশ করেছি। বেশ উপভোগ করেছি। ভিন্নতা আছে এখানে। বিশেষ করে এখানে চীনা সমাজের দৃষ্টিকোণ থেকে অপরাধ জগতের অনেক কিছুই তুলে ধরার প্রয়াস দেখা যাচ্ছে। ভিন্ন সাহিত্যের স্বাদ পেতে আপনারাও পড়তে পারেন। নিরাশ হবেন না।
▪️বই : দি আনটাচড ক্রাইম
▪️লেখক : জিযিন চেন
▪️অনুবাদ : আহনাফ তাহমিদ
▪️প্রকাশনী : গ্রন্থ রাজ্য
▪️ব্যক্তিগত রেটিং : ৩.৮/৫