ছোটবেলায় পড়তাম মিশনারি স্কুলে। কী আনন্দেই না কেটেছিলো স্কুলের জীবনের এগারোটি বছর। স্কুলে যারা বন্ধু ছিলো, আর যাঁরা শিক্ষক ছিলেন তাঁদের কথা আমার বহু গল্প আর উপন্যাসে এসেছে। আমার সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষকদের একজন ছিলেন স্কাউট স্যার নিকোলাস রোজারিও। তাঁকে নিয়ে পুরো একটা উপন্যাসই লিখেছিলাম, যেটি এখনো আমার প্রিয়।
Shahriar Kabir (in Bengali: শাহরিয়ার কবির) is a Bangladeshi journalist, filmmaker, human rights activist and author. His books focuses on human rights, communism, fundamentalism, history, juvenile and the Bangladesh war of independence.
হাইস্কুলে উঠে সিক্স আর সেভেনে দুবারই স্কাউটে নাম লেখাতে গিয়ে কিক খেয়েছি। তবুও আমার স্কাউটিং-এর প্রতি অবসেশনটা ‘অঙুরফল টক’ হয়ে যাইনি। লেখকের মিশনারি স্কুল, স্কাউট টিচার নিকোলাস রোজারিও আর স্কাউট জীবনের আউটিংয়ের স্মৃতির সঙ্গে পুরোনো জমিদার বাড়ির ভুতুড়ে রহস্য নিয়ে সেরা একটা কিশোর অ্যাডভেঞ্চার উপহার দিয়েছেন। রান্টুদের স্কুলের অ্যানুয়াল ফাংশনে ওদের স্কাউট দলের পারফরম্যান্সের জন্য খুব কম সময় বরাদ্দ হওয়ায় গানের টিচার নিখিল স্যারের সাথে রাগারাগি করে নিকোলাস স্যার তার ছেলেদের নিয়ে ক্যাম্প করতে যাবেন ঠিক করলেন। ছেলেরা এতে খুব দুঃখ অবশ্য পায় না। পাজল সল্ভ করে হেটে হেটে বিভিন্ন সাইন, ট্রাক ফলো করে ক্যাম্পিং স্পটে পৌছানোটা ছিল দারুণ মজার আর অ্যাডভেঞ্চারাস । তারপর ক্যাম্পে ওদের বিভিন্ন টেস্ট, রাতে ক্যাম্প ফায়ারে ওদের নাচ-গান খুব উপভোগ করেছি পাঠক হিসেবে। এরপর ওদের কানে আসে পাশের পুরোনো জমিদার বাড়িতে নানা ভুতুড়ে ঘটনার কথা, যেটা এখন শুটিং স্পট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। শুটিংয়ের দুটো ঘোড়া আর ঝাড়বাতিও হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে নাকি। নিকোলাস স্যার ওদের অবজার্ভেশন টেস্টে এমন কিছু পেলেন যা ওদের ভাবনায় ফেলল খুব; সিনেমার ডিরেক্টর আবার নিকোলাস রোজারিওর বন্ধু মানুষ। মূল কাহিনী যেমন জমজমাট, অ্যাডভেঞ্চারটাও টপনচ, এর বাইরে ওদের ক্যাম্পিংয়ের অভিযান সবচেয়ে ভালো লেগেছে। কমেডিও ছিল খুব। খুব বেশি কিছু আশা না রেখে পড়া শুরু করেছিলাম তবে আমার পড়া বাংলা সেরা পাঁচ জুভিনাইল অ্যাডভেঞ্চারের একটা হয়ে থাকবে এই বইটা।
অনেকদিন ধরে একটা শান্তির বই খুঁজছিলাম। এই ছোট্ট কিশোর উপন্যাস পড়ে সেই শান্তি পেয়েছি। এতদিন কেন শাহরিয়ার কবিরের বই পড়লাম না সেটাই এখন চিন্তার বিষয়। স্কুলের শিক্ষকদের কৌতুকপূর্ণ কিছু রেষারেষি থেকে খুব সুন্দর একটা এডভেঞ্চারে চলে যাওয়া আবার রহস্যের মাঝে জড়িয়ে যাওয়া সব আছে।
অসাধারণ, অসাধারণ , অসাধারণ!!! ছোটবেলায় যারা স্কাউটিং করেছেন কিংবা এখনও করছেন তাদের সেই সুখস্মৃতি মনে করিয়ে দিবে সে সম্পর্কে কোন সন্দেহ নেই। সেই ক্যাম্পিং, গ্যাজেট , নিজেদের রান্না করে খাওয়ার কথা :D সেই সাথে উপরি হিসেবে চমতকার একটা রহস্য তো আছেই। সাথে বুদ্ধিদীপ্ত ডায়লোগ আর মজার সব চরিত্র। প্রতিটা পেজ উপভোগ করেছি। অবশ্যই পড়ে ফেলতে পারেন বইটা। সিঙ্গেল যদি না কিনতে পান, শাহরিয়ার কবির কিশোর সমগ্র -২ এ পেয়ে যাবেন। হ্যাপি রিডিং ^_^
কি যে নেই বইটাতে, বলা মুশকিল। ক্যাম্পিং, রহস্য, ক্যাম্পফায়ার, চোর, ডাকাত। টানটান উত্তেজনা সব কিছুতেই। নিজের কখনো ক্যাম্পিং এ যাওয়া হয় নি।ছোটবেলায় তিন গোয়েন্দা পড়তাম আর দীর্ঘশ্বাস ফেলতাম। কি সুন্দর নিজেরা নিজেরা ক্যাম্পিং করে! আহা! আমিও যদি যেতে পারতাম ওদের মত! বাইরে তাবু খাটিয়ে নিজেরা রান্না করে খেতাম। রাতে খাওয়া দাওয়া শেষ করে ক্যাম্পফায়ারের পাশে বসে গল্প করতে পারতাম! বইটা পড়ে নতুন করে সেই দীর্ঘশ্বাসটাই আবার ফেললাম। এবং "বয়সকালে পড়তে পাইনি" লিস্টে আরো একটা বই যোগ হল।
উপন্যাসটা প্রথম পড়ি আমার বড় কাজিনের ধানশালিকের দেশে-এর একটা ইস্যুতে, ওই ইস্যুতে অনেক গুলো সুন্দর উপন্যাস ছিলো (ট্রাইটন একটা গ্রহের নাম, জীবনের জন্য, সূর্যের দিন, আরও একটা ছিলো নাম মনে আসছে না)। স্বাধীনতা পূর্ব ঢাকা নিয়ে লেখা, আমার বাবা নিজেও এই টাইমলাইনে (ষাটের দশকে) একজন বয়স্কাউট, পরে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে রোভার স্কাউট ছিলেন, সেই সময়ের ক্যাম্পিং, ইন্টারন্যাশনাল মিট, আর জাম্বুরির অনেক গল্প শুনেছি ছোটবেলা থেকে। মধ্যবিত্ত পরিবারের টাইট বাজেটে কীভাবে এসব জিনিস অ্যাডজাস্ট হতো, সেটা এই রান্টু আর তার দিদার মতো আমাদের পরিবারগুলোরও গল্প ছিলো। তাই ২০০৩ সালে যখন প্রথম নিজের ঘরের আরামে জীর্ণ ধানশালিকের দেশের পাতাগুলো উল্টে নিকোলাস রোজাজিওর ছেলেরা পড়ি, রান্টু, শিবলী, জোসেফদের মধ্যে আমার বাবা আর উনার বন্ধুদের খুঁজে পাই। এই সেন্ট গ্রেগরিজের সম্মানিত শিক্ষকদের নাম সবই আসল, সাধু গ্রেগরির দিনগুলোতে বিশদ লিখে গিয়েছেন শা.ক.- শ্রদ্ধেয় নিকোলাস রোজারিও স্মরণে ফেসবুক পেইজও আছে দেখেছিলাম। শুধু দুঃখ হয়েছিলো যখন পড়েছিলাম ওই নিখিল স্যার আর শুভদারঞ্জন স্যারকে পাক হানাদার বাহিনী মুক্তিযুদ্ধের সময়ে হত্যা করেছিলো!
কখনো স্কাউটিং করার সুযোগ হয় নি কিন্তু স্কাউটিং এর প্রতি ভালোবাসা টা ছিলো। বইটা পড়তে গিয়ে সেই ভালোলাগা টা আরো বেড়ে গিয়েছে। আর স্কুল লাইফ এর কথা মনে পড়ে গেল। ক্যান্ট পাবলিক এর স্পোর্টস এর সময় এ বড় মাঠ এ কারা আগে প্র্যাক্টিস করবে সেটা নিয় ডিস্প্লের শাবনাজ ম্যাডাম আর পি টি র ফারহানা ম্যাডাম এর মধ্যে একবার ঝগড়া হতই। আর আমরা প্যারেড ট্রুপারস রা বিশাল জায়গা লাগবেই দেখে বিনা যুদ্ধে সুযোগ পেতাম বড় মাঠ ব্যবহার এর। উফ্ স্মৃতি আসলেই মধুর। যদি আরও কিছু দিন আগে বইটা পড়তাম তাহলে হয়তো আরো ভালো লাগত। লকডাউন এর এই সময় এ একটানা বই পড়তে পড়তে বিরক্তির দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছি। কিন্তু এই বইগুলোর কারণে অন্তত চার দেয়ালের বাইরের দুনিয়া অনুভব করতে পারতেসি।
অনেকদিন ধরে একটা শান্তির বই খুঁজছিলাম। এই ছোট্ট কিশোর উপন্যাস পড়ে সেই শান্তি পেয়েছি। এতদিন কেন শাহরিয়ার কবিরের বই পড়লাম না সেটাই এখন চিন্তার বিষয়। স্কুলের শিক্ষকদের কৌতুক��ূর্ণ কিছু রেষারেষি থেকে খুব সুন্দর একটা এডভেঞ্চারে চলে যাওয়া আবার রহস্যের মাঝে জড়িয়ে যাওয়া সব আছে।
স্কুল জীবন শেষ হওয়ার পর যখন "নিকোলাস রোজারিওর ছেলেরা" পড়ি, তখন বইটি যেন আমার সদ্য ফেলে আসা দিনগুলোর দরজা খুলে দিয়েছিলো। লেখক শাহরিয়ার কবিরের সাবলীল বর্ণনায় মিশনারি স্কুলের পরিবেশ, শিক্ষক-ছাত্রদের আন্তরিক সম্পর্ক আর স্কাউটিংয়ের ছোট ছোট খুঁটিনাটি বিষয়গুলো জীবন্ত হয়ে উঠেছিলো আমার কাছে। আমি নিজে কখনো স্কাউট হইনি, কিন্তু এই উপন্যাস পড়ার পর মনে হয়েছিলো স্কাউটিং না করাটা বুঝি একটা অপূর্ণতা হয়েই রইল জীবনে! গল্পে ক্যাম্পিংয়ের প্রস্তুতি, দলগত চ্যালেঞ্জ, গান-বাজনার মজার মুহূর্ত সব মিলিয়ে কিশোর বয়সের নির্মল আনন্দ খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
তবে এই উপন্যাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো রহস্য-রোমাঞ্চের উপাদান। পুরোনো জমিদার বাড়িকে ঘিরে তৈরি হওয়া ভৌতিক গল্প, সিনেমার শুটিংয়ের অদ্ভুত ঘটনা, আর তার সঙ্গে যুক্ত হওয়া নিকোলাস স্যারের পর্যবেক্ষণ, সব মিলিয়ে এক চমৎকার কিশোর অ্যাডভেঞ্চার। বইটি পড়ে শুধু আনন্দিতই হইনি, বরং বারবার ভাবতে বাধ্য হয়েছি, আমাদের শৈশবের ছোট ছোট অভিজ্ঞতাগুলো কতটা রঙিন হতে পারে সঠিক গাইড আর বন্ধুত্বের ছোঁয়ায়।
কাব স্কাউটিং করেছি। পড়তাম মিশনারি স্কুলে। আমাদের স্কাউট টিচার ছিলেন নির্মল স্যার। সাথে ছিলেন নিকোলাম আর ক্রিস্টফার স্যার। বইটা পড়ার সময় বারবার মনে হয়েছে এ যেন আমার শৈশব। আমার মত যারা শৈশব কৈশোরে স্কাউটিং করেছেন তারা এই বই পড়ার সময় দারুন ভাবে নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হবেন। বইয়ের ভাষা বরাবরের মতই দারুন ঝরঝরে।কাহিনীও ভালো। লেখকের অন্যান্য বইয়ের মত এই বইতে বাম ভাবধারার প্রভাব নেই। যারা শিশুকিশোরকে বইয়ের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে চান তারা এ ধরনের বইগুলো তাদের হাতে তুলে দিতে পারেন। শাহরিয়ার কবিরের কিশোর সাহিত্যের বইগুলোর আরেকটা ভালো ব্যাপার হল এগুলো দামে তুলনামূলক অন্য বইয়ের তুলনায় বেশ সস্তা। এই বইয়ের কাহিনীর ধারাবাহিকতায় আরেকটি বই কেন হল না সেটা ভেবে আফসোস হয়।
শাহরিয়ার কবির আমার অন্যতম পছন্দের একজন লেখক। তার প্রতেকটা কিশোর উপন্যাস একেকটা মাস্টারপিস। নিকোলাস রোজারিওর ছেলেরাও তার ব্যাতিক্রম নয়। রহস্য, এডভেঞ্চার, ভূত, রম্য সবই এক মলাটের ভেতর। নিকোলাস স্যার চরিএটা অনেক সুন্দর ছিলো।