সত্তরের দশকের শুরুতে যে রাজনীতি এই উপমহাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো, যার ঢেউ বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পৌঁছেছিলো, সেই 'নকশাল' আন্দোলনের পটভূমিতে লেখা প্রামাণ্য উপন্যাস 'ওদের জানিয়ে দাও'।
Shahriar Kabir (in Bengali: শাহরিয়ার কবির) is a Bangladeshi journalist, filmmaker, human rights activist and author. His books focuses on human rights, communism, fundamentalism, history, juvenile and the Bangladesh war of independence.
আক্ষরিক অর্থেই বারুদ! "ওদের জানিয়ে দাও" প্রথমবার পড়েছিলাম ২০০৪ সালে। সত্যি বলতে, তখন এর বিষয়বস্তু মাথায় ঢোকেনি ঠিকভাবে। আজ, ২০ বছর পর, এই বই পড়তে যেয়ে রীতিমতো হতবাক হয়ে গেলাম। কারণ, এ উপন্যাস সাপ্তাহিক "বিচিত্রা"য় প্রকাশিত হয়েছিলো ১৯৭৪ সালে। ক্ষমতাসীন সরকার ও বামপন্থীদের রীতিমতো নির্মম ও বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা করেছেন শাহরিয়ার কবির। প্রকাশক ও লেখক যে অপঘাতে মারা পড়েননি এটাই আশ্চর্যের। রক্ষীবাহিনীর হাতে পড়লে কারো রক্ষা নেই, সরকারের অদক্ষতায় দেশজুড়ে দুর্ভিক্ষ চলছে, অতি প্রগতিশীল বামপন্থীরা "শ্রেণিশত্রু" নাম দিয়ে যাকে তাকে মারছে, কর্মীরা কেউ প্রতিবাদ করতে গেলে তাদেরও খরচের খাতায় ফেলে দেওয়া হচ্ছে, বড় বড় বুলি দিয়ে গোপন রাজনীতি করা মানুষজন সাংগঠনিক দুর্বলতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে সর্বনাশ ডেকে আনছে নিজেদের - এমন অনেক বিষয় সরাসরি ও বিনা ভ্রুক্ষেপে তুলে ধরেছেন লেখক। উপন্যাসটির শিল্পমূল্য কতোটুকু হবে জানি না, কিছু দুর্বলতা আছে কিন্তু সময়ের দলিল হিসেবে "ওদের জানিয়ে দাও" অবশ্যপাঠ্য।
উপন্যাসের পটভূমি নকশাল আন্দোলন। গোপন রাজনীতির গল্পগুলো সাধারণত যেমন হয়, ‘ওদের জানিয়ে দাও’ তেমনই, আলাদা কিছু নয়। ১৯৭৪ সালে লিখিত ও প্রকাশিত এই উপন্যাসে কিছু বিষয় (রক্ষীবাহিনী, তৎক্ষালীন ক্ষমতাসীন সরকারের চরম ব্যর্থতা, দুর্ভিক্ষ) এনে সাহসের পরিচয় দিয়েছেন লেখক। বিপ্লবী দলগুলোর কার্যক্রম ও অন্তঃকোন্দল বেশ স্পষ্টভাবেই এসেছে।
সবমিলিয়ে যা পাওয়া গেল, তা থেকে বেশি কিছুর আশা ছিল।
জীবন আসলে একসময় তোমাকে বুঝিয়ে দেবে, আসলে সে বড্ড আলুনি। ছুটকো ছাটকা এডভেঞ্চার, আদর্শিক কপচানি, সবই একসময় সময় নষ্ট বা অতীতের সুগন্ধ হয়ে রয়ে যাবে।
সমাজতন্ত্র, মার্কসবাদ এসব নিয়ে প্রথম পাঠ ছিল ক্রাচের কর্ণেল। দারুণ উদ্দীপ্ত হয়েছিলাম। কিন্তু সিরাজ শিকদার বা ক্র্যাচের কর্ণেলের লাস্টের দিকে এই আদর্শিক আন্দোলন যে কখন রক্তে রাঙা হয়ে গেল, তার আভাস আছে। ওদের জানিয়ে দাও বইটা নকশাল আন্দোলনের প্রামাণ্য উপন্যাস হিসাবে সেদিকটা আরেকটু ইলাবোরেট করেছে আরকি।
বইটা পড়তে পড়তে অসং্খ্য ভাবনা মাথায় এসেছে। রক্তগরমের দিনগুলি ছুঁড়ে ফেলে ঠান্ডা রক্তের চাকুরীজীবি হওয়াটা কতটা উচিত হয়েছে? জাফর, দীপু, পূরবী বা রাজুর জীবনের দ্বিধাগুলি আমার জীবনের দ্বিধাগুলির কথা মনে করিয়ে দিয়েছে।
সবশেষে কি হল? কেউ পড়ল কাফন, আর কেউ জীবনের স্বাভাবিক স্রোতে ভেসে গেল। এইতো? কেউ প্রেমে পড়ল, কারো ভাগ্যে জুটল গুলি।
যেকোন বিষয়ে চরমপন্থী হবার আগে দশবার ভাবা উচিত, একশবার ভাবা উচিত। আর সবাইকে দিয়ে তা হয়ও না। মানুষ আসলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বড় দুর্বল প্রাণী।
বামদলগুলোর নিজস্ব অন্তর্কোন্দল, ক্ষমতার লোভের বয়ানের সাথে এই উপন্যাসে কিছু উক্তি ছিলো সদ্য স্বাধীন দেশের পেটি বুর্জোয়াদের পুঁজিবাদ ও সংরক্ষণশীলতা, লীগারদের-মুজিব বাহিনীর-রক্ষী বাহিনীর অত্যাচার, ৭৪ এর দুর্ভিক্ষ, পঁচাত্তরের জরুরী অবস্থা, কিংবা সিরাজ শিকদার হত্যার ওপরেও। বহু বছর পেরিয়ে ওইসব ধারাভাষ্য আজ হয়ে উঠেছে ইতিহাসের বয়ান।
বিপ্লবের স্বপ্ন দেখা চার তরুণ-তরুণী, নকশাল আন্দোলনের তত্ত্ব নিয়ে বাদানুবাদ, শ্রেণীশত্রু 'খতম' করে লোকালয় থেকে দূরে পালানো, সন্তানের বীজ ভেতরে রেখে বিপ্লবের উদ্দেশ্যে নতুন দিগন্তের উদ্দেশ্যে চলার এক অসাধারণ উপন্যাস।
২৩.০৭.২০২৫ (দেরি করে ফেলছি অনেক আগে পড়া উচিত ছিল)
খুব আগ্রহ নিয়ে পড়তে বসেছিলাম, শেষ করে লেখকের উপর রাগ হয়েছে, এমন এক প্লট পেয়ে এমন গড়পরতা লেখা কী করে লিখলেন উনি? চরিত্রগুলো নিজেদের গুণে আমাদের মনে দাগ কাটে, আরেকটু হলে লেখক তাও ধ্বংস করে ফেলতেন আরকি, পড়ে মনে হয় তিনি কিছু ঘটনা জানেন, তাই আমাদের জানানোর জন্য একটা গল্প ফেঁদেছেন। দুই তারকা দিলাম শুধু যে ঘটনাকে আশ্রয় করে এ উপন্যাস লেখা তার জন্যে, লেখকের এতে বিন্দু কৃতিত্ব নেই।