দেশভাগের পর সোনার পরিবারকে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসতে হলো। পূব বাংলার আধা বনেদী পরিবারটি পশ্চিমে গিয়ে খুইয়ে বসলো প্রায় সবকিছু। সম্পদ নিয়ে তাঁদের ততো চিন্তা নেই কিন্তু সম্মানটা চাইতো। সেটুকু না পেয়ে নিজেরদের নিঃস্ব, ব্রাত্য মনে করে কোনমতে কোথাও টিকে থাকলো তাঁরা। আর তাঁদের বংশের যে প্রদীপটিকে নিয়ে তাঁদের সবচেয়ে আশা ছিল, সেই সোনাকে এখন করতে হয় কিছু।
কিছু করার উদ্দেশ্যে সোনা যোগ দিলো জাহাজে। জাহাজে কাজের ট্রেনিং নিয়েছিল সে দুই মাস কিন্তু জাহাজে কাজ তো পায় না। প্রায় প্রতিদিন বন্দরে দাঁড়িয়ে থাকে কিন্তু কচি মুখের ছেলেকে কেউ নিতে চায় না। আজকের দিনে যেমন চাকরির বিজ্ঞাপনে অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়, এও তেমনি। সমুদ্র যাত্রার অভিজ্ঞতা না থাকলে জাহাজে নেওয়া হয় না।
তবু সোনা পেয়ে যায় একটা জাহাজ। এমন এক জাহাজ, যে জাহাজে কেউ যেতে চায় না। কয়লায় চলা এই জাহাজের নাম ‘এস এস সিউল ব্যাংক’। বুড়ো ক্যাপ্টেন স্যালি হিগিনস ছাড়া যার দায়িত্ব কেউ নিতে চায় না। পুরনো ঝুরঝুরে জাহাজটাকে ভাগাড়ে পাঠানোর কথা হয়েছে অনেকবার কিন্তু অজ্ঞাত নানা কারনে তা হয়নি। ধরে নেওয়া হয়ে জাহাজের এই শেষ যাত্রা, হিগিনসেরও। আর সেই জাহাজেই জুটে গেলো সোনা। তাকে কিছু একটা করে কটা পয়সা পাঠাতে হবে বাড়িতে।
জাহাজের খবর সে পেয়েছিল এক মুসলমান বুড়োর কাছে, সিউল ব্যাংকের এনজিন সারেঙ সে। সোনা তাকে চাচা বলে ডাকে। জাহাজে উঠে পরিচয় হলো অমিয় আর মৈত্রর সঙ্গে।
বাকি দিনগুলো এদের সঙ্গে কাটবে সোনার। মৈত্রর উপর ভাড় পড়েছে ছেলেটাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে নেওয়ার। আপাতত সোনা এ জাহাজে ‘কোলবয়’, বয়লারে কয়লা টানার কাজ তার। মৈত্র তার নাম দিয়েছে ছোটবাবু এবং এখান থেকেই ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’-র সোনা, ছোটবাবু হয়ে যায়।
অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দেশভাগ’ সিরিজের তৃতীয় বই ‘অলৌকিক জলযান’। দেশভাগ সিরিজ নাম হলেও এই বইয়ের দেশভাগ সম্পর্কিত কিছুই নেই। নেই বললে আবার ভুল হয়। কেননা দেশভাগ, ইংরেজ শাসনের প্রভাব, বাংলা ভাগ-এ সব কিছুর প্রভাব পরবর্তী সময় এমনকি এখনও রয়ে গেছে।এগুলো প্রকাশিত হয় নানা ভাবে। এমনকি একটা জাহাজের গল্প বললে সেখানেও খুঁজে পাওয়া যায়।
এ বই ‘এস এস সিউল ব্যাংক’-এর একটা যাত্রার গল্প। পশ্চিমবঙ্গের বন্দর থেকে ভেসে তার আবার সেখানে অর্থাৎ ‘হোমে’ ফিরে আসা পর্যন্ত যাত্রার কথা। জাহাজ, মসুদ্র, জাহাজের মানুষ, নাবিকদের জীবনের গল্প ‘অলৌকিক জলযান’। যাত্রার শুরু থেকে শুরু হওয়া জাহাজিদের মাঝে সম্পর্ক, তার ওঠা নামা, মিত্রতা, শত্রুতা, আশা আকাঙ্ক্ষার কথা নিয়ে লিখিত এ উপন্যাস, যেখানে ছোটবাবু প্রধান চরিত্র।
আমাদের আজকের দিনে বিয়ের বাজারে ‘মেরিন ইঞ্জিনিয়ার’ পাত্রের খুব কদর। সেকথা বাদ দিলেও জাহাজের জীবন, জাহাজীদের জীবন নিয়ে অনেকের অনেক রকম রোমান্টিসিজম আছে। থাকাই স্বাভাবিক। সমুদ্র এক অপার রহস্যের নাম আর জাহাজ নিয়ে যারা সমুদ্রে ঘুরে বেড়ায়, তাঁদের জীবন নিয়ে কৌতূহল থাকাই স্বাভাবিক। সে জীবনে আসলে যেমন রোমাঞ্চ আছে, তেমনি আছে বিপদ। আর তারচেয়েও যা আছে তা হলো বিস্বাদ, একাকীত্ব। সে একাকীত্বে ভোগেন ক্যাপ্টেন হিগিনস, একাকীত্বে ভোগে মৈত্র।
কখনও বিপদ আসে। সমুদ্র ফুলে ফেপে ওঠে। সে সব সামাল দেয় ওরা সবাই মিলে। কখনও নিজেদে��� মাঝে ঝগড়া বাঁধে। আবার নিজেরাই মিটিয়ে নেয়। মৈত্র তার বউ শেফালির চিঠির জন্য অপেক্ষা করে। জাহাজ কোন বন্দরে নোঙ্গর করলে ডেবিড নেমে যায় ম���য়ে মানুষের খোঁজে। পুরুষ পরিবেষ্টিত জাহাজে পুরুষের যৌনতার প্রয়োজন মেটানো হয় না অনেকদিন। বন্দর পেলেই তাই তাঁরা মেয়েমানুষের খোঁজে বের হয়।
কিন্তু সিউল ব্যাংকের একটা রহস্য আছে, যা কেউ জানে না। কিন্তু কানাঘুষো আছে, সবাই জানে। কেউ যা জানে না তা হলো ক্যাপ্টেন হিগিনস নিজের ছেলে বলে জ্যাককে সঙ্গে নিয়ে ভ্রমণে বের হয়, সে আসলে ছেলে না। জ্যাক আসলে বনি, হিগিনসের মেয়ে। মেয়েকে ছেড়ে সমুদ্রে থাকতে চায় না হিগিনস। অথচ এতগুলো ক্ষুধার্ত পুরুষের সামনে বনির পরিচয় প্রকাশ করতেও চায় না। তবু পুরুষের পোশাকের নিচে কিশোরী বনি ধীরে ধীরে যুবতী হয়ে ওঠে। জ্যাক পরিচয়ে ছোটবাবুর সঙ্গে তার বন্ধুত্ত ক্রমে প্রেমের দিকে চলে যায়। আর ওদিকে মেজো মিস্ত্রি আর্চি বাতাসে গন্ধ শুকে বুঝতে পারে জ্যাকের মাঝে মেয়েলী গন্ধ।
দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর অতীন অনেক ধরনের কাজ করেছেন। তার মধ্যে একটা হলো খালাসী হয়ে জাহাজের কাজ। জাহাজে কাজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তার আছে আর সে অভিজ্ঞতার সঙ্গে কল্পনার মিশেলে রচিত ‘অলৌকিক জলযান’। এখানে যেমন মানুষের জীবনের কথা আছে তেমনি আছে এই জাহাজের জীবনের কথা। সঙ্গে কিছু রহস্য, কিছু জানা অজানায় মেশা কথা। আর সেই জাহাজের জঠরে থাকা মানুষেরা। জাহাজের সাথে তাঁদের জীবন জড়িয়ে যায়। জাহাজে বসেই মৈত্র জানতে পারে তার স্ত্রী প্রসব করেছে অন্যের সন্তান। সে জাহাজ থেকে হারিয়ে যায় মৈত্র। সারেঙ খেয়াল রাখে ছোটবাবুর। জ্যাক অর্থাৎ বনি ভালোবাসোতে চায় ছোটবাবুকে। কিন্তু হিগিনস জানেন জাহাজ চলেছে কোন নিরুদ্দেশ যাত্রায়। যে জাহাজে তিনি হত্যা করেছেন আপন স্ত্রীকে। বনিকে বাঁচাতে সে জাহাজেই ছোটবাবু খুন করেছে আর্চিকে।
‘অলৌকিক জলযান’ সিউল ব্যাংক। কেননা তাকে যতবার ভাগাড়ে পাঠানোর কথা চিন্তা করা হয়েছে ততবার কোন না কোন দুর্ঘটনা ঘটেছে। হিগিনস কোনদিন জাহাজ স্ক্র্যাপ করায় সম্মতি দেননি। কিন্তু এবার দিলেন। আর তাই বুঝি হিগিনসের চালনার বাইরে জাহাজ নিজেই চলছে। বারবার ভুল কোর্সে চলছে। ঘতে যাচ্ছে অদ্ভুত সব ঘটনা। হিগিনস জানেন নিয়তি কাউকে ছেড়ে দেয় না কিন্তু তিনি চান বনি আর ছোটবাবু ভালো থাকুক।
অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের এ উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অনন্য সংযোজন। জাহাজ, জাহাজী, প্রেম, কামনা, রহস্য আর সমুদ্র নিয়ে এমন উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে আর আছে কিনা জানা নেই। সহজ কিন্তু চমৎকার এর ভাষা। কিছু জাহাজী শব্দ আছে যেমন ‘বড় টিন্ডাল’, ‘মেজো মালোম’, ‘হারিয়া হাফিজ’, ‘ফোকসাল’ আরও অনেক কিছু। জাহাজের বিভিন্ন অংশের নাম গুগুল করলে পাওয়া যাবে কিন্তু জাহাজীদের মুখের সব ভাষার অর্থ পাওয়া না গেলেও খুব একটা সমস্যা হবে না। সমুদ্রের মতো কখনও শান্ত, কখনও দুর্দান্ত আর কখনও রহস্যময় এ লেখা পাঠক পড়ে যাবে অনায়াসে। কখনও হারিয়ে যাবে, কখনও মুগ্ধ হবে।