Jump to ratings and reviews
Rate this book

দেশভাগ ##৩

অলৌকিক জলযান

Rate this book
দেশভাগ নিয়ে ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে' সিরিজের চারটি পর্ব। প্রথম পর্ব ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে', দ্বিতীয় পর্ব ‘মানুষের ঘরবাড়ি’, তৃতীয় পর্ব ‘অলৌকিক জলযান’, চতুর্থ পর্ব ‘ঈশ্বরের বাগান'। কিংবদন্তী তুল্য উপন্যাস ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ সম্পর্কে অগ্রজ সাহিত্যিক বিমল কর লিখেছেন, ‘অতীনের সেরা লেখা, এর মধ্যে অতীনের সত্তা ডুবে আছে, আমরা যাকে বলি ভর পাওয়া লেখা । ‘পুতুলনাচের ইতিকথার পর এতটা আর অভিভূত হইনি'—অশোক মিত্র। ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে এই সময়ের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস'—শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে এই সময়ের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস’–সমরেশ মজুমদার। সমকালের আর এক বিশিষ্ট সাহিত্যিক সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ লিখেছিলেন—দুই বাংলার সাহিত্যিক ঐতিহ্যের ঐক্যে বিশ্বাসী বলে আমার জানাতে দ্বিধা নেই যে, অতীনের এই রচনা এযাবৎকালের নজিরের বাইরে। ভাবতে গর্ব অনুভব করছি যে, আমার সমকালে এই তাজা তেজস্বী খাঁটি লেখকের আবির্ভাব ঘটেছে। আজ হয়ত তিনি নিঃসঙ্গ যাত্রী। কিন্তু বিশ্বাস করি, একদা আমাদের বংশধরগণ তাঁর নিঃসঙ্গ যন্ত্ৰণা অনুভব করে পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে তিরস্কার বর্ষণ করবে। ‘পথের পাঁচালীর' পর এই হচ্ছে দ্বিতীয় উপন্যাস যা বাংলা সাহিত্যের মূল সুরকে অনুসরণ করেছে।' পাঠিকা ঝর্ণা নাগ শিবপুর থেকে লিখেছিলেন—‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে' পড়ে আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। ঈশ্বরের সৃষ্ট সুন্দর পৃথিবী দেখে মুগ্ধ হয়ে যেমন তার সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে কৌতুক বিস্ময় জাগে এও তেমনি।' এমন অজস্র চিঠি এবং সাহিত্যঋণের কথা স্বীকার করা হয়েছে অন্য তিনটি পর্ব ‘মানুষের ঘরবাড়ি’, ‘অলৌকিক জলযান’ এবং ‘ঈশ্বরের বাগান' সম্পর্কেও। বিদগ্ধ এবং গুণী ব্যক্তিরা লিখেছেন, ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে' যদি মহৎ উপন্যাস, ‘অলৌকিক জলযান' তবে মহাকাব্য বিশেষ—আর ‘মানুষের ঘরবাড়ি সোনার কিশোর জীবনের অবিনাশী আখ্যান। শেষ পর্ব ‘ঈশ্বরের বাগান’–এতে আছে দেশভাগ জনিত উদ্বাস্তু পরিবারটির সংগ্রামী বিষয়, অভিনব চরিতমালা এবং পটভূমি সহ জীবনের রোমাঞ্চকর অভিযানের লৌকিক-অলৌকিক উপলব্ধি পুষ্টি খণ্ডিত বঙ্গের অখণ্ড বর্ণমালা।

472 pages, Hardcover

First published January 1, 1962

6 people are currently reading
245 people want to read

About the author

Atin Bandyopadhyay

83 books27 followers
Atin Bandyopadhyay (Bangla: অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়; anglicised spelling of surname: Banerjee) is a noted writer of Bengali literature. He was born in 1934 in Rainadi, Dhaka.

He spent his childhood in a joint family set-up in the then East Bengal of undivided India and studied in Sonar Gaon Panam School. After the Partition, migrated to India. He earned his undergraduate degree in commerce in 1956 and subsequently earned a teacher's training degree, all from the University of Calcutta. He took various jobs as a sailor, truck-cleaner, primary school teacher. Also became headmaster of a senior basic school. Settled permanently in Kolkata in 1963. Here also he took on various jobs like factory manager, publication advisor and lastly journalist.

The first story of the author was published in the magazine Abasar of Berhampore. He has penned many works since then, but his masterpiece is a three-part trilogy on the Partition: Nilkantha Pakhir Khonje (নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে), Aloukik Jalajan (অলৌকিক জলযান) and Ishwarer Bagan (ঈশ্বরের বাগান). Another famous writer of Bengal, Syed Mustafa Siraj has compared Nilkantha Pakhir Khonje (নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে) with Greek tragedies and also found it tuned with the core spirit with the Bangla literature like Bibhutibhushan Bandyopadhyay's Pather Panchali.

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
24 (44%)
4 stars
17 (31%)
3 stars
10 (18%)
2 stars
2 (3%)
1 star
1 (1%)
Displaying 1 - 14 of 14 reviews
Profile Image for রিফাত সানজিদা.
174 reviews1,355 followers
November 27, 2016
আগে সিরিজ পড়ার পেছনের গল্প করি। :)

বিখ্যাত বই।
পরিচিত বহু পাঁড়পাঠক ভূয়সী প্রশংসা করেছেন বারংবার, পশ্চিমবঙ্গের এক সচল ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ জানিয়েছিলেন যত দ্রুত সম্ভব পড়ে, রিভিউ লেখার। চারটি পর্বের সিরিজ; পয়লা নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে, দ্বিতীয় মানুষের ঘরবাড়ি, তৃতীয়টি 'অলৌকিক জলযান' এবং সমাপ্তিতে ঈশ্বরের বাগান

বাতিঘরে গিয়ে দুই খন্ড কিনে ফেলেছিলাম একদিন। চারটাই একসঙ্গে কেনার ইচ্ছে ছিলো, রেস্তোতে কুলায়নি।
ভাল কথা, দাম হাজার ছাড়ানো প্রতিটাই, যতদূর মনে পড়ে।

পড়ে, আশানুরূপ মুগ্ধ হইনি, বলাই বাহুল্য।
তাও, মাস কয় পর, ভজিয়ে-ভাজিয়ে বাকি দুই খণ্ড ধার নিয়ে এলাম এক বন্ধুর কাছ থেকে। আমি কঠিন কঞ্জুস, পারতপক্ষে বই ধার দিই না। নিইও না, নেহায়েত ঠ্যাকায় না পড়লে।
সে প্রথম শ্রেণির অমানুষ, নিজের শেলফের ধারেকাছে বাইরের কাউকে নিঃশ্বাস ফেলতে দেখলেও রামদা নিয়ে তেড়ে আসে। রাত জেগে, টানা পড়ে, তুচ্ছ, নশ্বর সেই পুস্তকদ্বয় ৭২ ঘন্টার মধ্যে আমাকে ফেরত দিতে হয়েছিল।

খুদা, তুমি আছো নিশ্চয়ই উপরে, অফটাইম পেলে একদিন এই ছোটলোকামির বিচার কইরো। :3

প্যাঁচাল বহুত পেড়েছি, আসল কথায় আসি।

নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে দেশভাগ নিয়ে রচিত অতীনের সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস। এই উপন্যাসের জন্য ২০০৫ সালে তিনি পান শরৎ পুরষ্কার এবং ২০০৮ সালে আই আই পি এমের দেয়া সুরমা চৌধুরী আর্ন্তজাতিক স্মৃতি পুরষ্কার। কথিত হয়ে থাকে এই উপন্যাসটি উপমহাদেশের বিবেক।
একই কথা বলেছেন বিমল কর, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায, সমরেশ মজুমদার। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ এই উপন্যাসকে তুলনা করেছেন পথের পাঁচালীর সঙ্গে।

দুঃখিত, আমি পারিনি।

নগণ্য পাঠক হিসেবে বারবার; দেশভাগের কারণে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন জীবন, উৎসবের বাদ্যি, ঢাকঢোল সানাই, মহররমের মেলা সব ছাপিয়ে হিন্দু- মুসলিম সম্প্রীতিতে যে আচমকা ভাঙনের সুর, হঠাৎ করে জিন্নাহ টুপির ছড়াছড়ি, মাঠের এ'পাশে আল্লাহু আকবর, নদীর ওপাড়ে হিন্দু গ্রামে বন্দে মাতরম...ঘোর দুঃসময়ের মুখোমুখি ছোটবাবু; কিশোর সোনার নিখাদ কৈশোর, হারিয়ে ফেলা বাল্যের অমল সঙ্গিনী ফাতিমা, আজন্মের ভিটা ছেড়ে, মাতৃভূমি দেশ ছেড়ে গিয়ে কলকাতায় উদ্বাস্তু জীবনের সূচনা, মূল্যবোধের অবক্ষয়, দারিদ্যের কষাঘাত, স্বজনবিচ্ছেদ--সবকিছু ছাপিয়ে পাঠে তীব্র অস্বস্তি এনেছে চরিত্রদের কামনা-বাসনার চাহিদা ও যোগানের অগাধ ফিরিস্তি।

সাহিত্যে যৌনতা বিষবৎ পরিত্যজ্য এমন খুকিপনা নেই, কিন্তু, বিশেষত এ পর্বে--যখন ছোটবাবু রিফিউজি পরিবারের হাল ধরতে গিয়ে জাহাজি হয়ে মহাসমুদ্রে, বনি, জাহাজের ক্যাপ্টেনের মেয়ে, যার ইহকালীন একমাত্র চাওয়া তখন সুন্দর ফ্রক কিংবা সিল্কের গাউন পরে ছোটবাবুর সামনে বসে থাকা এবং নিঃশর্ত শারিরীক সমর্পণের আকুলতা, পাতার পর পাতা ধরে সে কাহিনি পড়তে, পড়তে, পড়তে... আদতেই বিবমিষা জাগে।
হাস্যকর এবং দুঃখজনকভাবে আবারো মনে পড়ে পুতুলনাচের ইতিকথা'র লাইন-- 'শরীর, শরীর, তোমার মন নাই কুসুম?'

আমি মেয়ে ছোটবাবু, আমি মেয়ে, আমি বনি..ব্লা ব্লা।
বুঝলাম তুমি বনি, তুমি মেয়ে, হাজার বছর ধরের আম্বিয়ার মতো তোমারো আঁটসাঁট শাড়ির খাঁজেখাঁজে দুরন্ত যৌবন (বোধহয় ৭/৮বার ছিলো এই লাইনটা উপন্যাসে, ফুহঃ)
এখন কী করতে বলো ময়না, নাচব?

হাই প্রোফাইল এই কোয়াড্রোলজিটি বৃদ্ধ বয়সে, অধিকতর পরিণত মগজে পুনঃপাঠে ইচ্ছুক। ক্ষীণ আশা রাখি, রেটিং বদলাবে।
আপাতত গড়ে ৩/৫, চারটে খণ্ড মিলিয়ে।
Profile Image for Mahmudur Rahman.
Author 13 books356 followers
July 26, 2019
দেশভাগের পর সোনার পরিবারকে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসতে হলো। পূব বাংলার আধা বনেদী পরিবারটি পশ্চিমে গিয়ে খুইয়ে বসলো প্রায় সবকিছু। সম্পদ নিয়ে তাঁদের ততো চিন্তা নেই কিন্তু সম্মানটা চাইতো। সেটুকু না পেয়ে নিজেরদের নিঃস্ব, ব্রাত্য মনে করে কোনমতে কোথাও টিকে থাকলো তাঁরা। আর তাঁদের বংশের যে প্রদীপটিকে নিয়ে তাঁদের সবচেয়ে আশা ছিল, সেই সোনাকে এখন করতে হয় কিছু।

কিছু করার উদ্দেশ্যে সোনা যোগ দিলো জাহাজে। জাহাজে কাজের ট্রেনিং নিয়েছিল সে দুই মাস কিন্তু জাহাজে কাজ তো পায় না। প্রায় প্রতিদিন বন্দরে দাঁড়িয়ে থাকে কিন্তু কচি মুখের ছেলেকে কেউ নিতে চায় না। আজকের দিনে যেমন চাকরির বিজ্ঞাপনে অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়, এও তেমনি। সমুদ্র যাত্রার অভিজ্ঞতা না থাকলে জাহাজে নেওয়া হয় না।

তবু সোনা পেয়ে যায় একটা জাহাজ। এমন এক জাহাজ, যে জাহাজে কেউ যেতে চায় না। কয়লায় চলা এই জাহাজের নাম ‘এস এস সিউল ব্যাংক’। বুড়ো ক্যাপ্টেন স্যালি হিগিনস ছাড়া যার দায়িত্ব কেউ নিতে চায় না। পুরনো ঝুরঝুরে জাহাজটাকে ভাগাড়ে পাঠানোর কথা হয়েছে অনেকবার কিন্তু অজ্ঞাত নানা কারনে তা হয়নি। ধরে নেওয়া হয়ে জাহাজের এই শেষ যাত্রা, হিগিনসেরও। আর সেই জাহাজেই জুটে গেলো সোনা। তাকে কিছু একটা করে কটা পয়সা পাঠাতে হবে বাড়িতে।

জাহাজের খবর সে পেয়েছিল এক মুসলমান বুড়োর কাছে, সিউল ব্যাংকের এনজিন সারেঙ সে। সোনা তাকে চাচা বলে ডাকে। জাহাজে উঠে পরিচয় হলো অমিয় আর মৈত্রর সঙ্গে।
বাকি দিনগুলো এদের সঙ্গে কাটবে সোনার। মৈত্রর উপর ভাড় পড়েছে ছেলেটাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে নেওয়ার। আপাতত সোনা এ জাহাজে ‘কোলবয়’, বয়লারে কয়লা টানার কাজ তার। মৈত্র তার নাম দিয়েছে ছোটবাবু এবং এখান থেকেই ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’-র সোনা, ছোটবাবু হয়ে যায়।
অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দেশভাগ’ সিরিজের তৃতীয় বই ‘অলৌকিক জলযান’। দেশভাগ সিরিজ নাম হলেও এই বইয়ের দেশভাগ সম্পর্কিত কিছুই নেই। নেই বললে আবার ভুল হয়। কেননা দেশভাগ, ইংরেজ শাসনের প্রভাব, বাংলা ভাগ-এ সব কিছুর প্রভাব পরবর্তী সময় এমনকি এখনও রয়ে গেছে।এগুলো প্রকাশিত হয় নানা ভাবে। এমনকি একটা জাহাজের গল্প বললে সেখানেও খুঁজে পাওয়া যায়।

এ বই ‘এস এস সিউল ব্যাংক’-এর একটা যাত্রার গল্প। পশ্চিমবঙ্গের বন্দর থেকে ভেসে তার আবার সেখানে অর্থাৎ ‘হোমে’ ফিরে আসা পর্যন্ত যাত্রার কথা। জাহাজ, মসুদ্র, জাহাজের মানুষ, নাবিকদের জীবনের গল্প ‘অলৌকিক জলযান’। যাত্রার শুরু থেকে শুরু হওয়া জাহাজিদের মাঝে সম্পর্ক, তার ওঠা নামা, মিত্রতা, শত্রুতা, আশা আকাঙ্ক্ষার কথা নিয়ে লিখিত এ উপন্যাস, যেখানে ছোটবাবু প্রধান চরিত্র।
আমাদের আজকের দিনে বিয়ের বাজারে ‘মেরিন ইঞ্জিনিয়ার’ পাত্রের খুব কদর। সেকথা বাদ দিলেও জাহাজের জীবন, জাহাজীদের জীবন নিয়ে অনেকের অনেক রকম রোমান্টিসিজম আছে। থাকাই স্বাভাবিক। সমুদ্র এক অপার রহস্যের নাম আর জাহাজ নিয়ে যারা সমুদ্রে ঘুরে বেড়ায়, তাঁদের জীবন নিয়ে কৌতূহল থাকাই স্বাভাবিক। সে জীবনে আসলে যেমন রোমাঞ্চ আছে, তেমনি আছে বিপদ। আর তারচেয়েও যা আছে তা হলো বিস্বাদ, একাকীত্ব। সে একাকীত্বে ভোগেন ক্যাপ্টেন হিগিনস, একাকীত্বে ভোগে মৈত্র।

কখনও বিপদ আসে। সমুদ্র ফুলে ফেপে ওঠে। সে সব সামাল দেয় ওরা সবাই মিলে। কখনও নিজেদে��� মাঝে ঝগড়া বাঁধে। আবার নিজেরাই মিটিয়ে নেয়। মৈত্র তার বউ শেফালির চিঠির জন্য অপেক্ষা করে। জাহাজ কোন বন্দরে নোঙ্গর করলে ডেবিড নেমে যায় ম���য়ে মানুষের খোঁজে। পুরুষ পরিবেষ্টিত জাহাজে পুরুষের যৌনতার প্রয়োজন মেটানো হয় না অনেকদিন। বন্দর পেলেই তাই তাঁরা মেয়েমানুষের খোঁজে বের হয়।

কিন্তু সিউল ব্যাংকের একটা রহস্য আছে, যা কেউ জানে না। কিন্তু কানাঘুষো আছে, সবাই জানে। কেউ যা জানে না তা হলো ক্যাপ্টেন হিগিনস নিজের ছেলে বলে জ্যাককে সঙ্গে নিয়ে ভ্রমণে বের হয়, সে আসলে ছেলে না। জ্যাক আসলে বনি, হিগিনসের মেয়ে। মেয়েকে ছেড়ে সমুদ্রে থাকতে চায় না হিগিনস। অথচ এতগুলো ক্ষুধার্ত পুরুষের সামনে বনির পরিচয় প্রকাশ করতেও চায় না। তবু পুরুষের পোশাকের নিচে কিশোরী বনি ধীরে ধীরে যুবতী হয়ে ওঠে। জ্যাক পরিচয়ে ছোটবাবুর সঙ্গে তার বন্ধুত্ত ক্রমে প্রেমের দিকে চলে যায়। আর ওদিকে মেজো মিস্ত্রি আর্চি বাতাসে গন্ধ শুকে বুঝতে পারে জ্যাকের মাঝে মেয়েলী গন্ধ।

দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর অতীন অনেক ধরনের কাজ করেছেন। তার মধ্যে একটা হলো খালাসী হয়ে জাহাজের কাজ। জাহাজে কাজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তার আছে আর সে অভিজ্ঞতার সঙ্গে কল্পনার মিশেলে রচিত ‘অলৌকিক জলযান’। এখানে যেমন মানুষের জীবনের কথা আছে তেমনি আছে এই জাহাজের জীবনের কথা। সঙ্গে কিছু রহস্য, কিছু জানা অজানায় মেশা কথা। আর সেই জাহাজের জঠরে থাকা মানুষেরা। জাহাজের সাথে তাঁদের জীবন জড়িয়ে যায়। জাহাজে বসেই মৈত্র জানতে পারে তার স্ত্রী প্রসব করেছে অন্যের সন্তান। সে জাহাজ থেকে হারিয়ে যায় মৈত্র। সারেঙ খেয়াল রাখে ছোটবাবুর। জ্যাক অর্থাৎ বনি ভালোবাসোতে চায় ছোটবাবুকে। কিন্তু হিগিনস জানেন জাহাজ চলেছে কোন নিরুদ্দেশ যাত্রায়। যে জাহাজে তিনি হত্যা করেছেন আপন স্ত্রীকে। বনিকে বাঁচাতে সে জাহাজেই ছোটবাবু খুন করেছে আর্চিকে।

‘অলৌকিক জলযান’ সিউল ব্যাংক। কেননা তাকে যতবার ভাগাড়ে পাঠানোর কথা চিন্তা করা হয়েছে ততবার কোন না কোন দুর্ঘটনা ঘটেছে। হিগিনস কোনদিন জাহাজ স্ক্র্যাপ করায় সম্মতি দেননি। কিন্তু এবার দিলেন। আর তাই বুঝি হিগিনসের চালনার বাইরে জাহাজ নিজেই চলছে। বারবার ভুল কোর্সে চলছে। ঘতে যাচ্ছে অদ্ভুত সব ঘটনা। হিগিনস জানেন নিয়তি কাউকে ছেড়ে দেয় না কিন্তু তিনি চান বনি আর ছোটবাবু ভালো থাকুক।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের এ উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অনন্য সংযোজন। জাহাজ, জাহাজী, প্রেম, কামনা, রহস্য আর সমুদ্র নিয়ে এমন উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে আর আছে কিনা জানা নেই। সহজ কিন্তু চমৎকার এর ভাষা। কিছু জাহাজী শব্দ আছে যেমন ‘বড় টিন্ডাল’, ‘মেজো মালোম’, ‘হারিয়া হাফিজ’, ‘ফোকসাল’ আরও অনেক কিছু। জাহাজের বিভিন্ন অংশের নাম গুগুল করলে পাওয়া যাবে কিন্তু জাহাজীদের মুখের সব ভাষার অর্থ পাওয়া না গেলেও খুব একটা সমস্যা হবে না। সমুদ্রের মতো কখনও শান্ত, কখনও দুর্দান্ত আর কখনও রহস্যময় এ লেখা পাঠক পড়ে যাবে অনায়াসে। কখনও হারিয়ে যাবে, কখনও মুগ্ধ হবে।
Profile Image for DEHAN.
278 reviews80 followers
December 2, 2024
হিন্দুস্থান আসার পর পর ই সোনারা মহা বিপদে পড়লো । খাদ্য ,বস্ত্র ,বাসস্থান এই তিনটা মৌলিক চাহিদার কোনটাই ঠিক মতো পূরণ হয় না এরকম বিপদ । বাধ্য হয়ে সোনা ঠিক করলো সে জাহাজে চাকুরী নিবে । সমুদ্রে ঘুরলে অন্তত এই চাহিদা গুলো পুরণ হতে পারে । তারপর অনেক চেষ্টার পর একটি জাহাজে তার ঠাই হয় ছোটবাবু হিসেবে ।
সে এক আজদহা জাহাজ ।নাম সিউল ব্যাংক।এই জাহাজের সবচাইতে বড় বৈশিষ্ট্য তার পুরাতনত্ব এবং এতে ভ্রমণ করতে মানুষদের অনীহা প্রকাশ।
কিন্তু জাহাজ তো আর থেমে থাকবে না সেজন্যে। যথা সময়ে প্রায় জাহাজের বয়সী একজন রাশভারী কাপ্তান ওদের কয়েকজন কে নিয়ে রওনা দেয় এক বিশাল যাত্রায় । সেই যাত্রার কাহিনি নিয়েই অলৌকিক জলযান । এইখানে জল ও যানের ভূমিকাই মুখ্য। স্থলের কথা নেই বললেই চলে । এই জাহাজেই সোনার জীবনে আসে প্রথম প্রেম তাও ঐ কাপ্তানের মেয়ের সাথেই। তাছাড়াও জাহাজের আরো কর্মচারীদের জীবন যাপন এর গালগপ্প তো আছেই। দীর্ঘস্থায়ী সামুদ্রিক যাত্রার গল্প কখনো কখনো একঘেয়ে লাগে বটে কিন্তু সমুদ্রের প্রতি আলাদা দুর্বলতা আছে বলে পড়ে আনন্দ পেয়েছি ।
সমুদ্রের বর্ণনা নিয়ে কোন অভিযোগ নাই । আমার নিজের ও ইচ্ছা আছে একদিন এইরকম কোন জাহাজে উঠে বসবো । তারপর অনন্ত যাত্রা ,চারিপাশে ধূ ধূ জলরাশি ভিন্ন কিছুই থাকবে না। এতদিনে অবশ্য চলেও যেতাম কিন্তু সাঁতার টা শেখা হয়ে উঠে নাই বিধায় যেতে পারছি না । এই একই কারনে আমার জীবনে এখন পর্যন্ত সমুদ্র দর্শন ও হয় নাই । পরিবারবর্গ, দূরসম্পর্কের বন্ধু-বান্ধব , আত্মীয়-অনাত্মীদের সাথে যাওয়ার নেমন্তন্ন পেয়েছি কয়েকবার কিন্তু যাই নি । সমুদ্র আমার কাছে খুবই ব্যক্তিগত ব্যাপার । দুনিয়ার মানুষ নিয়ে সার্কাস দেখা যায় ,সমুদ্র না । সাঁতার টা শিখলেই আমি একদিন সমুদ্রে যাবো । এমন সময়ে যাবো যখন তেমন কোন পর্যটক থাকবে না। মাঝেমধ্যেই রাতে ঘুমানোর আগে কল্পনা করি,আমি একটা স্যান্ডো গেঞ্জি আর লুঙ্গি পড়ে সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। সুমদ্রের গর্জনের শব্দে লুঙ্গির বাতাসে উড়ার শব্দ ঢাকা পড়ে যাচ্ছে বারবার। আমার হাতে একটা ডাব। ডাবের পানি খাইলে মাথা ঘুরে তাই ডাবের মধ্যে পানির বদলে থাকবে চা। আমি স্ট্র দিয়ে একটু একটু করে চায়ে চুমুক দিচ্ছি আর সমুদ্র নিয়ে অনেক আগে পড়া একটা বিশেষ কবিতা মনে করার চেষ্টা করছি। পায়ের পাতায় লবনাক্ত পানি, মুখের মধ্যে মিষ্টি চা; নিঃসন্দেহে ডেডলি কম্বো। লবনাক্ত জলরাশি আমার গ্রামীন চেকের লুংঙ্গি একটু পরপর ছুঁয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছে। এরকমভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পা ব্যথা হয়ে গেলে এক পর্যায়ে লুঙ্গি মালকোঁচা দিয়ে আমি ডাব সুদ্ধ সমুদ্রে ঝাঁপায় পড়ি। তখনি আমার কল্পনার সূতো টকাস করে ছিঁড়ে যায়। আস্তে আস্তে আমি বাস্তবে ফিরে আসি,আমার মনে পড়ে লুঙ্গি আর সাঁতার দুইটার কোনটাকেই আমি এখন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে আনতে পারি নাই। আমার দীর্ঘনিঃশ্বাসের শব্দ আর হাই তোলার শব্দ, কল্পনার সূতো ছেঁড়ার শব্দকে ঢাকতে পারে না। আমি মাথায় ’টকাস’ শব্দ নিয়ে একসময় ঘুমিয়ে যাই
সোনার সমুদ্রে ঘোরাঘুরি আর জাহাজের সেকেন্ড অফিসার কে খুন করার গল্প আমাকে সাঁতার শেখার নতুন আশা জাগিয়েছে।
Profile Image for Masudur Tipu.
130 reviews2 followers
September 15, 2025
সমুদ্র পছন্দ তাই এই বইটা ভালোই লেগেছে। দেশভাগ সিরিজের এই বইয়ে আগের বইগুলোর মতো কোনো সবুজ নেই, আছে শুধু পানি আর পানি! জাহাজে করে সমুদ্র যাত্রার এই ভ্রমণ কাহিনী প্রথম হাফ ভালোই লেগেছে। এই অংশ টুকু ৫/৫ ব্যাক্তিগত রেটিং। জাহাজে বুড়ো চাচার কল্যাণে কোলবয় হিসেবে চাকরি জুটে নীলকন্ঠ পাখির খোজে বইয়ের সোনার।ছোট্ট সোনা এখন কিশোর হয়ে জাহাজে কয়লা টানে।সেখানে ওর মতো মৈত্র এর সাথে পরিচয় হয়, যে তার নতুন নাম দেয় ছোটবাবু। জাহাজ অনেকদিন পর পর বিভিন্ন দেশে তীরে আসে।তখন একটা জোস ফিলিং হয় পড়ার সময়ে।নতুন অভিজ্ঞতা হয় সোনার যে নতুন দেশের কালচার,খাবার,মানুষ, রেস্টুরেন্ট, ছবির মতো সুন্দর বাড়ি দেখে অভিভূত হয়ে যায়। মৈত্র, ডেভিডরা বিদেশিনী দের পিছনে ছোটে,জাহাজে অনেক দিন একা কাটানোর পর। মৈত্রের গ্রামের বউয়ের প্রতি টান, যিনি একসময় অন্যের বাচ্চা পেটে নিয়ে মৈত্র কে পাগল করে দেয়। তার লাশ যখন সোনা কাধে নেয় সেই অংশ পড়ে খুবই আবেগ প্রবণ হয়ে যাই।

এখন আসি খারাপ লাগার অংশ টুকু তে, জাহাজের ক্যাপ্টেন হিগিনস এর মেয়ের সাথে সোনার প্রথম প্রেম হয়, নেকামো দিয়ে ভরা। সেই মেয়ে কে আবার শুরু তে ছেলে সাজিয়ে রাখে তার বাবা জাহাজের এতোগুলা ছেলের হাত থেকে বাচাতে, যা কোনো সেন্স মেক করে না। আমি টোটালি ওদের প্রেম কাহিনি স্কিপ করে গেছি, এতো টা বিরক্ত হয়েছি।এই অংশ টুকুর ব্যাক্তিগত রেটিং ১/৫।

সব মিলিয়ে ভাল লেগেছে দেশভাগ সিরিজের তৃতীয় বইটি।
Profile Image for প্রিয়াক্ষী ঘোষ.
364 reviews34 followers
May 6, 2023
অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় এর দেশভাগ নিয়ে " নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে " সিরিজের চারটি পর্ব।
প্রথম পর্ব- " নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে "
দ্বিতীয় পর্ব - " মানুষের ঘরবাড়ী "
তৃতীয় পর্ব - " অলৌকিক জলযান"।

সুখী স্বচ্ছল একান্নবর্তী পরিবারে জন্ম এবং বেড়েওঠা, তবে দেশভাগের ফলে সেই সুখ ও স্বচ্ছলতা জীবন থেকে হারিয়ে যায় সোনার। ছোট্ট সোনার ছোট বেলাটা মধুর কাটলেও দেশভাগ কেড়ে নেয় সকল সুখ, তখন টিকে থাকা বা বেঁচে থাকাটাই হয়ে ওঠে কষ্ট কর।
এর পর নতুন করে নতুন জায়গাতে ঘরবাড়ি আকড়ে চোখে বড় হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে বার বার হোঁচট খেয়ে জীবনের মানেটা খুঁজে পায়।
এর পরই আসে অনন্ত সে সমুদ্র যাত্রা। 'নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে'র সোনা এই পর্বে এসে জাহাজের ছোটবাবু।
এস. এস. সিউল ব্যাংক এ করে ভারত মহাসাগর, আটলান্টিক, মিসিসিপি ও ছবির মত দ্বীপ তাহিতি। একনাগাড়ে মাসের পর মাস৷ সমুদ্রের বুকে জাহাজের অমানুষিক খাটুনি সহ্য করে প্রকৃত জাহাজী হয়ে ওঠা।

সমুদ্রের বুকে সাদা জাহাজ, জাহাজের কলকব্জা, জাহাজের ডেক, মাস্তুল সব সাবলীল ভাবে অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায় পাঁচশো পৃষ্ঠার বইটাতে তুলে ধরেছেন।
Profile Image for Shuk Pakhi.
513 reviews316 followers
February 25, 2025
বইটা পড়তে পড়তে বারবার মনে হয়েছে এটাকে দেশভাগ সিরিজে না ঢুকিয়ে স্ট্যান্ট এলোন রাখলেই ভালো হতো।
Profile Image for Anjum Haz.
287 reviews71 followers
April 7, 2022
সমুদ্র ও জীবনের ছেদবিন্দুতে লেখা এক মহাকাব্য।

নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে উপন্যাসের সোনা দেশভাগের পর চলে আসে ভারতে। কৈশোর থেকে যুবা বয়সের মাঝামাঝি সময়। নিজের যোগ্যতা দিয়ে ছিন্নমূল পরিবারের হাল ধরার ভীষন তাগিদ। দুবেলা পেট ভরে ভাত আর সেইলরের সাদা পোশাকে বাবা-মাকে গর্বিত করার আশা নিয়ে জাহাজে উঠে আসে সোনা। আমাদের সোনাবাবু— সোনালী বালির নদীর চর, যেখানে সে বালির মধ্যে গর্ত করে একটা মালিনী মাছ বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিল, সেই নদী, সেই তরমুজ ক্ষেত পেরিয়ে সে এখন অন্তহীন সমুদ্রে এস. এস. সিউল-ব্যাংক জাহাজের নাবিক। জাহাজে সবাই তাকে ডাকে ছোটবাবু বলে। সমুদ্রের বিশালত্বে কিংবা নতুন জীবনের অভ্যস্ততায় এক সময় তার মনেই থাকে না, তার একটা দেশ আছে পৃথিবীর অপর প্রান্তে, সেখানে তার বাবা-মা, ভাইবোন কতো আলাদাভাবে জীবন কাটাচ্ছে।
সাদা জাহাজটাকে সে কিছুতেই ভাবতে পারে না জাহাজ, আসলে সেই সৌরলোকের অন্তহীন যাত্রার মতো মনে হয়, যেন চারপাশে সব গ্রহ নক্ষত্র, উপগ্রহ আর এক সৌরলোক থেকে অন্য সৌরলোকে একটা যান অনবরত ছুটছে।

দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় বন্দরে বন্দরে বিরতি। জাহাজীরা চিঠি পায় বন্দরে পৌঁছুলে। বাদশা মিয়ার চার নম্বর বউ চিঠি লিখে পাঠায়। মৈত্রদা বাংকে শুয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে বউয়ের চিঠি পড়ে। সবার চিঠি আসে। শুধু চিঠি আসে না ছোটবাবুর। রিফিউজি পরিবারটির ঠিকানা আজ এখানে, কাল সেখানে। ছোটবাবু দেখছে সমুদ্রের বিচিত্র জীবন, সমুদ্রের গর্ভে তিমি মাছের ছোটাছুটি, দেখছে জাহাজ মিসিসিপি নদীতে পড়ছে, কিন্তু জানাতে পারছে না কাউকে। বলতে পারছে না, মা, আমরা এখন মিসিসিপি নদীতে।

এত সুন্দর কাব্যের আঙ্গিকে বাংলা সাহিত্যে কোনো পুরুষ চরিত্রের উপস্থাপন দেখিনি আগে। সোনাবাবু কিংবা জাহাজের ছোটবাবু, তাকে নিম্নস্তরের জাহাজীদের কাতারে ফেলে দেওয়া যায় না। মনে হয়, একটা সময় খুব বনেদি পরিবারের ছেলে ছিল। সেই চন্দন কাঠের সুবাস গায়ে। ছোটবাবুর শরীরের সুষমা অধীর করে দেয় বনিকে-
যেন জীবনের এক আশ্চর্য মোহ অথবা ঘ্রাণ বলা যেতে পারে, অথবা রাজার রাজা ছোটবাবু, এবং শরীরের সর্বত্র মহিমময় ঈশ্বর কোন কৃপণতা রাখেন নি। এক আশ্চর্য মোমের শরীর, অথবা পাথরের মূর্তি। ... ছোটবাবুর মুখে নীল দাড়ি। শরীরের লাবণ্য কোনো দূরবর্তী এক বনভূমির কথা অথবা কোন মরুভূমিতে একজন মুসাফিরের নিত্য হেঁটে যাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়।

কতো রকম ব্যক্তিত্বের মানুষ এই জাহাজে। জাহাজের কাপ্তান স্যালি হিগিনস। তার একটাই দায়িত্ব—ঝড়ঝঞ্ঝা সবকিছু থেকে জাহাজকে বন্দরে পৌঁছে দেওয়া। সাদা চুল, নকল দাঁত, কাপ্তান এর সাদা ইউনিফর্ম, কাঁধে চারটে সোনালী স্ট্র্যাপ। পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে ব্যবহারের মাঝে বিরাজ করে প্রাজ্ঞতা। কাপ্তান স্যালি হিগিনস, এস.এস.সিউল-ব্যাংক‌ আন্ডার হিজ কম্যান্ড।

দেখি এন্জিন সারেং এর মতো বিশ্বস্ত মানুষ। কাজকর্ম শেষে সে তার কোরান খুলে বসে। আবিষ্ট মনে সূরার আয়াত পড়ে যাচ্ছে। তার পৃথিবীতে এর বেশি কিছু লাগে না।

জাহাজে চড়ে বসে একজোড়া চড়ুই পাখি। তারাও যোগ হয় জাহাজের যাত্রী কিংবা এই উপন্যাসের চরিত্র হিসেবে। যোগ হয় এক অ্যালবাট্রস যুগল। আর পুরোটা উপন্যাস জুড়ে প্রতাপশালী হয়ে রয়েছে সমুদ্র। কি মনোরম বর্ণনা-
কেননা, সমুদ্র সেই কবে থেকে, কেউ বলতে পারে না, পৃথিবীতে অথবা সৌরজগতে বড় সে একা! একাকী সে, আছে তার মতো, সে কখনও উত্তাল তরঙ্গমেলার ভেতর আকাশের নক্ষত্রদের ছুঁয়ে দিতে চায়, তার কি যে প্রলোভন তখন।

নোনা জলে ভাসতে ভাসতে ডাঙা তখন দুর্লভ বস্তু জাহাজীদের কাছে। কোথাও একটা দ্বীপ চোখে পড়লে বা বন্দরের আবছা অবয়ব দৃষ্টিসীমার মধ্যে আসলে, জাহাজীরা সব কাজ ফেলে, ডেকে এসে দাঁড়ায়। কাজ ফেলে দূরবীন লাগিয়ে বসে থাকে ডেবিড।‌ অথবা কখনো কাজের তাড়া থাকলে ছোটবাবুকে বসিয়ে রাখে দূরবীন নিয়ে। এনি ওম্যান ছোট? সমুদ্রে নাকি জীবনধারণের জন্য ঈশ্বর সবই দিয়ে রেখেছেন। তবে আসল জিনিসটাই কিনা নেই। ওম্যান।

একনাগাড়ে মাসাধিক শুধু জলে ভেসে থাকতে থাকতে বন্দর এলে জাহাজীরা 'প্রকৃত জাহাজী' হয়ে যায়। দাদার মতো শাসন করে, ছায়া দিয়ে রাখে মৈত্রদা। ‌বন্দর এলে মৈত্রদা 'জাহাজী মৈত্র' হয়ে যায়। এই জায়গাটায় চৌরঙ্গী বইয়ের সাথে মিল পেয়েছি। হোটেল শাজাহানে বিত্তশালীরা যেমন আদিম রিপুর তাড়নায় বেসামাল হয়ে যেতো, বন্দরে তেমনি জাহাজীরা আদিম রিপুকে ব্রেক কষাতে পারে না কোনো কিছু দিয়েই।‌

চারিদিকে শুধু সমুদ্রের ঢেউ আর আকাশ। তার মধ্যে দিয়ে ছুটে চলেছে সাদা জাহাজ। জাহাজের কলকব্জা, কতো রকমের মাস্তুল, ডেক—সব যার্গন এতো সাবলীলভাবে কথায় কথায় টেনে এনেছেন অতীন বাবু। চোখের সামনে চলে আসে অতিকায় পিস্টন, জাহাজের পিচিং। কিছুতেই মনে হয় না, জাহাজটা শুধু একটা জাহাজ। মনে হয় এরও প্রাণ আছে। মানুষ যেভাবে বাঁচে অক্সিজেন দিয়ে, জাহাজটা তেমনি কয়লা টেনে নিচ্ছে প্রশ্বাসে। কোথাও এর একটা আত্মা না থেকে পারে না। অন্তত এমন একটা বিশ্বাস জন্মে যায় নাবিকের মনে।

সাড়ে চারশো পৃষ্ঠাব্যাপী এই উপন্যাস। তবুও এর ব্যপ্তি আরো গভীর। ষাটের দশকের এস. এস. সিউল-ব্যাংক পাঠককে গোটা পৃথিবীটাই ঘুরিয়ে আনবে। ভারত মহাসাগর, আটলান্টিক, মিসিসিপি নদী হয়ে ছবির মত দ্বীপ তাহিতি। সমুদ্রের জলের নিচে ফসফরাস জ্বলে উঠলে মনে হয় নক্ষত্রপুঞ্জ ঝলমল করছে জলের নিচে। সমুদ্র ও আকাশের অসীমতায় ডুবে পরিক্রমণ করে আসা হয় ব্যক্তি-জীবনের গণ্ডিও। প্রকৃতি ও মানুষের কি অক্ষুন্ন আদিমতা। অনন্ত পারাবারকে প্রদক্ষিণ করে বয়ে চলে এই মহাকাব্য।

অলৌকিক জলযানে কাটানো একটি বিকেল।
38 reviews12 followers
April 1, 2018
অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস “অলৌকিক জলযান”। “নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে” এর পরের খন্ড ৪৬৭ পৃষ্ঠার এ খন্ডটি। আগে ধারণা ছিল “মানুষের ঘরবাড়ি” এর পর। ধারণাটি ভাঙল। অলৌকিক জলযান” ই দ্বিতীয় খন্ড। পড়লাম এ সপ্তাহে। শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি চিটাগাং এ বইটি নিয়ে কাটল। বইটির শেষ দিকে এসে শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি হলেও অফিসের ঝামেলায় ( কাজের চাপে) শেষ করতে পারিনি। উসখুস নিয়ে রবিবারও কাটল।
বিধ্বস্ত জাহাজ থেকে চারজন বাদে সব বোটে নেমে গেছে। চারজনের একজন বাঙালি মুসলিম বুড়ো সারেং, একজন বাঙালি হিন্দু যুবক ছোট বাবু। ক্যাপ্টেন খৃষ্ট্রান স্যালি হিগিনস ও তার মেয়ে। এমতোবস্থায় বইটি শেষ না করে থাকা বড্ড কষ্টকর।
যাহোক। উপন্যাসটি শেষ করেছি। এটি এক মালবাহী জাহাজের বিভিন্ন ও বিচিত্র কাহিনী ও কথা। জাহাজীদের জীবন গাথা। বিভিন্ন জাতির লোকের জীবন এক জায়গার যেন এক সূতায় গাথাঁ। তাদের যাপিত জীবনের ব্যথা। জাহাজের ব্যবস্থাপনা, খালাসী ও অফিসারদের রান্নার খাওয়া। বন্দরে ভিড়লে নাবিকদের যৌন জীবন। মাটির প্রতি তাদের টান। তখন যে কোন দেশে অধিবাসীদের কাছে ডাঙাই যেন নিজ ভূম। জাহাজ ঝড়ের কবলে পড়লে অনিশ্চয়তা। সমুদ্রে বিভিন্ন লৌকিক ঘটনার অলৌকিক ব্যাখ্যা। কিছু দেখা ঘটনার বৈজ্ঞানিক কারণ না জেনে অলৌকিকতা আরোপ।
মাল টানা জাহাজে ছদ্মবেশে একমাত্র বালিকার যুবতী হবার গল্প । ক্যাপ্টেনের মেয়ে বনি ছেলে হিসেবে জ্যাক সেজে থাকলেও মেজ মিস্ত্রির কাছে ধরা পরে যাবার পর এক দোলাচল অবস্থা চলে। আছে ছোট বাবুর চরিত্র। “নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে” বইয়ের সোনা এখানে ছোট বাবু।
শেষ করে মন পুড়ছে । অবশেষে ক্যাপ্টেন স্যালি হিগিনস তার মেয়েকে ছলনা করে বিধ্বস্ত জাহাজ থেকে ছোটবাবুর সাথে নৌকায় তুলে দেয়। নৌকাও যে ডাঙা পাবে তা নিশ্চিত নয়। তবে চোখের সামনে তো আর মেয়ের মৃত্যু সহ্য করতে হবে না। যে মেয়ে এবং যে বাবা পরস্পকে ছেড়ে থাকতে পারবে না বলে ঝুঁকি নিয়ে ছেলে সেজে একদল যৌন ক্ষুধার্থ মানুষের মাঝে একমাত্র মেয়ে হয়ে মাসের পর মাস বসবাস করেছে সে মেয়েকে অসীম জলরাশির মধ্যে নৌকায় ভাসিয়ে দেয়া আর বাবা বিধ্বস্ত জাহাজে পড়ে থেকে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা। কী দুঃসহ।
এ সিরিজের বাকী থাকলো “ঈশ্বরের বাগান” । শীঘ্রই পড়ব। সংগ্রহে আছে।
Profile Image for Asif Khan Ullash.
146 reviews8 followers
November 29, 2023
অলৌকিক জলযান, নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে সিরিজের তৃতীয় কিস্তি। তবে সময়ের হিসেবে এটি মানুষের ঘরবাড়ি এর আগেই প্রকাশ পেয়েছিল। সেকারণেই হয়তো নীলকন্ঠ পাখির খোজে-র সোনাকে এই বইয়ে কিছুটা হলেও খুঁজে পাওয়া গিয়েছে।

বইতে আগের পর্বের প্রভাব খুব সামান্যই, মাঝে মাঝে শুধু প্রচ্ছন্ন আভাস রয়েছে এছাড়া এটি স্বতন্ত্র একটি উপাখ্যান। কয়লা চালিত মালবাহী জাহাজ এস এস সিউল ব্যাংক ও এর জাহাজীদের জীবন নিয়েই গল্প এগিয়েছে। বাংলা ভাষায় জাহাজ ও সমুদ্রে নাবিকদের জীবন নিয়ে এত বিশাল কলেবরের আর কোন উপন্যাস নেই সম্ভবত। দিনের পর দিন যে মানুষেরা মাটির সংস্পর্শ পায় না, অসীম দিগন্তবিস্তৃত সাগরের নীলই যাদের বাড়িঘর, স্বভাবতই তাদের জীবন-যাপনের ধরণ আপামরজনগণের থেকে অনেক আলাদা। লেখক নিজে একসময় নাবিক ছিলেন, জাহাজের জীবন তাই তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে চেনা।

বার বার স্ক্র্যাপ হয়ে যাওয়ার হাত থেকে বেঁচে যাওয়া প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত জাহাজ সিউল ব্যাংক নিজেই এই বইয়ের অন্যতম প্রধাণ চরিত্র, সেই জাহাজের নামেই বইয়ের নামকরণ “অলৌকিক জলযান”। অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায় কখনো কখনো মনে হয়েছে সিউল ব্যাংক জীবন্ত এক সত্ত্বা, সে এবং তার কাপ্তান হিগিনস যেন অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বইয়ের ক্যাপ্টেন স্যালি হিগিনসের সাথে হারমান মেলভিলের, মবি ডিক উপন্যাসের ক্যাপ্টেনের অনেক মিল লক্ষ্য করেছি। সম্ভবত, দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রে জাহাজ ও তার কাপ্তান একে অপরকে অবলম্বন করে বেঁচে থাকে বলেই এক জাদুবাস্তব সম্পর্ক গড়ে ওঠে তাদের মধ্যে।

মানুষের ঘরবাড়ি এবং পরবর্তীতে অলৌকিক জলযানেও লক্ষ্য করেছি অতীনবাবুর নারী চরিত্রগুলো অত্যন্ত দূর্বল। না এমন না যে গল্পে তাদের বিশেষ অবদান নেই, সেটা ভালোভাবেই আছে। কিন্তু কখনোই তারা শক্তিশালী চরিত্র হয়ে উঠতে পারে না। মানুষের ঘরবাড়ি এর লক্ষী বা মৃন্ময়ী; অলৌকিক জলযানের বনি এদের ইম্প্যাক্ট মূল গল্পে বেশ ভালোভাবেই আছে। কিন্তু চরিত্র হিসেবে এদের গঠন সুবিধার না। খুবই দূর্বল, মেলোড্রামাটিক এবং ‘ক্লিঙ্গি’। এখন পরবর্তী এবং দেশভাগ সিরিজের শেষ পর্ব, ঈশ্বরের বাগানেও একই জিনিসের আবর্তন হয় কিনা দেখতে হবে।
29 reviews6 followers
January 2, 2023
অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সোনা ট্রিলজির দ্বিতীয় বা তৃতীয় পর্ব হলো অলৌকিক জলযান। সমুদ্রে ভাসমান জাহাজি নাবিক জীবনের গল্প।বাংলা সাহিত্যে নদী কেন্দ্রীক প্রচুর গল্প উপন্যাস থাকলেও, সামুদ্রিক নাবিক জীবন নিয়ে লেখা কমই আছে। অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই লেখাটা বাংলা সাহিত্যে একটা অন্য রকম অবদান। সমুদ্রের অজানা অনেক রূপ জানতে পেরেছি বইটা থেকে। সমুদ্রে নাবিকদের ভয়, সাহস, আনন্দ বেদনা, রোগশোক ইত্যাদির গল্প বিস্তর পরিসরে উঠে এসেছে। অনেক অজানা অধ্যায়ও এই গল্পে পাওয়া যায় যেমন নাবিকদের যৌন জীবন, ভৌতিক ভয়ভীতি। এই উপন্যাসটা পড়ার সময় আমাকে একটা ঘোরের মধ্যে নিয়ে গিয়েছিল। শেষ দিকে কূল কিনারা হীন বিস্তৃর্ণ জলরাশির ভয়ঙ্কর চিত্রটা চোখের সামনে অনেকদিন ভাসছিল।
Profile Image for Gain Manik.
362 reviews4 followers
April 8, 2024
আসলে এটা সিরিজের দ্বিতীয় গল্প! মানুষের ঘরবাড়ি যেহেতু ভিন্ন চরিত্র নিয়ে। তবে এই ব‌ই পড়ে প্রথম দিকে কেমন একটা আকর্ষণ ধরে রাখতে পারিনি। নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে ব‌ইটা ছিল অসাধারণ। যাইহোক এই ব‌ই কিন্তু এসটি কোলেরিজকে পর্যাপ্ত ক্রেডিট দিয়েছে যেহেতু বারবার এলবাট্রসের কথা আসছে। এই বিষয়টি ভাল লেগেছে, আগে থেকে যেহেতু রাইম অফ দা এনসেন্ট মেরিনার পড়া ছিল তাই বুঝতে একটু সুবিধা হয়েছে!
Profile Image for Yeasmin Nargis.
195 reviews3 followers
December 30, 2025
গল্পটাকে সিরিজের অংশ না ভেবে যদি স্ট্যান্ড এলোন গল্প হিসেবে ভাবি তাহলে ভালো লাগবে বেশি। সমুদ্রযাত্রার এক বিশাল উপন্যাস, লোভ, লালসা, হিংসা, প্রেম, ভালবাসা, ব্যর্থতা, প্রতারণা ও অবিশ্বাসের এক বিশাল আখ্যান।
Profile Image for Anirban.
2 reviews
December 4, 2021
এমন থ্রিলার বাংলায় খুব একটা লেখা হয়নি।
Displaying 1 - 14 of 14 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.