হাসান আজিজুল হক তাঁর অর্ধশতাব্দীরও দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে বাংলা সাহিত্যকে উপহার দিয়েছেন বিচিত্র ও বিস্ময়কর অনেক ছোটগল্প আর জীবনদর্শন ও চিন্তারসে জারিত বহু সুস্বাদু গদ্য। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার, আগুনপাখির আগে পর্যন্ত তাঁর কাছ থেকে আমরা তেমন কোনো উপন্যাস পাইনি। যদিও দুটি ছোট উপন্যাস লিখেছিলেন, যাকে তিনি উপন্যাস না বলে উপন্যাসিকা বলেন। অথচ হাসান তাঁর লেখকজীবনের প্রায়-সূচনাতেই বয়স অনুপাতে বেশ ভালো উপন্যাস লিখেছিলেন এবং সেটি তৎকালীন বিখ্যাত লেখকদের বিচারে বেশ মূল্যও পেয়েছিল। শামুক নামের সেই রচনাটি আজও পর্যন্ত অপ্রকাশিত আর তারপর থেকে তিনি খুব ন্যায্যভাবেই 'ছোটগল্পের রাজকুমার' হিসেবে সর্বজনশ্রদ্ধেয়। কিন্তু সেই হাসান আজিজুল হক প্রায় এক দশক ধরে আর গল্প লিখছেন না, বরং লিখছেন আত্মজীবনী, চিন্তাশীল গদ্য এবং বিশেষভাবে উপন্যাস। তাঁর একটি গল্পের ভ্রুণ থেকে বিকশিত আগুনপাখি উপন্যাসটি নানাভাবে পুরস্কৃত-প্রশংসিত-আলোচিত হবার পরও তিনি অতি-সংযমী। তাই আগুনপাখির বহুদিন পর তিনি লিখলেন আর এক আশ্চর্য-আখ্যান সাবিত্রী উপাখ্যান। একজন সাধারণ কিশোরীর ধর্ষিত হওয়া থেকে তার নারী হয়ে ওঠা এবং জীবনসংগ্রাম এমন ভাষায় লিখেছেন তিনি, এভাবে হয়তো কেবল হাসান আজিজুল হকই লিখতে পারেন। - ( সূত্র: বইয়ের পেছনের মলাট হতে)
Hasan Azizul Huq (Bengali: হাসান আজিজুল হক) is a Bangladeshi writer, reputed for his short stories. He was born on 2 February, 1939 in Jabgraam in Burdwan district of West Bengal, India. However, later his parents moved to Fultala, near the city of Khulna, Bangladesh. He was a professor in the department of philosophy in Rajshahi University.
Huq is well known for his experiments with the language and introducing modern idioms in his writings. His use of language and symbolism has earned him critical acclaim. His stories explore the psychological depths of human beings as well as portray the lives of the peasants of Bangladesh.
He has received most of the major literary awards of Bangladesh including the Bangla Academy Award in 1970.
দীর্ঘ সাহিত্য জগতে বাংলা সাহিত্যে হাসান আজিজুল হক উপহার দিয়েছেন বিচিত্র ও বিস্ময়কর অনেক ছোটগল্প আর জীবনদর্শন ও চিন্তারসে ভরা অনেক গদ্য। "আগুন পাখি" উপন্যাসটি তাঁর প্রথম লেখা উপন্যাস। এই উপন্যাসের অনেক পরে তিনি লেখেন "সাবিত্রী উপাখ্যান " উপন্যাসটি।তাঁর কিছু ছোট গল্পও আছে। আবার কিছু লেখা অপ্রকাশিত ও থেকে যায়।
সাবিত্রী দেবী শ্রীকৃষ্ণপুরে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে। দাদা গুরুদাস। জন্মের পরপরই তার মা মারা যায়। বাড়ীর ঝি এর মেয়ে নিশিবালার কাছেই সাবিত্রী বড় হতে থাকে।তবে তার খুব ছোট বেলাতেই পাশের বাড়ীর দুকড়ি চট্টোপাধ্যায়ের সাথে বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে পনের ষোল বছর বয়স পর্যন্ত সে মাত্র তিনবার শ্বশুর বাড়ীতে গেছে তবে একবারও স্বামীর সাথে দেখা হয়নি। আর শ্বশুর ভাতের খরচ বাঁচাতে ছেলের বৌকে নিজেদের বাড়ীতে রাখার কথা কখনও বলেও নি।
সাবিত্রীর সতেরো বছর বয়সের সময় একদিন তার স্বামী দুকড়ি এসে তার কাছে ১০টাকা চায়, কারন সে কলকাতায় যাবে কাজের খোঁজে, লাগবে ১০ টাকা কিন্তু তার বাবা তাকে ২টাকা দিয়েছে। সাবিত্রী ঝিকে দিয়ে নিজের সোনার গয়না বন্ধক রেখে স্বামীকে ১০টাকা এনে দেয়। পরের বছর আষাঢ় মাসে দুকড়ি গয়না ছাড়ানোর জন্য সাবিত্রী কে ১০ টাকা পাঠায়। কিন্তু ঝি নিশিবালা বার বার টাকা নিয়ে গেলেও গয়না ফেরত পায় না কারন গয়নাটি তখন অন্যের কাছে বাধা পড়ে।
এক শীতের পূর্ণিমায় দুকড়ির বাড়ীতে আসার কথা তাই সেদিন সাবিত্রী নতুন শাড়ী ও গয়না পরে স্বামীর অপেক্ষায় থাকে। সেই সন্ধ্যায় পাশের বাড়ীর নলিনী কেওট এর স্ত্রী এসে সাবিত্রীকে নিয়ে যায় কারন তার সেই বন্ধক রাখা সোনার গয়নাটি তার হতেই ফেরত দিবে দূর্গাপদ। দাদা বাড়ীতে না থাকায় এবং নিশিবালাকে কাছাকাছি না পেয়ে সাবিত্রী নিজের ইচ্ছা না থাকলেও গয়না পাওয়া জন্য নলিনীর স্ত্রীর সাথে যায় এবং হঠাৎ করে বাগানের কাছ থেকে অন্ধকারে মাঝে মুখ চেপে তাকে তুলে নিয়ে যায় তিনজন লোক। তেলা, বটকৃষ্ণও সবুর তাকে অজয়ের পাড়ে নিয়ে যায় এবং ধর্ষণ করে।
তারপর অবলম্বন হীন জীবনটা বয়ে চলে সাবিত্রী।
মানুষের জীবনটা বড়ই বিচিত্র। জীবনের প্রতিটা স্তরে আছে নানান ঘাত প্রতিঘাত। তবে মেয়ে মানুষের জীবনটা একটু বেশীই বিচিত্র এবং রহস্যে ভরা। সাবিত্রী দেবীর রহস্যে ভরা জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাহিনী লেখক তুলে ধরেছেন লেখক। একজন সাধারন কিশরীর মা ছাড়া বড় হওয়া। বাবাকে হারানো। বিয়ে হবার পরেও ভাইয়ের আশ্রয়ে থাকা। কিশোরী থেকে নারী হয়ে ওঠা। জীবনসংগ্রামে টিকে থাকলেও বেঁচে না থাকা। অস্তিত্ব থাকলেও অস্তিত্বহীন ভাবে বাঁচা, সব কিছুকে এভাবে বর্ণনা দেওয়া হয়তো শুধু লেখকই পক্ষে সম্ভব।সময়টা তখন ১৯৩৮। লেখক সেই সময়ের সামাজিক প্রেক্ষাপটটাও নিখুঁত ভাবে তুলে ধরেছেন।তুলে ধরেছেন অবিভক্ত বাংলার চিত্র।
বেঁচে থাকাটা সহজ কিন্তু ভালোভাবে বাঁচাটা কঠিক। কখনও কখনওকিছু কিছু জীবন থমকে যায় কিন্তু শেষ হতে পারে না। আবার হাজার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়েও যায় না। কোন এক রকম ভাবে চলে। তাতে পৃথিবীর কোন কিছুই যায় আসে না এই সব জীবনের বোঁচে থাকা বা হারিয়ে যাওয়াতে। সেই সময়ের সমাজ ব্যবস্থা বা পরিবারের অবহেলার সাবিত্রী দেবীর অস্তিত্ব টেকেনি।সেই সাবিত্রী দেবীরা এই সময়ে এসে এখনও হয়তো কোন না কোন ঘরে মরেও বেঁচে আছে।
মদ্র দেশের নিঃসন্তান রাজা-রানী, অশ্বপতি এবং মালবী সন্তানের আশায় সূর্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সাবিত্রীর নামে পুজো দিয়ে এক কন্যা সন্তান লাভ করেন। দেবীর প্রতি সম্মান জানিয়ে মেয়ের নামকরণ হয় 'সাবিত্রী'। কালক্রমে সেই মেয়ে নিজের সতীত্বের বিশাল ব্যাপক নজির রাখেন। যেকারণে হিন্দু পুরাণে তিনি 'সতী সাবিত্রী' হিসেবে খ্যাত। হাসান আজিজুল হকের দ্বিতীয় উপন্যাস "সাবিত্রী উপাখ্যান" এর কেন্দ্রিয় চরিত্র সাবিত্রী'র নামকরণ সেই দেবী কিংবা রাজকন্যার নামানুসারে হয়েছিল কিনা জানা নেই। তবে সূর্যের আলো কিংবা তথাকথিত সতীত্বের অহংকারের ঠিক বিপরীতে চরিত্রটির নির্জীব অবস্হান। এই অবস্হান নিয়তি নির্ধারিত ছিল না। কিছু পশুর অধম মানুষ আর বিকলাঙ্গ সমাজ সাবিত্রীর পরিণতির জন্য দায়ী। যে কারণে, পরবর্তীতে আলোহীনতার মাঝে সাবিত্রীর স্বস্তি খুঁজে ফেরা। বিকারগ্রস্হ হয়ে মৃতপ্রায় একটা কিশোরী জীবন টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া মর্মান্তিক বার্ধ্যকের দিকে(পঁচাশি বছর বেঁচে ছিলেন সাবিত্রী)।
"সাবিত্রী উপাখ্যান" হাসান আজিজুল হকের মনগড়া কাহিনির ভিত্তিতে রচিত উপন্যাস না। বিংশ শতকের গোড়ার দিকে রাঢ় বাংলার শ্রীকৃষ্ণপুরের সাবিত্রী নামের এক কিশোরীকে সদলবলে অপহরণ এবং সম্মিলিত ধর্ষণের পর তাকে অপরাধী দলের পাপীষ্ঠ সবুরের উপর ছেড়ে দিয়ে অন্যরা সরে পড়ে। নিরাপত্তার কারণে এরপর তাকে নিয়ে সবুর শুরু করে ভ্রাম্য জীবন। ভ্রমণকালীন সময়ে সবুরের কুকর্মের সঙ্গী হয় বক ধার্মিক সৈয়দ সাহেব, সবুরের বন্ধু হুদা, হুদার আত্মীয় মওলাবখ্শ। হরির লুটের জিনিসে ভোগের আনন্দ তো ভাগেও! সাবিত্রী তখন ভিন্ন কোনো সত্তার অধিকারী নয়, কেবলি মাংসের দলা। যার উপর নিরন্তর চলে নেড়ি কুকুরের মত কিছু পুরুষের 'মচ্ছব'। তারই পরিণতিতে একজন প্রাণবন্ত কিশোরীকে প্রায় নো ম্যান্স ল্যাণ্ডের বাসিন্দা হয়ে পরবর্তী জীবন পার করে যেতে হয়। সাবিত্রীর সেসব ক্লেদাক্ত আর মর্মযাতনায় ভরা দিনরাত্রির কাহিনি নিয়ে এ উপন্যাস।
হাসান আজিজুল হকের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস "আগুন পাখি"র ভীষণ সাদামাটা কথক নারী চরিত্রটির সময় মত প্রজ্ঞাময় বলিষ্ঠতায় উচ্ছ্বসিত- মুগ্ধ, এই পাঠক। আগ্রহ নিয়ে সেরকম কিছুর আশায় তাঁর দ্বিতীয় রচনা পাঠের পর উপাখ্যানে সাবিত্রী চরিত্রটির প্রতিবাদহীনতা এবং জীবনকে বঞ্চিত করতে দেখে যুগপৎ ব্যথিত এবং হতাশই লেগেছে। সবুর যখন তাকে স্হান থেকে স্হানান্তরে নিয়ে বেড়াচ্ছে, সেসব সময়ে সাবিত্রীর ভাবনায় যে চমক ছিল, ছিল গভীর জীবনবোধের ইশারা; জীবনের ক্ষেত্রে তার যথার্থ প্রয়োগের কোন লক্ষণই দেখা যায়নি। মানছি, এক্ষেত্রে সমাজ-সংসার তাকে সঙ্গ দেয়নি সেভাবে, সময়কালটাও একটা বড় ফ্যাক্টর। কিন্তু যে মানুষ নিজের উপর ঘটে যাওয়া চরম অন্যায়ে নিজেকে মৃত্যুর হাতে সঁপে না দিয়ে সাহসের সাথে ভাবতে পেরেছিল 'কেউই বাঁচা বাদ দেবে না, তাহলে সেই বা দেবে কেন?' তার সে ভাবনাকে সঙ্গী করে সে তো বাঁচার আনন্দে বেঁচে নিতে পারতো! তা সে করেনি, বরং বলা ভালো করতে দেয়া হয়নি, তাই যাপনের আগ্রহ হারিয়ে পূর্ণিমার আলোকে অচ্ছুৎ রেখেছে বাকী জীবন, নানান বিকারে হয়েছে আক্রান্ত। অন্যের পাপে নিজেকে শাস্তি দেবার এই ব্যাপারটায় মন সত্যিই ভারাক্রান্ত হয়েছে।
নিরন্তর ভাবনায় সাবিত্রী তার মনের ঘৃণা যথেচ্ছা উপুড় করেছে, 'পিথিমির মদ্দা কোনো শোওর যেন তার কাছে না আসে' কিন্তু ঘটনাকালে(প্রথমবার বাদে) সে প্রতিবাদহীন থেকে গেছে। তার এই প্রতিবাদহীনতা ছিল পীড়াদায়ক। সবুরের মণ্ডুটা আঁশবটি দিয়ে কোপ বসানোর জন্যেও সে হাড়িদিদির উপস্হিতি কামনা করেছে, স্বপ্রণোদিত হয়ে বটির সন্ধানে উন্মুখ হয়নি। নারীর এহেন প্রতিবাদহীনতায় পুরুষতান্ত্রিক সমাজ আর তার কাছে মেরুদণ্ড বন্দক রাখা পুরুষ সকল যথেচ্ছা সুযোগ নি��ে থাকে। সাবিত্রীকেও তাই ছাড় দেয় না সবুর বা তার পরিচিতরা।
একই সুযোগে ঠুলি পরা মানুষের দ্বারা তাকে নিয়ে রচিত হয়েছে মুখরোচক গান, 'সাবিত্রীর এই যাওয়াতে ছেড়েছে পতি। কী কারণে মেয়েমানুষ এমন কুকর্মে মতি।' বটেই তো। পতি পরম গুরু, সে যতই মেরুদণ্ডহীন হোক, দুকড়ি আয় উপার্জনের মুরোদ নাই থাকুক, নারীর জন্য তার চে' বড় সহায় আর কে হতে পারে! সহায় কেউ হয়নি সাবিত্রীর, না স্বামী, না সমাজ না পুলিশ প্রসাশন বা বিচার ব্যবস্হা। তাই এমন অপরাধের শাস্তি হিসেবে একজনেরও মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন হয়নি। নানা মেয়াদের জেলবাসের শাস্তি সদ্য বিবাহিতা কিশোরী এক মেয়ের জীবনটা তছনছের মূল্য হিসেবে ধার্য হয়েছিল মাত্র। সাবিত্রী অপহরণ ঘটনা নিয়ে হিন্দু-মুসলমান সংঘর্ষে লাশ পড়লেও তাতে সাবিত্রীর ভাগ্যের কিস্যু হেরফের হয়নি। ভাইয়ের সংসারের এককোণে বাতিল হওয়া আসবাবের মতই জীবনকে বরণ করে নিতে হয়, আগুন পাখি হয়ে ওঠার মন্ত্র সাবিত্রীর জানা ছিল না!
বিংশ শতকের গোড়ায় সাবিত্রী তার ঈশ্বরের প্রতি প্রশ্ন রেখেছিল 'হায় ভগোমান পিথিমিতে মেয়ে মানুষ কেন জন্মায়!' একবিংশ শতকেও এমন আহাজারিতে পৃথিবীর বাতাস সমানভাবে ভারী হয়। ক্ষমতার রাজনীতিতে ভারসাম্য রক্ষায় একজন পূর্ণিমা রানীর জায়গায় বসানো হয় নোয়াখালীর সুবর্ণচরের চার সন্তানের হতভাগী জননীকে। যুদ্ধ বিগ্রহ, ক্ষমতায় টিকে থাকার লড়াই, কিংবা ব্যক্তিগত আক্রোশ মিটাতে নারী আজও দুপেয়ে সারমেয়দের লক্ষ্যবস্তু। সবুরদের মতো সারমেয়রা আজীবনই পশু থেকে যায়। মানুষ হতে পারেন না। তাদের থাবার নীচে নারী শরীর কেবলি মাংস পিণ্ড।
অত্যন্ত পছন্দের লেখকের কাছ থেকে বহুদিনের অপেক্ষার পর পাওয়া "সাবিত্রী উপাখ্যান" নিয়ে যতটা আশা ছিল, তা পুরোপুরি মিটেনি যেন। কাহিনি বর্ণনার মাঝে মাঝে এই ঘটনার সাক্ষি সবুদের ডকুমেন্টেশনের উপস্হাপনা উপভোগ্য লাগেনি মোটেও, বরং কোথাও কোথাও কাহিনি ছন্দ হারিয়ে বিরক্তি এনেছে। এই উপন্যাসের সবচে' বড় অলংকার হাসান আজিজুল হকের জাদুকরী ভাষার কারুকার্য। এ বইতেও তার নজির কম নেই। তাঁর অনবদ্য শব্দচয়ন আর ভাষাভঙ্গির প্রতি পাঠক মন নতজানু হবে বলেই বিশ্বাস। ২১৫ পাতাকে আমার বাহুল্যই মনে হয়েছে।
শুরুটা চমৎকার যখন লেখক সদর্পে ঘোষণা করেন তিনি সর্বজ্ঞ কারন তিনি জানেন বাইরে কী ঘটেছিলো, আবার জানেন মনের ভেতরে তলায় কিংবা মাঝে যা কিছু ঘটে গেছে। লেখকের ছোটগল্প আর আগুনপাখি পড়বার পরে এটুকু নিশ্চিত জানা যায়, লেখকের এক অসাধারণ ক্ষমতা আছে গল্প বলার, সেটাই ম্যাজিসিয়ানের আস্তিনে রাখা নিশ্চিন্ত আয়ুধ তবে তা হয়ত উপুর্যুপরি ব্যবহারে ক্লান্ত। কখনো কখনো মনে হয়েছে সরলরৈখিক গল্প পাঠককে শুধুমাত্র শেষ পর্যন্ত আঁকড়ে রাখতে চেয়ে এই লেখাকে করে ফেলেছে আরেকটা বড় গল্পের গতানুগতিক প্রয়াস। পাঠক হিসেবে মনে হয়েছে, খানিকটা নয় অনেকটাই অবিচার লেখক করেছেন নিজের ওপর আর অন্ধকার সচেতন কোন সাবিত্রীর করুণ হৃদয়স্পর্শী উপাখ্যানের ওপর।
প্রেক্ষাপট বইটি বাস্তব ঘটনার উপরে লিখিত। সাবিত্রি ব্যানার্জি নামক একজন ব্রাহ্মণ মহিলার শিশুকাল থেকে শুরু, তার কিশোরি বয়সে ক্রমাগত ৮ মাস অনেক ব্যক্তি কতৃক ধর্ষণ ও তাকে খুঁজে পাবার পর মামলার সাক্ষীদের জবানবন্দির উপর ভিত্তি করে ক্রমান্বয়ে সাজানো হয়েছে বইটি। বইটিতে ফুটে উঠেছে কিছু পুরুষ মানুষের পাশবিক চেহারা, নারীদেহ বাঘের থাবার মত ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া এর মাঝেও সাবিত্রির মরেও বেঁচে থাকার ঘটনা। ফুটে উঠেছে ব্রিটিশ ভারতের পুলিশের দায়সারা ভাব, কোন কিছুতেই মূল ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় পরিণত হবার কাহিনী।
লেখনী লেখকের লেখনী ভাল। বইটি আমি একদিনে দুই বসায় শেষ করেছি। বইটি ২২২ পৃষ্ঠার মত। বর্ণনায় লেখকের লেখার মাঝে মাঝে সাক্ষীদের সাক্ষ্যের নথি থেকে বাংলা অনুবাদ দেয়া হয়েছে।
শুরু গল্পটি শুরু হয় বৃদ্ধা সাবিত্রির জোসনা না অমাবস্যা এই ঘোর নিয়ে। সে সবসময়ই জানতে চাইত চাঁদ আছে কি নেই। চাঁদ না থাকলে তিনি খুশি থাকতেন। এর কারণ হিসেবে আমরা দেখি তাকে প্রথমবার অপহরণ করে ধর্ষণ করা হয়েছিল জোস্না রাতে ভরা চাঁদের আলোয় খোলা মাঠের নিচে।
কাহিনি সংক্ষেপ সাবিত্রিরা তিন ভাইবোন। দুইভাই একবোন। সাবিত্রির বড় দাদা মারা যান তার জন্মেরও আগে। সাবিত্রির মা মারা যায় তার জন্মদানের সময়ই। এরপর সে মানুষ হতে থাকে তার বাড়ির কাজের লোকের হাতে। কিন্তু তিনিও মারা যান কলেরায়। এরপর সাবিত্রির দ্বায়িত্ব ঘাড়ে নেন তার চেয়ে মাত্র কয়েক বছরের বড় নিশিবালা যাকে সাবিত্রি সম্বোধন করে দাড়িদিদি বলে। দাড়িদিদি মাত্র ১০ বছর বয়স থেকেই মাতৃস্নেহে মানুষ করতে থাকে সাবিত্রিকে। সাবিত্রির যখন ৭ বছর বয়স তখন তার বিযে হয় দুকড়ি চট্টোপধ্যায় নামক একজন লোকের সাথে। সাবিত্রির বাবা এর কিছুদিন পর মারা যান। সাবিত্রির দাদা গুড়ুদাস ব্যানার্জির কাপড়ের ব্যাবসা। সে সেগুলো নিয়েই ব্যস্ত থাকে। তার সাথে তেমন দেখা সাক্ষাত হয় না। সাবিত্রির স্বামী কলকাতা যাবে বলে সাবিত্রির কাছে কিছু টাকা জোগাড় করে দিতে বললে সে তার বিয়ের সময় বাবার দেয়া একটি অনন্ত নিশিবালার মাধ্যমে দুর্গাদাস ওরফে তেলার কাছে বন্ধক দিয়ে আট টাকা দুকড়িকে দেয়। দুকড়ি কলকাতা গিয়ে একটি মুদি দোকানে চাকরিতে ঢোকে। কিছুদিন পর সে দশ টাকা পাঠিয়ে দেয় অনন্তটি ছাড়িয়ে নেবার জন্য। কিন্তু দুর্গাদাস গড়িমসি করতে থাকে। তিন মাস পেড়িয়ে গেলেও সে বিভিন্ন টালবাহানা করতে থাকে। এরপর জানায় সে সেটি আরেকজনার কাছে বন্ধক দিয়েছে। পরে বলে অনন্তর মালিক এসে অনন্তটি যেন নিয়ে যায়। সাবিত্রি এতে অস্বীকৃতি জানায়। ইতিপূর্বে সাবিত্রির সাথে তার স্বামীর সহবাস হয় নাই। কিন্তু ইতিমধ্যে সে বয়সন্ধির পর নারীতে পরিণত হয়। এরপর যেদিন সাবিত্রির স্বামীর কলকাতা থেকে আসার কথা সেদিন ডোম বউ সরোজিনি (নলিন কেওটের স্ত্রী) তাকে বলে তেলা তাদের বাসায় বসে আছে। সে গেলে অনন্তটি ফেরত দেবে। প্রথমে রাজি না হলেও সাবিত্রি পরে রাজী হয়। নলিনের হাতে টাকা দিয়ে অনন্তটি আনতে গেলে আমবাগানের অন্ধকারে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তেলা, বটা ও সবুর। এরপর শুরু হয় ক্রমান্বয়ে ধর্ষণ। কিছুদিন পরথেকে সবুর সাবিত্রিকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যায় এবং সে এবং তার পরিচিত পুরুষরা তাকে ধর্ষণের পর ধর্ষণ করতে থাকে। একবার বর্ধমান একবার কলকাতা একবার বগুড়া এভাবে আটমাস তার উপর পাশবিক অত্যাচার করে একদিন রাতে তাকে বর্ধমানে ছেড়ে দিয়ে সবুর পালিয়ে যায়। এরপর যে ভদ্রলোকের বাড়ির সামনে সাবিত্রি সারারাত ছিল ভোরবেলা সেই ভদ্রলোক তাকে পুলিশে সোপার্দ করে। এবং রাষ্ট্রীয় পক্ষ থেকে মামলা করা হয়। মোটামুটি সবাইকে চিহ্নিত ও গ্রেপ্তার করা হয়। তবে তাদের কি শাস্তি হয়েছিল এ ব্যাপারে লেখক তেমন কোন তথ্য পান নি। তবে তিনি এইটুকু উল্লেখ করেন যে সম্ভবত কারোরই ফাঁসি বা জাবজ্জীবন কারাদান্ড হয় নাই।
এই ঘটনা ছড়িয়ে পড়লে এটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাতে রূপ নেই। বিভিন্ন গ্রামে একের পর এক লাশ পড়তে থাকে। কোনদিন হিন্দু গ্রামে, কোনদিন মুসলিম গ্রামে।
বর্তমান বনাম অতীত বইটি থেকে আমরা দেখি এই ঘটনা কি পরিমাণ আলোড়ন তুলেছিল সেই সময়। এ থেকে বোঝা যায় সেই সময় হয়ত এই ঘটনা গ���লো এখনকার মত বেশি ছিল না। এই ঘটনা ধামাচাপা দেবার জন্য মেয়েটিকে মেরে ফেলার কথা খুব স্বল্প সময়ের জন্য উঠলেও তা করা বা এর চেষ্টা করা হয় নাই যেটি আমরা বর্তমানে হরহামেশাই দেখতে পাই।
This entire review has been hidden because of spoilers.
I remember reading this book in one sitting, curled up on the couch of my grandma's living room in Malibagh on a quiet afternoon. Everyone else was taking a vatghum (post-lunch-nap) and I was so engrossed in this book that I didn’t even notice when time rolled by! I was breathless after finishing this book.
চরম পর্যায়ের যৌনতায় ভরপুর। যৌনতা হলো একটি রসালো বিষয়, এজন্যই পাঠক পুরো বইটা শেষ করতে পারছে। একজন নারীকে ৪-৫ জন মিলে কিভাবে ধর্ষণ করছে তার রসালো বর্ণনাই এই উপন্যাসের মূল কাহিনী।